শুক্রবার | জুলাই ১৭ | ২০২৬

     বাংলাদেশের জলবায়ু ক্রান্তীয় মৌসুমী প্রকৃতির। নাতিশীতোষ্ণ ও সহনীয় আবহাওয়ার জন্য প্রাণ-প্রাচুর্যে ভরা এই ভূমি। নদীমাতৃক এই দেশ। নদী আমাদের আত্মপরিচয়ের একটি প্রধান উপাদান। কিন্তু এই আত্মপরিচয় এখন সংকটে। নদীর সাথে আমাদের জীবন, অর্থনীতি, বাঁচা-মরার লড়াই দীর্ঘকাল ধরে। বাংলাদেশের নদীগুলো মরে যাচ্ছে। অনেক নদী প্রাকৃতিক কারণে ভরাট হয়ে নাব্যতা সংকটে মরে গেছে, কিছু নদী নদীখেকোদের লোভে মরে গেছে, কিছু নদী মারা যাচ্ছে পর্যাপ্ত পানির অভাবে। সড়কপথ ও রেলপথে যাত্রী ও পণ্য পরিবহন বহুগুন বেড়ে যাওয়ায় নদীর উপর নির্ভরতা কমেছে। স্বাভাবিক কারণেই নদীর প্রতি আমাদের গুরুত্ব ও ভালোবাসাও কমেছে। বাংলাদেশের প্রতিটি অঞ্চল সমানভাবে নদী, বৃষ্টিপাত কিংবা পানিসম্পদের সুবিধা পায় না। দেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চল, বিশেষ করে রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের বিস্তীর্ণ এলাকা দীর্ঘদিন ধরেই জলবায়ুগত বৈরিতার মুখোমুখি। এ অঞ্চল সমুদ্র থেকে অনেক দূরে অবস্থিত; দক্ষিণাঞ্চলের মতো সাগরের আর্দ্রতার প্রভাব এখানে পৌঁছায় না। ফলে গ্রীষ্মে দীর্ঘস্থায়ী তাপপ্রবাহ, শীতে তীব্র শৈত্যপ্রবাহ এবং শুষ্ক মৌসুমে প্রকট খরা এই তিনটি বৈশিষ্ট্য উত্তরবঙ্গের কৃষি ও জনজীবনকে নিয়মিতভাবে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বরেন্দ্র এলাকা বাংলাদেশের অন্যতম জলবায়ু-সংবেদনশীল অঞ্চল। এখানে বার্ষিক বৃষ্টিপাত দেশের পূর্ব ও দক্ষিণাঞ্চলের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে কম। আবার যে বৃষ্টিপাত হয়, তারও বড় অংশ অল্প সময়ে নেমে যায় এবং পর্যাপ্ত জলাধার, পুনর্ভরণ ব্যবস্থা ও নদী-খালের ধারণক্ষমতা না থাকায় সেই পানি দ্রুত নষ্ট হয়ে যায়। ফলে এই অঞ্চল বর্ষাকালে সহজেই বন্যায় আক্রান্ত হয় এবং শুষ্ক মৌসুমে তীব্র পানিসংকটে পড়ে। এই সংকটের সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী কৃষক; বিশেষ করে প্রান্তিক কৃষক, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষক এবং সীমিত জমির মালিকরা। সেচনির্ভর বোরো চাষ, সবজি উৎপাদন কিংবা ফলচাষের জন্য তাদের প্রধান ভরসা ভূগর্ভস্থ পানি। কিন্তু বছরের পর বছর অতিরিক্ত উত্তোলনের ফলে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। অনেক এলাকায় আগের তুলনায় অনেক গভীর থেকে পানি তুলতে হচ্ছে। ফলে বিদ্যুৎ খরচ বাড়ছে, উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং কৃষিতে লাভ কমছে।

রাজশাহীর তানোরে খরায় চৌচির ধানের জমি
রাজশাহীর তানোরে খরায় চৌচির ধানের জমি

বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশন এবং বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ উত্তরাঞ্চলের সেচব্যবস্থার উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। গভীর নলকূপ, ভূগর্ভস্থ পাইপলাইন, খাল পুনঃখনন, পুকুর সংস্কার, রাবার ড্যাম নির্মাণ এবং ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানোর বিভিন্ন উদ্যোগ ইতোমধ্যে নেওয়া হয়েছে। এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। তবে এসব উদ্যোগ উত্তরবঙ্গের ক্রমবর্ধমান পানির চাহিদার তুলনায় যথেষ্ট নয়।

 কৃষিজমির পরিমাণ, ফসলের নিবিড়তা, জনসংখ্যা বৃদ্ধি এবং জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত সবকিছু বিবেচনায় বর্তমান পানি প্রবাহ ও সেচ অবকাঠামো পর্যাপ্ত নয়। এখনও বহু প্রান্তিক কৃষক সেচ সুবিধার বাইরে। বিশেষ করে সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহালী, পাহান, মাহাতো, কোলসহ উত্তরাঞ্চলের বিভিন্ন ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষকরা অনেক ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সেচ সেবার আওতায় আসতে পারেননি। তাদের অনেকেরই জমি ছোট, অর্থনৈতিক সক্ষমতা সীমিত এবং গভীর নলকূপের পানির জন্য অন্যের ওপর নির্ভর করতে হয়। এই নির্ভরতা অর্থনৈতিক ও সামাজিক বৈষম্যও সৃষ্টি করে। সেচের পানি না পাওয়ায় ফসল নষ্ট হওয়া, ঋণের বোঝা বাড়া এবং হতাশা থেকে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষকদের আত্মহত্যার মতো মর্মান্তিক ঘটনাও উত্তরবঙ্গে অতীতে ঘটেছে। এসব ঘটনা শুধু ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি নয়; এগুলো রাষ্ট্রের পানি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতা ও বন্টনে বৈষম্যের সাক্ষ্য।

একটি সাঁওতাল কৃষি পরিবার

জলবায়ু পরিবর্তন এই সংকটকে আরও জটিল করে তুলছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উত্তরাঞ্চলে তাপপ্রবাহের সংখ্যা ও স্থায়িত্ব বেড়েছে। দীর্ঘ সময় ধরে উচ্চ তাপমাত্রা মাটির আর্দ্রতা দ্রুত কমিয়ে দেয়, ফসলের পানির চাহিদা বাড়ায় এবং সেচনির্ভরতা বৃদ্ধি করে। অন্যদিকে অনিয়মিত বৃষ্টিপাতের কারণে ভূগর্ভস্থ পানির স্বাভাবিক পুনর্ভরণও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। উত্তর- পশ্চিমাঞ্চলের চরমভাবাপন্ন আবহাওয়া ও পানি সংকটে ভৌগোলিক অবস্থান ও জলবায়ু পরিবর্তনের সাথে কিছু মনুষ্য সৃষ্ট কারণও রয়েছে। মানুষের পরিকল্পনাহীন কর্মকাণ্ডও জলবায়ু পরিবর্তনে প্রভাব ফেলছে। উত্তরবঙ্গে মহাসড়কের দুই পাশে এবং বিভিন্ন সামাজিক বনায়ন প্রকল্পে ব্যাপকভাবে আকাশমণি ও ইউক্যালিপটাস জাতীয় দ্রুতবর্ধনশীল বিদেশি বৃক্ষ রোপণ করা হয়েছে। অর্থনৈতিক দিক থেকে এগুলোর কিছু সুবিধা থাকলেও বহু পরিবেশবিদ দীর্ঘদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন যে, এই ধরনের বৃক্ষ তুলনামূলক বেশি পানি ব্যবহার করে, স্থানীয় জীববৈচিত্র্যকে ক্ষতিগ্রস্ত করে এবং দীর্ঘমেয়াদে পরিবেশগত ভারসাম্যে নেতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে। সরকারি, বেসরকারি ও ব্যক্তিগত পর্যায়ের বৃক্ষরোপণ কর্মসূচিতে ইউক্যালিপটাস ও আকাশমণি গাছের চারা তৈরি ও রোপণ এবং বিক্রয় নিষিদ্ধ করেছে সরকার। এই ঘোষণা শক্তভাবে বাস্তবায়ন জরুরি। বনায়নে দেশের জীববৈচিত্র্য রক্ষায় আগ্রাসী প্রজাতির গাছের চারা রোপণের পরিবর্তে দেশি প্রজাতির ফলদ, বনজ ও ঔষধি গাছের চারা রোপণ করাই হবে সচেতন নাগরিকদের দায়িত্ব।

বর্ষাকালে উত্তরবঙ্গের ওপর দিয়ে বিপুল পরিমাণ পানি প্রবাহিত হয়ে বাংলাদেশের দক্ষিণাঞ্চলের দিকে চলে যায়। এই পানির একটি অংশ যদি কার্যকরভাবে সংরক্ষণ করা যায় তাহলে শুষ্ক মৌসুমে কৃষি সেচের জন্য ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা অনেকাংশে কমানো সম্ভব। উত্তরবঙ্গের অসংখ্য নদী, খাল ও বিল বছরের পর বছর ভরাট হয়ে গেছে। অনেক নদী শুধু নামেই নদী। বর্ষায় সামান্য পানি আসে, শুষ্ক মৌসুমে সেগুলো প্রায় সম্পূর্ণ শুকিয়ে যায়। নদী খননের জন্য সরকার অর্থ ব্যয় করলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই খনন কার্যক্রম টেকসই ফল দেয় না। কোথাও পর্যাপ্ত গভীরতা নিশ্চিত হয় না, কোথাও আবার উজানের পলি ব্যবস্থাপনার অভাবে কয়েক বছরের মধ্যেই নদী পুনরায় ভরাট হয়ে যায়। এজন্য নদী খননকে প্রকল্পভিত্তিক আনুষ্ঠানিকতায় না রেখে বৈজ্ঞানিক নদী পুনরুদ্ধার কর্মসূচি নিতে হবে। নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ, ক্যাচমেন্ট এলাকা, পলি পরিবহন ও পানি ধারণক্ষমতা বিবেচনায় এনে খনন করতে হবে।

বিশ্বের অনেক দেশ বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলের চেয়েও শুষ্ক জলবায়ুর মধ্যে কৃষিতে বিস্ময়কর সাফল্য অর্জন করেছে। মধ্যপ্রাচ্যের কয়েকটি দেশ তার উদাহরণ। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সৌদি আরব, মিশর, ইসরায়েল ইত্যাদি দেশগুলো মরুভূমিময় হলেও তারা ড্রিপ ইরিগেশন, বর্জ্যপানি পুনর্ব্যবহার এবং বৃষ্টির প্রতিটি ফোঁটা সংরক্ষণের মাধ্যমে কৃষিকে টেকসই করেছে। বর্তমানে দেশগুলো কৃষিতে ব্যবহৃত পানির একটি বড় অংশ পরিশোধিত পুনর্ব্যবহৃত পানি থেকে সংগ্রহ করে। অস্ট্রেলিয়ার মারে-ডার্লিং অববাহিকা, ভারতের গুজরাট ও রাজস্থানের চেক ড্যাম মডেল ও নেদারল্যান্ডসের সমন্বিত পানি ব্যবস্থাপনা দেখিয়ে দিয়েছে পানি সংকটের সমাধান শুধু বেশি পানি তোলা নয় বরং দক্ষ ব্যবস্থাপনা। বাংলাদেশের উত্তরাঞ্চলেও সেই ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে।

আমরা দীর্ঘদিন ধরে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরশীল কৃষি গড়ে তুলেছি। অথচ প্রকৃতির নিয়ম হলো যতটা পানি উত্তোলন করা হবে ততটাই পুনরায় মাটির নিচে ফিরিয়ে দেওয়ার ব্যবস্থা থাকতে হবে। এই ভারসাম্য আজ ভেঙে পড়েছে। অনেক এলাকায় শুষ্ক মৌসুমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তর কয়েক দশক আগের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে নিচে নেমে গেছে। ফলে শুধু কৃষিই নয়, অনেক গ্রামের নলকূপেও পানি উঠতে সমস্যা হচ্ছে। এই পরিস্থিতিতে শুধু গভীর নলকূপ বাড়ানো কোনো স্থায়ী সমাধান হতে পারে না। এটি ভবিষ্যতে ভূগর্ভস্থ পানির ওপর আরও চাপ সৃষ্টি করবে। বিশ্বের শুষ্ক ও অর্ধশুষ্ক অঞ্চলের অভিজ্ঞতা বলছে, ভূগর্ভস্থ পানি ব্যবহারের পাশাপাশি ভূ-উপরিস্থ পানি সংরক্ষণ, বৃষ্টির পানি ধরে রাখা এবং পুনর্ভরণ ব্যবস্থার ওপর জোর দেওয়াই দীর্ঘমেয়াদি সমাধান। এখন সবচেয়ে জরুরি হলো Surface Water First Policy বা ভূ-উপরিস্থ পানিকে অগ্রাধিকার দেওয়ার জাতীয় নীতি। নদী, খাল, বিল, জলাশয়, দিঘি ও পুকুরকে পুনরুজ্জীবিত না করে শুধু গভীর নলকূপ বাড়িয়ে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য পানি নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়।

বরেন্দ্র অঞ্চলের ভূগর্ভস্থ পানির স্তর নেমে যাচ্ছে (ছবি সংগৃহীত)

একইসঙ্গে উত্তরবঙ্গের প্রতিটি উপজেলায় বড় আকারের রেইনওয়াটার রিজার্ভার, কৃষি জলাধার এবং পুনর্ভরণ পুকুর (Recharge Pond) নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত। শহরাঞ্চলের জন্য যেমন মাস্টারপ্ল্যান থাকে তেমনি উত্তরাঞ্চলের প্রতিটি জেলার জন্য একটি ওয়াটার মাস্টারপ্ল্যান প্রণয়ন করা সময়ের দাবি। শুধু সরকারি উদ্যোগের ওপর নির্ভর না করে গ্রামভিত্তিক সমবায় ও কৃষক সংগঠনগুলোকেও এসব ব্যবস্থাপনায় যুক্ত করতে হবে। বর্ষায় যে বিপুল পরিমাণ পানি ব্যবহার না হয়ে নষ্ট হয়ে যায়, তা ধরে রাখতে পারলে শুষ্ক মৌসুমে সেচের জন্য নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচিত হবে।

কই সঙ্গে বর্তমান কিছু আইন ও নীতিমালার বাস্তবসম্মত সংস্কার জরুরি। বাংলাদেশে ভূমি ও কৃষিভূমি সুরক্ষায় প্রণীত হয়েছে ভূমি ব্যবহার নিয়ন্ত্রণ ও কৃষিভূমি সুরক্ষা আইন, ২০২৬। এই আইনের মূল লক্ষ্য হলো যত্রতত্র অকৃষি স্থাপনা নির্মাণ রোধ করে কৃষি জমি রক্ষা করা। বর্তমান ভূমি ব্যবস্থাপনায় কৃষিজমিতে পুকুর বা জলাধার খননের ক্ষেত্রে নানা আইনি বাধা, প্রশাসনিক জটিলতা ও বিধিনিষেধ রয়েছে। এসব বিধান মূলত উর্বর কৃষিজমি নির্বিচারে নষ্ট হওয়া রোধের জন্য করা হয়েছে যা উদ্দেশ্যের দিক থেকে যৌক্তিক। কিন্তু বাস্তবে এমন বহু জমি রয়েছে যেখানে মৌসুমি জলাধার তৈরি করলে কৃষি উৎপাদন বরং বাড়তে পারে। তাই আইনকে একেবারে শিথিল নয়, বৈজ্ঞানিক ও পরিকল্পিতভাবে সংশোধন করতে হবে, যাতে পরিবেশগত মূল্যায়নের ভিত্তিতে ব্যক্তি ও সমবায়  উভয় পর্যায়ে কৃষি জলাধার নির্মাণের সুযোগ তৈরি হয়।

পানি সংকট মোকাবিলায় গবেষণা ও উদ্ভাবনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতে হবে। শুধু সরকার একা এই বিশাল চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা করতে পারবে না। গবেষণা ও উদ্ভাবনের ক্ষেত্রেও একটি নতুন দৃষ্টিভঙ্গি প্রয়োজন। বাংলাদেশ কৃষি গবেষণা ইনস্টিটিউট, বাংলাদেশ ধান গবেষণা ইনস্টিটিউট, বিএডিসি, বিএমডিএ, পানি উন্নয়ন বোর্ড, বিশ্ববিদ্যালয়, স্থানীয় সরকার প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থাগুলোর মধ্যে সমন্বিত গবেষণা নেটওয়ার্ক গড়ে তুলতে হবে। প্রতি বছর উত্তরাঞ্চলের খরা, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর, মাটির আর্দ্রতা, বৃষ্টিপাতের পরিবর্তন, ফসলের পানির চাহিদা এবং জলবায়ু অভিযোজন নিয়ে যৌথ গবেষণা পরিচালনা করা জরুরি। বিশেষ গুরুত্ব দিতে হবে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI), রিমোট সেন্সিং, স্যাটেলাইট ডেটা, জিআইএস ম্যাপিং এবং ডিজিটাল হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিং ব্যবহারে। পৃথিবীর বহু দেশ ইতোমধ্যে স্যাটেলাইটের মাধ্যমে মাটির আর্দ্রতা পর্যবেক্ষণ করে কৃষকদের আগাম সেচ পরামর্শ দিচ্ছে। বাংলাদেশেও সেই প্রযুক্তি ব্যবহারের সময় এসেছে।

কৃষি উৎপাদন ব্যবস্থায়ও পরিবর্তন আনতে হবে। উত্তরাঞ্চলের সব জমিতে একই ধরনের উচ্চ পানিনির্ভর ফসল চাষ দীর্ঘমেয়াদে টেকসই নয়। কম পানিতে উৎপাদনশীল ধান, গম, ভুট্টা, ডাল, তেলবীজ, ফল ও সবজির জাত সম্প্রসারণ করতে হবে। একই সঙ্গে ড্রিপ ইরিগেশন, স্প্রিংকলার, Alternate Wetting and Drying (AWD) প্রযুক্তি এবং Precision Agriculture-এর ব্যবহার বাড়াতে হবে। পানি সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে সরকারি ভর্তুকি ও প্রণোদনা দেওয়া উচিত। এতে যেমন পানির অপচয় কমবে, তেমনি কৃষকের উৎপাদন ব্যয়ও হ্রাস পাবে।

সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিতে হবে প্রান্তিক কৃষক এবং ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর কৃষকদের দিকে। সাঁওতাল, ওরাঁও, মুন্ডা, মাহালীসহ উত্তরাঞ্চলের বহু ক্ষুদ্র কৃষক এখনও সেচ সুবিধা, কৃষিঋণ এবং আধুনিক প্রযুক্তির ক্ষেত্রে পিছিয়ে রয়েছেন। পানি শুধু কৃষি উৎপাদনের উপকরণ নয়; এটি একটি মৌলিক উন্নয়ন অধিকার। কোনো কৃষক যেন সেচের অভাবে ফসল হারিয়ে ঋণের বোঝায় ভেঙে না পড়েন সে জন্য সহজ শর্তে সেচসুবিধা, ক্ষুদ্র জলাধার নির্মাণে সহায়তা, সৌরচালিত সেচ পাম্প, স্বল্পসুদে ঋণ এবং কৃষি বীমা চালুর উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নয়নের সুফল তখনই অর্থবহ হবে যখন সমাজের সবচেয়ে দুর্বল মানুষটিও তার ন্যায্য অংশ পাবেন। উত্তরবঙ্গের পানি সংকট সমাধানের নীতিমালাও তাই হতে হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, বিজ্ঞানভিত্তিক এবং মানবিক।

উত্তরবঙ্গের পানি সংকট নিরসনে প্রথমেই একটি “North-western Bangladesh Water Security Master Plan” প্রণয়ন করতে হবে। এই প্রকল্প আগামী ৫০ বছরের জন্য পানি ব্যবস্থাপনার একটি দীর্ঘমেয়াদি রোডম্যাপ হওয়া উচিত। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের প্রতিটি জেলা, উপজেলা ও বরেন্দ্র এলাকার ভূপ্রকৃতি, বৃষ্টিপাত, নদী-খাল, ভূগর্ভস্থ পানির স্তর এবং কৃষির পানির চাহিদার সমন্বিত তথ্যভান্ডার তৈরি করে সেই অনুযায়ী পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। প্রতি পাঁচ বছর পরপর এই মহাপরিকল্পনা পর্যালোচনা ও হালনাগাদ করার বিধানও রাখতে হবে। আধুনিক প্রযুক্তির ব্যবহারও বাড়াতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্যাটেলাইট তথ্য, রিমোট সেন্সিং, জিআইএস এবং ডিজিটাল হাইড্রোলজিক্যাল মডেলিংয়ের মাধ্যমে কোন এলাকায় কখন সেচ প্রয়োজন, কোথায় ভূগর্ভস্থ পানির স্তর দ্রুত নিচে নামছে এবং কোথায় নতুন জলাধার নির্মাণ করলে সর্বাধিক সুফল পাওয়া যাবে এসব তথ্যভিত্তিক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা সম্ভব। প্রযুক্তিনির্ভর পানি ব্যবস্থাপনাই ভবিষ্যতের পথ।

উত্তরবঙ্গের খরা স্থায়ী প্রাকৃতিক দুর্যোগ; এটি ধীরে ধীরে গভীরতর হয়ে জাতীয় নিরাপত্তা, খাদ্য নিরাপত্তা ও জলবায়ু অভিযোজনের চ্যালেঞ্জ তৈরি করছে। আজ যে ভূগর্ভস্থ পানি আমরা নির্বিচারে ব্যবহার করছি, সেটিই আগামী প্রজন্মের জীবনরেখা। তাই এখনই সমন্বিত পরিকল্পনা না নিলে ভবিষ্যতে সংকট আরও তীব্র হবে। বাংলাদেশ একসময় বন্যা নিয়ন্ত্রণে বৈপ্লবিক অগ্রগতি অর্জন করেছে। উপকূলীয় অঞ্চলে ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায়ও বিশ্বে প্রশংসিত মডেল গড়ে তুলেছে। একইভাবে উত্তরবঙ্গের পানি ব্যবস্থাপনায়ও যদি বিজ্ঞান, গবেষণা, সুশাসন এবং রাজনৈতিক অঙ্গীকার একসঙ্গে কাজ করে তবে এই অঞ্চলকে খরার জনপদ নয়, টেকসই কৃষি ও জলসম্পদ ব্যবস্থাপনার একটি আন্তর্জাতিক মডেলে পরিণত করা সম্ভব।

লেখক: গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক

Share.
Exit mobile version