মধ্যপ্রাচ্য মানব সভ্যতার সূতিকাগার। দজলা- ফোরাতের অববাহিকায় গড়ে ওঠা মেসোপটেমীয় সভ্যতা, জেরুজালেমের পবিত্র ভূমি, দামেস্কের প্রাচীন নগরী কিংবা মিশরের পিরামিড সব মিলিয়ে এই অঞ্চল মানব ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র। এখানে জন্ম অনেক সর্বপ্রাণবাদী ধর্মের। জন্ম নিয়েছে আব্রাহামিক তিনটি ধর্ম ইহুদি, খ্রিস্টান ও ইসলাম। অথচ সভ্যতার এই জন্মভূমি আজ বিশ্বের সবচেয়ে অস্থির, রক্তাক্ত ও মানবিক বিপর্যয়পীড়িত অঞ্চলে পরিণত হয়েছে। গোষ্ঠীগত বিরোধ, জাতিগত বিরোধ, আন্তঃধর্মীয় সংঘাত, বহিঃশক্তির নীলনকশা অশান্ত করে রেখেছে সভ্যতার এই উৎপত্তিস্থলকে। প্রাচীন সেমিটিক জনগোষ্ঠীর বিভিন্ন শাখা ইহুদি, আরব, আরামীয়সহ নানা সম্প্রদায় এই অঞ্চলে বসবাস করত। ব্যাবিলনীয়, পারস্য, গ্রিক, রোমান, বাইজেন্টাইন এবং পরবর্তীকালে মুসলিম সাম্রাজ্যের উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে অঞ্চলটির রাজনৈতিক ও জনসংখ্যাগত চিত্র বারবার বদলেছে।
মধ্যপ্রাচ্যের ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাত ইতিহাসের অন্যতম দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সংকট যার শিকড় গভীরে প্রোথিত। খ্রিস্টীয় প্রথম শতকে রোমান সাম্রাজ্যের বিরুদ্ধে বিদ্রোহের পর বিপুলসংখ্যক ইহুদি নিজভূমি থেকে বিতাড়িত হন। শুরু হয় দীর্ঘ ইহুদি ডায়াস্পোরা। আরব উপদ্বীপ থেকে বিতাড়ন, মধ্যযুগের ধর্মীয় নিপীড়ন, ইউরোপজুড়ে শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বৈষম্য, নিপীড়ন ও অ্যান্টিসেমিটিজমের শিকার, রাশিয়ার পোগ্রম এবং নাৎসি জার্মানির হলোকাস্ট ইহুদিদের নিজেদের জন্য রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে তীব্র করে তোলে। ইহুদি জাতীয়তাবাদের উন্মেষ, প্রভূত অর্থনৈতিক শক্তি, প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ফলাফল ইসরায়েল রাষ্ট্রের ভিত্তি তৈরি করে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে অটোমান সাম্রাজ্য পরাজিত না হলে মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্ব রাজনীতির মানচিত্র সম্পূর্ণ ভিন্ন হতো। ফিলিস্তিনের ভাগ্য সরল রৈখিকভাবেই রচিত হত। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তি বিজয়ী হওয়ার ফলেই সাইকস-পিকট চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে ব্রিটেন ফিলিস্তিনের নিয়ন্ত্রণ পায়, ব্যাপকহারে ইহুদি বসতি স্থাপন শুরু করে। নিজভূমিতে পরবাসী হয়ে পড়তে থাকে ফিলিস্তিনিরা। ফলে ১৯৩৭ সালে ব্রিটিশ ম্যান্ডেটভুক্ত ফিলিস্তিনে ইহুদি ও আরবদের মধ্যে তীব্র সংঘাত ও উত্তেজনা তৈরি হয়। ব্রিটিশ সরকার পিল কমিশন গঠন করে যারা ফিলিস্তিনে একটি আরব রাষ্ট্র, একটি ইহুদি রাষ্ট্র এবং পবিত্র স্থানগুলো সম্বলিত একটি নিরপেক্ষ অঞ্চলে বিভক্ত করার প্রস্তাব করে যা প্রত্যাখ্যান করে আরবরা। কমিশনের এই প্রস্তাবের পর ফিলিস্তিনি আরবদের যে মহাবিদ্রোহ চলছিল, তা আরও তীব্র আকার ধারণ করে। ব্রিটিশ বাহিনী ও ইহুদিদের হাগানাহ বাহিনীর বিরুদ্ধে আরব বিদ্রোহীরা লড়াই চালিয়ে যায়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র-রাশিয়া-ব্রিটেন-ফ্রান্স নেতৃত্বাধীন মিত্র শক্তি বিজয়ের অব্যবহিত পরেই জাতিসংঘের হাত দিয়ে ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা হয়। জাতিসংঘের একটি স্বাধীন ইহুদি রাষ্ট্র ও একটি আরব রাষ্ট্র গঠনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হলেও স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র ৭৮ বছরেও বাস্তবায়িত হয়নি। ফিলিস্তিনিরা ভূমি, রাষ্ট্র ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার হারিয়েছে সময়ের সাথে সাথে। ইসরায়েল রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার পর প্রায় ৭ লাখ ৫০ হাজার ফিলিস্তিনি তাদের নিজ ভূমি থেকে বাস্তুচ্যুত ও উচ্ছেদ হয়, যা ইতিহাসে ‘নাকবা’ বা মহাবিপর্যয় নামে পরিচিত। ওই সময়ে ৪০০-এরও বেশি ফিলিস্তিনি গ্রাম ও জনবসতি ধ্বংস করা হয়। বাস্তুচ্যুত ফিলিস্তিনিদের সহায়তায় গঠিত জাতিসংঘের ত্রাণ সংস্থা (UNRWA) বর্তমানে প্রায় ৫৯ লাখ ফিলিস্তিনিকে নিবন্ধিত শরণার্থী হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে। ১৯৫৬ সালের সুয়েজ সংকট, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কিপুর যুদ্ধ এবং বিভিন্ন সংঘাত ফিলিস্তিন তথা মধ্যপ্রাচ্যকে অস্থিতিশীল করে তোলে। প্রথম ইন্তিফাদা, পিএলও’র নেতৃত্বে অসলো চুক্তির মাধ্যমে শান্তির দ্বারপ্রান্তে পৌঁছানো, ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিনের হত্যাকাণ্ড পরিস্থিতে ঘোলাটে করে তোলে। হামাসের প্রতিষ্ঠা, হামাস-পিএলও দ্বন্ধ- সংঘাত, ফিলিস্তিনের অবিসংবাদিত নেতা ইয়াসির আরাফাতের রহস্যজনক মৃত্যু পরিস্থিতি শুধু খারাপের দিকেই নিয়েছে। এর পরের ইতিহাস আমাদের সবার জানা। সর্বশেষ ৭ অক্টোবর ২০২৩ এ ইসরাইলে হামাসের অতর্কিত হামলায় ১২০০ ইসরাইলির মৃত্যু হয়। হামাস ও অন্যান্য গোষ্ঠীগুলো নারী, শিশু ও বৃদ্ধসহ মোট ২৫১ জনকে জিম্মি করে গাজায় নিয়ে যায়। পরিপ্রেক্ষিতে ইসরাইলি হামলায় গাজার প্রায় ৮১ শতাংশ অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত বা ধ্বংস হয়েছে। ইসরায়েলি হামলায় ৭৩ হাজার ফিলিস্তিনিকে হত্যা্র শিকার হয়, যার মধ্যে বড় অংশই নারী ও শিশু। ২০২৫ সালের অক্টোবর মাসে একটি অস্থায়ী যুদ্ধবিরতি চুক্তি হলেও গাজায় ইসরায়েলি বাহিনীর হামলা অব্যাহত রয়েছে। ২০২৬ সালের জুন মাসেও বেশ কয়েকজন হামাস কমান্ডার নিহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা গাজার এই পরিস্থিতিকে গণহত্যা এবং মানবিক বিপর্যয় হিসেবে বর্ণনা করেছে।
বিশ্বের বহু মানুষ মধ্যপ্রাচ্যের সংকট বলতে শুধু ফিলিস্তিন-ইসরায়েল সংঘাতেই দৃষ্টিপাত করেন। বাস্তবে এটি অনেক বৃহত্তর এবং জটিল এক সংকটাবস্থা। ফিলিস্তিন প্রশ্ন অবশ্যই কেন্দ্রীয় ইস্যু কিন্তু মধ্যপ্রাচ্যের অস্থিরতার কারণ কেবল সেটি নয়। জাতিগত দ্বন্দ্ব, সাম্প্রদায়িক বিভাজন, কৃত্রিম সীমান্ত, কর্তৃত্ববাদী শাসন, অর্থনৈতিক বৈষম্য, তেলভিত্তিক অর্থনীতি ও রাজনীতি এবং বিশ্ব পরাশক্তিগুলোর প্রতিদ্বন্দ্বিতা, সব মিলিয়ে মধ্যপ্রাচ্য আজ এক জটিল ভূরাজনৈতিক গোলকধাঁধা।
উদাহরণস্বরূপ ইরান ও ইরাকের আট বছরের যুদ্ধ প্রাসঙ্গিক। আরব ও পারস্য জাতীয়তাবাদের প্রতিদ্বন্দ্বিতা দীর্ঘ। তবে ইরান- ইরাক যুদ্ধ কেবল জাতীয়তাবাদ, সীমান্ত বিরোধ, শাতিল আরবে নৌপথে কর্তৃত্ব স্থাপন নয়। এই যুদ্ধের পেছনে পারস্য সভ্যতার উত্তরাধিকারী ইরান এবং আরব জাতীয়তাবাদী শক্তিগুলোর মধ্যে নেতৃত্বের দাবিদার ইরাকের আঞ্চলিক রাজনীতিতে প্রভাব বিস্তারের ভূমিকা ছিল। তবে নেপথ্যে ছিল তৎকালীন পরাশক্তি ও তেল ব্যবসায়ীদের কূটকৌশল। বলা হয়ে থাকে বিপ্লব পরবর্তী ইরানের সাথে সাদ্দাম হোসেনের ইরাককে দিয়ে প্রক্সি যুদ্ধ করানো হয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের মতো ভয়াবহ সংঘাতময় যুদ্ধে নিষিদ্ধ অস্ত্রের ব্যবহার করা হয়। প্রায় লক্ষাধিক সিভিলিয়ান জীবন হারায়, প্রাণ হারায় দুই পক্ষের প্রায় এক মিলিয়ন যোদ্ধা; যুদ্ধে ধ্বংস হয়ে যায় ইরাক ও ইরানের অর্থনীতি। গণহত্যার শিকার হয় ৫০ হাজার থেকে দুই লাখ কুর্দি।
একইভাবে ইরান ও সৌদি আরবের প্রতিদ্বন্দ্বিতা মধ্যপ্রাচ্যের বহু সংকটের কেন্দ্রে অবস্থান করছে। এটি শুধু ভূ-রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা নয়; এটি ইসলাম ধর্মের নেতৃত্বের প্রশ্নেও একটি আদর্শিক সংঘাত। ইয়েমেন, সিরিয়া, লেবানন কিংবা ইরাকের রাজনীতিতে এই প্রতিদ্বন্দ্বিতার প্রভাব স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান। ইয়েমেনে হুথি বিদ্রোহীদের প্রতি ইরানের সমর্থন এবং সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের সামরিক হামলা শত্রুভাবাপন্ন দুইটি দেশের যুদ্ধাংদেহী অবস্থান ও প্রক্সি যুদ্ধের প্রতিফলন। জাতিসংঘের হিসাব মতে ৪ কোটি ৩০ লাখ জনসংখ্যা অধ্যুষিত ইয়েমেনে যুদ্ধে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ কারণে তিন লাখেরও বেশি মানুষের প্রাণহানি ঘটেছে। প্রত্যক্ষ সামরিক হামলায় অন্তত এক লাখ ৫০ হাজারের বেশি মানুষ মারা গেলেও এর চেয়েও বেশি প্রায় ৬০ শতাংশ মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে যুদ্ধজনিত কারণে সৃষ্ট তীব্র খাদ্যাভাব, সুপেয় পানির অভাব এবং স্বাস্থ্যসেবা ভেঙে পড়ার কারণে। প্রাণ হারানো ব্যক্তিদের মধ্যে ৭০ শতাংশই পাঁচ বছরের কম বয়সী শিশু। সংঘাতের কারণে প্রায় ৪৫ লাখের বেশি মানুষ ঘরবাড়ি ছাড়তে বাধ্য হয়েছে। বছরের পর বছর ধরে চলা বিমান হামলা ও সংঘর্ষে ইয়েমেনের হাসপাতাল, স্কুল, বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং বন্দরসহ গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি সাধিত হয়েছে। বিশ্বের অন্যতম ভয়াবহ মানবিক সংকটে পতিত হয়েছে ইয়েমেন। ২০২৬ সালের মাঝামাঝি নাগাদ ইয়েমেন সংকট আরও জটিল রূপ নিয়েছে।অর্ধেকের বেশি মানুষের বেঁচে থাকার জন্য জরুরি মানবিক সহায়তা প্রয়োজন। প্রায় ১ কোটি ৮৩ লাখ মানুষ তীব্র খাদ্য অনিরাপত্তায় ভুগছেন, যার মধ্যে বড় একটি অংশ দুর্ভিক্ষের মুখোমুখি। প্রায় ১ কোটি ১০ লাখ শিশু সহায়তার অপেক্ষায় রয়েছে। এই বছরের ২৮ ফেব্রুয়ারি যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের যৌথ হামলার মাধ্যমে ইরানে বড় ধরনের সংঘাত শুরু হয়। পরবর্তীতে ৮ এপ্রিল একটি যুদ্ধবিরতি চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও, জুন মাসে তা ভেঙে পড়ে। সঙ্গত কারণেই সৌদি আরব তার পুরনো মিত্র আমেরিকার পাশে দাড়িয়েছে। তাছাড়া যেহেতু সৌদি আরবে আমেরিকার ঘাটি আছে, যুদ্ধ পরবর্তী ধাপে গেলে ইরান-সৌদি আরব যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সবচেয়ে বড় অমীমাংসিত জাতিগত প্রশ্ন হলো কুর্দি সমস্যা। প্রায় চার কোটি কুর্দি জনগোষ্ঠী তুরস্ক, ইরাক, সিরিয়া ও ইরানে ছড়িয়ে রয়েছে কিন্তু তাদের নিজস্ব কোনো রাষ্ট্র নেই। প্রথম বিশ্বযুদ্ধ-পরবর্তী সীমান্ত বিন্যাসে কুর্দিদের রাষ্ট্র গঠনের স্বপ্ন অপূর্ণ থেকে যায়। ফলে কুর্দি সংকট আজও মধ্যপ্রাচ্যের স্থিতিশীলতার জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। ইরান-ইরাক যুদ্ধ, উপসাগরীয় যুদ্ধ, ইরাকের উপর স্যাংশন, ইরাকে মার্কিন হামলা, জঙ্গিগোষ্ঠী আইএসআইএস বা আইএস এর উত্থান ও সিরিয়ার গৃহযুদ্ধে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্থ হয়েছে কুর্দি জনগোষ্ঠী। কুর্দিদের স্বাধীনতা ও স্বায়ত্তশাসনের আন্দোলন দমনের দীর্ঘ ইতিহাসে তুরস্ক কর্তৃক ব্যাপক সংঘাত ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটেছে। বিভিন্ন ইতিহাসবিদ ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে বিংশ শতাব্দীর শুরুতে বেশ কয়েকটি কুর্দি বিদ্রোহ কঠোরভাবে দমন করা হয়, যার মধ্যে ১৯৩০-এর দশকে ডারসিম গণহত্যার মতো ভয়াবহ ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত। ১৯৭৮ সালে কুর্দিস্তান ওয়ার্কার্স পার্টি (PKK) গঠনের পর থেকে তুরস্ক ও কুর্দিদের মধ্যে দীর্ঘস্থায়ী সশস্ত্র সংঘাত চলে আসছে। এই সংঘাতের জেরে তুরস্ক সরকারের বিরুদ্ধে হাজার হাজার বেসামরিক নাগরিকের মৃত্যু, জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুতি এবং কুর্দি সংস্কৃতি ও ভাষার ওপর কঠোর নিষেধাজ্ঞার অভিযোগ রয়েছে।
মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের বহুমাত্রিক চরিত্রকে সবচেয়ে স্পষ্টভাবে তুলে ধরে সিরিয়ার গৃহযুদ্ধ। ২০১১ সালের মার্চ মাসে দারা’আ শহরে বিক্ষোভ শুরু হয় এবং তা দ্রুত সারা দেশে ছড়িয়ে পড়ে। একটি রাজনৈতিক আন্দোলন থেকে শুরু হয়ে এটি দ্রুত আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সংঘাতে পরিণত হয়। সেখানে সিরীয় সরকার, বিদ্রোহী গোষ্ঠী, কুর্দি বাহিনী, তুরস্ক, ইরান, রাশিয়া, যুক্তরাষ্ট্র এবং বিভিন্ন অ-রাষ্ট্রীয় শক্তি জড়িয়ে পড়ে। সিরিয়া একটি প্রক্সি যুদ্ধের পরীক্ষাগারে পরিণত হয়। ২০২৪ সালে হাইআতু তাহরির আল-শাম (এইচটিএস) সহ বিভিন্ন বিরোধী বিদ্রোহী গোষ্ঠীর অতর্কিত হামলায় সিরিয়ার প্রেসিডেন্ট বাশার আল আসাদের হাত থেকে দামেস্কের নিয়ন্ত্রণ চলে যায় এবং ৮ ডিসেম্বরে বাশার আল আসাদের দুই যুগের শাসনের অবসান ঘটে। বাশার আল-আসাদ দেশ ছেড়ে পালিয়ে যাওয়ার পর গঠিত হয় অন্তর্বর্তীকালীন সরকার। জঙ্গিবাদে অভিযুক্ত বিদ্রোহী নেতা আহমেদ আল-শারা আবু মোহাম্মদ আল-জোলানি অন্তর্বর্তীকালীন রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব গ্রহণ করেন। এরপরেই আসাদপন্থী রাজনৈতিক কর্মী, সমর্থক, ভিন্নমতাবলম্বীদের উপর সহিংসতা ও গণহত্যা চালানোর ঘটনা ঘটে। গণতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের জন্য জোলানি সরকার ৫ বছর মেয়াদী একটি ক্রান্তিকালীন সময় ও নতুন সংবিধান প্রণয়নের ঘোষণা দিয়েছিল। তবে দুই বছর অতিবাহিত হলেও সহিংস পরিস্থিতির তেমন উন্নতি ঘটেনি, গনতান্ত্রিক ব্যবস্থায় উত্তরণের সম্ভাবনাও তৈরি হয়নি।
লেবাননকে মধ্যপ্রাচ্যের বারুদখানা বলাই সঙ্গত হবে। মধ্যপ্রাচ্যের ভূ-রাজনীতিতে লেবানন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল কেন্দ্রবিন্দু। ফিলিস্তিন ও ইসরাইলের সাথে ভৌগোলিক নৈকট্য এবং অভ্যন্তরীণ জটিল রাজনৈতিক পরিস্থিতির কারণে লেবানন প্রায়শই আঞ্চলিক সংঘাতের ককপিট হিসেবে কাজ করে। লেবাননের রাজনীতি মূলত সাম্প্রদায়িক বা ধর্মীয় গোষ্ঠীভিত্তিক ক্ষমতা ভাগাভাগির ওপর প্রতিষ্ঠিত। ১৯৪৩ সালে স্বাধীনতার পর থেকে দেশটির সাংবিধানিক ও রাজনৈতিক কাঠামো বিভিন্ন ধর্মীয় সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের নিশ্চয়তা ও ক্ষমতার ভারসাম্য রক্ষার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। তবে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন, এই সাম্প্রদায়িক কাঠামোর জন্যই দেশটিতে কার্যকর ও স্থায়ী শৃঙ্খলা এবং সুশাসন আসেনি। বহু বছর ধরে দেশটি সাম্প্রদায়িক রাজনীতি, অর্থনৈতিক সংকট এবং আঞ্চলিক শক্তিগুলোর প্রভাবের মধ্যে আটকে আছে। হিজবুল্লাহ ও ইসরায়েলের সংঘর্ষ প্রায়ই পুরো অঞ্চলকে উত্তেজনার মধ্যে রাখে। দশকের পর দশক ধরে লেবাননে ইসরাইলের হামলা যেনো রুটিনে পরিণত হয়েছে। মার্চ ২০২৬ থেকে শুরু হওয়া ইসরাইলের হামলায় লেবাননে নিহতের সংখ্যা ৩,৭০০ ছাড়িয়েছে, যার মধ্যে বিপুল সংখ্যক নারী ও শিশু রয়েছেন। এছাড়া প্রায় ২ শতাধিক স্বাস্থ্যসেবা কেন্দ্রে হামলার ঘটনা ঘটেছে, যার ফলে অন্তত ৪৪টি প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্র ও ৩টি হাসপাতাল বন্ধ হয়ে গেছে। ১৩ জুন ২০২৬ তারিখে ইসরায়েলি বাহিনী দক্ষিণ লেবাননের নাবাতিয়ে, টায়ার এবং জেজ্জিন জেলাসহ ২০টিরও বেশি স্থানে ব্যাপক বিমান ও কামান হামলা চালায়। ইসরায়েলি প্রতিরক্ষা বাহিনী দাবি করেছে যে, তারা গত শনিবারে দক্ষিণ লেবাননে হিজবুল্লাহর ৭০০টিরও বেশি লক্ষ্যবস্তু ও অবকাঠামোতে হামলা চালিয়েছে। হামলার পরিপ্রেক্ষিতে হিজবুল্লাহ ইসরায়েলি সেনাদের লক্ষ্য করে পাল্টা রকেট ও ড্রোন হামলা চালিয়ে যাচ্ছে।
মধ্যপ্রাচ্যে স্থায়ী শান্তি কতদূর?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে বিশ্বের পরাশক্তিগুলোর ভূমিকা বিশ্লেষণ করতে হবে। মধ্যপ্রাচ্য বিশ্বের বৃহত্তম জ্বালানি ভাণ্ডারগুলোর একটি। ফলে এই অঞ্চল শুধু আঞ্চলিক শক্তিগুলোর নয়, বৈশ্বিক শক্তিগুলোরও কৌশলগত আগ্রহের কেন্দ্র। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে যুক্তরাষ্ট্র মধ্যপ্রাচ্যে প্রভাব বিস্তার করেছে মূলত পেট্রো-ডলার বাণিজ্য, জ্বালানি নিরাপত্তা, সামুদ্রিক রুট নিয়ন্ত্রণ এবং মিত্র রাষ্ট্রগুলোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে। ইসরায়েল ও উপসাগরীয় রাজতন্ত্রগুলো দীর্ঘদিন ধরে মার্কিন কৌশলগত নীতির গুরুত্বপূর্ণ অংশ। অন্যদিকে সোভিয়েত ইউনিয়ন এবং পরবর্তীতে রাশিয়া সিরিয়া, ইরানসহ বিভিন্ন শক্তির সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করেছে। বিশেষ করে সিরিয়ায় রাশিয়ার সামরিক হস্তক্ষেপ মধ্যপ্রাচ্যের শক্তির ভারসাম্য নতুনভাবে নির্ধারণ করেছে। চীন তুলনামূলকভাবে সামরিক উপস্থিতি কম রাখলেও অর্থনৈতিক কূটনীতি এবং জ্বালানি নিরাপত্তার মাধ্যমে দ্রুত প্রভাব বাড়াচ্ছে। সাম্প্রতিক অতীতে ২০২৩ সালে সৌদি আরব ও ইরানের মধ্যে কূটনৈতিক সম্পর্ক পুনঃস্থাপনে চীনের মধ্যস্থতা মধ্যপ্রাচ্যে কূটনীতি ও শক্তির পুনর্বিন্যাসের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল। আপাত দৃষ্টিতে যাই দেখা যাক, মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ সংঘাত আসলে স্থানীয় যুদ্ধ নয়; এগুলো বৃহত্তর ভূ-রাজনৈতিক গেমের অংশ। মধ্যেপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত ও যুদ্ধগুলো মূলত প্রক্সি যুদ্ধ, যেখানে স্থানীয়রা রক্ত ঝরাচ্ছে, মূল্য দিচ্ছে; বৃহৎ শক্তিগুলো নিজেদের স্বার্থ রক্ষা করছে।
মধ্যেপ্রাচ্যে পরাশক্তির ভূমিকার পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ সংকট হলো গণতন্ত্রের ঘাটতি। মধ্যপ্রাচ্যের অধিকাংশ দেশে কার্যকর গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠান দুর্বল অথবা অনুপস্থিত। কোথাও রাজতন্ত্র, কোথাও সামরিক আধিপত্য, কোথাও একদলীয় নিয়ন্ত্রণ রাজনৈতিক অংশগ্রহণকে সীমিত করেছে। ফলে জনগণের অসন্তোষ প্রায়ই রাজনৈতিক ব্যবস্থার ভেতরে সমাধানের সুযোগ পায় না। এর ফল হয় বিস্ফোরণ, বিদ্রোহ বা গৃহযুদ্ধ। ২০১১ সালের আরব বসন্ত ছিল মানুষের স্বাধীনতা, মর্যাদা ও জবাবদিহিমূলক শাসনের দাবির বহিঃপ্রকাশ। কিন্তু অধিকাংশ ক্ষেত্রে সেই আন্দোলন গণতান্ত্রিক রূপান্তরের বদলে গৃহযুদ্ধ, দমন-পীড়ন কিংবা রাষ্ট্রীয় অস্থিতিশীলতায় পরিণত হয়েছে। এটি প্রমাণ করে যে কেবল সরকার পরিবর্তন করলেই স্থিতিশীলতা আসে না; শক্তিশালী প্রতিষ্ঠানও প্রয়োজন।
মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠার প্রচেষ্টার কাঙ্ক্ষিত সাফল্য অধরাই রয়ে গেছে। শতবর্ষব্যাপী যুদ্ধও এক সময় শেষ হয়। যুদ্ধ বিরতি কার্যকর হয়েছে আরব- ইসরাইল যুদ্ধ থেকে শুরু করে হালের ইরান- ইসরায়েল-আমেরিকা যুদ্ধেও। কিন্তু দীর্ঘ মেয়াদী বা স্থায়ী শান্তি কী আসবে না মধ্যপ্রাচ্যে? প্রথম আরব- ইসরায়েল যুদ্ধ, সুয়েজ সংকট, ১৯৬৭ সালের ছয় দিনের যুদ্ধ, ১৯৭৩ সালের ইয়োম কাপুর যুদ্ধগুলো জাতিসংঘ ও পরাশক্তিগুলোর তত্ত্বাবধানে বন্ধ হয়। পরবর্তীতের ১৯৭৮ সালের ক্যাম্প ডেভিড চুক্তি, ১৯৯১ সালের মাদ্রিদ সম্মেলন, ১৯৯৩ সালের অসলো চুক্তি, ১৯৯৪ সালের জর্ডান-ইসরায়েল শান্তিচুক্তি, ২০০২ সালের আরব পিস ইনিশিয়েটিভ, ২০০৩ সালের রোডম্যাপ ফর পিস এবং ২০২০ সালের আব্রাহাম অ্যাকর্ডস প্রতিটি উদ্যোগই শান্তির নতুন আশা তৈরি করেছিল। বিশেষ করে ইয়াসির আরাফাত, আইজ্যাক রবিন এবং বিল ক্লিন্টনের সেই ঐতিহাসিক করমর্দন বিশ্বকে বিশ্বাস করিয়েছিল যে দীর্ঘ সংঘাতের অবসান সম্ভব। কিন্তু সেই আশা বাস্তবতায় রূপ নেয়নি।
লেখক: গবেষক, উদ্যোক্তা ও সমাজসেবক

