সোমবার | মার্চ ২ | ২০২৬

দেশের বৃহত্তম বেসরকারি ব্যাংক ইসলামী ব্যাংক বাংলাদেশ পিএলসি (আইবিবিএল) গত সাত বছর ধরে এস আলম গ্রুপ–সমর্থিত পূর্ববর্তী ব্যবস্থাপনার অবৈধ নিয়োগের কারণে বিপুল আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছে। এসব অনিয়মের কারণে ব্যাংকটি প্রতি বছর অন্তত ১৫০০ কোটি টাকার বেশি ক্ষতির বোঝা টানছে।

তদন্তে জানা গেছে, কোনো নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি বা পরীক্ষা ছাড়াই ৮ হাজারের বেশি অদক্ষ ও অর্ধশিক্ষিত মানুষকে টাকা নিয়ে নিয়োগ দেওয়া হয়েছিল। তাদের মধ্যে ছিলেন পানের দোকানদার, অটোরিকশা চালক, রাজমিস্ত্রির সহকারী ও গৃহকর্মীর মতো বিভিন্ন পেশার মানুষ। এই অবৈধ নিয়োগের ফলে গত সাত বছরে ব্যাংকটির ক্ষতির পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ১০ হাজার কোটি টাকারও বেশি।

বর্তমান কর্তৃপক্ষ ব্যাংকটিকে পুনরুদ্ধারে কঠিন সংগ্রাম চালাচ্ছে। তবে ব্যাংক থেকে ১ লাখ কোটি টাকারও বেশি অর্থ পাচারের অভিযোগ এবং চলমান আর্থিক চাপ একে আরও সংকটের মুখে ফেলেছে। ব্যাংকিং বিশেষজ্ঞদের মতে, ইসলামী ব্যাংকের এই অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতি পুরো ব্যাংক খাতের স্থিতিশীলতাকেই ঝুঁকির মধ্যে ফেলেছে।

যোগ্যতা যাচাই প্রক্রিয়ায় দেখা গেছে, অনেক কর্মকর্তা জাল সার্টিফিকেট ব্যবহার করে চাকরি পেয়েছেন। প্রমাণ মিললে তাদের বরখাস্ত করা হচ্ছে, এবং যাচাই প্রক্রিয়া এখনও চলছে।

সম্প্রতি ব্যাংক কর্তৃপক্ষ কর্মীদের দক্ষতা যাচাইয়ের জন্য একটি বিশেষ পরীক্ষা আয়োজন করলে অবৈধভাবে নিয়োগপ্রাপ্ত প্রায় ৯০ শতাংশ কর্মী তা বর্জন করেন। তাদের অনেকেই ব্যাংকের বিরুদ্ধে অপপ্রচার চালাচ্ছেন এবং বর্তমান ব্যবস্থাপনার ওপর নানা হুমকি দিচ্ছেন। শুক্রবার ভোরে ব্যাংকের সরকারি ফেসবুক পেজ হ্যাক হওয়ার ঘটনাও ঘটেছে, যা ‘বাইরের ইন্ধনে’ ঘটেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

ইসলামী ব্যাংকের সাবেক একজন পরিচালক বলেছেন, বিদ্রোহী কর্মীদের হাতে গ্রাহকের অর্থ নিরাপদ নয়। তাদের অবাধ্যতা প্রমাণ করে ব্যাংকের ক্যাশ ও ভল্ট নিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে। তিনি সতর্ক করে বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে ব্যাংকটি ভয়াবহ সংকটে পড়বে।

গত সাত বছরে নিয়ন্ত্রণহীন নিয়োগের কারণে আন্তর্জাতিক মানের এই ব্যাংকটি এখন আঞ্চলিক রূপ নিয়েছে। চট্টগ্রাম অঞ্চলের কর্মীদের প্রাধান্যে ব্যাংকের অভ্যন্তরে আঞ্চলিক ভাষা ও আচরণ প্রভাব ফেলেছে, ফলে গ্রাহকসেবা মারাত্মকভাবে ব্যাহত হয়েছে।

ব্যাংকের মানবসম্পদ বিভাগের এক কর্মকর্তা জানান, এসব কর্মকর্তা সহকর্মীদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করতেন, ঊর্ধ্বতনদের নির্দেশনা উপেক্ষা করতেন এবং নিজেদের পছন্দমতো বদলি করাতে বাধ্য করতেন। যারা তাদের নিয়ন্ত্রণে আনতে চেয়েছিলেন, তাদের বিরুদ্ধে মিথ্যা অভিযোগ দিয়ে চাকরি ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে।

ওই কর্মকর্তা আরও জানান, এই কর্মকর্তারা এখনও এস আলমের প্রভাব ফিরিয়ে আনার হুমকি দিচ্ছেন।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ইসলামী ব্যাংককে টিকিয়ে রাখতে হলে অবৈধ নিয়োগ, দুর্নীতি ও অভ্যন্তরীণ গোষ্ঠীদ্বন্দ্বের জট একযোগে সমাধান করতে হবে। না হলে ব্যাংকটি শুধু আর্থিক নয়, বিশ্বাসের সঙ্কটেও পড়বে, যা পুরো ব্যাংক খাতের জন্য মারাত্মক ঝুঁকি তৈরি করবে।

Share.
Exit mobile version