মঙ্গলবার | জুন ২ | ২০২৬

বিশ্ব আজ এক নতুন সমীকরণের দোরগোড়ায়। প্রাচীন সিল্করোডের ঐতিহাসিক ভূমিকা পুনর্জীবিত হচ্ছে বৈশ্বিক বাণিজ্য, অবকাঠামো এবং ভূরাজনৈতিক কৌশলের মাধ্যমে। এই পরিবর্তনের অন্যতম কেন্দ্রীয় উদ্যোগ হলো চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (BRI) যা ইউরেশিয়া ও তার বাইরের অঞ্চলগুলোকে নতুনভাবে সংযুক্ত করছে। এই বৃহত্তর কাঠামোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ক্রমশই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে।

সিল্ক রোড- বিআরআই ও এমএসআর
সিল্ক রোড- বিআরআই ও এমএসআর

বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থান, দক্ষিণ ও দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার সংযোগস্থল এবং সামুদ্রিক বাণিজ্যপথে প্রবেশাধিকার; সব মিলিয়ে বাংলাদেশ একটি সম্ভাব্য মেরিটাইম হাব হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে। এই প্রাসঙ্গিকতা থেকেই বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা, ভূরাজনৈতিক তাৎপর্য, নীল অর্থনীতির সম্ভাবনা এবং সংশ্লিষ্ট চ্যালেঞ্জগুলো বিশদভাবে ভাবা দরকার।

ঐতিহাসিকভাবে সিল্করোড কেবল স্থলপথে সীমাবদ্ধ ছিল না; এটি সংস্কৃতি, জ্ঞান এবং বাণিজ্যের একটি বিস্তৃত নেটওয়ার্ক ছিল, যা এশিয়া, আফ্রিকা ও ইউরোপকে সংযুক্ত করেছিল। আধুনিক যুগে এই ধারণা সমুদ্র কেন্দ্রিকতায় রূপ নিচ্ছে, যেখানে সামুদ্রিক রুটগুলো বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংযোগের প্রধান মাধ্যম হয়ে উঠছে। চীনের BRI-এর মেরিটাইম সিল্ক রোড (MSR) উদ্যোগটি এই পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এটা সমুদ্রপথে এশিয়া থেকে আফ্রিকা ও ইউরোপ পর্যন্ত নতুন বাণিজ্য করিডোর তৈরি করছে। এই প্রেক্ষাপটে বঙ্গোপসাগরের তীরে অবস্থিত বাংলাদেশ এক অনন্য ভূরাজনৈতিক অবস্থানে রয়েছে। এই হিসাব বাংলাদেশকে আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রভাবকে পরিণত করেছে। বঙ্গোপসাগর বিশ্বের অন্যতম কৌশলগত গুরুত্বপূর্ণ সামুদ্রিক অঞ্চল। এটি ভারত, বাংলাদেশ, মিয়ানমার, শ্রীলঙ্কা, থাইল্যান্ড এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোকে ঘিরে রেখেছে এবং এর আশপাশে বিশ্বের এক-চতুর্থাংশ মানুষের বসবাস। এই উপসাগরটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য এবং স্থানীয় অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কারণ এটি পূর্ব ও পশ্চিমের মধ্যে শিপিং রুটের মহাসড়ক হিসেবে কাজ করে। বিশ্বের মোট সামুদ্রিক বাণিজ্যের প্রায় ৫০% এবং তেল পরিবহনের প্রায় ৬৫% ভারত মহাসাগরের মধ্য দিয়ে যায় যার একটি বড় অংশ বঙ্গোপসাগর অতিক্রম করে। বাংলাদেশ  ভৌগোলিক অবস্থানের কারণে এশিয়ার বাণিজ্য ও সংযোগ বৃদ্ধির জন্য সেতুবন্ধনের ভূমিকা পালন করতে সক্ষম।

বিআরআই-এর অধীনে বাংলাদেশ-চীন-ভারত-মিয়ানমার (BCIM) অর্থনৈতিক করিডোর বঙ্গোপসাগর এবং ভারত মহাসাগরের মাধ্যমে নীল অর্থনীতি ও আন্তর্জাতিক সামুদ্রিক বাণিজ্যের জন্য সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করেছে।

বিআরআই-এর মেরিটাইম সিল্ক রোড বাংলাদেশের সমুদ্রবন্দরগুলোর উন্নয়নে নতুন সম্ভাবনা নিয়ে এসেছে। চট্টগ্রাম বন্দর বাংলাদেশের প্রধান সমুদ্রবন্দর। দেশের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের সিংহভাগ এই বন্দরের মাধ্যমেই সম্পন্ন হয়। এর পাশাপাশি পায়রা গভীর সমুদ্রবন্দর এবং মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর উন্নয়ন প্রকল্প দুটি বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর জাপানের সহায়তায় নির্মিত হলেও এটি আঞ্চলিক সংযোগের ক্ষেত্রে BRI-এর বৃহত্তর কাঠামোর সাথে পরোক্ষভাবে যুক্ত হতে পারে। বিআরআই-এর অধীনে চীনা বিনিয়োগ বাংলাদেশের অবকাঠামো উন্নয়নে, বিশেষ করে বন্দর এবং সংযোগ প্রকল্পে উল্লেখযোগ্য প্রভাব ফেলছে। উদাহরণ স্বরূপ কক্সবাজারের মহেশখালীতে একটি গভীর সমুদ্রবন্দর নির্মাণে চীনের আগ্রহ ছিল, যদিও পরবর্তীতে মাতারবাড়ী প্রকল্প জাপানের অর্থায়নে শুরু হয়। তবে বিভিন্ন সড়ক, সেতু এবং বিদ্যুৎ প্রকল্পে চীনের বিনিয়োগ বাংলাদেশের আঞ্চলিক বাণিজ্য কেন্দ্র হিসেবে গড়ে ওঠার সম্ভাবনাকে জোরদার করছে। এই প্রকল্পগুলো ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা বৃদ্ধি, আঞ্চলিক বাণিজ্য প্রবাহ শক্তিশালীকরণ এবং লজিস্টিক হাব হিসেবে বাংলাদেশের ভূমিকাকে সুদৃঢ় করতে পারে।

নীল অর্থনীতি (Blue Economy) বাংলাদেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির  বিশাল সুযোগ তৈরি করেছে। বঙ্গোপসাগরে সমুদ্র সম্পদ আহরণ, সামুদ্রিক পর্যটন, শিপিং, নবায়নযোগ্য শক্তি এবং মৎস্য চাষের মতো খাতগুলো বাংলাদেশের অর্থনীতিতে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে। বাংলাদেশের বিশাল সমুদ্রসীমা (১১৮,৮১৩ বর্গ কিলোমিটার) এবং মৎস্য সম্পদের প্রাচুর্য নীল অর্থনীতির সম্ভাবনার একটি বড় অংশ। নীল অর্থনীতির সঠিক ব্যবহার বাংলাদেশের টেকসই অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি অর্জনে সহায়ক হতে পারে। তবে এর জন্য প্রয়োজন সুনির্দিষ্ট নীতি, পরিবেশগত সুরক্ষা, প্রযুক্তিগত সক্ষমতা এবং দক্ষ মানবসম্পদ। বিআরআই-এর মতো উদ্যোগগুলো নীল অর্থনীতির সংশ্লিষ্ট অবকাঠামো উন্নয়নে বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে পারে যা বাংলাদেশের সামুদ্রিক সক্ষমতা এবং অর্থনীতিকে আরও শক্তিশালী করবে।

বাংলাদেশের জন্য বিআরআই-এর সম্ভাবনার পাশাপাশি কৌশলগত ভূরাজনৈতিক চ্যালেঞ্জও বিদ্যমান। বঙ্গোপসাগরে বৈশ্বিক শক্তিগুলোর ক্রমবর্ধমান প্রতিযোগিতা একটি বড় উদ্বেগের কারণ। যুক্তরাষ্ট্রের ইন্দো-প্যাসিফিক কৌশল(IPS) এবং কোয়াডের (Quadrilateral Security Dialogue)মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, জাপান এবং অস্ট্রেলিয়ার মতো দেশগুলো এই অঞ্চলে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছে। কোয়াড চীনের বিআরআই-এর প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচিত। এই পরিস্থিতিতে  বাংলাদেশকে তার অর্থনৈতিক উন্নয়ন, সার্বভৌমত্ব এবং আঞ্চলিক সহযোগিতার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করতে হবে। চীনের বিআরআই-এর সঙ্গে যুক্ত হওয়ার ক্ষেত্রে অর্থনৈতিক নির্ভরতা এবং ঋণ-ফাঁদের ঝুঁকি নিয়ে বিতর্ক আছে। বাংলাদেশের জন্য  বিনিয়োগের স্বচ্ছতা, প্রকল্পের অর্থনৈতিক কার্যকারিতা এবং নিজস্ব ভূরাজনৈতিক স্বার্থ রক্ষা করা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। পাশাপাশি, পরিবেশগত নিরাপত্তা এবং সামরিক উদ্বেগের বিষয়গুলিও ক্রমবর্ধমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠছে। বাংলাদেশকে তার জাতীয় নিরাপত্তা এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করার জন্য একটি সুসংহত এবং দূরদর্শী সামুদ্রিক কৌশল গ্রহণ করতে হবে।

বাংলাদেশের সামনে এখন গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন, সে কি শুধু নতুন সামুদ্রিক সিল্করোডের অংশীদার হবে নাকি এই ব্যবস্থার সক্রিয় নীতিনির্ধারক শক্তি হয়ে উঠবে? এর উত্তর নির্ভর করে একটি সুসংগঠিত জাতীয় সামুদ্রিক কৌশল প্রণয়ন ও বাস্তবায়নের উপর। এই কৌশলের মূল ভিত্তি হওয়া উচিত স্বচ্ছ বিনিয়োগ কাঠামো, বিদেশি বিনিয়োগ, বিশেষ করে বিআরআই-এর আওতায় আসা প্রকল্পগুলোতে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করা। সম্ভাব্য ঝুঁকিগুলো মূল্যায়ন করে দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা না নিলে জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সামুদ্রিক কৌশলে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্ব নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট কোনো শক্তির উপর নির্ভরশীল না হয়ে বিভিন্ন আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করা আবশ্যক। ভারত, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র এবং ইউরোপীয় ইউনিয়নের মতো অংশীদারদের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক বজায় রাখাতে হবে।

সামুদ্রিক সক্ষমতা বৃদ্ধিতে বন্দর ব্যবস্থাপনা, নীল অর্থনীতি এবং নৌবাহিনীর জন্য দক্ষ জনশক্তি তৈরি করা প্রয়োজন। এর জন্য উচ্চশিক্ষা, প্রশিক্ষণ এবং প্রযুক্তি স্থানান্তরে বিনিয়োগ করা অপরিহার্য। নীল অর্থনীতির টেকসই বিকাশের জন্য সামুদ্রিক পরিবেশ এবং জীববৈচিত্র্য রক্ষা করা, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় সক্ষমতা বাড়ানো দরকারি। নীল অর্থনীতির প্রতিটি খাতের জন্য সুনির্দিষ্ট কর্মপরিকল্পনা এবং বিনিয়োগ আকর্ষণ করার জন্য প্রণোদনা প্যাকেজও তৈরি করতে হবে। BIMSTEC (বে অব বেঙ্গল ইনিশিয়েটিভ ফর মাল্টি-সেক্টরাল টেকনিক্যাল অ্যান্ড ইকোনমিক কো-অপারেশন) এবং IORA (ইন্ডিয়ান ওশান রিম অ্যাসোসিয়েশন) এর মতো আঞ্চলিক ফোরামগুলোতে বাংলাদেশের কার্যকর ভূমিকা রাখা প্রয়োজন।

আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক ফোরামে বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষা করা এবং বঙ্গোপসাগরের স্থিতিশীলতা ও নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশের কূটনৈতিক দূরদর্শিতার প্রয়োজন। বাংলাদেুশের উচিত তার ভূরাজনৈতিক অবস্থানকে কাজে লাগিয়ে একটি  ব্রিজিং পাওয়ার হিসেবে আবির্ভূত হওয়া। পররাষ্ট্রনীতিতে সকলের সাথে বন্ধুত্বের নীতি থেকে সরে আসার সুযোগ নেই বাংলাদেশের। এই নীতি বাংলাদেশের জন্য ভূরাজনৈতিক ভারসাম্য বজায় রাখার ক্ষেত্রে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

সিল্করোডের আধুনিক সংস্করণ মেরিটাইম সিল্ক রোড বাংলাদেশের জন্য অভূতপূর্ব সুযোগ তৈরি করেছে। সঠিক কৌশল ও দূরদর্শী নেতৃত্ব থাকলে বাংলাদেশ কেবল অংশগ্রহণকারী নয় বরং আঞ্চলিক সামুদ্রিক ক্ষমতার একটি কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে। বঙ্গোপসাগরের ভূরাজনৈতিক গুরুত্বকে কাজে লাগাতে একটি সুচিন্তিত জাতীয় সামুদ্রিক কৌশল প্রয়োজন। তাহলে বহুমাত্রিক অংশীদারিত্বের মাধ্যমে বাংলাদেশ তার অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি ত্বরান্বিত করতে এবং আঞ্চলিক স্থিতিশীলতায় গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখতে সক্ষম হবে। তবে এর জন্য প্রয়োজন অভ্যন্তরীণ সক্ষমতা বৃদ্ধি, পরিবেশগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা এবং বৈশ্বিক শক্তিগুলোর প্রতিযোগিতার মাঝে বিচক্ষণতার সাথে পথচলা। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ কেবল তার স্থলভূমির উপর নির্ভরশীল নয় বরং বিশাল সামুদ্রিক সম্ভাবনা এবং বঙ্গোপসাগরে কৌশলগত অবস্থানের উপর গভীরভাবে প্রোথিত।

লেখক: উদ্যোক্তা, গবেষক ও সমাজসেবক

Share.
Exit mobile version