বাংলাদেশে নারীরা আজ আর পিছিয়ে নেই। জনসংখ্যার ভারসাম্যে তারা পুরুষের সমান, অনেক ক্ষেত্রে সংখ্যাগরিষ্ঠও। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষা, রাজনীতি কিংবা বৈদেশিক শ্রমবাজার সবখানেই নারীর উপস্থিতি সুস্পষ্ট। সবচেয়ে বড় কথা, গত তিন দশক এই দেশ নারীর নেতৃত্বে পরিচালিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী, স্পিকার, বিরোধী দলীয় নেতা রাষ্ট্রক্ষমতার সর্বোচ্চ আসনে দীর্ঘ সময় ধরে নারীর পদচারণা। এমন বাস্তবতায় প্রশ্ন উঠতেই পারে সংসদে নারীদের জন্য এখনো কেন সংরক্ষিত আসনের প্রয়োজন? এটি কি নারীর ক্ষমতায়ন, নাকি এক প্রকার অবমূল্যায়ন?
সংরক্ষিত আসনের যুক্তি একসময় ছিল নারীর পিছিয়ে পড়া, সুযোগ সৃষ্টি করা। কিন্তু আজকের বাস্তবতা ভিন্ন। নারীরা প্রমাণ করেছেন, তারা কেবল রাজনীতির অংশীদার নন, বরং নেতৃত্বের যোগ্য। তবুও সংরক্ষিত আসনের প্রচলন চলমান। এর আড়ালে রয়েছে আরেক বাস্তবতা রাজনীতির সুবিধা অর্জনের কৌশল। সংসদে আসন পাওয়া দলগুলো আনুপাতিক হারে সংরক্ষিত নারী আসন বণ্টন করে। অনেক সময় দেখা যায়, এই আসনে দল বা পরিবারের প্রভাব প্রাধান্য পায়। কেউ পরিবারের রাজনৈতিক উত্তরাধিকার অনুযায়ী আসেন, আবার কেউ দলের শীর্ষ নেতৃত্বের সদয় বিবেচনায় আসন পান। ফলে আসন কখনো প্রাপকের যোগ্যতা নয়, বরং রাজনৈতিক নেটওয়ার্কের প্রতিফলন হয়ে দাঁড়ায়। ফলে ২০০ আসন জয়ী দল বাড়তি ৩২ আসনও নিশ্চিত করে নেয়। গণতন্ত্রের মঞ্চ তখন রূপ নেয় সংখ্যার খেলার ভেতরে, আর বিরোধী দল সীমাবদ্ধ হয়ে পড়ে প্রতীকি ভূমিকায়। এটি সরলভাবে বললে, স্বৈরাচার প্রতিষ্ঠার একটি প্রক্রিয়া।
গণতন্ত্রের মূল সৌন্দর্য প্রতিযোগিতায়, সমান সুযোগে। নারী যদি জনগণের ভোটে জয়ী হন, সেটিই প্রকৃত ক্ষমতায়ন। কিন্তু সংরক্ষিত আসন দিয়ে সংসদে প্রবেশ করানো মানে হলো “তুমি নির্বাচনে জিততে পারবে না, তাই শর্টকাটে আসন নাও।” এভাবে নারীর সক্ষমতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করা হয়। স্থানীয় সরকার, পৌরসভা কিংবা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে নারীরা ইতিমধ্যেই নিয়মিত নির্বাচিত হচ্ছেন। তারা জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন, ভোট সংগ্রহের সক্ষমতা দেখিয়েছেন, মাঠে লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। তাহলে জাতীয় সংসদে এসে তাদের জন্য বিশেষ কোটার প্রয়োজন কেন?
সংরক্ষিত আসনের নারীরা কি আসলেই জনগণের প্রতিনিধি? জনগণের ভোটে নির্বাচিত হওয়ার পরিবর্তে তারা আসন পান রাজনৈতিক দলের মনোনয়নে বা পরিবারের রাজনৈতিক প্রভাবের ভিত্তিতে। ফলে সংসদে তাদের ভূমিকা সীমাবদ্ধ হয়ে দাঁড়ায় দলীয় আনুগত্য প্রদর্শনে, জনগণের সমস্যার প্রতিনিধিত্বে নয়। এতে সংসদে জন্ম নেয় একদল নিছক সংখ্যার প্রতিনিধি, প্রকৃত অর্থে জনপ্রতিনিধি নয়। বাংলাদেশে নারী সমাজ ইতিমধ্যেই শক্ত অবস্থান গড়ে তুলেছে। কৃষিক্ষেত্র, শিল্প, গার্মেন্ট কারখানা, অফিস-আদালত, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান—সবখানেই তাঁরা গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছেন।
বিশ্বের অন্যান্য গণতান্ত্রিক দেশও আজ নারীর রাজনৈতিক অংশগ্রহণ বাড়ানোর প্রয়াস নিচ্ছে, তবে তা হচ্ছে সরাসরি নির্বাচনের মাধ্যমে, পরোক্ষভাবে নয়। এখানেই পার্থক্য। বাংলাদেশের নারীরা যদি সত্যিই ক্ষমতাশালী প্রতিনিধি হতে চান, তবে তাদের আসতে হবে জনগণের ভোটের আস্থায়। শর্টকাট কোনোদিনই স্থায়ী সমাধান নয়। অতএব সময় এসেছে নতুন করে ভাবার। সংরক্ষিত আসনের প্রচলন বাতিল করে রাজনৈতিক দলগুলোকে বাধ্য করতে হবে প্রার্থী মনোনয়নে নারীদের যথাযথ গুরুত্ব দিতে।
নারীরা সমান প্রতিযোগিতার সুযোগ পাক সেটিই হবে প্রকৃত ক্ষমতায়ন। অন্যথায় সংরক্ষিত আসন কেবল সংসদে অপ্রয়োজনীয় সংখ্যা যোগ করবে, জনগণের প্রকৃত কণ্ঠস্বর নয়। বাংলাদেশে নারীরা আর করুণা চান না; তারা চান সুযোগ। সেই সুযোগ হতে হবে সমান মঞ্চে, জনগণের রায়ের ভিত্তিতে। কারণ ইতিহাস প্রমাণ করেছে যে ক্ষমতা জনগণের ভোটে আসে, সেটিই স্থায়ী হয়; আর যে ক্ষমতা শর্টকাটে আসে, তা টেকে না। প্রশ্ন আজ একটাই আমরা কি নারীকে সমান মানুষ হিসেবে দেখতে চাই, নাকি তাকে অনুগ্রহের আসনে বসিয়ে রেখে ভুয়া ক্ষমতায়নের প্রদর্শনী চালিয়ে যেতে চাই!

খসরু খান
লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।

