মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

বাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অর্থনৈতিক অগ্রগতির এক উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে দীর্ঘদিন ধরে প্রশংসিত হয়ে আসছে। তৈরি পোশাক খাত, প্রবাসী আয়, দারিদ্র্য হ্রাস, মানবসম্পদ উন্নয়ন ও অবকাঠামো খাতে সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্ব দরবারে নিজের অবস্থান সুদৃঢ় করেছে। তবে সম্প্রতি প্রকাশিত দুটি গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবেদনের তথ্য বলছে, অর্থনীতির ভেতরে জমতে থাকা গভীর সংকট এখন আর উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বিশ্বব্যাংকের ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স ২০২৫’ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) সর্বশেষ হিসাব বলছে, বাংলাদেশের আর্থিক অন্তর্ভুক্তি ও রাজস্ব আহরণে ধস নেমেছে। যা দেশের সামগ্রিক অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতা ও টেকসই উন্নয়নের জন্য এক বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার কমেছে ১০ শতাংশ পয়েন্ট
বিশ্বব্যাংকের সর্বশেষ ‘গ্লোবাল ফিনডেক্স রিপোর্ট’ বলছে, ২০২৪ সালে বাংলাদেশের ১৫ বছর বা তার বেশি বয়সী জনগণের মধ্যে মাত্র ৪৩ শতাংশের কোনও ব্যাংক বা মোবাইল মানি অ্যাকাউন্ট রয়েছে, যা ২০২১ সালে ছিল ৫৩ শতাংশ। অর্থাৎ, তিন বছরের ব্যবধানে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার এক লাফে ১০ শতাংশ পয়েন্ট কমে গেছে।

এদিকে বিশ্বব্যাপী আর্থিক অন্তর্ভুক্তির হার বেড়েছে। ১৪১টি দেশের মধ্যে বেশিরভাগ দেশেই গড় ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীর সংখ্যা ৭৪ শতাংশ থেকে বেড়ে ৭৯ শতাংশে পৌঁছেছে। দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান তুলনামূলক দুর্বল। ভারতের ব্যাংক অন্তর্ভুক্তির হার ৮৯ শতাংশ এবং শ্রীলঙ্কার ৮০ শতাংশের ওপরে। বাংলাদেশ কেবল পাকিস্তানের তুলনায় এগিয়ে আছে।

বিশ্বব্যাংক আরও জানিয়েছে, মোবাইল ফিনান্সিয়াল সার্ভিস (এমএফএস) বা মোবাইল মানি অ্যাকাউন্টধারীর হারও কমে এসেছে। ২০২১ সালে যেখানে ২৯ শতাংশ ছিল, ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ২০ শতাংশে। ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠানে হিসাবধারীর হারও কমে ২৪ শতাংশ থেকে ২৩ শতাংশে পৌঁছেছে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা এই পতনের কারণ ব্যাখ্যা করে বলেন, “আগে একজন গ্রাহক একাধিক মোবাইল অ্যাকাউন্ট খুলতে পারতেন। এনআইডি ভিত্তিক একক হিসাব চালুর ফলে অসংখ্য ভুয়া ও অকার্যকর অ্যাকাউন্ট বাতিল হয়ে গেছে। ফলে পরিসংখ্যানে হ্রাস লক্ষ্য করা যাচ্ছে।”

নারী–পুরুষের অন্তর্ভুক্তিতে বেড়েছে বৈষম্য
আরও উদ্বেগের বিষয় হলো নারী–পুরুষের মধ্যে আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ব্যবধান আরও বেড়েছে। ২০২১ সালে যেখানে ‘জেন্ডার গ্যাপ’ ছিল ১৯ শতাংশ পয়েন্ট, ২০২৪ সালে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ২১ শতাংশে। বর্তমানে নারীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টধারীর হার মাত্র ৩৩ শতাংশ, যেখানে পুরুষদের ৫৪ শতাংশ।

বিশ্বব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশে প্রাপ্তবয়স্ক মানুষের সংখ্যা ১২ কোটি ২৮ লাখ। এর মধ্যে ৬ কোটি ৯৭ লাখ মানুষের কোনও ধরনের ব্যাংকিং বা আর্থিক অ্যাকাউন্ট নেই। এই পরিসংখ্যান বাংলাদেশের অবস্থানকে বিশ্বের সেই আটটি দেশের কাতারে নিয়ে গেছে, যেখানে অধিকাংশ জনগণ এখনও ব্যাংকবহির্ভূত রয়ে গেছে।

রাজস্ব ঘাটতিতে টালমাটাল অর্থনীতি
একই সময়ে রাজস্ব খাতেও অস্থিরতা দেখা যাচ্ছে। জাতীয় রাজস্ব বোর্ড (এনবিআর) টানা ১৩ বছর ধরে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জনে ব্যর্থ হচ্ছে। সদ্য শেষ হওয়া ২০২৪–২৫ অর্থবছরে এনবিআরের রাজস্ব আহরণ হয়েছে তিন লাখ ৭০ হাজার ৮৭৪ কোটি টাকা, যা সংশোধিত লক্ষ্যমাত্রার তুলনায় ৯২ হাজার ৬২৬ কোটি টাকা কম।

বছরের শুরুতে সরকার এনবিআরের জন্য ৪ লাখ ৮০ হাজার কোটি টাকার লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেছিল। কিন্তু বছরের মাঝপথে তা হ্রাস করেও কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারেনি এনবিআর। এই রাজস্ব ঘাটতি অর্থনীতিতে বহুমাত্রিক চাপ তৈরি করেছে—সরকারি বিনিয়োগে ছাঁটাই, উন্নয়ন প্রকল্পে বিলম্ব, ব্যাংকিং খাতে তারল্য সংকট এবং ঋণনির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে।

অর্থনীতিবিদদের মতে, কর ব্যবস্থার দুর্বলতা, প্রশাসনিক জটিলতা ও রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ এর প্রধান কারণ। সেন্টার ফর পলিসি ডায়লগের (সিপিডি) সিনিয়র রিসার্চ ফেলো তৌফিকুল ইসলাম খান বলেন, “বর্তমান কাঠামো দিয়ে রাজস্ব লক্ষ্যমাত্রা অর্জন সম্ভব নয়। কর ফাঁকি ও কর অব্যাহতির সংস্কৃতি রাজস্ব ব্যবস্থাকে দুর্বল করেছে।”

তার মতে, ২০২২–২৩ অর্থবছরে শুধু কর ফাঁকির কারণেই সরকার ২ লাখ ২৬ হাজার কোটি টাকা রাজস্ব হারিয়েছে, যার অর্ধেক ছিল করপোরেট ফাঁকি।

তিনি আরও বলেন, “বাজেট পরিকল্পনা ও রাজস্ব সংগ্রহের মধ্যে কোনও সমন্বয় নেই। এ কাঠামো পুরনো ও অকার্যকর, সংস্কার ছাড়া অর্থনৈতিক টেকসই সম্ভব নয়।”

নীতিনির্ধারকদের দৃষ্টিভঙ্গি
সৈয়দ নাসিম মঞ্জুর বলেন, বাংলাদেশ সরকার ট্যারিফ ইস্যুতে কোন পথে যাচ্ছে তা নিয়ে আমরা কনফিউজড।

সভায় বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সাউথ এশিয়ান নেটওয়ার্ক অন ইকোনমিক মডেলিংয়ের (সানেম) নির্বাহী পরিচালক সেলিম রায়হান বলেন, বাংলাদেশের দরকষাকষির অভিজ্ঞতা নেই। পাল্টা শুল্ক বিষয়ে অন্য দেশের তুলনায় আমাদের দর–কষাকষি হতাশ করেছে। নন-ডিসক্লোজার এগ্রিমেন্ট (এনডিএ) থাকা সত্ত্বেও মালয়েশিয়া জটিল ইস্যুগুলো নিয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনের সঙ্গে বৈঠক করছে।

বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সভাপতি আনোয়ার উল আলম চৌধুরী পারভেজ বলেন, সরকার কী করছে বা হালনাগাদে কী অগ্রগতি আছে, তা ব্যবসায়ীরা জানতে পারেনি। ওই সময় (এপ্রিল মাসে) সরকার থেকে বলা হলো তারা (সরকার) চেষ্টা করছে। কিন্তু সরকার কী করছে বা হালনাগাদে কী অগ্রগতি আছে, সেগুলো আমরা জানতে পারিনি।

Share.
Exit mobile version