রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ও বাংলাদেশ সেনাবাহিনী নির্মাণ করেছে ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে। পূর্বাচল ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে তথা ৩০০ ফিট সড়ক নামেই এটি সমাধিক পরিচিত। প্রশস্ততা, কার্পেটিংয়ের গুণগত মান, দৃষ্টিনন্দন ইত্যাদি কারণে সড়ক যোগাযোগের পাশাপাশি পর্যটন স্পট হয়ে উঠেছে ৩০০ ফিট সড়ক। মোটরসাইকেল ও গাড়ি রেসিংয়ের ঘটনা-দুর্ঘটনা অহরহ ঘটছে।
দেশের অন্যতম প্রশস্ত ১৪ লেন বিশিষ্ট এই সড়কটিতে পাঁচটি ‘অ্যাট গ্রেড’ ইন্টারসেকশন রয়েছে। পূর্বাচল ও পূর্বাচল প্রকল্প ছিল ড্রিম প্রজেক্ট। ধারণা ছিল ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে আধুনিক নগরায়নের এক অনন্য উদাহরণ হবে। সড়কটিতে নিরাপদ, দ্রুত ও শৃঙ্খলাবদ্ধ যোগাযোগ নিশ্চিত হবে।
কিন্তু বাস্তবচিত্র ভিন্ন। প্রতিনিয়ত এই সড়কে ঘটছে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। উদ্বোধনের পর থেকেই ভয়াবহ সব দুর্ঘটনায় শিরোনাম হচ্ছে ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়ে। অনেকের প্রাণ ঝরেছে, অনেকেই আহত হয়ে পঙ্গুত্ব বরণ করেছেন। সর্বশেষ ৩ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সংঘটিত মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনাটি একটি দৃষ্টান্ত। দুর্ঘটনাটি আবারো জনমনে গভীর উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে।
সাধারণত সড়ক দুর্ঘটনার জন্য কেবল চালকদের বেপরোয়া গতি বা জনসচেতনতার অভাব দায়ী করা হয়। প্রকৃতপক্ষে বাস্তবতা ভিন্ন। সড়ক দুর্ঘটনার মূল অনুঘটক প্রযুক্তি ব্যবহারের ব্যর্থতা, অদক্ষ বাস্তবায়ন এবং আইন প্রয়োগের দুর্বলতা।
২৪ কনস্ট্রাকশন ব্রিগেডের অধীনস্থ ২৫ ইসিবি কর্তৃক যানবাহনের গতি ও যানজট নিয়ন্ত্রণে বিপুল অর্থ ব্যয়ে Adaptive Traffic Management System (ATMS) এবং আধুনিক Intelligent Traffic System (ITS) ভিত্তিক সিগন্যাল স্থাপন করা হয় ৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে। কিন্তু এসব সিগন্যাল কার্যকর হয়নি। বরং সড়ক ব্যবহারকারীরা বিভ্রান্ত হচ্ছে। দুর্ঘটনাও প্রতিরোধ করা যাচ্ছে না। কেননা অ্যাট গ্রেড ইন্টারসেকশনে কোনো প্রকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবহার করার কথা নয়।
অ্যাট গ্রেড ইন্টারসেকশনে আন্তর্জাতিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সূত্রানুসারে ‘প্রায়োরিটি কিউ’ প্রথা অনুসরণ করার কথা। তবে সেক্ষেত্রে গাড়ির চালকগণকে প্রয়োজনীয় প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা গ্রহণ করা প্রয়োজন। যেটি বাংলাদেশের মতো দেশে দীর্ঘ প্রক্রিয়া। সেক্ষেত্রে এক্ষুনি বসুন্ধরা, জলসিঁড়ি, পিংক সিটি ও অপরাপর আবাসিক এলাকার প্রবেশমুখে সড়ক দুর্ঘটনা এবং সড়কের ট্রাফিক দুর্ভোগ এড়াতে উল্লেখিত আধুনিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা সংযোজন করাই শ্রেয়।
৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে বর্তমান সমস্যার মূল কারণ হলো অভিজ্ঞতাহীন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান পেন্টা গ্লোবাল। অভিযোগ রয়েছে, তারা অভিজ্ঞ প্রতিষ্ঠান BIT & CES JV কর্তৃক প্রস্তুতকৃত কার্যকর সমাধানকে পাশ কাটিয়ে প্রতারণামূলকভাবে দাহুয়া (Dahua) থেকে হার্ডওয়্যার এবং অসম্পূর্ণ সফটওয়্যার কিনে প্রকল্প শেষ করে। সবচেয়ে গুরুতর বিষয় হলো, প্রকল্পে দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ ও কার্যকারিতা নিশ্চিতে কোনো চুক্তি হয়নি।
চুক্তির দূর্বলতার কারণে কয়েক কোটি টাকা ব্যয়ের এই প্রকল্প কার্যত অচল হয়ে আছে। অথচ BIT & CES JV ইতোমধ্যে ঢাকার গুলশানে সফলভাবে অপারেশন করছে। গুলশানে ট্রাফিক সিগন্যাল নিয়ন্ত্রণ, ই-পুলিশিং, ট্রাফিক আইন অমান্যকারী গাড়িতে স্বয়ংক্রিয়ভাবে মামলা দেওয়া হচ্ছে BIT & CES JV এর সফটওয়্যারের মাধ্যমে। গুলশানের মতো ব্যস্ত ও গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ইতোমধ্যে ট্রাফিক শৃঙ্খলা বেড়েছে। যানজট সহনীয় হচ্ছে।
৩৬ জুলাই এক্সপ্রেসওয়েতে বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা অপারেশনাল ও প্রযুক্তিগত ব্যর্থতা। যেটা জননিরাপত্তার সরাসরি হুমকি এবং আর্থিক অপচয়ের জ্বলন্ত দৃষ্টান্ত। প্রতিদিনের দুর্ঘটনা নাগরিকদের জীবনের ঝুঁকি বাড়াচ্ছে। কার্যকর সমাধানহীনতার কারণে জনমনে হতাশা ও ক্ষোভ বাড়ছে। এটি প্রমাণ করছে প্রকল্প অনুমোদন, নকশা এবং বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহির অভাব রয়েছে।
এই সংকট নিরসনে ফিফটি-ফিফটি বা আংশিক সমাধান যথেষ্ট হবে না। মানুষের জীবনের দাম ও নিরাপত্তা বিবেচনা করতে হবে। প্রশস্ত ও দৃষ্টিনন্দন সড়ক তৈরি করে মৃত্যুফাঁদ জারি রাখা কাজের কথা নয়। প্রয়োজন পূর্ণাঙ্গ ও স্বাধীন মূল্যায়ন। তার ভিত্তিতে অভিজ্ঞ পরামর্শক ও দক্ষ ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পুনরায় ATMS ও ITS বাস্তবায়ন করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি রক্ষণাবেক্ষণ চুক্তি বাধ্যতামূলক করতে হবে।
নিরাপদ সড়ক নিশ্চিতের জন্য কিছু পদক্ষেপ নেওয়া অতিব জরুরি। ট্রাফিক আইনের কার্যকর প্রয়োগে পুলিশের সক্রিয় ভূমিকা নিশ্চিত করতে হবে। সেই সাথে অতি প্রয়োজনীয় E-Police ও স্বয়ংক্রিয় জরিমানা ব্যবস্থা, সেন্ট্রাল ট্রাফিক পুলিশ কমান্ড সেন্টারের সঙ্গে সাপোর্ট সফটওয়্যারের সংযোজন ও ব্যবহার নিশ্চিত করতে হবে।
অতিরিক্ত গতি, সিগন্যাল অমান্য ও বেপরোয়া ড্রাইভিংয়ের ঝুঁকি সম্পর্কে জাতীয় পর্যায়ে সচেতনতা ক্যাম্পেইন চালাতে হবে। অর্থদণ্ড আরোপ ও মওকুফের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ ও স্বাধীন ম্যাজিস্ট্রেট-পুলিশ যৌথ কমিটি গঠন করা প্রয়োজন। জরিমানা থেকে প্রাপ্ত রাজস্ব স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারের মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট সব সংস্থার মধ্যে ন্যায়সঙ্গতভাবে বণ্টন নিশ্চিত করতে হবে। ট্রাফিক আইন লঙ্ঘনের ক্ষেত্রে জরিমানার অর্থের স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন বহুদিনের।
সময়টা এখন প্রযুক্তির। প্রযুক্তির সঠিক ব্যবহার ছাড়া এই সময়ে ট্রাফিক ব্যবস্থাপনা ও দুর্ঘটনা রোধ সম্ভব নয়। ITS প্রকল্পে শুধুমাত্র অভিজ্ঞ ও দক্ষ প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে পরিকল্পনা ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পারলে সড়কের বিশৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা বহুলাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব। দীর্ঘমেয়াদে অ্যাট গ্রেড ইন্টারসেকশনে পর্যায়ক্রমে কোনো প্রকার ট্রাফিক সিগন্যাল ব্যবহার করার প্রয়োজন নেই। অ্যাট গ্রেড ইন্টারসেকশনে আন্তর্জাতিক ট্রাফিক ব্যবস্থাপনার সূত্রানুসারে প্রায়োরিটি কিউ প্রথা অনুসরণ করতে হবে। তার জন্য গাড়ি চালকদের এই সংক্রান্ত বিষয়ে প্রশিক্ষিত করে তুলতে হবে। গাড়ি চালকদের সচেতনতা, উচ্চতর প্রশিক্ষণ, সড়ক ব্যবস্থাপনার কারিগরি জ্ঞান সীমিত। এই বিষয়ে সরকারেরও কোনো পদক্ষেপ দেখা যায় না। দক্ষ, প্রশিক্ষিত ও সুস্থ চালক সড়ক যোগাযোগে শৃঙ্খলা ও দুর্ঘটনা রোধে ভীষণ কার্যকর ব্যবস্থা।
পূর্বাচল এক্সপ্রেসওয়ে বাংলাদেশের নগরায়নের একটি আদর্শ প্রতীক হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু আজ এটি অনিয়ম, অপচয় এবং প্রযুক্তিগত ব্যর্থতার প্রতিচ্ছবি। এখন সময় এসেছে দায় নির্ধারণের, স্বচ্ছ তদন্তের এবং কার্যকর সমাধানের। অন্যথায়, পূর্বাচল সড়ক আরও বহু প্রাণহানির সাক্ষী হবে। জনসাধারণের আস্থা হারাবে রাজউক ও সেনাবাহিনীর উন্নয়ন কার্যক্রমে।
.
লেখক: সড়ক ও পরিবহন ব্যবস্থাপনা বিশেষজ্ঞ

