আতাউর রহমান বাবুল
রাষ্ট্রের মালিক জনগণ এটি কোনো কল্পনা নয়, একটি গণতান্ত্রিক সত্য। জনগণের ট্যাক্সে রাষ্ট্র চলে, জনগণের শ্রম ও অংশগ্রহণে রাষ্ট্র গড়ে ওঠে, এবং জনগণের রায়েই রাষ্ট্র পরিচালিত হওয়ার কথা। সুতরাং রাষ্ট্রে কোথায় কোথায় সংস্কার প্রয়োজন, সেটাও ঠিক করবেন জনগণই।
গণতন্ত্রে এই সিদ্ধান্ত গ্রহণের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ উপায় হচ্ছে নির্বাচন। জনগণ তাদের প্রতিনিধিকে নির্বাচিত করে সংসদে পাঠায় এই বিশ্বাসে যে, তারা রাষ্ট্রীয় সমস্যাগুলো চিহ্নিত করে কার্যকর সংস্কার আনবেন। নির্বাচনই সেই প্রক্রিয়া, যার মধ্য দিয়ে প্রার্থীরা জনগণের কাছে তাদের সংস্কারের পরিকল্পনা উপস্থাপন করেন।
উদাহরণ ১
ভারতে নরেন্দ্র মোদির ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’
২০১৪ সালের নির্বাচনের আগে নরেন্দ্র মোদি তার প্রচারে বলেছিলেন— ভারতে পরিচ্ছন্নতা একটি বড় সমস্যা, এবং তিনি ‘স্বচ্ছ ভারত অভিযান’ নামে একটি আন্দোলন চালু করবেন। জনগণ সেই প্রতিশ্রুতিকে সমর্থন করে তাকে ভোট দেয়। পরবর্তীতে সরকারিভাবে সেই সংস্কার বাস্তবায়ন হয়। এই উদাহরণ দেখায়, কীভাবে সংস্কারের পক্ষে জনমত ও রাজনৈতিক ম্যান্ডেট নির্বাচন থেকেই আসে।
উদাহরণ ২
আমেরিকায় ওবামার ‘অবামা কেয়ার’ স্বাস্থ্যনীতি
২০০৮ সালে বারাক ওবামা “সবার জন্য স্বাস্থ্যসেবা” দেওয়ার প্রতিশ্রুতি নিয়ে নির্বাচনে জয়ী হন। নির্বাচনের পর তাঁর প্রস্তাবিত স্বাস্থ্য সংস্কার নিয়ে কংগ্রেসে তুমুল বিতর্ক হয়, জনগণের নানা প্রতিক্রিয়া আসে, মিডিয়ায় বিশ্লেষণ হয়—সব মিলিয়ে একটি গণতান্ত্রিক পদ্ধতির মধ্য দিয়ে সংস্কার প্রতিষ্ঠিত হয়।
নির্বাচন ছাড়া সংস্কার মানে একতরফাভাবে ক্ষমতা প্রয়োগ, যা গণতন্ত্রের মূলনীতির পরিপন্থী। সংসদে নির্বাচিত প্রতিনিধিদের মধ্যে যে বিতর্ক হয়, তা সংস্কারকে জনমতের আলোয় যাচাই করার পথ তৈরি করে। মিডিয়া সেই বিতর্ক পৌঁছে দেয় জনগণের ঘরে ঘরে। জনমত তখন স্পষ্টভাবে বুঝতে পারে—কোনটা প্রয়োজনীয় সংস্কার, আর কোনটা রাজনৈতিক স্ট্যান্ট।
নির্বাচনের আগে সংস্কার আসলে একটি রাজনৈতিক চাল। বর্তমানে যাঁরা নির্বাচনের আগেই নানা সংস্কারের কথা বলে ভোট এড়িয়ে যেতে চাইছেন, তারা মূলত নির্বাচনের পথকে রুদ্ধ করতে চাইছেন। তারা একটি অবৈধ সংস্কারের দেয়াল দাঁড় করিয়ে জনগণকে দূরে রাখছেন। এটি গণতন্ত্র নয়, এটি কর্তৃত্ববাদী মানসিকতার প্রতিফলন।
ইতিহাস থেকে শিক্ষা
যখন নির্বাচনহীন সংস্কার ছিল ভেতরে ‘অন্য কিছু’
রাশিয়ায় পুতিনের নির্বাচনের আগেই ‘পরিবর্তন’ কৌশল
ভ্লাদিমির পুতিন প্রায় প্রতিবার নির্বাচনের আগে সাংবিধানিক পরিবর্তন ও ‘রাষ্ট্র সংস্কার’ ঘোষণা দেন— কখনো প্রধানমন্ত্রী থেকে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা বাড়িয়ে, কখনো মেয়াদ বাড়িয়ে। কিন্তু এইসব সংস্কার সবসময়ই নির্বাচন থেকে দৃষ্টি সরিয়ে ক্ষমতায় থাকার পাকা ব্যবস্থা হিসেবে ব্যবহৃত হয়েছে।
মিসরে হোসনি মুবারকের ‘সংস্কার প্রতিশ্রুতি’:
মুবারক শাসনামলে মিসরে নির্বাচনের আগে বারবার বলা হয়েছে যে ‘রাজনৈতিক সংস্কার চলছে’। কিন্তু প্রকৃত অর্থে কোনো অংশগ্রহণমূলক নির্বাচন হয়নি। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়াই সংস্কারের নামে সেনা ও পুলিশের দমননীতি কঠোর হয়েছে। ২০১১ সালের আরব বসন্ত সেই দীর্ঘ অবৈধ সংস্কার ব্যবস্থার বিরুদ্ধে এক প্রতিক্রিয়া ছিল।
চিলির পিনোশে শাসনকাল:
অগাস্টো পিনোশে ১৯৭৩ সালে ক্ষমতা দখল করে সাংবিধানিক সংস্কারের নামে গণতন্ত্রের সমস্ত প্রতিষ্ঠান ধ্বংস করেন। তার ‘সংস্কার’ ছিল মূলত বিরোধী কণ্ঠস্বর স্তব্ধ করা এবং সামরিক একনায়কতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করা। চিলির জনগণ ১৫ বছর পর গণভোটের মাধ্যমে সেই ‘সংস্কার’ প্রত্যাখ্যান করে।
প্রকৃতপক্ষে, আজ যারা নির্বাচন এড়িয়ে গিয়ে আগেভাগে সংস্কারের কথা বলছেন, তারা মূলত নির্বাচনকেই প্রশ্নবিদ্ধ করছেন। এটি রাজনৈতিকভাবে একটি চাল—নির্বাচনের দরজা বন্ধ করে নিজেদের জন্য একচেটিয়া সিদ্ধান্ত গ্রহণের রাস্তা তৈরি করা। ইতিহাস বলছে, এমন পদক্ষেপ সবসময়ই গণতন্ত্রের বিপরীতে গেছে, এবং একসময় তা জনরোষে ধ্বংস হয়েছে।
লেখক: ডাটা এনালিস্ট, এনওয়াইএস, যুক্তরাষ্ট্র

