নিজস্ব প্রতিবেদক:
বেশ কয়েক বছর ধরেই প্রসার হচ্ছে দেশে ই-কমার্স ব্যবসা। তবে করোনা মহামারী শুরু হলে নতুন নতুন বেশ কিছু কোম্পানি রাতারাতি ফুলে ফেঁপে উঠে। বাজারমূল্যের চেয়ে অর্ধেক দামে পণ্য বিক্রির প্রলোভন দেখিয়ে গ্রাহকের হাজার কোটি টাকা হাতিয়ে নিয়েছে বেশ কিছু প্রতিষ্ঠান।
অনেকে অর্ধেক দামে পণ্য কিনে পরে বেশি দামে বিক্রির আশায় এসব কোম্পানিতে লাখ লাখ টাকার অর্ডার করেছেন। যাদের অনেকেই আবার নেমেছেন রাজপথে। তবে গ্রাহকদের পণ্য বা টাকা ফেরত পাওয়া নিয়ে বাড়ছে সংশয়। এক অনুসন্ধানে জানা যায় যে, বাইক পণ্য ডেলিভারির আড়ালে ‘চেক ডেলিভারি’ নামে এক অভিনব আর্থিক কৌশলের অভিযোগে আলোচনায় এসেছেন এস কে ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী বাজাজ মামুন। অভিযোগ রয়েছে, বাইক সরবরাহের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিপুল অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে তিনি স্বল্প সময়ে শতকোটি টাকার সম্পদের মালিক হন ও অর্থ পাচার করেন। এতে ব্যবসায়ী বাজাজ মামুন কয়েকটি ই-কমার্স প্ল্যাটফর্মের যোগসাজসে শতকোটি টাকা হাতিয়ে নেন।

এস কে ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী বাজাজ আল মামুনের অন্যতম সহযোগী ইভ্যালির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মো. রাসেল ও আলিশা মার্ট ই-কমার্সের চেয়ারম্যান মো. মনজুর আলম শিকদার। আল মামুনের বিরুদ্ধে মানি লন্ডারিং আইনে মামলা করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। বনানী থানার মামলা নং ৪০, যাহার স্মারক নং ৩২১৬(৫)/১, ১/৬/ ২০২৩ ইং । সিআইডির ফিনান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগ মামলাটি তদন্ত করছে। এই মামলাটিতে আলিশা মার্টের চেয়ারম্যান ০১ নাম্বার আসামি । আর বাজাজ আল মামুন ০৪ নাম্বার আসামি।
এছাড়াও অনলাইনে পণ্য বিক্রির নামে গ্রাহকদের কাছ থেকে অর্থ নিয়ে প্রতারণার অভিযোগ রয়েছে। সবচেয়ে বেশি পরিমাণ অর্থ আত্মসাৎ এর অভিযোগ রয়েছে ইভ্যালি ও আলিশা মার্ট এই দুই ই–কমার্স প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে। সিআইডি জানিয়েছে, ৩১০ কোটি ৯৯ লাখ ১৩ হাজার ৪০৭ টাকা আত্মসাতের অভিযোগে কাফরুল থানায় ইভেলির বিরুদ্ধে একটি মামলা করা হয়েছে। উল্লেখ্য যে, এস কে ট্রেডার্স এর স্বত্বাধিকারী ব্যবসায়ী বাজাজ মামুন এর কাছে ইভ্যালির প্রতারণার শতকোটি টাকার একাংশ রয়েছে বলে জানা গেছে।
প্রাথমিক তদন্তে উঠে এসেছে, রাসেল ও শামীমা পরস্পর যোগসাজশে কয়েক হাজার গ্রাহক ও মার্চেন্টের কাছ থেকে অগ্রিম অর্থ সংগ্রহ করেছিলেন। পণ্য সরবরাহ না করে সেই অর্থ দিয়ে তাঁরা বিলাসবহুল গাড়ি ক্রয়, অঢেল সম্পদ অর্জন এবং বিদেশ ভ্রমণসহ ব্যক্তিগত ভোগ-বিলাসে ব্যয় করেছেন। গ্রাহকদের বারবার ডেলিভারির ভুয়া তারিখ দিয়ে আশ্বস্ত করা হলেও শেষ পর্যন্ত পণ্য বা অর্থ কোনোটিই ফেরত দেওয়া হয়নি, যা স্পষ্ট প্রতারণা ও মানিলন্ডারিংয়ের শামিল।
সিআইডি আরও জানিয়েছে, এই বিশাল অঙ্কের আত্মসাৎ করা অর্থের সঠিক অবস্থান শনাক্ত করতে এবং এই চক্রের সঙ্গে জড়িত অন্য সহযোগীদের চিহ্নিত করতে গভীর তদন্ত চলছে। প্রতারিত গ্রাহক ও মার্চেন্টদের স্বার্থ রক্ষায় পাচার হওয়া অর্থ উদ্ধারে সিআইডির বিশেষ টিম কাজ করে যাচ্ছে।
কীভাবে চলতো কার্যক্রম
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, একটি ই-কমার্স ভিত্তিক ডেলিভারি ব্যবস্থার আড়ালে গড়ে তোলা হয় আলাদা আর্থিক নেটওয়ার্ক। গ্রাহকেরা অনলাইনে বাইক অর্ডার করতেন। কিন্তু নির্ধারিত সময়ে বাইক সরবরাহের পরিবর্তে তাদের হাতে তুলে দেওয়া হতো পোস্ট-ডেটেড চেক।
প্রথমদিকে নির্ধারিত সময়ে চেক নগদায়ন হওয়ায় গ্রাহকদের মধ্যে আস্থা তৈরি হয়। পরে উচ্চ মুনাফার আশায় অনেকেই একটি বাইকের পরিবর্তে একাধিক কখনও ১০ থেকে ২০টি পর্যন্ত বাইক অর্ডার দেন। অভিযোগ রয়েছে, অনেক ক্ষেত্রে গ্রাহকের প্রকৃতপক্ষে বাইক নেওয়ার প্রয়োজন ছিল না; বরং বাইকের বিপরীতে নগদ অর্থ পাওয়ার প্রত্যাশাই ছিল মূল প্রেরণা। বাজাজ মামুন বাইক বা টাকা কোনোটাই না দেওয়ায় ১ লাখের বেশী বাইক অর্ডার জমা হয়। তার নগদ টাকার অফারে গ্রাহক লোভে পড়ে চাহিদার তুলনায় বেশি অর্ডার করে, ফলে ই-কমার্স স্ক্যাম করে। কারণ বছরে ১ লাখ বাইকের উৎপাদন ক্ষমতা ডিলার এসকে ট্রেডার্স এর মূল কোম্পানি উত্তরা মটরর্সের ওই সে সক্ষমতা নেই। বাজাস আল মামুন শুধুমাত্র নিজস্ব ইন ভয়েসের মাধ্যমে বাইক অর্ডার নিতো ও চেক নিতো। প্রকৃতপক্ষে বাইকগুলোর কোন চেসিস নাম্বার ইঞ্জিন নাম্বার সহ আমদানি করার কোন কাগজপত্র ছিল না। অনুসন্ধানে জানা যায়, মামুন ইভ্যালি,আলেশামার্ট, কিউকমের সহযোগী প্রতারক চক্র ও প্রতিষ্ঠানগুলোর বিশ্বস্ত মানুষ ছিল। ই-কমার্স প্রতিষ্ঠানগুলো ও ডিলার সরবরাহকারী ভেন্ডর এস কে ট্রেডার্স যৌথভাবে এই প্রতারণা ও কারসাজি করে অর্থ লোপাট করে। গ্রাহকদেরকে বিভিন্ন প্রলোভন ও লোভনীয় অফার তৈরি করে এইসব ই-কমার্স গুলোতে পক্ষে সে নিজেই মার্কেটিং করত।
এইভাবে ই-কমার্স প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে হাজার কোটি টাকার লেনদেনের এক চক্র গড়ে ওঠে বলে দাবি ভুক্তভোগীদের।

