বাংলাদেশ উন্নয়ন করছে এই বাক্যটি এখন অমোঘ সত্য। দেশের বিভিন্ন প্রান্তে সড়ক, সেতু, বিদ্যুৎ, নগরায়ণ এবং অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির যে চিত্র আমরা দেখি তা নিঃসন্দেহে অগ্রগতির কথা বলে। আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশকে উন্নয়নের একটি রোল মডেল হিসেবে তুলে ধরা হয়। পারমাণবিক বিদ্যুত কেন্দ্র, নতুন নতুন সমুদ্র বন্দর, বিশাল সব তাপ বিদ্যুত কেন্দ্র, পদ্মা সেতু, যমুনা সেতু, যমুনা রেল সেতু, মেট্রোরেল, সম্প্রসারিত ও আধুনিকায়িত রেল, এক্সপ্রেসওয়ে, ৪ লেন- ৬ লেনের মহাসড়ক, আলো ঝলমলে দেশ, সুদৃশ্য স্কাইস্ক্রাপারে ছেয়ে যাওয়া নগর ইত্যাদি উন্নয়নের দৃশ্যমান প্রতীকগুলো আমাদের সামনে দাঁড়িয়ে আছে। কিন্তু এই দৃশ্যমান সাফল্যের ভেতরে একটি জিজ্ঞাসা অবান্তর নয়, সেটা হলো এই সব উন্নয়ন মহাযজ্ঞ পুরোপুরিভাবে সুষম করা গিয়েছে কি?
উন্নয়নশীল দেশের বিশাল জনগোষ্ঠী পদ্ধিগতভাবেই মৌলিক অধিকার ও নাগরিক অধিকারগুলোতে পূর্ণাঙ্গ প্রবেশাধিকার পায় না। দারিদ্র্য সীমার নিচে অবস্থান করা সকলের জীবনের গল্পেই বিস্তর মিল পাওয়া যায়। তথাপি সুষম উন্নয়ন প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দৃষ্টি ফেরাতে হয় সেইসব মানুষের দিকে যারা উন্নয়নের মূলধারায় বৃহদাকারে সংযুক্ত হতে পারেননি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর জীবনমানের বাস্তবতা এই প্রশ্নের সবচেয়ে অস্বস্তিকর উত্তর দেয়। সরকারি হিসাবে দেশে প্রায় ১৬ থেকে ১৭ লাখ ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বসবাস করে। যদিও বিভিন্ন গবেষণা ও সংগঠনের মতে এই সংখ্যা আরও অনেক বেশি। কিন্তু সংখ্যার এই ভিন্নতার চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো তাদের জীবনযাত্রার মান এবং রাষ্ট্রীয় কাঠামোর ভেতরে তাদের অবস্থান। বাস্তবতা হলো এই জনগোষ্ঠীগুলো এখনো দেশের সবচেয়ে দরিদ্র, বঞ্চিত এবং প্রান্তিক মানুষের মধ্যে অন্যতম। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার জাতীয় গড়ের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি।
গত কয়েক দশকে বাংলাদেশ দারিদ্র্য বিমোচনে মাইলফলক স্থাপন করেছে। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন অনুযায়ী ১৯৭১ সালে বাংলাদেশের দারিদ্র্যের হার ৮০ শতাংশের বেশি থাকলেও ২০২২ সাল নাগাদ হ্রাসের মাধ্যমে তা ২০ শতাংশের নিচে নেমে আসে। বিশেষ করে ২০১০ থেকে ২০২২ সালের মধ্যে বাংলাদেশে দারিদ্র্যের হার ৩৭.১% থেকে উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পেয়ে ১৮.৭% এ দাঁড়িয়েছিল। একই সময়ে অতি দারিদ্র্যের হার ২০১০ সালের ১২.২% থেকে কমে ২০২২ সালে ৫.৬% এ নেমে আসে। অন্যদিকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর বড় একটি অংশ এখনো মৌলিক চাহিদা পূরণে হিমশিম খাচ্ছে। তাদের অধিকাংশই নিম্ন আয়ের, অনিশ্চিত জীবিকার ওপর নির্ভরশীল এবং প্রায় কোনো সঞ্চয় নেই। ২০২২ সালের উপাত্ত অনুযায়ী বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে দারিদ্র্যের হার ছিল ৪১.৩ শতাংশ, যা জাতীয় গড় ১৮.৭ শতাংশের চেয়ে দ্বিগুনের বেশি। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে যে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর নির্দিষ্ট কিছু কমিউনিটির মধ্যে অতি দারিদ্র্যের হার ২৫ থেকে ৩০ শতাংশ পর্যন্ত, যা জাতীয় অতি দারিদ্র্যের গড় ৫.৬ শতাংশের তুলনায় অনেক বেশি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর একটি পরিবারের উপার্জনক্ষম ব্যক্তি অসুস্থ হয়ে পড়লে বা কোনো কারণে আয় বন্ধ হয়ে গেলে পুরো পরিবার তাৎক্ষণিকভাবে অর্থনৈতিক সংকটে পড়ে। এই ভঙ্গুরতা তাদের জীবনের প্রতিটি স্তরে ছড়িয়ে আছে।
ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রার মান বিশ্লেষণ করলে এই বঞ্চনার গভীরতা আরও স্পষ্ট হয়। অনেক পরিবার অস্বাস্থ্যকর পরিবেশে বসবাস করে, নিরাপদ পানির অভাব রয়েছে, স্যানিটেশন সুবিধা অপর্যাপ্ত। স্বাস্থ্য সেবার অপরিমিত সুযোগ, শিক্ষা অর্জনের ক্ষেত্রে সুযোগের অপ্রতুলতা ইত্যাদি সেখানকার বাস্তবতার প্রতিচ্ছবি। এদেশে মানুষের আটপৌরে জীবনযাপনের জন্য প্রতিদিন সংগ্রাম করতে হয়।
স্বাস্থ্য খাতের দিকে তাকালে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর উদ্বেগজনক পরিস্থিতি দেখতে পাওয়া যাবে। ভৌগোলিক বিচ্ছিন্নতা, দারিদ্র্য এবং সাংস্কৃতিক বাধার কারণে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো জাতীয় গড়ের তুলনায় স্বাস্থ্যসেবা প্রাপ্তির ক্ষেত্রে পদ্ধতিগত বৈষম্যের শিকার হয়। ফলে তাঁদের মধ্যে আনুষ্ঠানিক স্বাস্থ্যসেবার স্বল্প ব্যবহার এবং ঐতিহ্যগত চিকিৎসার ওপর অধিক নির্ভরশীলতা দেখা যায়। পরিসংখ্যান অনুযায়ী দেশের মোট জনসংখ্যার ৬১ শতাংশ মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা পায়। অন্যদিকে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো বিশেষ করে পার্বত্য চট্টগ্রামের অধিবাসীদের মধ্যে মৌলিক স্বাস্থ্যসেবা গ্রহণের হার অনেক কম। জাতীয় পর্যায়ে পানি, পয়ঃনিষ্কাশন ও স্বাস্থ্য সুরক্ষা প্রাপ্যতার হার যেখানে ৮৫%, সেখানে পার্বত্য চট্টগ্রামের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর মধ্যে এই হার ৫১%। মাতৃ স্বাস্থ্যসেবা সুবিধা প্রাপ্তির জাতীয় গড় ৭০ শতাংশ হলেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো পাচ্ছে ৫১ শতাংশের মতো। বাল্যবিবাহের হারও তাদের মধ্যে বেশি। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কমিউনিটিগুলোতে কারো অসুস্থতা শুধু শারিরীক সমস্যা হিসেবে থাকে না, অর্থনৈতিক বিপর্যয়েও পরিণত হয়। অসুখ-বিসুখ অনেক সময় একটি পরিবারকে দীর্ঘমেয়াদি দারিদ্র্যের মধ্যে ঠেলে দেয়।
শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়। বাংলাদেশ জাতীয় পর্যায়ে প্রাথমিক বিদ্যালয়ে ভর্তির ক্ষেত্রে ৯০ শতাংশের বেশি অর্জন করলেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো শিক্ষার ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য প্রতিকূলতার সম্মুখীন হচ্ছে। আদিবাসী শিশুদের একটি বড় অংশ প্রাথমিক শিক্ষার গণ্ডি পেরোতে পারে না। দারিদ্র্য তাদের শিক্ষাজীবনের সবচেয়ে বড় বাধা। অনেক শিশু অল্প বয়সেই শ্রমে যুক্ত হয়, কেউ কেউ পারিবারিক দায়িত্বের কারণে স্কুল ছাড়তে বাধ্য হয়। এর সঙ্গে ভাষাগত প্রতিবন্ধকতাও বড় একটি সমস্যা। কারণ মাতৃভাষাভিত্তিক শিক্ষা এখনো পর্যাপ্তভাবে নিশ্চিত করা হয়নি। ফলে অনেক শিশু শুরু থেকেই পিছিয়ে পড়ে এবং ধীরে ধীরে শিক্ষা ব্যবস্থা থেকে ছিটকে যায়। এই প্রক্রিয়াটি একটি দুষ্টচক্র তৈরি করে, যেখানে শিক্ষা থেকে বঞ্চিত হওয়া মানে ভবিষ্যতে ভালো আয়ের সুযোগ হারানো, আর সেটি আবার দারিদ্র্যকে আরও স্থায়ী করে তোলে। জাতীয় পর্যায়ে প্রাপ্ত বয়স্কদের স্বাক্ষরতার হার প্রায় ৭৯ শতাংশ, এথনিক মাইনোরিটি কমিউনিটিগুলো এই দৌড়ে উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে রয়েছে। কিছু প্রতিবেদনে দেখা গেছে যে বান্দরবান জেলার স্বাক্ষরতার হার মাত্র ৩৫.৯ শতাংশের নিচে। মূলধারার সুপরিচালিত স্কুলগুলোর তুলনায় দুর্গম ও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠী অধ্যুষিত এলাকায় স্কুলের সংখ্যাও অনেক কম। পাহাড়ে বা দুর্গম অঞ্চলে ভৌত অবকাঠামো নির্মাণ সমতলের মতো সহজ নয়। কিন্তু প্রকৃত উন্নয়নের জন্য সকল গোষ্ঠীকে সুষম উন্নয়নের ছাতার নিচে নেওয়ার কোনো বিকল্প নাই। এই চিত্র আমাদের মনে করিয়ে দেয় উন্নয়ন অবকাঠামো মানুষের জীবনমানের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত।
পাহাড়ে হোক, সমতলে হোক; ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর কৃষির উন্নতি হয়নি। কৃষির উন্নয়নে পুরো দেশই পিছিয়ে, তবে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো তারচেয়েও পিছিয়ে। বাঙালি কৃষকদের হাতে আধুনিক যন্ত্রপাতি কিছুটা পৌঁছলেও ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো এখনো পশ্চাৎপদ। পাহাড়ে জুম চাষ আর সমতলে পুরনো পেশা বা মান্ধাতার কৃষি তাঁদের ছাড়েনি। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সেচের পানির অপ্রতুলতা, যা কৃষিনির্ভর ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর পরিবারগুলোর জন্য একটি বড় সংকট। সেচের পানি না পেয়ে, বঞ্চনার শিকার হয়ে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর কৃষকদের আত্মহত্যার ঘটনা একাধিকবার সংবাদ শিরোনাম হয়েছে। অপ্রকাশিত বঞ্চনা ও বৈষম্য নিশ্চয়ই অনেক বেশি। অনেক এলাকায় বড় কৃষি প্রকল্প থাকলেও প্রান্তিক চাষিরা সেই সুবিধা পান না। ফলে তাদের উৎপাদন কমে যায়, আয় হ্রাস পায় এবং তারা ধীরে ধীরে কৃষি থেকে সরে যেতে বাধ্য হয়। এই পরিবর্তন তাদের অর্থনৈতিক অবস্থাকে আরও দুর্বল করে তোলে এবং অনিশ্চিত শ্রমবাজারের ওপর নির্ভরশীল করে দেয়।
অর্থনৈতিক ও সামাজিক বঞ্চনার পাশাপাশি নিরাপত্তাহীনতা ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর একটি গভীর উদ্বেগের বিষয়। বিভিন্ন অঞ্চলে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর ওপর হামলা, বাড়িঘর ভাঙচুর, এমনকি হত্যার ঘটনাও ঘটেছে। এই ঘটনাগুলো অনেক সময় সাময়িকভাবে আলোচিত হলেও দীর্ঘমেয়াদে এর প্রভাব গভীর। যখন একটি পরিবার জানে যে তারা নিরাপদ নয়, তখন তাদের জীবনযাত্রার প্রতিটি সিদ্ধান্তে অনিশ্চয়তা কাজ করে। শিশুরা স্কুলে যেতে ভয় পায়, পরিবারগুলো ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তায় থাকে এবং একটি পুরো সম্প্রদায় মানসিকভাবে চাপে থাকে। এই পরিস্থিতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নের সামনে দাঁড় করায়। উন্নয়ন কাদের কেন্দ্র করে হচ্ছে? যদি উন্নয়ন সুষম ও অন্তর্ভুক্তিমূলক না হয়; দৃশ্যমান অবকাঠামো এবং অর্থনৈতিক সূচকের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তবে তা সমাজের একটি অংশকে বাদ দিয়েই এগোবে।
১৯৯৭ সালে পার্বত্য শান্তি চুক্তির ফলে বাংলাদেশের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর বৃহৎ অংশ রাষ্ট্রের মূলধারায় যুক্ত হয়েছে। শিক্ষা ও সরকারি চাকরিতে কোটায় খানিকটা এগিয়েছিল ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো। শান্তি চুক্তির আগের ও পরে ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর জীবনযাত্রা, জীবনমান এক নয়। উন্নয়নের ধারা সৃজিত হয়েছে, তবে উন্নয়ন সামগ্রিকও নয়, যথেষ্টও নয়। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলো উন্নয়নের যে স্রোতধারায় যুক্ত হয়েছে, এটা আরো বেশি প্রবহমান করতে হবে। শিক্ষা ও চাকরিতে কোটা না থাকলে অসম প্রতিযোগিতা করে তাদের পক্ষে অগ্রগতি ধরে রাখা সম্ভব হবে না, বৈষম্যও বাড়তে থাকবে। তাছাড়া ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীগুলোর প্রত্যেক কমিউনিটি যেন সমানভাবে এগোতে পারে সেটা নজরদারির মধ্যে থাকতে হবে। শহুরে কমিউনিটি যেন গ্রামের কমিউনিটিগুলোর অধিকার আত্মসাৎ করতে না পারে; পাহাড় আর সমতলের ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মধ্যে যেন বৈষম্য প্রকট আকার ধারণ না করে সেটাও খেয়াল রাখতে হবে। দেশের সকল নাগরিকের অধিকার যেমন সমান, তেমনি ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর সকল কমিউনিটির, সকল সদস্যের অধিকার সমান। একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকারের উন্নত হয় যখন তার সবচেয়ে প্রান্তিক মানুষটিও সেই উন্নয়নের পুরো সুফল ভোগ করতে পারে।
বাংলাদেশ আজ যে উন্নয়নের পথে এগিয়েছে তা নিঃসন্দেহে গৌরবময় এবং প্রশংসনীয়। কিন্তু এই অগ্রগতিকে অর্থবহ করতে হলে উন্নয়নের প্রক্রিয়াকে আরো বেশি সুষমভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে। যা হবে অন্তর্ভুক্তিমূলক, ন্যায়ভিত্তিক এবং সকল জনগোষ্ঠীর সঙ্গে সংগতিপূর্ণ। ক্ষুদ্র জাতিগোষ্ঠীর মতো দীর্ঘদিন ধরে বঞ্চিত মানুষের জীবনমান জাতীয় ছন্দে এগিয়ে নিতে রাষ্ট্রের দর্শন ও কর্মসূচি পরিমার্জন করা সময়ের দাবি।
