বাংলাদেশের সড়কে প্রতিদিন অসংখ্য মানুষ চলাচল করেন। এই ব্যস্ত সড়কে দুর্ঘটনা, ট্রাফিক আইন ভঙ্গ, ছিনতাই কিংবা চোরাচালানের মতো নানা অপরাধ প্রায়ই ঘটে থাকে। এসব ঘটনার মুখোমুখি সবচেয়ে আগে যে পুলিশ সদস্যরা হন, তারা হলেন ট্রাফিক বিভাগের পুলিশ সার্জেন্টরা। অনেকেই তাই পুলিশ সার্জেন্টদের বাংলাদেশ পুলিশের “দর্পণ” বলে থাকেন। কারণ সড়কে পুলিশের উপস্থিতির সবচেয়ে দৃশ্যমান প্রতীকই হলো এই সার্জেন্টরা। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সড়কে অপরাধ ও দুর্ঘটনার প্রথম সাক্ষী হয়েও অনেক ক্ষেত্রে তারা তদন্ত পরিচালনার আনুষ্ঠানিক ক্ষমতা থেকে বঞ্চিত। ফলে প্রশ্ন উঠছে যেখানে সার্জেন্টরা ঘটনাস্থলে প্রথম উপস্থিত হন, সেখানে তদন্তের ক্ষমতা তাদের দেওয়া হবে না কেন?
পিআরবি বিধি ৭৩৯(২) অনুযায়ী পুলিশ সার্জেন্টরা নিরস্ত্র পুলিশ সদস্য হিসেবে যোগদান করেন। এস.আর.ও নং–৩৪৩, আইন/২০১৬ অনুযায়ী তারা বাংলাদেশ পুলিশ একাডেমি, সারদায় এক বছর মেয়াদি কঠোর প্রশিক্ষণ গ্রহণ করেন। এই প্রশিক্ষণের সময় সাব-ইন্সপেক্টরদের মতোই প্রায় একই ধরনের সিলেবাসের আওতায় আইন, অপরাধ তদন্ত পদ্ধতি এবং পুলিশি কার্যক্রমের বিভিন্ন বিষয়ে জ্ঞান অর্জন করেন। প্রশিক্ষণ শেষে তারা পুলিশের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষানবীশকাল সম্পন্ন করেন। অর্থাৎ প্রশিক্ষণ ও যোগ্যতার বিচারে সার্জেন্টরা তদন্ত সংক্রান্ত মৌলিক জ্ঞান ও দক্ষতা অর্জন করেই মাঠপর্যায়ে দায়িত্ব পালন শুরু করেন।
সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮ অনুযায়ী অনেক ধারা ধর্তব্য অপরাধ হিসেবে বিবেচিত। বিশেষ করে ৪৩, ৬৬, ৭২, ৭৫, ৮৪, ৮৭, ৮৯, ৯২ ও ৯৫ ধারার আওতায় সংঘটিত অপরাধের ক্ষেত্রে পুলিশ সার্জেন্টরা তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা গ্রহণ করে জরিমানা আরোপ করতে পারেন। একই আইনের ১১০ ধারায় তাদের বিনা পরোয়ানায় অপরাধী আটক করার ক্ষমতাও দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ আইন প্রয়োগের ক্ষেত্রে সার্জেন্টদের ওপর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব অর্পিত রয়েছে। কিন্তু সড়ক দুর্ঘটনার তদন্তের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তাদের ক্ষমতা সীমিত রাখার বিষয়টি অনেকের কাছেই প্রশ্নবিদ্ধ।
সড়ক পরিবহন আইন–২০১৮ এর ১০৫ ধারায় সড়ক দুর্ঘটনা সংক্রান্ত অপরাধের তদন্তের বিষয়টি উল্লেখ রয়েছে। আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, যেহেতু এই আইন প্রয়োগের ক্ষমতা সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টর উভয়ের ওপরই অর্পিত, তাই সার্জেন্টদের দিয়ে তদন্ত পরিচালনায় আইনগত কোনো বাধা থাকার কথা নয়। একই আইনের ১২০ ধারায় সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টরকে আইন প্রয়োগের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে, যা তাদের দায়িত্বের পরিধিকে আরও সুস্পষ্ট করে।
এদিকে পুলিশ হেডকোয়ার্টারের নির্দেশনায় ট্রাফিক বিভাগ ইতোমধ্যে “Scientific Investigation for Road Traffic Accident” নামে একটি বিশেষ প্রশিক্ষণ কোর্স চালু করেছে। প্রতি ব্যাচে ২৫ জন সার্জেন্ট ও ২৫ জন সাব-ইন্সপেক্টরকে এই প্রশিক্ষণ দেওয়া হচ্ছে এবং ইতোমধ্যে সাতটি ব্যাচ সফলভাবে প্রশিক্ষণ সম্পন্ন করেছে। এটি প্রমাণ করে যে, সার্জেন্টদেরকে দুর্ঘটনা তদন্তে দক্ষ করে তোলার উদ্যোগ ইতোমধ্যেই নেওয়া হয়েছে।
আইনগত দিক থেকেও বিষয়টি স্পষ্ট। ফৌজদারি কার্যবিধি অনুযায়ী তদন্ত বলতে পুলিশ কর্মকর্তার দ্বারা সাক্ষ্যপ্রমাণ সংগ্রহকে বোঝায়। ১৮৬১ সালের পুলিশ আইনের ২৩(৬) ধারায় অপরাধ অনুসন্ধান ও আসামি গ্রেফতার করে আদালতে প্রেরণ করার দায়িত্ব পুলিশ কর্মকর্তাদের ওপর অর্পিত হয়েছে। একই সঙ্গে ফৌজদারি কার্যবিধির ১৫৬ ধারা এবং পিআরবি ২৫৮ অনুযায়ী থানার অফিসার ইনচার্জ চাইলে তার অধীনস্থ কর্মকর্তাদের দিয়ে তদন্ত করাতে পারেন, তবে তা সাব-ইন্সপেক্টর পদমর্যাদার নিচে নয়। যেহেতু পুলিশ সার্জেন্ট ও সাব-ইন্সপেক্টর একই পদমর্যাদার কর্মকর্তা, তাই সার্জেন্টদের দিয়ে তদন্ত পরিচালনায় আইনগত কোনো প্রতিবন্ধকতা নেই বলেই মনে করেন সংশ্লিষ্টরা।
বাস্তব অভিজ্ঞতা বলছে, সড়ক দুর্ঘটনা ঘটলে ট্রাফিক সার্জেন্টরাই প্রথম ঘটনাস্থলে পৌঁছান। তারা ঘটনাস্থল নিয়ন্ত্রণ করেন, আহতদের উদ্ধার করেন এবং প্রাথমিক তথ্য সংগ্রহ করেন। কিন্তু পরবর্তীতে তদন্ত অন্য ইউনিটের কাছে হস্তান্তর করা হলে অনেক সময় তথ্যের ধারাবাহিকতা নষ্ট হয় এবং তদন্ত দীর্ঘসূত্রতায় পড়ে। ফলে মামলার নিষ্পত্তিও বিলম্বিত হয়।
মাঠপর্যায়ের অনেক সার্জেন্ট মনে করেন, তাদের তদন্ত ক্ষমতা দেওয়া হলে সড়কে সংঘটিত দুর্ঘটনা ও অপরাধের প্রকৃত কারণ দ্রুত উদঘাটন করা সম্ভব হবে। একই সঙ্গে পুলিশের ওপর বিদ্যমান তদন্তের চাপ কমবে এবং মামলার দ্রুত নিষ্পত্তি নিশ্চিত করা যাবে। উল্লেখ্য, বর্তমানে প্রায় ২২০০ পুলিশ সার্জেন্ট দেশের বিভিন্ন স্থানে দায়িত্ব পালন করছেন, যাদের অধিকাংশই বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উচ্চশিক্ষা অর্জন করেছেন। তাদের এই দক্ষতা ও মেধাকে রাষ্ট্রের প্রয়োজনে আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগানোর সুযোগ রয়েছে।
পুলিশ আইন ১৮৬১ সালের ১২ ধারায় পুলিশ মহাপরিদর্শককে বাহিনীর প্রয়োজন অনুযায়ী দায়িত্ব বণ্টনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে। ফলে আইন পরিবর্তনের প্রয়োজন ছাড়াই একটি প্রশাসনিক পরিপত্রের মাধ্যমে সার্জেন্টদের তদন্ত ক্ষমতা প্রদান করা সম্ভব। তাই সময়ের দাবি হলো—আইন ও বাস্তবতার আলোকে বিষয়টি নতুন করে বিবেচনা করা।
সড়ক নিরাপত্তা আজ দেশের বড় একটি চ্যালেঞ্জ। এই চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় মাঠপর্যায়ে সবচেয়ে সক্রিয় বাহিনীকে যদি যথাযথ ক্ষমতা দেওয়া যায়, তাহলে সড়ক দুর্ঘটনা তদন্ত আরও কার্যকর ও দ্রুত হতে পারে। তাই এখন প্রশ্ন একটাই রাষ্ট্র কি এই বাস্তবতাকে স্বীকার করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেবে?

