হামের চলমান প্রাদুর্ভাবে বাংলাদেশে এ পর্যন্ত হাম ও এর উপসর্গ নিয়ে মোট ৪৭৫ জন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। আক্রান্ত সংখ্যা প্রায় ৬৪ হাজার ছাড়িয়ে গেছে। রেকর্ড ছাড়ানো এই মৃত্যু এবং আক্রান্ত সংখ্যা আরো কত বেশি হতে পারে সেটা সবাই ধারণা করে নিতে পারেন। হামে আক্রান্ত রোগী এবং মৃত্যুর সংখ্যার দিক থেকে বিভাগভিত্তিক তথ্যের ভিত্তিতে সবচেয়ে বেশি আক্রান্তের শিকার হচ্ছে ঢাকা বিভাগের শিশুরা। দ্বিতীয় চট্টগ্রাম এবং তৃতীয় বরিশাল।
হাম ভাইরাসজনিত একটি মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগ। প্রাথমিক উপসর্গগুলো সাধারণত ১০ থেকে ১৪ দিন পরে দেখা যায়। তীব্র জ্বর, সর্দি কাশি, চোখ লাল হয়ে যাওয়া এবং সারা শরীরে লালচে দানা বা ফুসকুড়ি ছড়িয়ে পড়ার পর রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা না থাকলে তাদের জন্য নেমে আসে মৃত্যুর পরোয়ানা।
বর্তমান বাংলাদেশ হামের এক ভয়াবহ মহামারীর কবলে পড়েছে। অতিরিক্ত রোগীদের জায়গা দিতে না পেরে দেশের হাসপাতালগুলোতে এক বিস্তৃঙ্খল পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। সরকারি হাসপাতালগুলোতে এই মারাত্মক ছোঁয়াচে রোগের চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে একই সিটে ৩-৪ জনকে রেখে। সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ছে সুস্থ মানুষের শরীরে। আক্রান্ত হয়ে পড়েছে শিশু ওয়ার্ড থেকে শুরু করে অন্যান্য ওয়ার্ডের রোগীরা পর্যন্ত। হাসপাতালগুলোতে দেখা যাচ্ছে অনেক শিশু শ্বাসকষ্টে ভুগছে, অনেকেই নিথর হয়ে পড়ে থাকছে অযত্নে অবহেলায়। শয্যা সংকটের কারণে অনেক রোগীদেরকে মেঝেতে রেখেই চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে হাম অনেকটা নির্মূল হয়ে যাওয়া একটি রোগ ছিল। এক দশক আগেও বিজ্ঞানীরা এই রোগ নির্মূল করার স্বপ্ন দেখেছিলেন। কিন্তু বিভিন্ন কারণে বিভিন্ন দেশে নাটকীয়ভাবে ফিরে এসেছে এই রোগ বারে বারে। শুধু বাংলাদেশ নয় কানাডা থেকে শুরু করে ইউরোপের অনেকগুলো দেশ হাম-মুক্ত স্লোগানের মর্যাদা হারিয়েছে। আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী যুক্তরাষ্ট্রের মতো দেশেও এ বছর হামে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ২০০০ ছাড়িয়ে গেছে! কিন্তু ইউরোপীয় দেশগুলো এবং যুক্তরাষ্ট্রের তুলনায় আমাদের দেশের মৃত্যুর সংখ্যাটা বেশি হওয়ার জন্য আমাদের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা ভেঙে পড়াকে দায়ী করা যায়। অন্যদিকে পুষ্টিহীনতা এবং রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কম হওয়ার কারণে হামের সঙ্গে লড়াই করে পেরে উঠছে না আমাদের শিশুরা।
অনেকগুলো দেশে ক্রমবর্ধমান টিকার প্রতি অনীহা, কোভিড-১৯ মহামারি এবং যুদ্ধের কারণে টিকা কার্যক্রম বিঘ্নিত হওয়ার কারণে এই মহামারি নির্মূল হওয়ার পরেও পুনরায় ফিরে এসেছে। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ উচ্চ টিকাদানের হারের কারণে গর্ব করে আসলেও ২০২৪ সালের জুলাই অভ্যুত্থানের পর টিকা সংগ্রহ এবং সংগ্রহ পদ্ধতিতে এক ভয়াবহ বিপর্যয় ঘটেছে।
টিকাদান কর্মসূচি অব্যাহত থাকলেও দেশে দেখা দিয়েছিল টিকা সংকট। ৯ মাস থেকে ১৫ মাস বয়সে হাম-রুবেলা(এমআর) টিকার দুটি ডোজ দেওয়া হয়। সেই ডোজ অনেকেই একটা পেলেও দ্বিতীয়টি পায়নি। প্রত্যন্ত অঞ্চলে অনেকে স্বাস্থ্যকেন্দ্রে টিকা না পেয়ে ফেরত এসেছে। অতীতে মহামারীর এমন বাস্তব অভিজ্ঞতা না থাকার কারণে অনেক অভিভাবকেরা টিকা দেওয়ার ক্ষেত্রে অবহেলা করেছে। স্বাস্থ্য কেন্দ্র থেকে টিকা না পেয়ে ফেরত আসলেও তারা বারবার যোগাযোগ করেনি। অনেকে আবার বলছেন, টিকা ঠিক সময়ে দিতে না পারার কারণে অন্য সময় টিকা দিতে গেলে বাচ্চা সুস্থ না থাকার কারণে তারা আবারও হাম-রুবেলা টিকা দিতে পারেনি।
সচেতন অনেক বাবা মার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে টিকা সংকটের কারণে মূলত তারা বিপদে পড়েছে। যখন টিকা থাকে তখন তাদের বাচ্চা সুস্থ থাকেনা আবার যখন সুস্থ থাকে তখন টিকা মেলেনা এই চক্রের শিকার হয়ে অনেক সচেতন বাবা মায়েরা তাদের সন্তানদের সচেতন হয়েও টিকা দিতে পারেনি।
বছরের পর বছর ইউনিসেফ এই টিকা সরবরাহ করে আসছিল বাংলাদেশে। যার বেশিরভাগ অর্থায়ন করতো ‘গ্যাভি’ পাশাপাশি সরকারও এক্ষেত্রে অবদান রাখতো। ২০২৪ সালের ছাত্র অভ্যুত্থানের পরে এই ব্যবস্থাপনা ধ্বংস হয়ে গেছে। সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পরে অর্থনীতিবিদ ও নোবেল জয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে একটি অন্তর্বর্তীকালীন সরকার ক্ষমতা গ্রহণ করে। ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে ইউনুস সরকার ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা বন্ধ করে দিয়ে উন্মুক্ত দরপত্র পদ্ধতিতে চলে যায়। শুরু থেকে ইউনিসেফ এই পরিবর্তনের তীব্র বিরোধিতা করে আসছিল। সংস্থাটির বাংলাদেশের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বারবার সতর্ক করেছিল। অন্তর্বর্তী সরকারের স্বাস্থ্য উপদেষ্টা নূরজাহান বেগমকেও বিষয়টি জানানো হয়েছিল। ভবিষ্যতে মহামারী ছড়িয়ে পাড়ার পূর্বাভাস দেওয়া হলেও স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এ ব্যাপারে সঠিক সিদ্ধান্ত নেয়নি।
স্বাস্থ্য উপদেষ্টা এবং ইউনুস সরকারের আত্মঘাতী সিদ্ধান্তের কারণে আজকের এই মহামারী। দরপত্র প্রক্রিয়াতে আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় আটকে যায় টিকা আমদানি। দেশে শুরু হয় তীব্র টিকার সংকট। রাজনৈতিক অস্থিরতার কারণে ২০২৫ সালে নেওয়া সম্পূরক এমআর টিকাদান কর্মসূচিও বাতিল হয়ে পড়ে। যেখানে প্রতি বছর ৯৫ শতাংশ টিকা কাভারেজ নিশ্চিত করা হয়। সেখানে ২০২৫ সালে টিকা পেয়েছে মাত্র ৫৯ শতাংশ!
এবছর জানুয়ারি মাসে সর্বপ্রথম রোহিঙ্গা শরণার্থী শিবিরে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিলেও এখন সেটা ছড়িয়ে পড়েছে গোটা বাংলাদেশে। হাম নির্মূলে বাংলাদেশের ব্যাপক অগ্রগতি থাকলেও সেটা এখন পিছিয়ে পড়েছে দৃষ্টান্তমূলকভাবে। আইইডিসিআরের সাবেক প্রধান বিজ্ঞানী এ এস এম আলমগীরের মন্তব্য অনুযায়ী বাংলাদেশে ২০২৪ সাল থেকে তিনটি ভিটামিন-এ কর্মসূচি বাদ পড়েছে। এই ভিটামিন কর্মসূচি বাদপড়া আমাদের শিশুদের পুষ্টিহীনতার পাশাপাশি রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমিয়ে দিয়েছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নেতৃত্বে নতুন সরকার গঠন করার পরে এপ্রিল থেকে আবারও ইউনিসেফের মাধ্যমে টিকা কেনা শুরু হয়েছে।৫ এপ্রিল থেকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় এবং ২০ এপ্রিল থেকে দেশব্যাপী জরুরি টিকাদান কর্মসূচি শুরু হয়েছে। এই সিদ্ধান্তের পর দেশের মানুষ অনেকটা আশার আলো দেখছে।
এখন কথা হচ্ছে সরাসরি বুলেট দিয়ে একটা শিশুকে হত্যা করলে যেমন হত্যার বিচার হওয়া উচিত। ঠিক তেমনি স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা জিম্মি করে, দায়িত্ব অবহেলা করে শিশুদেরকে মৃত্যুর দিকে ঠেলে দেওয়াটারও বিচার হওয়া উচিত। কিন্তু এই বিচারের জন্য আমাদের দেশের জনগণ এবং ছাত্র-জনতা কি মাঠে নেমেছে?
চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনে সৌন্দর্য বর্ধনের কাজ করতে গিয়ে সামান্য জুলাই গ্রাফিতি মুছে যাওয়াকে কেন্দ্র করে আমাদের ছাত্র-জনতা মাঠে নামতে পেরেছে। চসিক মেয়রকে তারা বাধ্য করেছে নিজ হাতে আবারও গ্রাফিতি অঙ্কন করতে। এটা থেকে বোঝা যায় আমাদের ছাত্র জনতা চাইলে যে কোনো কিছু সম্ভব। কিন্তু তারা দেশে ছড়িয়ে পড়া সবচেয়ে ভয়াবহ মহামারীর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে রুখে দাঁড়াচ্ছে না কেন? শত শত অবুঝ শিশু যারা হামে আক্রান্ত হয়ে মারা যাচ্ছে তারা কি তাদের শত্রু ছিল? নাকি এই শিশুদের আক্রান্তের জন্য তারা নিজেরাও দায়ী। নিজেদের বিচার কি তারা নিজেরা দাবি করতে পারছে না?
দেশের বুদ্ধিজীবী, সাংবাদিক, কবি সাহিত্যিক, অভিজ্ঞ রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ সকলেই এ ব্যাপারে চুপ কেন? আমরা কি সম্মিলিতভাবে আমাদের শিশুদের বাঁচাতে এগিয়ে আসতে পারি না! আমরা কি আমাদের শিশুদের হত্যার বিচার দাবি করতে পারি না! শত শত অবুঝ শিশুর বাবা-মায়েরা যারা তাদের সন্তানকে হারিয়েছে, যারা অশ্রুসিক্ত নয়নে দু বাহু বাড়িয়ে তাদের সন্তানকে মাটির নিচে চাপা দিয়ে এসেছে তারা কি বুঝতে পেরেছে আমাদের সন্তানদের কেন হারাতে হচ্ছে!
প্রায় শতভাগ নির্মূল হয়ে পড়া অনেকটা হারিয়ে যাওয়া একটা ভাইরাস কেন আবারও আমাদের কাছে নাটকীয়ভাবে ফিরে এসেছে? এ ভাইরাসে আক্রান্ত হয়ে যাদের আত্মীয়-স্বজনের মৃত্যু হয়েছে, যারা তাদের প্রিয়জনকে হারিয়েছে তারা এবং সত্যিকারের বিবেকবান মানুষ ছাড়া হয়তো বা আর কেউই উপলব্ধি করতে পারছে না স্বজন হারানোর বেদনা।
সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ধর্মান্ধ মৌলবাদীদের অনেক ভিডিও চোখে পড়েছে। তাদের দাবি একটা শিশুরও হামে মৃত্যু হচ্ছে না এটা একটা গুজব। আবার তাদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন আমাদের কয়েকটা শিশুর মৃত্যু হলেও পশ্চিমাদের চাপিয়ে দেওয়া টিকা আমরা গ্রহণ করবো না! এইসব বক্তব্যের বিরোধিতা করতে কিংবা সন্তানহারা অভিভাবকদের সান্ত্বনা দিতে এগিয়ে আসতে পারে এমন কোনো ব্যক্তি কি আমাদের দেশে নেই!
আর কত শিশুর মৃত্যু হলে আপনাদের বিবেককে নাড়া দেবে? আর কতগুলো মহামারী আমাদেরকে ছোবল মারলে আপনাদের চেতনা ফিরে আসবে? আপনাদের আসমান তবে কবে কাঁপবে? এই শিশু মৃত্যু উপত্যকায় শিশুদের সারি সারি সমাধি সামনে রেখে, শিশু হত্যার পরিবেশ সৃষ্টির জন্য যারা দায়ী তাদের যথাযথ শাস্তির দাবি জানাই।
লেখক: সাংবাদিক, কলামিস্ট।


