দিদারুল ইসলাম
বন্দর নগরী চট্টগ্রামের অলিগলির হাওয়ায় মিষ্টি ঘ্রাণ ছড়াচ্ছে পাকা তাল। নগরীর নিউমার্কেট এলাকার পুরাতন রেলস্টেশনের সামনে এবং কদমতলীতে জমে উঠেছে পাকা তালের পাইকারি বাজার। সেখান থেকে খুচরা বিক্রেতারা পাকা তাল নিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন এলাকায় এবং নগরীর অলিগলিতে।
ফল হিসেবে তাল বাংলাদেশের মানুষের কাছে খুবই জনপ্রিয়। পাকা তালের ঘন রস থেকে তৈরি হয় বিভিন্ন রকমের বৈচিত্রময় পদ। তালের বীজও খাওয়া হয়, সেটা লেপা বা “তালশাঁস” নামে পরিচিত। তাল গাছের কাণ্ড থেকে রস সংগ্রহ করে তৈরী হয় গুড়, পাটালি আর মিছড়ি।
তাল অত্যন্ত সুমিষ্ট এবং রসালো একটি ফল। তালে রয়েছে পুষ্টিগুণ—ভিটামিন এ, বি ও সি, জিংক, পটাসিয়াম, আয়রন ও ক্যালসিয়ামসহ আরও অনেক খনিজ উপাদান। এর সাথে রয়েছে অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট ও অ্যান্টি-ইনফ্লামেটরি।
কথায় বলে “তাল পাকা গরম পড়ছে!” মূলত শ্রাবণের শেষ থেকে শুরু করে ভাদ্র মাস পর্যন্ত মৌসুমী গরমে তাল পাকে বলেই এই কথার উৎপত্তি। ভাদ্র মাসের গরম শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাজারে প্রচুর পরিমাণে পাকা তালের সমারোহ দেখা যায়। তবে শ্রাবণের শেষ থেকেই দেশের গ্রামগঞ্জের হাটে-বাজারে পাকা তাল উঠতে শুরু করে।
তাল গাছ পাম গোত্রের একটি অন্যতম দীর্ঘ গাছ। এই গাছের পাতাগুলো পাখার মতো ছড়ানো থাকে। তালগাছের প্রায় প্রতিটি অংশই গুরুত্বপূর্ণ। বহুমুখী ব্যবহারের কারণে তাল গাছের পাতারও রয়েছে ব্যাপক চাহিদা। এই পাতা থেকেই তৈরি হয় গরমে স্বতি আনা শীতল হাওয়ার আরামদায়ক হাতপাখা। এই যুগেও তালপাতার পাখার চাহিদা ও কদর কমেনি। এছাড়া তৈরী হয় শীতল পাটি, ঘরের ছাউনি, মাদুর আর খেলার পুতুল।
বহু আগে, মিশরের প্যাপিরাসের মতো আমাদের ছিল তালপাতা। বিশেষ প্রক্রিয়ায় তালপাতা হয়ে উঠেছিল টেকসই কাগজ। তালপাতায় লিখে তা সংরক্ষণ করা হতো। শত শত বছর ধরে এসব লেখা অক্ষত রয়েছে। তালপাতায় লেখা পুঁথি আমাদের সংস্কৃতি ও সাহিত্যের মহামূল্যবান অংশ।
বর্ষায় তালের কাণ্ড দিয়ে নৌকা তৈরির প্রচলন রয়েছে। এ ছাড়া ঘরবাড়িও তৈরির কাজে তাল গাছের কাণ্ডের ব্যবহার ছিল। অভিজাত পাড়ায় তালের কাণ্ড ঢুকে পড়েছে শৈল্পিক আসবাবপত্র আর সৌখিন ভাস্কর্য হয়ে।
বাজারে সচরাচর দুই ধরনের পাকা তাল দেখা যায়—একটি কালো এবং অন্যটি একটু লালচে বর্ণের। দুই বর্ণের তালের স্বাদ ও ঘ্রাণের তীব্রতায় পার্থক্য রয়েছে। চট্টগ্রামের বাজারে কালো রঙের তালের চাহিদাই বেশি। কারণ এতে রস বেশি এবং স্বাদে তুলনামূলক মিষ্টি। খুচরা বাজারে একেকটি বড় তাল ৫০ থেকে ৮০ টাকা এবং ছোট ও মাঝারি আকারের তাল ৩০ থেকে ৫০ টাকায় বিক্রি হচ্ছে।
পিঠা-পায়েস তৈরির গন্ডি পেরিয়ে বর্তমানে জিলাপি, রসমালাই, রোলসহ বেকারি পণ্যে তালের রসের ব্যবহার বাড়ছে। তাল-দুধ, তাল-মুড়ি খুবই মুখরোচক খাবার। এসব খাবার রুচি বাড়ায় এবং হজম সহায়ক।
নানা পদের মুখরোচক খাবার তৈরির আগে পাকা তাল থেকে রস বের করতে হয়। এই রস বের করার পক্রিয়াটি বেশ কষ্টসাধ্য এবং সময়সাপেক্ষ। ফলে ইচ্ছা থাকা সত্বেও অনেকে তালের রস দিয়ে বিভিন্ন খাবার তৈরীর পরিবর্তে বাইরে থেকে কিনে খেতে পছন্দ করেন। তবে বিকল্প উপায় হিসাবে প্রথমে পাকা তালের খোসা ছাড়িয়ে বীজগুলো আলাদা করে এক থেকে দেড় লিটার বিশুদ্ধ পানিতে ভিজিয়ে রাখতে হয়। তারপর বীজগুলো হাতে চটকে রস বের করে ছেঁকে ১৫-২০ মিনিট চুলায় ঘন করে জ্বাল দিয়ে এবং চিনি মিশিয়ে তালের রস তৈরি করা হয়।
তাল গাছ একটি দীর্ঘজীবী বৃক্ষ, আয়ু প্রায় একশ থেকে দেড়শ বছর। এই গাছে ফল আসে বেশ দেড়িতে। তাই তাল গাছ রোপণ ও সংরক্ষণে আগ্রহ কমছে, সংখ্যায় হ্রাস পাচ্ছে। ফলে বজ্রপাতের ঝুঁকি বেড়েছে, বাবুই পাখির আবাসন সংকট তৈরি হয়েছে, এবং পুষ্টিসমৃদ্ধ তালশাঁসের পাশাপাশি পাকা তালের উৎপাদনও কমে গেছে। শুধু খাদ্য হিসেবে নয়, পরিবেশের টেকসই ভারসাম্য রক্ষায় তাল গাছের চারা রোপণ ও সুরক্ষার ওপর গুরুত্ব দেওয়া অত্যন্ত জরুরি।

