২য় পর্ব
মতিউর রহমান ছোটবেলা থেকেই ছিলেন একজন দক্ষ ফুটবলার। দূরের গ্রামেও গিয়ে খেলেছেন ফুটবল ম্যাচ। ফুটবলের পাশাপাশি সাঁতার, ভলিবল, ক্রিকেট, অ্যাথলেটিক্স, বর্শা নিক্ষেপসহ নানা খেলায় ছিলেন সমান পারদর্শী। ১৯৬৬ সাল থেকে নিয়মিত জোনাল স্পোর্টসে অংশ নিতেন, খেলাধুলাতেই ছিল তাঁর জীবনযাপন।
দেশের প্রতি অবিচার ও বৈষম্যের কথা তিনি ছোটবেলা থেকেই শুনতেন বড় ভাই মুসলেম উদ্দিনের মুখে। সে সময় মুসলেম উদ্দিন জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বিএসসি পাস করে চাকরির জন্য চেষ্টা করছিলেন। প্রায় প্রতিমাসেই ইন্টারভিউ দিতেন, কিন্তু চাকরি মিলত নাÑকারণ বাঙালিদের সুযোগ ছিল সীমিত।
১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু ঐতিহাসিক ভাষণ দিলেন। একদিন পর মতিউর ও তার তিন বন্ধু মিলে রেডিওতে সেই ভাষণ শোনেন। বঙ্গবন্ধুর কণ্ঠে ভেসে আসে, ‘আমরা যখন মরতে শিখেছি, তখন কেউ আমাদের দাবায়ে রাখতে পারবে না… মনে রাখবা, রক্ত যখন দিয়েছি, রক্ত আরো দেব…’
২৫ মার্চের পর দেশের অবস্থা দ্রুত বদলে যায়। মতিউর খেলতে মাঠে গেলে প্রায়ই গ্রামের আকাশে বোমা পড়ত, সবাই আতঙ্কে পালিয়ে যেত। পাকিস্তানি সেনাদের অত্যাচারের খবর তাঁর কিশোর মনে গভীর দাগ কাটে। অবশেষে নূর ইসলাম, শহিদ, কাউসার ফরাজীর সাথে যুদ্ধে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন।
এক সাক্ষাৎকারে নৌ-কমান্ডো মতিউর রহমান বলেন, ‘মে মাসের শেষের দিকে এক দুপুরে খেলার কথা বলে বের হয়ে পড়ি। পাশের গ্রামের শহিদুল ইসলাম ছিল পথপ্রদর্শক, সে ভারতের পথ চিনত। আমাদের পরিকল্পনা ছিল ফরিদপুর হয়ে যশোর, তারপর ভারতের চব্বিশ পরগনায় যাওয়া। কিন্তু বাগদা বর্ডার পার হওয়ার আগেই সঙ্গের দুই বন্ধু মত পাল্টাল, তারা বাড়ি ফিরে গেল। আরেকজন ভারতে গিয়ে ট্রেনিংয়ে যোগ দিতে রাজি হলো না। তখন আমি একা। তবুও সিদ্ধান্তে অটল ছিলাম। লোকমুখে ঠিকানা জেনে বাসে উঠি, কিন্তু পকেটে কোনো টাকা ছিল না। মাঝপথে ভাড়া দিতে না পারায় নেমে যেতে হয়। পরে হেঁটেই বনগাঁর টালিখোলা ক্যাম্পে পৌঁছাই। বিকেলের দিকে লাইনে দাঁড়াতেই আমাকে নিয়ে নেয়া হয়। সেখানে প্রায় দুই সপ্তাহ লেফট-রাইট আর ক্রলিংয়ের কড়া প্রশিক্ষণ চলল।’ তখন তিনি মাত্র দশম শ্রেণির শিক্ষার্থী, কৈশোর পেরিয়েছেন সবে।
বীর মুক্তিযোদ্ধা নৌ কমান্ডো মো. এনামুল হক তাঁর মুক্তিযুদ্ধের অভিজ্ঞতা নিয়ে, ‘অপারেশন জ্যাকপট: এক নৌকমান্ডোর অহংকার’ বইতে লিখেছেন ১৯৭১—এর দিনগুলোর স্মৃতিচারণ। মার্চের উত্তাল ঢাকা, ২৫ মার্চের কালরাত্রি, মুক্তিযুদ্ধ, নৌ-কমান্ডো গঠন, প্রশিক্ষণ এবং অপারেশন জ্যাকপটের নানা দিক সেখানে উঠে এসেছে।
শৈশবে বাবার চাকরিসূত্রে কক্সবাজারে থাকা অবস্থায় তিনি প্রায়ই বন্ধুদের সঙ্গে সাগরে সাঁতার কাটতে যেতেন। সেই অভিজ্ঞতা পরবর্তীতে নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণকে সহজ করে দেয়। অপারেশন জ্যাকপটের মতো ঝুঁকিপূর্ণ মিশনে নিশ্চিত মৃত্যুর সম্ভাবনা জেনেও পিছপা হননি। প্রশিক্ষণের শুরুতে অঙ্গীকারনামায় লিখেছিলেন, ‘আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণে অংশগ্রহণ করছি। যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।’
যুদ্ধে যাওয়ার কারণ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘তখন আমি জগন্নাথ কলেজের ছাত্র, ছাত্ররাজনীতির সঙ্গে জড়িত। পাকিস্তানিদের শোষণ—নিপীড়ন খুব কাছ থেকে দেখেছি। সেই দ্রোহই আমাকে যুদ্ধে যেতে উদ্বুদ্ধ করে।’
২৫ মার্চ রাতে হঠাৎ গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায়। চারদিকে বারুদের গন্ধ, আব্বা ভয়ে আজান দিতে থাকেন, আম্মা সবাইকে মেঝেতে শুয়ে পড়তে বলেন। পরবর্তী তিন দিন কারফিউ চলল। কারফিউ ওঠার পর ঢাকার অবস্থা দেখতে বেরিয়ে পড়েন এনামুল। যা দেখেন তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিনÑবিশেষ করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রোকেয়া হলের সামনে ছেঁড়া শাড়ি, ব্লাউজ, ওড়না ঝুলতে দেখে এবং জগন্নাথ হলে গণহত্যার ভয়াবহতার কথা শুনে ভিতরে গভীর ক্ষোভ জন্মে।
এরপর গ্রামের খবির, কুদ্দুস, রফিককে নিয়ে মিটিং করে সিদ্ধান্ত হয়— ভারতে গিয়ে প্রশিক্ষণ নেওয়া হবে। নানা জটিলতা পেরিয়ে ভারতে গিয়ে সাঁতারে দক্ষতার কারণে এনামুল হক নৌ-কমান্ডো প্রশিক্ষণের জন্য নির্বাচিত হন।
এসএসসি পাস করা, সদ্য কৈশোর পার হওয়া এমন বহু তরুণ মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েছিলেন—কেউ বাবা-মায়ের চোখ ফাঁকি দিয়ে, কেউ ভাইয়ের লাশ মাড়িয়ে, কেউ শত্রুর চোখ এড়িয়ে বন-জঙ্গল ডিঙিয়ে ভারতের ক্যাম্পে পৌঁছেছেন স্বাধীনতার জন্য জীবন বাজি রেখে।
ফ্রান্স থেকে পালিয়ে আসা ৮ জন সাবমেরিন নাবিক, কর্নেল রফিকুল ইসলাম, মুক্তিবাহিনীর প্রধান এম এজি ওসমানী এবং ভারতের নৌবাহিনীর অভিজ্ঞ জেনারেলদের তত্ত্বাবধানে ভগীরথী নদীর তীরে ৩০০ জন দক্ষ, সাহসী যুবককে নিয়ে শুরু হয় ]প্রশিক্ষণ। সেখান থেকেই গড়ে ওঠে মুক্তিযুদ্ধের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অভিযানÑঅপারেশন জ্যাকপট।
মুক্তিবাহিনীর প্রধান সেনাপতি কর্নেল ওসমানীর নির্দেশে নৌ-কমান্ডো সেক্টর খোলার পর বাছাইকৃত গেরিলাদের নিয়ে ট্রেনিং শুরু হলো পলাশীর স্মৃতিসৌধের পাশে ভাগীরথী নদীর তীরে। এই ট্রেনিং ক্যাম্পের সাংকেতিক নাম দেয়া হয়েছিল সি-২ পি (C-2p)।
ট্রেনিং শুরু হওয়ার আগেই বাছাইকৃত যোদ্ধাদের বলে দেওয়া হয় যে এটি একটি সুইসাইডাল অপারেশন বা আত্মঘাতী যুদ্ধ। তাই অপারেশনের সময় যেকোনো মূল্যে অপারেশন সফল করার উদ্দেশ্যে প্রয়োজনে তাদের প্রাণ দিতে হতে পারে। তাই প্রশিক্ষণের শুরুতেই প্রত্যেক প্রশিক্ষণার্থীদের ছবিসহ একটি সম্মতিসূচক পাতায় স্বাক্ষর নেয়া হয়েছিল। তাতে লেখা ছিল, ‘আমি দেশের স্বাধীনতার জন্য জীবন বিসর্জন দিতে সম্মত হয়েই এই প্রশিক্ষণ গ্রহণ করছি, আর যুদ্ধে আমার মৃত্যু ঘটলে কেউ দায়ী থাকবে না।
নৌ-কমান্ডোদের ওই প্রশিক্ষণ ক্যাম্পের দায়িত্বে ছিলেন ভারতীয় নেভাল অফিসার কমান্ডার এম এন সামানত, ট্রেনিং দেয়ার দায়িত্বে ছিলেন লে. কমান্ডার জি এম মার্টিস। ট্রেনিংয়ে ছিল দুটি অংশ।
প্রথমভাগে সারফেস ডেমোলিশন :
এতে গ্রেনেড নিক্ষেপ, এক্সপ্লোসিভের ব্যবহার, স্টেনগান—রিভলভার চালানো, আন—আর্মড কমব্যাট (খালি হাতে যুদ্ধ) ব্রিজ, কালভার্ট বোমা মেরে উড়িয়ে দেয়া।
দ্বিতীয়ভাগে আন্ডারওয়াটার ডেমোলিশন :
জলযুদ্ধের ট্রেনিং— বুকে ৫—৬ কেজি ওজনের পাথর বেঁধে সাঁতার, চিৎ সাঁতার, কোনো মতে পানির উপরে নাক ভাসিয়ে একটানা অনেকক্ষণ সাঁতার, পানিতে সাঁতরে এবং ডুব সাঁতার দিয়ে লিমপেট মাইন ব্যবহার, স্রোতের প্রতিকূলে সাঁতার, জাহাজের কেবল ভাঙা ইত্যাদি কঠিন সব প্রশিক্ষণ দেয়া হতো তীব্র খরস্রোতা ভাগীরথী নদীতে। এসময় শীত ও বর্ষায় একটানা ৪৮ ঘণ্টা পানিতে থাকার অভ্যাস করানো হয়েছিল। ভোর পাঁচটা থেকে রাত দশটা পর্যন্ত একটানা প্রশিক্ষণ। টানা ৪৮ ঘণ্টা শুধু তরল খাবার খেয়ে কাটানোর অভ্যাস করা হলো।
আগস্টের ৩ তারিখে প্রথম ব্যাচের ট্রেনিং শেষ হলো। প্রায় টানা তিন মাস ট্রেনিং এর পর আগস্টের প্রথম সপ্তাহে শেষ হয় ট্রেনিং। সাঁতারের সবকিছু এখন জানা। এবার যুদ্ধে যেতে হবে।
প্রথম ব্যাচ থেকে ১৬০ জন কমান্ডোকে বাছাই করে ভাগ করে দিলেন কর্তৃপক্ষ। ষাটজনের একটি গ্রুপের লিডার এ, ডব্লিউ, চৌধুরী। এই দল চিটাগাং পোর্টে অপারেশন চালাবে। ষাটজনের আরেকটি দল যাবে খুলনা। মোংলা বন্দর এবং আশেপাশের নদীবন্দরে এদের অ্যাকশন। এই দলের কমান্ডার আহসানউল্লা। বিশজনের দুটো দল চাঁদপুর আর নারায়ণগঞ্জ যাবে। চাঁদপুর দলের লিডার আমিনউল্লাহ্ শেখ এবং নারায়ণগঞ্জ দলের লিডার আবেদুর রহমান।
১৬০ জনের দলটি নিয়ে ইন্ডিয়ান আর্মির লরি রাতের অন্ধকারে যাত্রা শুরু করলো। প্রথমে কলকাতার নিউ ব্যারাকপুর ক্যান্টনমেন্ট। সেখান থেকে প্লেনে আগরতলার নিউ ক্যাম্পে। এখান থেকেই কমান্ডো দল চারটি গেরিলা আক্রমণের উদ্দেশ্যে আলাদা হয়ে গন্তব্যে যাত্রা করলো। প্রথম অপারেশনগুলোর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ চিটাগাং পোর্ট অপারেশন। এখানেই পাকিস্তানি জাহাজ অস্ত্র গোলাবারুদ নিয়ে নোঙর করছে। চৌধুরী দাদুর কমান্ডিং—এ ৬০ জনের দলটি হরিনা ক্যাম্পের উদ্দেশ্যে রওনা হলো।
এক নম্বর সেক্টর কমান্ডার মেজর রফিকুল ইসলাম সেখানে অপারেশনের স্থল পথ ও অন্যান্য পরিকল্পনা নিয়ে অপেক্ষায় আছেন। সাত তারিখের মধ্যে পৌঁছে যাবে সেখানে। আর পেছনে ফেরা নয়, এবার সামনে এগিয়ে যাওয়ার পালা। রণাঙ্গনের উত্তেজনাময় মুহূর্তগুলো হাতছানি দিয়ে ডাকছে। ডাকছে লাঞ্ছিত বাংলাদেশ। বুকে ধারণ করে মুক্তির শপথ ও বিজয়ের প্রত্যয়ে এগিয়ে চললো বাংলার দামাল ছেলেরা ।
এর আগে প্রত্যেক দলের নেতাদের অপারেশন জ্যাকপটের খুঁটিনাটি বিষয়াদি এবং টেকনিক্যাল বিষয় সম্পর্কে সম্যক ধারণা দিতে বিমানযোগে নিয়ে যাওয়া হয় দিল্লিতে এবং ১ আগস্ট আবার পলাশীতে ফিরিয়ে আনা হয়। অপারেশনের সময় তাঁদের দেয়া হয় একটি করে ট্রানজিস্টার যার মাধ্যমে দুইটি গানের সূত্র ধরে দলনেতারা জানতে পারবে কীভাবে অভিযান চালাতে হবে বা কবে অভিযান বন্ধ রাখতে হবে।
নিয়ম হলো গান বাজানো হলে প্রস্তুতি নিতে হবে এবং বাজানো না হলে অভিযান হতে বিরত থাকতে হবে। দুইটি গানের মধ্যে ছিলো একটি পঙ্কজ মল্লিকের, ‘আমি তোমায় যত শুনিয়েছিলেম গান, তার বদলে আমি চাই নে কোনো দান।’ এবং দ্বিতীয়টি ছিল সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়ের, ‘আমার পুতুল আজকে যাবে শ্বশুরবাড়ি, ওরে তোরা সব উলুধ্বনি কর।’
প্রথম গানটি বাজানো হলে বুঝতে হবে ২৪ হতে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে অপারেশন শেষ করার সব প্রস্তুতি নিতে হবে এবং দ্বিতীয়টি হলো ঠিক ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আঘাত হানতে হবে আর কোনো কারণে গান বাজানো না হলে বিরত থাকতে হবে এবং অপেক্ষা করতে হবে গান না বাজানো পর্যন্ত।
(চলবে..)

শফিক আহমেদ ভুইয়া
একজন সমাজ গবেষক ও লেখক, যিনি সমাজ, ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।

