দিদারুল ইসলাম, চট্টগ্রাম
চাহিদার তুলনায় সরবরাহ কম থাকায় তীব্র গরমে ডাবের দাম বেশি থাকে। কিন্তু তাই বলে এই বর্ষা মৌসুমেও ডাবের দাম আকাশচুম্বী থাকবে, এটা মেনে নিতে পারছেন না অনেক ক্রেতা।
শ্রাবণ মাসের শেষের দিকে বুধবার (১৩ আগস্ট) সকালে চট্টগ্রামের আকাশে দেখা দেয় একটুখানি রোদ। বাতাস চলাচল কম থাকার কারণে সেই রোদের তাপমাত্রা অনুভূতি ছিল স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি।
চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের বাদামতলী, চৌমুহনী, কাজির দেউড়ি, জিইসি, গোল পাহাড় ও প্রবর্তক মোড়ে দেখা মিলেছে ডাব বিক্রির ভ্রাম্যমাণ ভ্যান। সেই ভ্যানে ডাব বিক্রি হচ্ছে সাইজ অনুসারে প্রতিটি ১৩০ থেকে ১৬০ টাকা পর্যন্ত।
এই নিয়ে ডাব কিনতে আসা অনেক ক্রেতার ক্ষুব্ধ প্রতিক্রিয়া লক্ষ্য করা গেছে। চট্টগ্রাম আগ্রাবাদের বাদামতলী মোড়ে বসির উদ্দিন নামের এক ক্রেতা ক্ষোভ প্রকাশ করতে করতে দুটো ডাবের মূল্য দেন ২৮০ টাকা।
ক্ষুব্ধ হওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সংবাদ প্রবাহকে জানান, “আমার বাবা তিন দিন ধরে চট্টগ্রাম মা ও শিশু হাসপাতালে ভর্তি আছেন। ডাক্তার তরল খাবার এবং ডাবের পানি দিতে বলেছেন। হাসপাতালের আশেপাশে কচি ডাব না পেয়ে এখানে এসে দুটো ডাব নিলাম। ছোট সাইজের ওই দুটো ডাব থেকে ৫০০ মিলি পানি-ও হলো না, অথচ দাম নিল ২৮০ টাকা! এমন বর্ষাকালেও ডাবের দাম এত বেশি থাকে, তা জীবনে কখনও শুনিনি।”
অন্যদিকে ডাব বিক্রেতা মো. নিজামকে ডাবের দাম বেশি কেন জানতে চাইলে তিনি দৈনিক সংবাদ প্রবাহকে জানান, পাইকারি বাজারে ডাবের দাম অনেক বেশি। এভারেজে প্রতিটি ডাব ১০৫ থেকে ১১০ টাকায় কিনতে হয়। এর মধ্যে কিছু ছোট সাইজের ডাব থাকে, যেগুলো কেউ নিতে চায় না। আবার কিছু ডাব কচি না হওয়ায় কম দামে বিক্রি করতে হয়।
তিনি আরও জানান, “বাসা ভাড়া দিয়ে সংসার চালাতে প্রতিদিন ৭০০ থেকে ১০০০ টাকা খরচ লাগে। তার সঙ্গে ভ্যান ভাড়া ও বিভিন্ন চাঁদাবাজদের টাকা দিতে হয়। ডাবের দাম বেশি হওয়ায় বিক্রিও অনেক কমে গেছে।”
মাঝে মাঝে এর চেয়েও বেশি দামে ডাব বিক্রি হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের সামনে। সম্প্রতি ডেঙ্গু ও চিকুনগুনিয়া জ্বরের প্রকোপ বাড়ায় ডাক্তারদের পরামর্শে রোগীদের ডাবের পানি খাওয়ানো হচ্ছে। এ সুযোগ কাজে লাগিয়ে অসাধু ব্যবসায়ীরা মজুদ কমিয়ে কৃত্রিম সংকট তৈরি করে দাম বাড়িয়ে দিচ্ছে।
চট্টগ্রামে ডাবের পাইকারি বাজার হিসেবে পরিচিত ফিরিঙ্গিবাজারে গেলে আড়তদার মহিউদ্দিন দৈনিক সংবাদ প্রবাহকে জানান, “বর্ষাকাল হলেও এখন মানুষ নির্দিষ্ট সিজনের জন্য গাছে ডাব রাখে না। চাহিদা বেশি থাকায় সারা বছর গাছ থেকে ডাব নামানো হয়। গ্রাম থেকে কম দামে আনলেও গাড়ি ভাড়া ও বিভিন্ন সিন্ডিকেটের কারণে দাম বেড়ে যায়।”
তিনি বলেন, চট্টগ্রামে সবচেয়ে বেশি ডাব আসে নোয়াখালী ও লক্ষ্মীপুরের রায়পুর থেকে। সেখান থেকে প্রতিটি ডাব ৫০-৬০ টাকায় কিনে আনলেও বিভিন্ন খরচ যোগ করলে তা ৮০-৯০ টাকায় বিক্রি করতে হয়। খুচরা বাজারে দাম বেশি হলেও আড়তদাররা তেমন মুনাফা পাচ্ছেন না বলেও দাবি করেন তিনি।
“একজন আড়তদার হিসেবে বলব, ডাবের মূল্য সর্বোচ্চ ১২০ টাকা হওয়া উচিত। দাম কম থাকলে বেচা-কেনা বাড়ে, আমদানি বাড়ে। প্রতিটি ডাবে তিন-চার টাকা লাভ হলেও বিক্রি করা যায়। কিন্তু এখন ভিয়েতনাম থেকে আসা হাইব্রিড ডাবের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করতে গিয়ে আমরা ভালো মানের ডাব আনলেও ব্যবসা টিকিয়ে রাখা কঠিন হয়ে পড়ছে।”
তিনি আরও বলেন, “ডাবের স্বাদ ও গুণগত মানও নষ্ট হচ্ছে।”
পুষ্টিবিদ ও স্বাস্থ্যকর্মীরা জানান, গাছ থেকে আলাদা করার পর প্রথম দুই-তিন দিন ডাবের গুণগত মান ভালো থাকে। সময় যত বাড়ে, মান তত নষ্ট হয়। রোগীদের জন্য এক সপ্তাহের বেশি পুরোনো ডাব ক্ষতির ঝুঁকি বাড়ায়।
মাঠ পর্যায়ে ডাবের অতিরিক্ত মূল্য নিয়ন্ত্রণে ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণকে মাঝে মাঝে মাঠে নামতে দেখা যায়। তখন বিক্রেতারা দোকান ফেলে পালিয়ে যায়। ম্যাজিস্ট্রেট ও ভ্রাম্যমাণ আদালত যতক্ষণ মাঠে থাকে, ততক্ষণ দাম নিয়ন্ত্রণে থাকে। কিন্তু এক-দুই ঘণ্টা পরই শুরু হয় আবারও গলা কাটা ব্যবসা। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ যত বেশি জরিমানা করে, ব্যবসায়ীরা ততই পাল্লা দিয়ে দাম বাড়ায়। জরিমানার টাকা তুলতে তারা আরও প্রতারণার আশ্রয় নেয়।

