আট বছর আগে মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে ভয়াবহ সামরিক দমন-পীড়নের মুখে প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীর সদস্যরা। শুরুতে মানবিক কারণে আশ্রয় দিলেও আজ তা দেশের জন্য হয়ে উঠেছে এক বিরাট সামাজিক, অর্থনৈতিক ও নিরাপত্তাজনিত সংকট।
আন্তর্জাতিক মহল থেকে প্রত্যাবাসনের নানা আশ্বাস দিলেও এখন পর্যন্ত একজন রোহিঙ্গাও নিজ দেশে ফেরেনি। প্রত্যাবাসন না হওয়ায় দীর্ঘায়িত এই অচলাবস্থা ক্রমেই জটিল হয়ে উঠছে। ২০১৭ সালে প্রায় সাড়ে সাত লাখ রোহিঙ্গা প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আশ্রয় নিয়েছিল, যা এখন প্রায় ১১ লাখে পৌঁছেছে। এই মানবিক সংকট একসময় বিশ্বসমাজের ব্যাপক মনোযোগ পেয়েছিল, কিন্তু এখন প্রসঙ্গটি নতুন নতুন বৈশ্বিক সংকটের আড়ালে চাপা পড়ে যাচ্ছে।
ইন্টার সেক্টর কো-অর্ডিনেশন গ্রুপের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জন্য প্রত্যাশিত তহবিলের মাত্র ৩৫ শতাংশ পাওয়া গেছে। ২০১৮ সালে যেখানে ৭২ শতাংশ সহায়তা মিলেছিল, সেখানে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে এই হার লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। তহবিল হ্রাসের সরাসরি প্রভাব পড়ছে রোহিঙ্গাদের জীবনমান, খাদ্য, চিকিৎসা ও শিক্ষায়। জীবিকার প্রয়োজনে তারা মাদকপাচার, মানবপাচার এবং অস্ত্র ব্যবসার মতো অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডে জড়িয়ে পড়ছে। এতে কক্সবাজারের স্থানীয় বাসিন্দাদের জীবনযাত্রাও হুমকির মুখে পড়েছে।
রোহিঙ্গা সমস্যার মূল সমাধান প্রত্যাবাসন হলেও মায়ানমারের বর্তমান রাজনৈতিক পরিস্থিতি এবং রাখাইনে চলমান সংঘাতের কারণে তা অনিশ্চিত। ২০১৭ সালে প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও একজন রোহিঙ্গাও এখন পর্যন্ত ফিরে যায়নি। মায়ানমারে সামরিক জান্তার নির্যাতন এবং আরাকান আর্মির সঙ্গে চলমান সংঘাতের কারণে সেখানে নিরাপদ ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসনের কোনো পরিবেশ নেই।
রোহিঙ্গা সমস্যার রাজনৈতিক সমাধান জরুরি হলেও সেটি এখনো অধরাই রয়ে গেছে। আন্তর্জাতিক আদালতে গণহত্যা মামলার অগ্রগতি থাকলেও তার বাস্তব ফল দৃশ্যমান নয়। প্রত্যাবাসন ত্বরান্বিত করার জন্য আরো বড় ধরনের আন্তর্জাতিক চাপ প্রয়োজন। কিন্তু ভূ-রাজনীতির স্বার্থে বড় শক্তিগুলোর নীরবতা এ ক্ষেত্রে সবচেয়ে বড় অন্তরায় হয়ে আছে।
পাশাপাশি যারা ভুয়া তথ্য দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্র এবং পাসপোর্ট তৈরি করে অবৈধভাবে বাংলাদেশের নাগরিক হওয়ার চেষ্টা করছে, তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করা অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। বাংলাদেশ একা এ সংকট সামলাতে পারবে না। তাই সরকারের কূটনৈতিক তৎপরতা আরো জোরদার করতে হবে। দ্বিপক্ষীয় আলোচনার পাশাপাশি আঞ্চলিক মঞ্চগুলোতেও এই ইস্যু জোরালোভাবে তুলে ধরা দরকার। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সহায়তা নিশ্চিত করার চেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে।
স্থানীয় জনগণের ক্ষোভ প্রশমনে তাদের জন্য বিশেষ তহবিল, কর্মসংস্থান ও অবকাঠামো উন্নয়ন জরুরি। আমরা মনে করি, এই সংকটের একমাত্র টেকসই সমাধান হলো নিরাপদ, স্বেচ্ছামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ প্রত্যাবাসন। আন্তর্জাতিক মহলকে আবারও বুঝতে হবে, রোহিঙ্গাদের এভাবে অনির্দিষ্টকালের জন্য আশ্রয় দিয়ে রাখা বাংলাদেশের পক্ষে কোনোভাবেই সম্ভব নয়।
সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাচ্ছে। আজ পদক্ষেপ না নিলে কাল এই সংকট আরো ভয়াবহ হয়ে বাংলাদেশের জন্যই নয়, গোটা অঞ্চলের জন্যই নিরাপত্তাজনিত হুমকি হয়ে উঠবে।



