জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের সহ-সভাপতি অধ্যাপক ড. আলী রীয়াজ বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধ, ৫৩ বছরের সংগ্রাম ও অভাবনীয় গণ-অভ্যুত্থানকে পাশ কাটিয়ে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এই ঐতিহাসিক বাস্তবতা মাথায় রেখেই আমাদের সামনে এগোতে হবে।” আজ সোমবার রাজধানীর ফরেন সার্ভিস একাডেমির দোয়েল হলে আয়োজিত রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে জাতীয় ঐকমত্য কমিশনের দ্বিতীয় ধাপের ১৬তম দিনের আলোচনা শুরুর প্রারম্ভিক বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন।
আলোচনার শুরুতে ড. আলী রীয়াজ বলেন, “আমরা প্রতিদিনের আলোচনার শুরুতে যাদের প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করি, তারা হচ্ছেন আমাদের মুক্তিযোদ্ধারা। মুক্তিযুদ্ধ ব্যতীত আমরা এই জায়গায় আসতে পারতাম না। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ আমাদের অস্তিত্বের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। আমাদের সমস্ত সাফল্য, ব্যর্থতার ঊর্ধ্বে এই মুক্তিযুদ্ধ। লক্ষ লক্ষ মানুষের প্রাণ ও দীর্ঘ সংগ্রামের বিনিময়ে অর্জিত এই রাষ্ট্রের পথরেখা নির্ধারণের প্রক্রিয়া একটিমাত্র দল বা মতের দ্বারা নয়, সকলের সম্মিলিত প্রচেষ্টার মাধ্যমেই সম্ভব।”
তিনি বলেন, “গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার সংগ্রাম চলমান রয়েছে, এবং সেই ধারাবাহিকতায় আমরা একটি ভয়াবহ ফ্যাসিবাদ থেকে গণআন্দোলনের মধ্য দিয়ে এই অবস্থানে পৌঁছেছি। সেই পটভূমিই জাতীয় সনদের ভিত্তি—যা সকল রাজনৈতিক দলের মাথায় রাখা প্রয়োজন।”
জুলাই মাস শেষ হওয়ার আগে সনদ চূড়ান্ত করতে রাজনৈতিক দলগুলোকে দ্রুত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আহ্বান জানান ড. রীয়াজ। তিনি বলেন, “আমাদের হাতে আর ১০ দিন সময় আছে। যদি ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে আমরা ঐকমত্যে পৌঁছাতে চাই, তাহলে এই সময়ের মধ্যেই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি করতে হবে। কিছু বিষয়ে আলোচনা চললেও কিছু বিষয়ে এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে।”
তিনি জানান, কমিশনের পক্ষ থেকে ‘নোট অব ডিসেন্ট’-এর সুযোগ রাখা হয়েছে, অর্থাৎ কেউ চাইলে কোনো প্রস্তাবে দ্বিমত পোষণ করতে পারেন এবং তা জাতীয় সনদে উল্লেখ থাকবে।
ড. আলী রীয়াজ বলেন, “গতকাল তত্ত্বাবধায়ক সরকার নিয়ে ব্যাপক আলোচনা হয়েছে। কমিশনের ধারনা, সংশোধিত প্রস্তাবে বেশিরভাগ দল একমত। কিছু কিছু বিষয়ে হয়তো দ্বিমত থাকবে। আজকের মধ্যেই দলগুলোর কাছ থেকে পরামর্শ নিয়ে বিষয়গুলো নিষ্পত্তির চেষ্টা করা হবে।”
তিনি আরও বলেন, “দ্বিকক্ষ বিশিষ্ট সংসদ গঠনের বিষয়ে রাজনৈতিক দলগুলো যে মতামত দিয়েছে, তা বিবেচনায় রেখে কমিশন আগামীকাল বা পরশু চূড়ান্ত মত জানাবে।”
দলগুলোর উদ্দেশে ড. রীয়াজ বলেন, “রাজনৈতিক দলগুলোর প্রতি আমাদের অনুরোধ—আপনারা এই রাষ্ট্রের ইতিহাসকে, বিশেষত মুক্তিযুদ্ধ ও গণ-অভ্যুত্থানকে অস্বীকার না করে এগোন। আমরা যদি এই মূল ভিত্তির ওপর ঐকমত্যে পৌঁছাতে না পারি, তবে সনদ বাস্তবায়ন সম্ভব নয়।”
তিনি বলেন, “দীর্ঘ আলোচনা করার সময় নেই। জুলাই সনদ তৈরিতে দ্রুত ঐক্যমতে পৌঁছাতে হবে।”
আলোচনায় সভাপতিত্ব করেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী মনির হায়দার। এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন—কমিশনের সদস্য সফর রাজ হোসেন, বিচারপতি এমদাদুল হক, ড. বদিউল আলম মজুমদার, ড. ইফতেখারুজ্জামান ও ড. আইয়ুব মিয়া।
আজকের আলোচনায় অংশ নেয় বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি), বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি), গণঅধিকার পরিষদ, গণসংহতি আন্দোলন, বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি (সিপিবি), বিপ্লবী ওয়ার্কার্স পার্টি, আমার বাংলাদেশ (এবি) পার্টিসহ ৩০টি রাজনৈতিক দলের প্রতিনিধিরা।
জাতীয় ঐকমত্য সনদ চূড়ান্তে চলমান এই আলোচনা পর্ব রাজনৈতিক অঙ্গনে একটি সম্ভাব্য ঐক্যমতের ভিত্তি নির্মাণে গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। তবে আলী রীয়াজের মতে, ঐকমত্য ছাড়া এই রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ কাঠামো নির্ধারণ সম্ভব নয়। “এখন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সময়” বলেই মন্তব্য করেন তিনি।


