মঙ্গলবার | জুন ২ | ২০২৬

বাংলাদেশে নারী নেতৃত্বের বিষয়টি বহুদিনের আলোচিত একটি প্রসঙ্গ। স্বাধীনতার পর থেকে নানা উত্থান-পতনের মধ্য দিয়ে নারীরা দেশের রাজনৈতিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক অঙ্গনে নিজেদের অবস্থান তৈরি করেছেন। বিশেষ করে রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ পর্যায়ে নারীর নেতৃত্ব আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলেও বাংলাদেশের একটি স্বতন্ত্র পরিচিতি তৈরি করেছে। তবে এই অর্জনের পরও একটি মৌলিক প্রশ্ন রয়ে যায় তৃণমূল থেকে কি সত্যিই শক্তিশালী, ধারাবাহিক এবং প্রাতিষ্ঠানিক নারী নেতৃত্ব গড়ে উঠেছে? বাস্তবতা বলছে, এখনো সেই পথ পুরোপুরি সুগম হয়নি।

নারী নেতৃত্বের বিকাশে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা তৈরি হয় সামাজিক ও পারিবারিক মানসিকতায়। বাংলাদেশের সমাজ কাঠামো এখনো অনেকাংশে পিতৃতান্ত্রিক, যেখানে নারীর ভূমিকা প্রধানত ঘরকেন্দ্রিক হিসেবে বিবেচিত হয়। ফলে মেয়েদের ছোটবেলা থেকেই এমনভাবে গড়ে তোলা হয় যাতে তারা নেতৃত্বের পরিবর্তে অনুসরণে অভ্যস্ত হয়ে ওঠে। পরিবার অনেক সময় মেয়েদের বাইরে কাজ করা, মতামত দেওয়া বা জনপরিসরে সক্রিয় হওয়ার ক্ষেত্রে নিরুৎসাহিত করে। রাজনীতির মতো প্রতিযোগিতামূলক ক্ষেত্রে অংশগ্রহণ অনেকে নিরুৎসাহিত করে। এর সঙ্গে যুক্ত হয় নিরাপত্তাহীনতার ভয় যা নারীদের জনজীবনে অংশগ্রহণকে আরও সীমিত করে তোলে।

অর্থনৈতিক সীমাবদ্ধতাও নারী নেতৃত্বের পথে একটি বড় বাধা হিসেবে কাজ করে। একজন নারী যদি আর্থিকভাবে স্বনির্ভর না হন তবে তার পক্ষে নিজের মতামত প্রতিষ্ঠা করা বা নেতৃত্বের জায়গায় দৃঢ়ভাবে দাঁড়ানো কঠিন হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বাস্তবতায় অর্থনৈতিক শক্তি প্রায়ই সামাজিক মর্যাদা ও প্রভাবের সঙ্গে সম্পর্কিত। ফলে যারা অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল তারা নেতৃত্বের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়েন। অনেক সম্ভাবনাময় নারী শুধুমাত্র আর্থিক অসচ্ছলতার কারণে নিজেদের বিকাশের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হন।

রাজনৈতিক কাঠামোর ভেতরেও নারীদের জন্য সমান সুযোগ সবসময় নিশ্চিত হয় না। যদিও সংরক্ষিত আসন বা কোটা ব্যবস্থার মাধ্যমে নারীদের অংশগ্রহণ বাড়ানোর চেষ্টা করা হয়েছে, তবুও অনেক ক্ষেত্রে এই অংশগ্রহণ প্রতীকী পর্যায়েই সীমাবদ্ধ থাকে। সিদ্ধান্ত গ্রহণের গুরুত্বপূর্ণ জায়গাগুলোতে নারীদের উপস্থিতি এখনো তুলনামূলক কম। এর পেছনে কাজ করে দীর্ঘদিনের একটি সামাজিক ধারণা নারীরা নেতৃত্বের জন্য যথেষ্ট উপযুক্ত নন। এই মানসিকতা শুধু পুরুষদের মধ্যেই নয়, অনেক ক্ষেত্রে নারীদের মধ্যেও বিদ্যমান, যা নারী নেতৃত্বের বিকাশকে আরও কঠিন করে তোলে।

তবে এই চিত্র অপরিবর্তনীয় নয়। সঠিক পরিকল্পনা ও সমন্বিত উদ্যোগের মাধ্যমে নারী নেতৃত্বের বিকাশ ত্বরান্বিত করা সম্ভব। সর্বাগ্রে পরিবার থেকেই পরিবর্তনের সূচনা করতে হবে। মেয়েদের শুধু শিক্ষিত করলেই হবে না বরং তাদের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, সিদ্ধান্ত গ্রহণের ক্ষমতা এবং নেতৃত্বের গুণাবলি বিকাশের সুযোগ দিতে হবে। পরিবারকে নারীর স্বাধীনতা ও সক্ষমতাকে সম্মান করতে শিখতে হবে।

এছাড়া নারীদের অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করা অত্যন্ত জরুরি। কর্মসংস্থানের সুযোগ বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণ সুবিধা এবং প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা থাকলে নারীরা নিজেদের দক্ষতা কাজে লাগিয়ে স্বনির্ভর হতে পারবেন। অর্থনৈতিক স্বাধীনতা নারীদের কণ্ঠকে শক্তিশালী করে এবং নেতৃত্বের ক্ষেত্রে তাদের আত্মবিশ্বাস বাড়ায়। চাকরিতে সমান সুযোগ সৃষ্টির পাশাপাশি অনগ্রসর ক্ষেত্রগুলোতে নারীদের জন্য অগ্রাধিকার নিশ্চিত করা প্রয়োজন।

কর্মক্ষেত্র ও রাজনৈতিক অঙ্গনে নিরাপদ ও সহায়ক পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। নারীরা যেন হয়রানি, বৈষম্য বা সহিংসতার ভয় ছাড়াই কাজ করতে পারেন, সে জন্য আইন প্রয়োগের পাশাপাশি সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি প্রয়োজন। একই সঙ্গে রাজনৈতিক দলগুলোকে নারীদের জন্য বাস্তবিক অর্থে অংশগ্রহণের সুযোগ তৈরি করতে হবে, যাতে তারা কেবল প্রতীকী নয়, কার্যকর নেতৃত্ব দিতে পারেন। রাজনৈতিক দলগুলোর নেতৃত্বে ৩৩ শতাংশ নারীর বাধ্যবাধকতা পূরণের বিকল্প নেই। ২০০৮ সালের গণপ্রতিনিধিত্ব আদেশ (RPO) অনুযায়ী নিবন্ধিত দলগুলোর কমিটিতে ৩৩% নারী অন্তর্ভুক্তির বিধান রয়েছে। নির্বাচন কমিশনের আইন অনুযায়ী ২০২০ সালের মধ্যে সব স্তরের কমিটিতে এই লক্ষ্যমাত্রা অর্জনের কথা থাকলেও অধিকাংশ দল তা ব্যর্থ হয়েছে। ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে নারীর মনোনয়ন সংখ্যা ছিল হতাশাজনক।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো নারীদের ক্যারিয়ারের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা। অনেক নারী উচ্চশিক্ষা অর্জনের পর বিয়ে বা মাতৃত্বের কারণে কর্মজীবন থেকে সরে যান। এই বাস্তবতাকে অস্বীকার না করে বরং উপযোগী নীতিমালা গ্রহণ করতে হবে। সরকারি চাকরিতে যেমন মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করা গিয়েছে, বেসরকারি খাতেও মাতৃত্বকালীন ছুটি নিশ্চিত করতে হবে। এছাড়া কর্মক্ষেত্রে শিশুযত্নের সুবিধা/ ডে-কেয়ার সুযোগ নিশ্চিত করা জরুরি। এতে নারীরা তাদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত জীবনের মধ্যে ভারসাম্য বজায় রাখতে পারবেন।

সবশেষে বলা যায়, নেতৃত্ব কোনো তাৎক্ষণিক অর্জন নয়; এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি প্রক্রিয়া। সুযোগ, অভিজ্ঞতা এবং সামাজিক স্বীকৃতির সমন্বয়ে একজন কার্যকর নেতা তৈরি হয়। নারীদের জন্য যদি এই তিনটি উপাদান নিশ্চিত করা যায়, তবে তারা ধীরে ধীরে সব বাধা অতিক্রম করে দেশের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবেন।

বাংলাদেশের টেকসই উন্নয়ন নারীর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়। নারী নেতৃত্ব কোনো বিশেষ সুবিধা নয়, বরং এটি সময়ের দাবি। এখন প্রয়োজন এই বাস্তবতাকে গভীরভাবে উপলব্ধি করে কার্যকর ও অন্তর্ভুক্তিমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করা, যাতে ভবিষ্যতের বাংলাদেশে নারী নেতৃত্ব আর ব্যতিক্রম না থেকে স্বাভাবিক বাস্তবতায় পরিণত হয়।

লেখক: উদ্যোক্তা ও সমাজকর্মী

Share.
Exit mobile version