শুক্রবার | জুলাই ১৭ | ২০২৬

৭৫ বছরের বৃদ্ধা মায়ের মৃত্যু নিঃসন্দেহে বেদনাদায়ক। কোনো সন্তানই চাইবে না তার মায়ের শেষ জীবন নিয়ে ঋণাত্মক আলোচনা হোক। কিন্তু একটি মৃত্যুকে কেন্দ্র করে যখন তথ্য, অর্ধসত্য, গুজব, আবেগ এবং জনরোষ একসাথে মিশে যায়, তখন সত্যের চেয়ে গল্পই বেশি শক্তিশালী হয়ে ওঠে। কেউ বলছেন তিনি কয়েকদিন আগে মারা গেছেন, কেউ বলছেন রোববার কোনো এক সময় তিনি ওপারে পাড়ি জমিয়েছেন। কেউ বলছেন তিনি মানসিকভাবে সুস্থ ছিলেন না, সবসময় ভয় পেতেন কেউ তাকে হত্যা করবে। আবার অন্য সূত্র বলছে, ঈদের দিন ছেলেরা এসে তাঁর সঙ্গে খাবার খেয়েছেন, চিকিৎসকের কাছেও নিয়ে গিয়েছেন। কোনটি সত্য, কোনটি অতিরঞ্জন, সেটি তদন্ত ও প্রমাণের বিষয়। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে যেন রায় ঘোষণার আদালত বসে গেছে, যেখানে বিচারকের প্রয়োজন নেই, সাক্ষ্যের প্রয়োজন নেই, শুধু আবেগই যথেষ্ট।

নিসঙ্গ মা
নিসঙ্গ মা

বিভিন্ন প্রচারমাধ্যমে বলা হচ্ছে, মরদেহে পচন ধরেছিল এবং শরীরে পোকা দেখা গিয়েছিল। যদি সত্যিই এমন হয়ে থাকে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন আসে এত গুরুত্বপূর্ণ একটি ঘটনার সেই আলামতের কোনো নির্ভরযোগ্য ছবি বা নথি কি সংরক্ষিত আছে? এই প্রশ্নের উত্তরও হয়তো একদিন সামনে আসবে।

অবশ্যই প্রশ্ন উঠবে ৭৫ বছরের একজন বৃদ্ধা কেন একা থাকতেন? যদি তিনি অসুস্থ হয়ে থাকেন তবে পরিবারের আরও যত্নশীল হওয়া উচিত ছিল কি না, সেই প্রশ্নও স্বাভাবিক। কিন্তু প্রশ্ন তোলা আর রায় দিয়ে দেওয়া এক জিনিস নয়। কারণ একটি পরিবারের ভেতরের বাস্তবতা বাইরের মানুষের কাছে কখনোই পুরোপুরি দৃশ্যমান হয় না।

সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো কিছু সংবাদমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের প্রচার এমনভাবে সাজানো হয়, যেন মানুষের আবেগকে উত্তেজিত করাই মূল উদ্দেশ্য। সত্যের সঙ্গে সামান্য মিথ্যা, তথ্যের সঙ্গে সামান্য কল্পনা আর বাস্তবতার সঙ্গে সামান্য নাটকীয়তা মিশিয়ে এমন এক বর্ণনা তৈরি করা হয় যা মুহূর্তেই জনমতকে বিস্ফোরিত করে। বিশেষ করে যখন শোনা যায় একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, একজন যুগ্মসচিব অন্য ছেলে কানাডায় আইএস রত সন্তান জড়িত, তখন মানুষের ক্ষোভ আরও দ্রুত জ্বলে ওঠে। কারণ পদবী যত বড়, জনতার প্রত্যাশাও তত বড়।

যদি কোনো সংবাদমাধ্যম বা ব্যক্তি মানুষের আবেগকে কাজে লাগিয়ে বিশেষ কোনো উদ্দেশ্য হাসিলের চেষ্টা করে থাকে, সেটিও নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সামনে আসা উচিত। স্থানীয় এক সাংবাদিকের বক্তব্য অনুযায়ী, তিনিই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছেছিলেন। যদি মরদেহের অবস্থা নিয়ে যেসব তথ্য প্রচার করা হয়েছে সেগুলো সঠিক হয়ে থাকে, তাহলে সেসব আলামত তাঁর ধারণকৃত ছবিতেও থাকার কথা। আবার তিনি নিজেই বলেছেন, সংবাদটি প্রচার না করার জন্য তাঁকে একটি “খাম” দেওয়ার চেষ্টা করা হয়েছিল, কিন্তু তিনি তা গ্রহণ না করে হাত পিছনে ঠেলে দিয়ে এলাকার একজন দায়িত্বশীল মানুষ হিসেবে ঘটনাটি সরাসরি প্রচার করেন। কে, কেন এবং কোন উদ্দেশ্যে এসব ঘটেছে, সেটিও তদন্তের মাধ্যমে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন।

আমাদের সমাজের সবচেয়ে বড় সংকট সম্ভবত তথ্যের অভাব নয়, ধৈর্যের অভাব। আমরা শুনি, বিশ্বাস করি, উত্তেজিত হই, বিচার করি কিন্তু যাচাই করি না। বহু পুরোনো সেই প্রবাদ আজও আমাদের মানসিকতার আয়না হয়ে আছে “চিলে কান নিয়ে গেছে” শুনে আমরা কানে হাত না দিয়ে চিলের পেছনে দৌড়াই। দীর্ঘ পথ ছুটে একসময় বুঝতে পারি, কান তো নিজের জায়গাতেই আছে।

আজকের ডিজিটাল যুগে সেই চিলের নাম কখনো ফেসবুক পোস্ট, কখনো ইউটিউব ভিডিও, কখনো চটকদার শিরোনাম। আর আমরা হাজারো মানুষ সেই অদৃশ্য চিলের পেছনে ছুটে চলেছি। সত্য তখন আড়ালে পড়ে থাকে, আর আবেগ মঞ্চের কেন্দ্র দখল করে নেয়।
একজন মায়ের মৃত্যু অবশ্যই মানবিক বেদনার বিষয়। কিন্তু সেই বেদনাকে যদি কেউ ব্যক্তিগত স্বার্থে, রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে, দর্শক বাড়ানোর কৌশলে কিংবা জনরোষ সৃষ্টির অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে, তবে সেটিও কম নির্মম নয়। কারণ তখন মৃত মানুষটির প্রতি সম্মান নয়, তাঁর মৃত্যুকেই পণ্যে পরিণত করা হয়।

হায়রে বাঙালি! আমরা অনেক সময় সত্য খুঁজি না, আমরা খুঁজি এমন একটি গল্প, যা আমাদের ক্ষণিকের আবেগকে তৃপ্ত করে। অথচ সত্যের একটি নিজস্ব শক্তি আছে সে ধীরে হাঁটে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সামনে এসেই দাঁড়ায়। তখন বোঝা যায়, কত কথাই না বলা হয়েছিল, আর কত কথারই কোনো ভিত্তি ছিল না।

Share.
Exit mobile version