পর্ব-১
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে এবং বিশ্ব সামরিক অভিযানগুলোর মধ্যে অপারেশন জ্যাকপট অন্যতম সেরা নৌ অভিযান হিসেবে পরিগণিত। ১৬ আগস্ট ১৯৭১ সালের প্রথম প্রহরে চট্টগ্রাম ও মোংলা সমুদ্র বন্দরসহ চাঁদপুর ও নারায়ণগঞ্জ নদীবন্দরে সমন্বিতভাবে পরিচালিত এই বিশেষ নৌ অভিযানটিতে পাকিস্তানি বাহিনীর গুরুত্বপূর্ণ ২৬টি জাহাজ, যার মোট ওজন প্রায় ৫০ হাজার ৮০০ টন, সম্পূর্ণ ধ্বংস করে দিয়েছিলেন সাহসী নৌ-কমান্ডোরা।
এই অভিযানের ফলে পাকিস্তানি বাহিনীর নৌপরিবহণ ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় ধরনের বাধা সৃষ্টি হয়েছিল, যা সামগ্রিকভাবে মুক্তিযুদ্ধের গতি-প্রকরণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। অপারেশন জ্যাকপট কেবল মুক্তিযোদ্ধাদের সাহসিকতা ও দক্ষতার প্রতীক নয়, এটি বিশ্ব সামরিক ইতিহাসেও একটি গুরুত্বপূর্ণ মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত।
তুলন এক শান্ত নীরব শহর। ফ্রান্সের দক্ষিণ-পশ্চিম প্রান্তের তুলন শহরটি সমুদ্র সৈকতের পাহাড়ের গা কেটে তৈরি করা একটি সুবিশাল সাবমেরিন ডকইয়ার্ডের জন্য বিখ্যাত। এখানে একসঙ্গে বাইশটি সাবমেরিন রাখা যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়, যখন জার্মান বাহিনী ফ্রান্স দখল করেছিল, তখন এই ঘাঁটি নির্মাণ করা হয়। হিটলার যুদ্ধ জয়ের পর ফরাসি যুদ্ধবন্দিদের শ্রমিক হিসেবে কাজে লাগিয়ে এই আধুনিক ঘাঁটিটি গড়ে তোলেন।
ফ্রান্স থেকে লিজ নিয়ে পাকিস্তানি সাবমেরিন পি. এন. এস ‘ম্যাংরো’ এই তুলনের ঘাঁটিতে প্রশিক্ষণ নেয়। ম্যাংরো ক্রুদের মধ্যে ১৩ জন বাঙালি এবং বাকি ৫৭ জন পাকিস্তানি। ১৯৭১ এর মার্চ মাসে ফ্রান্সের তুলন বন্দরে পিএনএস ম্যাংরোতে প্রশিক্ষণ নিচ্ছিলেন তারা। সাবমেরিনে গোপন নথির দায়িত্বে ছিলেন বাঙালি সাবমেরিনার আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী।
২৬শে মার্চের দিন সাবমেরিনের এক রুমে বাঙালি ও পাকিস্তানি ক্রুরা একসাথে বিবিসির সংবাদ বুলেটিন শুনছিলেন। সংবাদ পাঠক নির্লিপ্ত কণ্ঠে পাকিস্তানি বাহিনীর ২৫শে মার্চের রাতের হত্যাযজ্ঞের বর্ণনা দিচ্ছিলেন। এই ভয়ংকর সংবাদ শুনে বাঙালি ক্রুদের হৃদয়ে নীরব শোকের ছায়া নেমে আসে, কিন্তু কোনো প্রতিক্রিয়া প্রকাশ না করে তারা স্বাভাবিক মনোভাব নিয়ে শুনতে থাকে ঢাকার গণহত্যার খবর, রাজারবাগ পুলিশ লাইনে নৃশংস আক্রমণ, বিশ্ববিদ্যালয়ের হলগুলোতে নির্বিচারে গুলিবর্ষণ, অগ্নিসংযোগ এবং অন্যান্য নৃশংসতার বর্ণনা।
পাকিস্তানি নৌ অফিসার বিষয়টিকে হালকা করার জন্য সহাস্যে কিছু বললেন বাঙালি সেনাদের উদ্দেশ্য করে। জবাবে কেউ কিছু বলল না। ছাইচাপা আগুন জ্বলতে থাকলো তাঁদের অন্তরে। এর আগে ৭ই মার্চের বঙ্গবন্ধুর ভাষণ শুনেই প্রাথমিক সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে, যদি প্রয়োজন হয় সাবমেরিন হাইজ্যাক করে দেশের জন্য যুদ্ধে অংশ নেব। তা না হলে সাবমেরিনসহ ধ্বংস হয়ে যাব নিজেরা। কিন্তু কাজটি বেশ ঝুঁকিপূর্ণ এবং সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম থাকায় সেই পরিকল্পনা থেকে সরে আসে।
সন্ধ্যের পর ক্যাফেটেরিয়ার লনে বসে কথা হচ্ছিল। আব্দুর রকিব গত কয়েকদিনের টেপ করে রাখা বিভিন্ন খবর, স্বাধীনতার ঘোষণা শোনালেন সবাইকে। তাঁর কাজই হলো ওপরের বাংকে শুয়ে শুয়ে সারা দুনিয়ার রেডিও স্টেশন ধরে সব খবর সংগ্রহ করা এবং সবাইকে শোনানো। এজন্য তাঁর আরেক নাম চলমান বিবিসি । ২৭ তারিখে তুলনের এক হোটেলের রুমে গোপনে মিলিত হলেন নয়জন।
বাকি পাঁচজনের পরিবার পশ্চিম পাকিস্তানে থাকায় এবং তাদের পাকিস্তান প্রীতির সম্পর্কে অবগত থাকায় তাদের ছাড়াই গোপন মিটিং করা হয়। এবং পালিয়ে যাবার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। বিষয়টি যেন বাকি ৫ জন বাঙালি অফিসার ঘুণাক্ষরেও বুঝতে না পারে সে কৌশল অবলম্বন করা হলো। এবং পালাতে হবে দ্রুত সময়ের মধ্যে কেননা এপ্রিলের প্রথম তারিখেই জাহাজ ছেড়ে দেওয়ার কথা। একবার পাকিস্তানে পৌঁছে গেলে মুক্তিযুদ্ধে যোগ দেওয়ার সম্ভাবনা ক্ষীণ হয়ে যাবে। ২৫ মার্চের পর থেকে বাঙালি নৌ—কমান্ডোদের উপর নজরদারি রাখে পাকিস্তানি নৌ-কমান্ডোরা।
একদিকে যেমন বাঙালিদের উপর অতিরিক্ত নজরদারি করা হচ্ছে, পাশাপাশি তাদের সবার পাসপোর্ট জমা ছিল কর্তৃপক্ষের কাছে। যা করতে হয় এর আগেই করতে হবে। সবাই মিলে পালিয়ে আসার যতদূর সম্ভব নিখুঁত একটা পরিকল্পনা তৈরি করলেন। এখান থেকে গোয়েন্দা বিভাগের চোখ ফাঁকি দিয়ে দেশে পাড়ি জমানো প্রায় দুঃসাধ্য ছিল। পরিকল্পনার ধাপে ধাপে অপেক্ষা করছে চরম বিপদ। কিন্তু দমলেন না তাঁরা। মৃত্যু যেখানে অবশ্যম্ভাবী সেখানে সম্মানের আর অহংকারের মৃত্যুকেই বরণ করার জন্য পা বাড়ালেন তাঁরা।
তারা তখনও জানতেন না, এই একটি সিদ্ধান্তই হয়তো অনেকখানি বদলে দেবে মুক্তিযুদ্ধের গতিপথ। ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা এই নৌ—সেনাদের ঘিরে বাংলার মাটিতেই গড়ে উঠবে পাঁচশত নৌ-কমান্ডোর এক চৌকস দল, যাদের হাতে রচিত হবে ‘অপারেশন জ্যাকপটে’র সোনালি ইতিহাস।
এই নয়জনের দলের সংগঠক এবং অন্যতম দলনেতা ছিলেন চিফ রেডিও আর্টিফিসার গাজী মো. রহমতউল্লাহ, তার সাথে আরো ছিলেন ইঞ্জিনরুম আর্টিফিসার সৈয়দ মো. মোশাররফ হোসেন, ইলেকট্রিক আর্টিফিসার আমিন উল্লাহ শেখ, মেকানিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের দায়িত্বে থাকা বদিউল আলম, আব্দুর রকিব মিয়া আর আহসানউল্লাহ, রেডিও অপারেটর আব্দুল ওয়াহেদ চৌধুরী, আবিদুর রহমান আর আবদুল মান্নান।
সিদ্ধান্ত অনুসারে সবার জমানো দামি জিনিসপত্র জাহাজে বুকিং করে পাকিস্তানে পাঠিয়ে দেয়া হলো যাতে করে মনে কোনো সন্দেহ না জাগে। সবাই প্রতিজ্ঞা করলেন যদি কেউ ধরা পড়ে জীবন গেলেও অন্যদের কথা প্রকাশ করবেন না।
মার্চের ৩০ তারিখে নৌ-ব্যারাক থেকে কেনাকাটার নামে বেরিয়ে পড়লেন তারা। আগের রাতে চৌধুরী এবং বদিউল দু’জনে জাহাজের সেফ-এর চাবি সংগ্রহ করে পাসপোর্টগুলো নিয়ে এসেছেন। পরিকল্পনা অনুসারে প্লেনে না গিয়ে ট্রেনে রওনা হবেন। কিন্তু তুলন থেকে কেউ ট্রেনে উঠবে না।
তুলন ত্যাগের পূর্বে তারা তাদের সিদ্ধান্ত কয়েকজন প্রশিক্ষণরত দক্ষিণ আফ্রিকান সেনাকে জানালেন। দক্ষিণ আফ্রিকান সেনারা তাদের সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলেন। বাঙালি সেনাদের অল্প কিছু নিত্য প্রয়োজনীয় সামগ্রীর ব্যাগটি তারা একটি নির্দিষ্ট স্থানে পৌঁছে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিও দিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার কয়েকজন বন্ধু ট্যাক্সিতে করে এক শ কিলোমিটার দূরে মার্সেইল স্টেশনে নামিয়ে দিলো কয়েকজনকে।
কেউ কেউ বাসে চেপে এলেন। রাত এগারোটায় ট্রেন। গন্তব্য সুইজারল্যান্ডের জেনেভা। তুলন থেকে ট্রেনে উঠলে প্যাসেঞ্জার লিস্টে নাম দেখে সহজেই অনুসরণ করা যাবে ভেবেই এই সতর্কতা অবলম্বন করা হয়েছে। স্টেশনে একে একে হাজির হলেন আটজন। শেষ মুহূর্তে জানা গেল আব্দুল মান্নান পথ ভুল করে অন্যপথে চলে গেছেন। বাধ্য হয়ে আটজনকেই রওনা হতে হলো।
ট্রেনের ছোট্ট কামরায় আটজনই শুধু যাত্রী। সামনে অনেকটা পথ অনিশ্চয়তায় ভরা। উৎকণ্ঠা দূর করার জন্য নিজেদের মধ্যে আলোচনা শুরু করলেন।
ইউরোপীয় দেশগুলোতে ভ্রমণের জন্য পাসপোর্ট ভিসার দরকার হয় না। শুধু পরিচয়পত্র হলেই চলে। তবে সবার সঙ্গে পাসপোর্ট আছে। রাত শেষে সকাল আটটায় বর্ডার ক্রস করে জেনেভায় প্রবেশ করলো ট্রেন। অটোমেটিক গেট খুলে গেল। পাহাড় আর প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে ভরা সুইজারল্যান্ড। কিন্তু এসবে কারো ভ্রূক্ষেপ নেই।
পাসপোর্ট থাকায় সাহস সঞ্চয় করে সুইজারল্যান্ডের ইমিগ্রেশন দপ্তরের এগোলেন দিকে। কিন্তু ভিসা না থাকায় তখন তাদেরকে সুইজারল্যান্ডে প্রবেশের অনুমতি দিতে নারাজ ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ। দীর্ঘসময় পাসপোর্ট জমা নিয়ে বাঙালি নাবিকদের একটি কক্ষে অবস্থানের জন্য অনুরোধ করা হয়। তাদের মনে তখন ভয় আর শঙ্কা, যদি পাকিস্তান দূতাবাসকে খবর দেওয়া হয়, তাহলে তাদের ধরে নির্ঘাত পাকিস্তান ফেরত পাঠানো হবে। এমতাবস্থায় কী করা যায়, এ নিয়ে চিন্তিত ছিলেন সবাই । পরে আবদুল ওয়াহেদ চৌধুরী ইমিগ্রেশন অফিসে দায়িত্বরতদের কাছে নিজেদের পরিচয় গোপন করে বলেন যে, তারা ছুটি কাটাতে সুইজারল্যান্ড যাচ্ছিলেন এবং তাড়াহুড়োয় ভিসা আনার কথা ভুলে গেছেন এবং যদি তাদেরকে ফ্রান্সে ফিরে যাওয়ার সুযোগ দেওয়া হয় তবে তারা ভিসা নিয়ে আবার আসতে পারবেন। অনেক কথা কাটাকাটির পর আবার ফ্রান্সে ফিরে যাবার আদেশ দিলেন সুইস পুলিশ কর্মকর্তা ।
ফ্রান্সে ফিরে ভারতীয় দূতাবাসের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা ব্যর্থ, পরামর্শের পর সিদ্ধান্ত নিলেন ট্রেনে লিওন শহর যাওয়ার। পরদিন লিওন শহরে এসে নিজেদের আসল পরিচয় আড়াল করে ভারতীয় পর্যটক পরিচয়ে একটি হোটেলে উঠলেন। এদিকে পাকিস্তান সরকার বাঙালি নৌ-কমান্ডোরা পালিয়ে গিয়েছে এ খবর ফরাসি কর্তৃপক্ষকে জানাল এবং তাদের ধরতে সহযোগিতার কথা বলে। হোটেলে হোটেলে ফরাসি গোয়েন্দা বিভাগ তল্লাশি করছে।
পরিচয়পত্র না দেয়ায় হোটেল ছাড়ার নির্দেশ দেওয়া হোল। বাধ্য হয়ে হোটেল ছেড়ে অন্য আরেকটি হোটেলে উঠলেন। দ্বিগুণ ভাড়ায় ঘর মিললÑশর্ত, পরিচয় প্রকাশ করা যাবে না। এভাবে কেটে গেল তিন দিন। কিন্তু সময় যত গড়াচ্ছিল, উৎকণ্ঠা তত বাড়ছিল। তিনদিন এভাবে কেটে গেল। যতই দিন কেটে যাচ্ছে উৎকণ্ঠা বেড়ে যাচ্ছে সবার। হঠাৎ খবর এলো এক ট্যুরিস্ট অফিসে লেখা আছে শুধুমাত্র পাকিস্তানিরা তিন মাসের জন্য স্পেনে যেতে পারবে ভিসা ছাড়া।
পরদিনই ট্রেনে চেপে স্পেনের পোর্টবো শহরে চলে এলেন। সেখান থেকে বার্সেলোনা যাবার সিদ্ধান্ত হলো। রেল কাস্টমে চেকিং শুরু হলো। দু’জন চেকিং শেষ করেই ট্রেনে উঠলেন। অন্য সবার চেকিং শেষ না হতেই ট্রেন ছেড়ে দিলো। তাদেরকে ছাড়াই বার্সেলোনা যেতে হলো পরে বার্সেলোনা এসে অনেক খোঁজাখুঁজির পর আবার সবাই একত্রিত হলেন।
পরবর্তীতে আসলেন রাজধানী মাদ্রিদে। মাদ্রিদের যে হোটেলে উঠলেন সেটি ছোট্ট সুন্দর হোটেল। হোটেল মালিক তার স্ত্রী আর তরুণী কন্যা মিলে হোটেলটি চালাচ্ছেন। মেয়েটির নাম গেগেলিন। ক’দিনেই তুমুল বন্ধুত্ব হয়ে গেল সবার সাথে। বাংলাদেশের যুক্তিযুদ্ধের কথা, সেখানে কী ঘটছে এসব শুনে গেগেলিন সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিলো। একরাতে হোটেল মালিক এসে জানালেন, ‘গোয়েন্দা পুলিশ ঘোরাঘুরি করছে, আপনাদের পরিচয়পত্র দিন।’ তখন গেগেলিন তার বাবাকে বুঝিয়ে তাদের রক্ষা করলেন।
এবার আর দেরি করার সুযোগ নেই। দেশে ফেরার ব্যবস্থা করতে হবে অবিলম্বে। শান্ত ও ধীরস্থির স্বভাবের রহমতউল্লাহ এবং মোশাররফ গেলেন ইন্ডিয়ান হাইকমিশনে। সেখানে পেঁৗছে দেখা গেল, চারিদিকে উত্তেজনার পরিবেশ। পাকিস্তানি সাবমেরিন থেকে বাঙালি নৌ-কমান্ডোদের পলায়নের খবর ভারত, পাকিস্তান এবং ইউরোপের বহু দেশে আলোড়ন তুলেছে। হাইকমিশনার তখন দেশে নেই, দায়িত্বে আছেন চার্জ দ্য অ্যাফেয়ার্স শ্রী বেদী। খবর শুনে তিনি উচ্ছ্বসিত হলেন এবং সবার নিরাপত্তার পূর্ণ নিশ্চয়তা দিলেন।
দুই দিন সবাই হোটেলে অবস্থান করলেন। কিছুদিনের মধ্যেই ভারত সরকারের কাছ থেকে রাজনৈতিক আশ্রয়ের অনুমোদন এসে পৌঁছাল। দূতাবাস থেকে জরুরি পাসপোর্ট তৈরি করে পরদিনই রোম পাঠানোর ব্যবস্থা হলো।
হোটেল ছাড়ার মুহূর্তে গেগেলিনের চোখ ভিজে উঠল। বিদায়বেলায় সে বলল, ‘Write me from your independent Bangladesh.’
রোমে গিয়ে তারা জানলÑ নিউইয়র্ক থেকে ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের একটি বিমান তাদের নিতে আসবে। কিন্তু যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে সেই ফ্লাইট বিলম্বিত হবে। এরই মধ্যে বিবিসির সংবাদে পালিয়ে আসা বাঙালি ক্রুদের খবর প্রচারিত হওয়ায় বিমানবন্দরে একদল সাংবাদিক ঘিরে ধরল। ইন্ডিয়ান এয়ারলাইন্সের এক কর্মকর্তা সতর্ক করে দিলেনÑ“কোনো মন্তব্য করবেন না,” তবু প্রশ্ন থামল না:
“আপনারা কেন স্বপক্ষ ত্যাগ করলেন?”
“বাংলাদেশের স্বাধীনতার ব্যাপারে আপনারা কতটা আশাবাদী?”
চিফ সেক্রেটারি জানালেন একটি নতুন রুটের কথাÑ সুইস এয়ারের একটি ফ্লাইটে জেনেভা, সেখান থেকে এক ঘণ্টার মধ্যে বোম্বে হয়ে ব্যাংককগামী আরেকটি ফ্লাইট। কিন্তু এর মধ্যেই পাকিস্তানি কর্তৃপক্ষ ইতালীয় প্রশাসনকে বোঝানোর চেষ্টা চালিয়ে গেলÑ ভারতীয়রা নাকি তাদের কিছু লোককে প্রলুব্ধ করে নিয়ে যাচ্ছে, তাই আটকানো উচিত। পরিস্থিতি জটিল হয়ে উঠলে চিফ সেক্রেটারি পেছনের দরজা খুলে বললেন:
“দ্রুত দৌড়ে গিয়ে জেনেভাগামী প্লেনে উঠে পড়ুন, সব ব্যবস্থা হয়ে গেছে। আর দেরি করবেন না।”
তাই কোনো বিলম্ব না করেই সবাই উঠে পড়লেন বিমানে। রোম বিমানবন্দরের ওয়েটিং রুমে পড়ে রইল সুটকেস ও ব্যাগপত্র।
জেনেভায় পৌঁছে ইন্ডিয়ান দূতাবাসের কর্মকর্তারা সুড়ঙ্গপথে তাদের সরাসরি ভিআইপি লাউঞ্জে নিয়ে গেলেন। ১৯৭১ সালের ৯ এপ্রিল সকাল ৯টা ৩০ মিনিটে তারা পৌঁছালেন দিল্লিতে। সামরিক গাড়ি নিয়ে অপেক্ষা করছিলেন ইন্ডিয়ান কমান্ডার মি. শর্মা। কড়া নিরাপত্তার মধ্যে আটজনকে আনা হলো হোটেলে।
এরপর পাকিস্তানি নৌবাহিনী সম্পর্কে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য সংগ্রহ করল ভারতীয় গোয়েন্দা বিভাগ। একসময় কমান্ডার শর্মা এসে বললেনÑ যুদ্ধের জন্য কী ধরনের অস্ত্র প্রয়োজন আপনাদের? আমি নিজে নৌবাহিনীর মানুষ, তাই জানিÑ আপনারা চাইলে আটজন মিলে আট শ জনের সমান কাজ করতে পারবেন। অল্প লোক, অল্প সময়ে, সর্বোচ্চ ফলাফল।”
তারই উদ্যোগে নৌ—কমান্ডো গঠনের পরিকল্পনা শুরু হলো। দিল্লির পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া যমুনা নদীতে শুরু হলো গেরিলা প্রশিক্ষণ। ১৯৭১ সালের ২৫ এপ্রিল থেকে ১৫ মে পর্যন্ত কুতুব মিনারের পাশের পাহাড়ি এলাকায় বিশ দিনের সংক্ষিপ্ত সাঁতার ও বিস্ফোরণ প্রশিক্ষণ সম্পন্ন হলো। প্রশিক্ষণ শেষে তারা দিল্লি থেকে কলকাতার উদ্দেশে রওনা দিলেন।
মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর নির্দেশে ২৩ মে নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের ট্রেনিং দেওয়ার উদ্দেশ্যে একটি গোপন ক্যাম্প খোলা হয় পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয়েছিল সি-২ পি।
ভারতের মুর্শিদাবাদের ধর্মগোলা থেকে একটি চওড়া রাস্তা তার চারপাশে সবুজ মাঠ, গ্রাম ছবির মত চোখের সামনে ভাসতে থাকে। এই রাস্তার শেষ প্রান্তে নবাব সিরাজউদ্দৌলার সাথে ইংরেজ বাহিনীর যুদ্ধের স্মৃতিস্তম্ভÑ মনুমেন্ট। তাতে লেখা “ব্যাটল ফিল্ড অব পলাশী ১৭৫৭। ”
উঁচু মনুমেন্টের দক্ষিণ পাশে ঘন আমের বাগান, ইতিহাসখ্যাত আম্রকানন। আম বাগানের পুবে একটা একতলা প্রাসাদ। এই প্রাসাদে নবাব সিরাজউদ্দৌলা এবং লর্ড ক্লাইভের যুদ্ধের স্মৃতি সংরক্ষিত আছে। আম বাগানের ঠিক মাঝখানটায় একটা পুকুর। পুকুরের চারপাশে তাঁবু খাটিয়ে তৈরি হয়েছে গোপন ট্রেনিং ক্যাম্প সি-টু-পি। বাংলাদেশের বিভিন্ন মুক্তিযোদ্ধা ক্যাম্প থেকে বাছাই করা প্রায় চার শ তরুণকে নৌ-কমান্ডো ট্রেনিং দেওয়া হচ্ছে।

শফিক আহমেদ ভুইয়া
একজন সমাজ গবেষক ও লেখক, যিনি সমাজ, ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

