লন্ডনভিত্তিক দৈনিক ফিন্যান্সিয়াল টাইমস (এফটি) বৃহস্পতিবার নতুন তথ্যচিত্র ‘বাংলাদেশের হারানো বিলিয়ন: চোখের সামনেই চুরি’ প্রকাশ করেছে। তথ্যচিত্রটি মূলত দুর্নীতির মাধ্যমে উপার্জিত বিপুল অর্থ পাচার এবং তা পুনরুদ্ধারের সম্ভাবনা নিয়ে তৈরি হয়েছে।
এফটি জানিয়েছে, প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শেখ হাসিনার ১৫ বছরের শাসনামলে প্রায় ২৩৪ বিলিয়ন ডলার (২ লাখ ৩৪ হাজার মিলিয়ন ডলার বা ২৮ লাখ ৫৪ হাজার ৮০০ কোটি টাকা) বাংলাদেশ থেকে লুট হয়েছে বলে। তথ্যচিত্রে কীভাবে অর্থ পাচার হয়েছে এবং তা ফেরত আনার সম্ভাবনা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে,। এতে বিক্ষোভকারী, রাজনীতিক, ব্যবসায়ী ও বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অন্তর্ভুক্ত হয়েছে।
তথ্যচিত্রের শুরুতে শেখ হাসিনার শাসনামলের পতনের প্রেক্ষাপট দেখানো হয়েছে। এ বিষয়ে মন্তব্য করেছেন বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের দুই সমন্বয়ক রাফিয়া রেহনুমা হৃদি ও রেজওয়ান আহমেদ রিফাদ। এছাড়া জন রিড (ফিন্যান্সিয়াল টাইমস, দক্ষিণ এশিয়া ব্যুরোপ্রধান), সুজানা স্যাভিজ (অ্যাগ্রিকালচার ও কমোডিটি করেসপন্ডেন্ট), হেলেন টেলর (স্পটলাইট অন করাপশনের ডেপুটি ডিরেক্টর) এবং রাফে উদ্দিন (ওয়েস্ট মিনস্টার লবি দলের রিপোর্টার) তথ্যচিত্রে বিভিন্ন তথ্য তুলে ধরেছেন।
তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের গ্রীষ্মে জনসাধারণের ক্ষোভ ফেটে পড়ে, যখন সরকার এমন একটি চাকরির কোটার প্রস্তাব আনে যা আওয়ামী লীগের সদস্যদের আত্মীয়স্বজনকে সুবিধা দিত। একই সময়ে, শেখ হাসিনা ক্রমেই আরও স্বৈরাচারী হয়ে ওঠেন এবং বিরোধীদের গণহারে কারাবন্দী করান। তবে শুধু কোটাব্যবস্থা নয়, মানুষের উদ্বেগ আরও বাড়ছিল দুর্নীতির মাত্রা দেখে—বিশেষ করে বিপুল অর্থ বিদেশে পাচারের গুঞ্জন।
তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, বাংলাদেশ থেকে চুরি হওয়া অনেক অর্থ যুক্তরাজ্যে পৌঁছেছে। লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল স্টেশন দেখানো হয়েছে, যেখানে বোর্ডে ইংরেজি ও বাংলায় লেখা ‘ওয়েলকাম টু হোয়াইট চ্যাপেল”। এটি দেখায়, বাংলাদেশের সঙ্গে যুক্তরাজ্যের সম্পর্ক কত পুরনো। মূলত ঔপনিবেশিক সময় থেকে, যখন বাংলাদেশ ভারতের অংশ ছিল, এই সংযোগ স্থায়ী হয়েছে।
যুক্তরাজ্য এখন বাংলাদেশের রাজনীতিকদের জন্য জনপ্রিয় স্থান, বিশেষ করে নির্বাসনে থাকা ব্যক্তিদের জন্য। এফটির সাংবাদিকরা জানিয়েছেন, তারা যুক্তরাজ্যের রাজনৈতিক দল ও বড় দাতাদের যোগসূত্র খতিয়ে দেখছিলেন, এবং তখন বাংলাদেশ শেখ হাসিনা ও তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে তদন্ত শুরু করে। এ কারণে এটি বৈশ্বিক খবর, কারণ হাসিনা ও তাঁর পরিবারও বৈশ্বিকভাবে পরিচিত।
শেখ রেহানা যুক্তরাজ্যের নাগরিক, আর তাঁর মেয়ে টিউলিপ সিদ্দিক লেবার পার্টির এমপি, সাম্প্রতিককালে স্টারমার সরকারের মন্ত্রী ছিলেন। টিউলিপ সিদ্দিকসহ শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানার পরিবারের কয়েকজন সদস্য অবকাঠামো প্রকল্প থেকে অর্থ আত্মসাতের অভিযোগে অভিযুক্ত। ঢাকায় কিছু সদস্যের বিরুদ্ধে রাষ্ট্রীয় জমি বেআইনি দখলের মামলা চলছে।
সুজানা স্যাভিজ বলেন,
“আমি বাংলাদেশে বহু বছর থেকেছি এবং বাংলাদেশ কাভার করেছি—সে সময় যুক্তরাজ্যে বাংলাদেশি অর্থ পাচারের বহু সূত্র পেয়েছি। এরপর শেখ হাসিনার পতন হলে আমি সহকর্মী রাফে উদ্দিনের সঙ্গে আলোচনা করি—কীভাবে এগুলো তদন্ত করা যায়।”
রাফে উদ্দিন বলেন,
“এক সূত্র আমাকে কিছু সম্পত্তি ও তার নিবন্ধনের নথি পাঠায়। একটি নথি বিশেষভাবে নজর কাড়ে—লন্ডনের ট্রেন্ডি কিংস ক্রসে একটি ফ্ল্যাট, যা টিউলিপ সিদ্দিক ২০০০-এর দশকের শুরুতে পেয়েছিলেন, তখন তাঁর বয়স ২২ বছরের বেশি হওয়ার কথা নয়। সম্পত্তিটি সিদ্দিককে হস্তান্তর করেছিলেন এমন একজন ডেভেলপার, যার সঙ্গে সাবেক বাংলাদেশি শাসনের যোগসূত্র ছিল।”
টিউলিপ সিদ্দিকের ওপর তদন্ত জোরালো হয়, যা আংশিকভাবে চলতি বছরের শুরুর দিকে তাঁর পদত্যাগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। তিনি তথ্যচিত্রে বলেন,
“এটি পুরোপুরি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত, আমাকে হয়রানি করার চেষ্টা। আমি কিছু ভুল করেছি—এমন কোনো প্রমাণ নেই।”
তথ্যচিত্রে আরও বলা হয়েছে, এই তদন্ত বৃহৎ জিগস পাজলের একটি অংশ, যেখানে সাবেক শাসন-ঘনিষ্ঠদের সঙ্গে যুক্ত শত শত সম্পত্তি খতিয়ে দেখা হয়।
সুজানা স্যাভিজ বলেন,
“একজন বিশেষ ব্যক্তি, সাবেক ভূমিমন্ত্রী সাইফুজ্জামান চৌধুরী, যুক্তরাজ্যে ৩০০টির বেশি সম্পত্তির মালিক।”
হেলেন টেলর মন্তব্য করেন,
“পৃথিবীর অন্যতম দরিদ্র দেশের একজন মন্ত্রীর জন্য যুক্তরাজ্যে ৩০০টি সম্পত্তি কেনা বিস্ময়কর। যেখানে একজন ব্যক্তি বছরে দেশের বাইরে ১২ হাজার ডলার বেশি নিতে পারেন না।”
যুক্তরাজ্যের ন্যাশনাল ক্রাইম এজেন্সি (এনসিএ) ৩৫০টি সম্পত্তি শনাক্ত ও জব্দ করেছে, যা এফটির খুঁজে পাওয়া ৩০০টির সঙ্গে মিলে যায়। সাইফুজ্জামান চৌধুরী এফটির কোনো প্রশ্নের জবাব দেননি।
তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, ২০০৯–২০২৩ পর্যন্ত প্রতি বছর প্রায় ১৬ বিলিয়ন ডলার পাচার হয়েছে। সুজানা স্যাভিজ জানান, বাংলাদেশের শাসন ক্ষমতা মূলত দুটি প্রধান দলের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে ২০০৮ সালের ডিসেম্বরে শেখ হাসিনা পুনর্নির্বাচিত হওয়ায় দেশের গতিপথ বদলে যায়।
বদিউল আলম মজুমদার (নির্বাচন সংস্কার কমিশনের প্রধান) বলেন,
“হাসিনার শাসনে লুটপাট ব্যাপক ছিল।”
ড. মোশতাক খান (লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়, এসওএএস) বলেন,
“উন্নয়নশীল দেশে দুর্নীতির সাধারণ ধারা হলো—শাসক দলকে তার সমর্থকদের মধ্যে টাকা বিলাতে হয়। তা না হলে ক্ষমতায় টিকতে পারে না। শাসনামলের শেষ দিকে আওয়ামী লীগ অর্থনীতি ও নিজেদের দল—দুয়েরই নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছিল।”
জন রিড বলেন,
“শেখ হাসিনার শাসনকালে যা ঘটেছে, তার কিছু তো সিনেমার কাহিনির মতো।”
তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, তৎকালীন শাসকদের ঘনিষ্ঠরা ডিজিএফআইর সাহায্যে ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ নিতেন।
ইসলামী ব্যাংকের সাবেক এমডি মুহাম্মদ আবদুল মান্নান বলেন,
“মাকে ডিজিএফআই প্রধানের সঙ্গে দেখা করতে বলা হয়। তিনি বললেন, ‘সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ’ চান আমি পদত্যাগ করি।”
তিনি উল্লেখ করেন, সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ হল তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,
“অবিশ্বাস্য হলেও তারা বোর্ডকে অস্ত্রের জোরে সরিয়ে নিজেদের বোর্ড বসিয়েছে, তারপর নিজেদের আপনজনদের ‘ঋণ’ দিয়েছে, যা ফেরত দিতে হবে না।”
ইফতি ইসলাম, সম্পদ উদ্ধার টাস্কফোর্সের পরামর্শদাতা, বলেন,
“একটি পরিবারের ব্যাংকে ১০% এর বেশি শেয়ার থাকার কথা নয়; বাস্তবে এই গোষ্ঠীগুলো একাধিক ব্যাংক নিয়ন্ত্রণ করে এবং নিজেদেরই ঋণ মঞ্জুর করে।”
এস আলম গ্রুপ প্রায় ১০ বিলিয়ন ডলার বা তার চেয়েও বেশি অর্থ বিদেশে নিয়েছে। তারা এসব অভিযোগ সম্পূর্ণ অসত্য বলেছে।
তথ্যচিত্রে বলা হয়েছে, টাকা বিদেশে যাওয়ার প্রধান পদ্ধতি হলো ওভার ইনভয়েসিং, আন্ডার ইনভয়েসিং এবং হুন্ডি/হাওলা।
ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন,
“ব্যাংক ও ব্যবসায়িক খাত মিলিয়ে মোট ২৩৪ বিলিয়ন ডলার লুটপাট হয়েছে।”
তথ্যচিত্রে দেখানো হয়েছে, অন্তর্বর্তী সরকার বৃহৎ অবকাঠামো প্রকল্প ও ব্যাংক নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে তৎকালীন দুর্নীতি মোকাবিলা করে।
শেষে, রাফিয়া রেহনুমা হৃদি বলেন,
“আমাদের ভয়, আমরা হয়তো শহীদদের কাছে প্রতিশ্রুতি পূরণ করতে পারব না—এটাই এখন সবচেয়ে বড় আশঙ্কা।”

