সরকারি নিয়ম অনুযায়ী প্রাথমিক শিক্ষার্থীদের বিনামূল্যে পাঠদান নিশ্চিত করার কথা থাকলেও ফরিদপুরের সালথা উপজেলার ১২ নম্বর সিংহপ্রতাপ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এর ব্যতিক্রম চিত্র দেখা যাচ্ছে। এখানে শিক্ষার্থীদের মাসিক বেতন দিয়ে পড়াশোনা করতে বাধ্য করা হচ্ছে, পাশাপাশি বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষেই চলছে ব্যক্তিগত কোচিং বা প্রাইভেট পাঠদান।
বিদ্যালয়টিতে কর্মরত ৮ জন শিক্ষকের মধ্যে ৬ জন নিয়মিতভাবে প্রাইভেট পড়ানোর সঙ্গে জড়িত বলে অভিযোগ রয়েছে। এদের কেউ কেউ ক্লাস চলাকালীন, কেউ মধ্যাহ্ন বিরতিতে, আবার কেউ ক্লাসের বাইরে বিদ্যালয়ের শ্রেণিকক্ষ ব্যবহার করে প্রাইভেট পড়ান। এতে শিক্ষার্থীদের খেলাধুলা ও বিশ্রামের সময়ও ব্যাহত হচ্ছে। একই সঙ্গে শ্রেণিকক্ষ ব্যবহারের কারণে অতিরিক্ত বিদ্যুৎ ব্যয় বহন করতে হচ্ছে সরকারকে।
সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হচ্ছে এটি এমন একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, যেখানে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে নিয়মিত মাসিক বেতন নেওয়া হচ্ছে। অভিযোগ রয়েছে, এই অর্থ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক ও সহকারী শিক্ষকরা মিলে ব্যয় করেন এবং এর একটি অংশ দিয়ে দুজন প্যারা শিক্ষক নিয়োগ দিয়ে তাদের সামান্য পারিশ্রমিক দেওয়া হয়।
বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের মধ্যে দুটি দম্পতি রয়েছেন। প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তারের বিরুদ্ধে অভিযোগ, তিনি নিজে প্রাইভেট না পড়ালেও অন্য শিক্ষকদের এ কার্যক্রমে বাধা দেন না এবং তাদের কাছ থেকে বিভিন্ন সুবিধা গ্রহণ করেন। অন্যদিকে সহকারী শিক্ষক সাহেবুল ইসলাম ও তাইফুন্নাহার দম্পতি প্রতিদিন সকালে এবং ক্লাসের ফাঁকে প্রাইভেট পড়ান। কাজী খালিদ হোসেন ও গুলশানারা আক্তারও নিয়মিত প্রাইভেট পরিচালনা করেন। সিনিয়রদের অনুসরণ করে রাবেয়া রুমা ও জাহিদ খানও এই কার্যক্রমে যুক্ত হয়েছেন বলে জানা গেছে। তবে লাবলী খানম এখনো প্রাইভেট পড়ানোর সঙ্গে যুক্ত নন।
ভয়ভীতি দেখিয়ে প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করার অভিযোগ
অভিযোগ রয়েছে, শিক্ষার্থীদের প্রাইভেট পড়তে বাধ্য করতে ফেল করানো, ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া কিংবা অন্যান্য ভয়ভীতি প্রদর্শনের আশ্রয় নেওয়া হয়। এছাড়া শিক্ষকদের মধ্যে দুজন উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষক সমিতির নেতা হওয়ায় তারা অনেক সময় বিদ্যালয়ে হাজিরা দিয়েই উপজেলা সদরে অবস্থান করেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
একজন অভিভাবক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “সরকারি স্কুলে বেতন নেওয়া এবং জোর করে প্রাইভেট পড়ানো সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক। বিদ্যালয়টি যেন একটি পারিবারিক কেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। আমরা প্রতিবাদ করার সাহস পাই না, কারণ কিছু শিক্ষক স্থানীয়ভাবে প্রভাবশালী।”
অভিযোগের বিষয়ে সহকারী শিক্ষক কাজী খালিদ হোসেন বলেন, “সবাই প্রাইভেট পড়ালেও স্কুল চলাকালীন সময়ে তা হয় না। বিদ্যালয়ে একজন প্যারা শিক্ষক রয়েছেন, যাকে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে সামান্য অর্থ সংগ্রহ করে বেতন দেওয়া হয়।”
প্রধান শিক্ষক নাজমা আক্তারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি সাড়া দেননি।
এ বিষয়ে সালথা উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা মো. তাশেম উদ্দিন বলেন, “শ্রেণিকক্ষে প্রাইভেট পড়ানো এবং শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে মাসিক বেতন নেওয়ার কোনো বৈধতা নেই। অভিযোগ তদন্ত করে সত্যতা পাওয়া গেলে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”
জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মো. মহিউদ্দিনও একই ধরনের বক্তব্য দিয়ে জানান, তদন্ত সাপেক্ষে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।
সালথা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা দবির উদ্দিন বলেন, “বিষয়টি ইতোমধ্যে উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তার সঙ্গে আলোচনা করা হয়েছে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।”


