মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

গত বছরের ১লা আগস্ট, বৃষ্টিভেজা দিনে রাজধানীর ফার্মগেটে দৃশ্যমাধ্যমের শিল্পীদের সমাবেশে অভিনেত্রী আজমেরী হক বাঁধনের সরব উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো। কোটা সংস্কার আন্দোলনকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা ‘জুলাই বিপ্লবে’ সক্রিয় ভূমিকা পালনকারী এই অভিনেত্রী, সেই দিনের গভীর অভিজ্ঞতা নিয়ে সম্প্রতি তার ফেসবুক অ্যাকাউন্টে একটি আবেগঘন পোস্ট লিখেছেন। এক বছর পরেও সেই স্মৃতি তার মনে কতটা জীবন্ত, তা স্পষ্ট ফুটে উঠেছে তার লেখায়।

বৃহস্পতিবার সকালে নিজের ফেসবুক পোস্টে বাঁধন লেখেন, “রাত থেকেই মানসিকভাবে আমি অতিরিক্ত চাপে ছিলাম। তবে একধরনের উত্তেজনাও বোধ করছিলাম, যে কারণে হয়তো সারা রাত ঘুমাতে পারিনি। ভোরে বিছানা থেকে উঠি। স্নিকার্স পায়ে দিই। কারণ, আমি জানতাম না আমার জীবনে আজ কী ঘটতে যাচ্ছে।” এই বাক্যগুলো থেকে স্পষ্ট বোঝা যায়, সেই দিনটির আগে বাঁধন কতটা মানসিক টানাপোড়েনের মধ্যে ছিলেন।

গত বছরের ১লা আগস্টের অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিতে গিয়ে বাঁধন তার পোস্টে উল্লেখ করেন, “আমার একমাত্র মেয়ে সেদিন মা-বাবার সঙ্গে ছিল। তারা তিনজনই জানত না আমি কোথায় যাচ্ছি। আমি তাদের এতটুকুই বলেছিলাম, কিছু মিডিয়ার বন্ধু মিলে একটা ইভেন্টে যাচ্ছি।”

এরপর শঙ্কা নিয়ে বাসা থেকে বেরিয়ে আসার মুহূর্তটিও তিনি তুলে ধরেন। দৃশ্যমাধ্যমের এই আন্দোলনকে জোরালো করতে আগে থেকেই ব্যানার, পোস্টারসহ যাবতীয় সরঞ্জাম প্রস্তুত ছিল। বাঁধন বাসা থেকে বেরিয়ে সরাসরি নিকেতনে চলে যান। সেখান থেকে ঝুঁকি নিয়ে ব্যানার, প্ল্যাকার্ড, মাইক গাড়িতে তোলেন। সেই সময় বিরাজমান কারফিউ এবং সম্ভাব্য পরিস্থিতি সম্পর্কে অনিশ্চয়তার মধ্যেও তিনি সাহসিকতার পরিচয় দেন। “আমার ড্রাইভারকে বলেছিলাম আপনার সঙ্গে মোবাইল আছে, যদি কিছু ঘটে ভিডিও করে রাখবেন। ড্রাইভার ভীতুর মতো আমার দিকে তাকিয়ে ছিল, আমিও ভীত ছিলাম সেই সময়,” লেখেন বাঁধন।

তিনি আরও যোগ করেন, “সেই সময় ক্রমেই তারকা, শিল্পী, কলাকুশলীরাসহ সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মানুষেরা মানিক মিয়া অ্যাভিনিউতে ভিড় করতে থাকেন। সময়টা ছিল সকাল ১১টার মতো। এর মধ্যে বৃষ্টি দেখা দেয়। আমি খামার বাড়ি এলাকায় বাবার গাড়িটি রেখে ফুটপাতে অপেক্ষা করি।” সেখানেই তারা পুলিশের বাধার মুখে পড়েন। পুলিশ তাদের জানায়, প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন কাছে থাকায় কোনো সভা বা প্রতিবাদ করা যাবে না। তখনই রাজীব ভাই, মোমেন ভাই, মামুন ভাইসহ সিনিয়ররা আসেন। পুলিশ কর্মকর্তারা তাদের বোঝানোর চেষ্টা করেন যেন প্রোগ্রাম বাতিল করা হয়। বাঁধন তখন চুপচাপ সব দেখে সামনের দিকে পা বাড়ানো শুরু করেন।

পুলিশের সঙ্গে বাকবিতণ্ডায় জড়িয়ে পড়ার ঘটনাটিও বাঁধন উল্লেখ করেন। পুলিশ বারবার তাদের নিরাপত্তার কথা বলে সরে যেতে বলছিল এবং ভয় দেখাচ্ছিল। বাঁধন লেখেন, “পুলিশ কর্মকর্তারা আমাদের ভয়ও দেখান। কারণ, আমরা সবকিছুকে অবজ্ঞা করে প্রতিবাদে সোচ্চার হতে যাচ্ছিলাম।” কথা কাটাকাটির একপর্যায়ে তারা ফার্মগেট আনন্দ সিনেমা হলের সামনে প্রতিবাদের অনুমতি পান।

কোটা সংস্কার আন্দোলনে “সরকারের কঠোর দমনপ্রক্রিয়া ও গুলিতে ছাত্র-জনতা হত্যার” প্রতিবাদে অংশ নেওয়ার সেই অভিজ্ঞতার প্রসঙ্গে বাঁধন লেখেন, “তারা চেষ্টা করেছিল মামুন ভাইকে গাড়িতে করে নিয়ে যেতে। কিন্তু লিমা আপা, রাজীব ভাই সবাই মিলে আমরা হেঁটে ফার্মগেট চলে আসি। পুলিশ আমাদের ওপর খুশি ছিল না। পরে বৃষ্টির মধ্যে ব্যানার নিয়ে আমরা রাস্তায় দাঁড়িয়ে যাই। আমি শিক্ষার্থীদের ন্যায়বিচারের সঙ্গে ঐকমত্য পোষণ করি। এটা ছিল আমার জীবনের সেরা পাওয়ারফুল মোমেন্টস। আমি কখনোই দিনটির কথা ভুলব না।”

আজমেরী হক বাঁধনের এই স্মৃতিচারণ কেবল একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা নয়, এটি গত বছরের জুলাই বিপ্লবের সেই উত্তাল দিনের একটি জীবন্ত দলিল, যা দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপটে শিল্পীদের দৃঢ় অবস্থানের কথা মনে করিয়ে দেয়।

Share.
Exit mobile version