সোমবার | মার্চ ২ | ২০২৬

 ২১ নভেম্বর শুক্রবার সকাল ১০টা ৩৮ মিনিট। শীতের আমেজ মাখা ছুটির সকাল। হঠাৎ করেই ঢাকাসহ সারা দেশে শক্তিশালী ভূমিকম্পে কেঁপে ওঠে। রিখটার স্কেলে এর মাত্র ছিল ৫.৭। ভূমিকম্পের উৎপত্তিস্থল ছিল নরসিংদীর মাধবদীতে। ভূপৃষ্ঠ থেকে ১০ কিলোমিটার অভ্যন্তরে ভুমিকম্প সংগঠিত হওয়ার খবর দেয আবহাওয়া অধিদপ্তর। ঢাকাসহ সারাদেশের মানুষ আতংকিত হয়ে পড়ে। ভবনগুলো কেঁপে ওঠে। ভিতরে থাকা আসবাবপত্র পড়ে ভেঙ্গে যায়। আতংকিত মানুষজন রাস্তায় বেরিয়ে আসে। শত শত ভবনে ফাঁটল দেখা দেয়। স্মরণকালের ভয়াবহ ভূমিকম্পে অসংখ্য ভবন হেলে পড়ে। রাজধানীর পুরান ঢাকার বংশালের কসাইটুলিতে দেয়াল চাপায় ৩ পথচারীর মৃত্যু আমাদের নাঁড়া দিয়ে যায়। নারায়নগঞ্জেও একজন দেয়াল ধ্বসে মারা যান। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত নিহত ০৩ ও আহত অন্তত ৫৫ জন। একটু ভেবে দেখলে উচ্চ ভূমিকম্পের পর প্রাণহানী ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমান অনুমান করতে খুব বেশি সময় লাগবে না। কার্যত ২১ নভেম্বরের ভূমিকম্প ও ক্ষয়ক্ষতি আমাদের বার্তা দিয়ে গেলো প্রস্তুত হওয়ার। এখন প্রশ্ন হচ্ছে আমরা কি প্রস্তুত?

বছরের বিভিন্ন সময়ে বন্যা, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস আমাদের জীবনে আঘাত হানে এবং আমরা এসব দুর্যোগকে দেশের পরিচয়ের অংশ হিসেবেই মেনে নিয়েছি। কিন্তু এমন একটি দুর্যোগ রয়েছে, যা অনেক বেশি নীরব, অপ্রত্যাশিত, এবং মুহূর্তের মধ্যে একটি জনপদকে ধ্বংসস্তূপে পরিণত করতে সক্ষম। সেই দুর্যোগ হলো—ভূমিকম্প।
ভূমিকম্পের একটি বড় বৈশিষ্ট্য হলো—এটি কোনো পূর্বাভাস দেয় না। তাই সচেতনতা, প্রস্তুতি ও সঠিক পরিকল্পনা ছাড়া এর ধাক্কা সামাল দেওয়া প্রায় অসম্ভব। আধুনিক পৃথিবীতে যেসব দেশে বড় বড় ভূমিকম্প হয়েছে—তাদের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে দিয়েছে, প্রাণহানির প্রধান কারণ হলো ভবন ধস, আগুন, যোগাযোগ বিচ্ছিন্নতা ও প্রস্তুতির ঘাটতি। বাংলাদেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে এসব ঝুঁকির প্রতিটিই অত্যন্ত তীব্র।

বিমেষজ্ঞতের মতে, বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় ভূকম্পন উৎসের খুব কাছে অবস্থিত।

প্রথমত, ডাউকি ফল্ট, যা সিলেট ও ভারতের মেঘালয় মালভূমির সীমানায় অবস্থিত। এর নড়াচড়া বৃহৎ ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে। দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম-ট্রিপুরা টেকটনিক জোন, যা চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জন্য বড় ঝুঁকি। তৃতীয়ত, মধ্যমণিপুর ফল্ট, যা বাংলাদেশের পূর্ব দিকের ভূ-চাপের কাজকে বাড়িয়ে দিলেও আমাদের ভূমিকম্প ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে।

বিশ্বের ভূমিকম্প মানচিত্রে বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন—এই অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা ৭ থেকে ৮ মাত্রার ওপরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন ভূমিকম্প হলে জনবহুল শহরগুলো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে।

বাংলাদেশের ভূমিকম্প ঝুঁকির সবচেয়ে বড় কেন্দ্রবিন্দু হলো ঢাকা। বিশ্বের সবচেয়ে ঘনবসতিপূর্ণ রাজধানীগুলোর মধ্যে ঢাকা অন্যতম।

অপরিকল্পিত রাস্তা,গ্যাস, বিদ্যুৎ ও পানির লাইনগুলোতে অনিয়ম।
খোলা জায়গার ঘাটতি,অডিট না করেই নির্মিত বহুতল ভবন নির্মাণ। এসব মিলিয়ে বড় মাত্রার ভূমিকম্পে ঢাকার ক্ষতি কল্পনার বাইরে হতে পারে। অনেক বিশেষজ্ঞ বলেন—ঢাকায় একটি বড় ভূমিকম্প হলে উদ্ধারকাজে অন্তত ৭২ ঘণ্টা প্রয়োজন হবে, যা জীবন-মৃত্যুর ব্যবধান তৈরি করতে পারে।

ঢাকার বাইরে চট্টগ্রাম, সিলেট, রংপুর, ময়মনসিংহ, এমনকি ছোট জেলা শহরগুলোতেও বহুতল ভবন নির্মাণের ধুম উঠেছে। কিন্তু বাস্তবতা হলো, সব ভবন বিল্ডিং কোড অনুযায়ী নির্মিত হয় না। অনেক ভবনে রড কম দেওয়া হয়। নিম্নমানের কংক্রিট ব্যবহার করা হয়। সঠিক নকশা বা অনুমোদন থাকে না।

উদাহরন হিসেবে রানা প্লাজা ধস শুধু একটি দুর্ঘটনা ছিল না; এটি ছিল আমাদের নির্মাণ বাস্তবতার নির্মম প্রতিচ্ছবি। ভূমিকম্প হলে এমন পরিস্থিতি হাজার গুণ ভয়াবহ হতে পারে।

বলা হয়ে থাকে, ভূমিকম্প মানুষকে হত্যা করে না, ভবন ধসে মানুষ মারা যায়। বাংলাদেশে এ কথাটি বহু গুণ সত্য। এখনো পর্যন্ত আমাদের দেশে ভূমিকম্প নিয়ে সাধারণ মানুষের জ্ঞান সীমিত। গ্রামের অনেকের মধ্যে বহু বছরের মিথ ও কুসংস্কার বাসা বেঁধে আছে এখনো।

ভূমিকম্পের সময় কোথায় আশ্রয় নিতে হবে।কিভাবে দ্রুত বের হতে হবে। কীভাবে আত্মরক্ষা করতে হবে। অফিস, স্কুল, শপিংমল বা উচ্চ ভবনে ভূমিকম্প মহড়া হয় না। জরুরি সিঁড়ি অনেক জায়গায় বন্ধ বা দখল হয়ে থাকে। আগুন নেভানোর সরঞ্জাম থাকলেও তা অচল বা অপ্রশিক্ষিত হাতে। এগুলো বড় ধরনের বিপদকে আমন্ত্রণ জানাতে পারে।

একটি বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে হাজার হাজার ভবন ধসে পড়তে পারে। গ্যাস লাইন বিস্ফোরণ হতে পারে। রাস্তায় যানবাহন চলাচল বন্ধ হতে পারে। হাসপাতাল ও উদ্ধারকাজ বাঁধাগ্রস্ত হতে পারে।
বিদ্যুৎ, পানি ও টেলিযোগাযোগ ব্যবস্থা অচল হয়ে যেতে পারে। আগুন ছড়িয়ে যেতে পারে।
সবচেয়ে বিপজ্জনক বিষয় হলো ঢাকার জনসংখ্যা ঘনত্ব, যা উদ্ধারকে প্রায় অসম্ভব করে তুলতে পারে। ভবন নির্মাণে আইন কঠোরভাবে প্রয়োগই পারে ভূমিকম্পের সম্ভাব্য ক্ষক্ষতির পরিমান কমাতে।

বাংলাদেশে বিল্ডিং কোড আছে, কিন্তু প্রয়োগ দুর্বল। এই কোড কঠোরভাবে প্রয়োগ না করলে কোনো প্রস্তুতিই কার্যকর হবে না।
নিয়মিত ভবন পরিদর্শন, অবৈধ নির্মাণ বন্ধ, ঝুঁকিপূর্ণ ভবন সনাক্তকরণ। পুরনো ভবন রেট্রোফিটিং। সরকারকে অনুমোদন ব্যবস্থা শক্তিশালী করাসহ এসব বিষয়ে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।

ঢাকার মতো শহরে খোলা মাঠ, পার্ক, বিদ্যালয়—এসব জায়গাকে ভূমিকম্প-পরবর্তী আশ্রয়স্থল হিসেবে পরিকল্পনায় রাখতে হবে।
শহরকে এমনভাবে সাজাতে হবে, যাতে, ফায়ার সার্ভিসের গাড়ি সহজে চলাচল করতে পারে। প্রশস্ত রাস্তা থাকে,ভবনের ভিড় কমানো যায়। পুরনো এলাকা পুনর্গঠন করা যায়।

ভূমিকম্পের পরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো দ্রুত উদ্ধার তৎপরতা। এজন্য, আধুনিক যন্ত্রপাতি, বিশেষ প্রশিক্ষণ, স্বেচ্ছাসেবক দল, পর্যাপ্ত অ্যাম্বুলেন্স ও চিকিৎসা কেন্দ্র
অপরিহার্য। অনেক দেশ ভূমিকম্পে সফলভাবে ক্ষতি কমাতে পেরেছে শুধু দ্রুত উদ্ধার ও নিখুঁত প্রস্তুতির কারনে।

ছাত্রছাত্রী, শিক্ষক, কর্মচারী, শ্রমিক—সবাইকে ভূমিকম্পে কী করতে হবে তা জানতে হবে। এজন্য নিয়মিত মহড়া অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

ভূমিকম্পকালীন ব্যক্তিগত ও পারিবারিকভাবে একটি জরুরি ব্যাগ রাখা, টর্চলাইট, ওষুধ, পানি, শুকনো খাবার রাখা, গুরুত্বপূর্ণ নথি নিরাপদ স্থানে রাখা, পরিবারের সদস্যদের নিরাপদ স্থানের ধারণা দেওয়া, গ্যাস অ্যাপ্লাই্যান্স নিরাপদ রাখা।
ব্যক্তিগত প্রস্তুতি যত বেশি হবে, ততই আমরা বিপদকে মোকাবেলা করতে পারব।

বাস্তবতা হল ভূমিকম্প আমরা থামাতে পারব না। এটির পূর্বাভাসও দিতে পারব না। কিন্তু ক্ষয়ক্ষতি কমাতে পারব যদি পরিকল্পনা, সতর্কতা, এবং দায়িত্বশীলতা থাকে।
বাংলাদেশ একটি দ্রুত উন্নয়নশীল দেশ। নতুন নতুন ভবন উঠছে, শহর ঘন হচ্ছে, জনসংখ্যা বাড়ছে এই বাস্তবতায় ভূমিকম্পের ঝুঁকি আরও বেড়েছে। তাই এখনই প্রয়োজন বিজ্ঞানসম্মত প্রস্তুতি ও কঠোর বাস্তব ব্যবস্থা।

ভূমিকম্পের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন নয় কিন্তু দেরি করলে তা অসম্ভব হয়ে যাবে। প্রশ্ন শুধু একটাই আমরা কি প্রস্তুত? নাকি একটি বড় দুর্যোগের পর জেগে উঠে আবার নতুন করে ভাববো? যেমনটা বড় বড় দূর্ঘটনার পর আমরা সম্স্বরে জেগে উঠি।

লেখকঃ গণমাধ্যম কর্মী ও কলামিষ্ট

বর্ডার নোটঃ

[বাংলাদেশ তিনটি সক্রিয় ভূকম্পন উৎসের খুব কাছে অবস্থিত।
প্রথমত, দাউকি ফল্ট, যা সিলেট ও ভারতের মেঘালয় মালভূমির সীমানায় অবস্থিত। এর নড়াচড়া বৃহৎ ভূমিকম্পের উৎস হতে পারে।
দ্বিতীয়ত, চট্টগ্রাম-ট্রিপুরা টেকটনিক জোন, যা চট্টগ্রাম অঞ্চল থেকে মিয়ানমার সীমান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত। এটি বাংলাদেশের দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের জন্য বড় ঝুঁকি।
তৃতীয়ত, মধ্যমণিপুর ফল্ট, যা বাংলাদেশের পূর্ব দিকের ভূ-চাপের কাজকে বাড়িয়ে দিলেও আমাদের ভূমিকম্প ঝুঁকিকে আরও তীব্র করে।

বিশ্বের ভূমিকম্প মানচিত্রে বাংলাদেশকে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চল হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিজ্ঞানীরা বহুদিন ধরে সতর্ক করে আসছেন—এই অঞ্চলে বড় মাত্রার ভূমিকম্প হলে তা ৭ থেকে ৮ মাত্রার ওপরে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এমন ভূমিকম্প হলে জনবহুল শহরগুলো ভয়াবহ বিপর্যয়ের মুখে পড়তে পারে]

Share.
Exit mobile version