লক্ষ্মীপুর জেলার চারটি সংসদীয় আসনে এবারের নির্বাচন দলীয় দ্বন্দ্বের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে ভোটার পুনর্বিন্যাসের পরীক্ষা। আওয়ামী লীগ মাঠে সরাসরি অনুপস্থিত থাকায় তাদের ঐতিহ্যগত ভোট একটি ফ্লোটিং ব্লক হিসেবে ঘুরছে। এই ব্লক কোথায় যাবে-বিএনপির দিকে, জামায়াতের দিকে, নাকি ভোটকেন্দ্রেই যাবে না; এই প্রশ্নের উত্তরই ফল নির্ধারণ করবে। ইউনিয়নভিত্তিক ভোটের অঙ্ক দেখলেই স্পষ্ট হয়, কোথায় বিএনপি এগিয়ে, কোথায় জামায়াত কাটছে, আর কোথায় আওয়ামী ভোটই সুইং ফ্যাক্টর।
লক্ষ্মীপুরু-১ (রামগঞ্জ) আসনে কাঞ্চনপুর ও ইছাপুর ইউনিয়নে বিএনপির সংগঠিত ভোট সবচেয়ে দৃশ্যমান। বিশ্লেষণ অনুযায়ী এই দুই ইউনিয়নে মোট ভোটের প্রায় ৪৫-৫০ শতাংশ বিএনপির ঘরে যেতে পারে, যেখানে আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যগত ভোট ২২-২৪ শতাংশ এবং জামায়াতের নিজস্ব ভোট ১২-১৫ শতাংশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। রামগঞ্জ পৌরসভায় বিএনপির ভোট শেয়ার আরও উঁচু-প্রায় ৫০ শতাংশের কাছাকাছি। কারণ তরুণ ও মধ্যবিত্ত ভোটাররা এখানে বেশি সক্রিয়। ভাদুর ও নোয়াগাঁও ইউনিয়নে চিত্র ভিন্ন; এখানে বিএনপি ৪০-৪৩ শতাংশে নামতে পারে, আওয়ামী ভোট ২৫ শতাংশের কাছাকাছি থাকে এবং জামায়াত ১৫-১৮ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। অর্থাৎ এই দুই ইউনিয়নেই জামায়াত মূলত আওয়ামী ভোটের একটি অংশ কেটে নিচ্ছে, বিএনপিকে সরাসরি ছাপিয়ে যাওয়ার মতো শক্তিতে নেই।
লক্ষ্মীপুরু-২ (রায়পুর ও সদর আংশিক) আসনে ইউনিয়নভিত্তিক চিত্র আরও স্পষ্টভাবে বিএনপির অনুকূলে। রায়পুর পৌরসভা ও চরবংশী ইউনিয়নে বিএনপি ৫০-৫৫ শতাংশ পর্যন্ত ভোট টানতে সক্ষম, আওয়ামী ভোট এখানে ২০-২২ শতাংশ এবং জামায়াত ১৫ শতাংশের নিচে। উত্তর হামছাদী ও দালাল বাজার ইউনিয়নে বিএনপির ভোট ৪৭-৫০ শতাংশে থাকে, আওয়ামী ভোট ২৩-২৫ শতাংশ এবং জামায়াত ১৫-১৭ শতাংশ। তবে শাকচর, টুমচর ও চর রমণীমোহনের মতো ইউনিয়নে বিএনপির ভোট ৪২-৪৫ শতাংশে নেমে আসে, আওয়ামী ভোট ২৪-২৬ শতাংশে স্থির থাকে এবং জামায়াত ১৮-২০ শতাংশ পর্যন্ত উঠতে পারে। এই অঙ্ক বলছে এই আসনে জামায়াত মূলত আওয়ামী ভোটের সর্বোচ্চ এক-তৃতীয়াংশের মতো টানতে পারলেও, বিএনপির লিড ভাঙার মতো শক্ত অবস্থানে নেই।
লক্ষ্মীপুরু-৩ (সদর) আসনে ইউনিয়ন ভিত্তিক ব্যবধান সবচেয়ে বড়। লক্ষ্মীপুর পৌরসভা ও ভবানীগঞ্জ ইউনিয়নে বিএনপি ৫৫-৬০ শতাংশ পর্যন্ত ভোট পেতে পারে, আওয়ামী ভোট ২২-২৫ শতাংশ এবং জামায়াত ১০-১২ শতাংশে সীমাবদ্ধ। বাঙ্গাখাঁ, লাহারকান্দি, তেওয়ারীগঞ্জ ও দত্তপাড়া ইউনিয়নে বিএনপি ৪৮-৫২ শতাংশ, আওয়ামী ভোট ২৪-২৬ শতাংশ এবং জামায়াত ১২-১৫ শতাংশের মধ্যে থাকে। সদর এলাকার শহুরে চরিত্রের কারণে আওয়ামী ভোটারদের বড় অংশ জামায়াতমুখী নয়; তারা হয় বিএনপির দিকে ঝুঁকছে, নয়তো নিরপেক্ষ থাকছে। ফলে জামায়াত এখানে আওয়ামী ভোটের সর্বোচ্চ ১৫-২০ শতাংশের বেশি টানতে পারছে না, যা ফল পাল্টানোর জন্য যথেষ্ট নয়।
চিত্র ভিন্ন লক্ষ্মীপুরু-৪ (রামগতি-কমলনগর) আসনে। আলেকজান্ডার ইউনিয়নে বিএনপি ও জামায়াত প্রায় কাছাকাছি অবস্থানে-বিএনপি ৪৫-৪৮ শতাংশ, জামায়াত ২০-২২ শতাংশ এবং আওয়ামী ভোট ১৮-২০ শতাংশ। চর বাদাম, চর পোড়াগাছা ও চর আবদুল্যাহ ইউনিয়নে বিএনপির ভোট ৪০-৪৩ শতাংশে নেমে আসে, জামায়াত ২২-২৫ শতাংশ পর্যন্ত উঠে যায় এবং আওয়ামী ভোট ১৮-২০ শতাংশে থাকে। কমলনগরের কয়েকটি চর ইউনিয়নে জামায়াত আওয়ামী ভোটের প্রায় ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত নিজেদের দিকে টানতে সক্ষম হচ্ছে-যা অন্য তিন আসনের তুলনায় ব্যতিক্রম। এখানেই এই আসনের অনিশ্চয়তা সবচেয়ে বেশি।
এই ইউনিয়নভিত্তিক অঙ্ক একত্রে দেখলে একটি বিষয় পরিস্কার লক্ষ্মীপুর জেলায় কোথাও জামায়াত বিএনপির সমকক্ষ ভোটভিত্তি গড়ে তুলতে পারেনি। তবে তারা সর্বত্র আওয়ামী ভোটের একটি অংশ কেটে নিচ্ছে। অধিকাংশ আসনে সেই অংশ ২০-২৫ শতাংশের বেশি নয়, কিন্তু রামগতি-কমলনগরে তা ৩৫-৪০ শতাংশ পর্যন্ত উঠছে। ফলে বিএনপির জন্য তিনটি আসন তুলনামূলক নিরাপদ হলেও একটি আসন এখনও দোলাচলে।
এই পুরো ভোটের অঙ্কের ভেতরে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনিশ্চিত উপাদান হলো তরুণ ভোটার। চারটি আসন মিলিয়ে মোট ভোটারের প্রায় এক-তৃতীয়াংশ তরুণ (১৮-৩৫ বছর)। ইউনিয়নভিত্তিক মাঠপর্যায়ের পর্যবেক্ষণে দেখা যাচ্ছে, তরুণদের বড় অংশ ঐতিহ্যগত দলীয় রাজনীতিতে আস্থা হারিয়েছে। কর্মসংস্থান সংকট, সামাজিক নিরাপত্তাহীনতা এবং ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তা তাদের ভোট আচরণকে ক্ষুব্ধ ও দোদুল্যমান করে তুলেছে। রামগঞ্জ ও রায়পুরে তরুণ ভোটারের প্রায় ৫৫ু৬০ শতাংশ বিএনপির দিকে ঝুঁকছে, বিশেষ করে যারা পরিবারগতভাবে রাজনৈতিক নিপীড়নের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে গেছে।
সদর আসনে তরুণ ভোট আরও জটিল। এখানে প্রায় ২০ু২৫ শতাংশ তরুণ ভোটার এখনো সিদ্ধান্তহীন। তারা বিএনপির প্রতি সহানুভূতিশীল হলেও সরাসরি দলীয় রাজনীতিতে যুক্ত নয়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সক্রিয় এই তরুণ অংশটি শেষ মুহূর্তে ভোটকেন্দ্রে যাবে কি না, সেটিই ব্যবধান নির্ধারণ করতে পারে। অন্যদিকে রামগতিুকমলনগরে তরুণ ভোটের বড় অংশ ধর্মীয় ও সামাজিক সংগঠনের প্রভাবে জামায়াতের দিকে যাচ্ছে, যা এই আসনে জামায়াতকে তুলনামূলক শক্তিশালী ভ্যারিয়েবল করে তুলেছে।
লক্ষ্মীপুরের এই নির্বাচন তাই কোনো একক ঢেউয়ের ফল নয়। এটি ইউনিয়ন ধরে ভোটার আচরণের যোগফল। শেষ পর্যন্ত ফল নির্ধারিত হবে-আওয়ামী ভোটাররা কতটা ভোটকেন্দ্রে যান, তারা জামায়াতকে কতটা গ্রহণযোগ্য মনে করেন এবং বিএনপি কতটা কার্যকরভাবে এই ভাসমান ভোটকে নিজেদের দিকে টানতে পারে। এই জেলাই হয়তো দেখিয়ে দেবে, বাংলাদেশের রাজনীতিতে ক্ষমতার বাইরে থাকা একটি বড় দলের ভোট কীভাবে নতুন সমীকরণ তৈরি করতে পারে।
লেখক: সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী
সমন্বয়কারী, নবান্ন ফাউন্ডেশন

