মঙ্গলবার | জুন ২ | ২০২৬

মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধনীতি, দেশে দেশে রেজিম চেঞ্জের কৌশল, ক্ষণে ক্ষণে শুল্ক যুদ্ধের ঘোষণা, এমনকি বিচারের নামে একটি স্বাধীন দেশের সরকার প্রধানের অপহরণ সব মিলিয়ে এক অস্থির সময় পার করছে বিশ্ব।

ঠিক এমন সময়, মার্কিন প্রশাসনের ক্ষমতার কেন্দ্রে থাকা আলোচিত-সমালোচিত রাজনীতিক, একসময় প্রবল প্রতিপক্ষ ডেমোক্র্যাটদের অন্যতম কণ্ঠস্বর, পরে রিপাবলিকান মিত্র তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগের ঘোষণাটি যতোটা আলোড়ন তোলার কথা তা ঠিক হলো না। অন্দরমহলে নীতিগত বিরোধের কথা বাজারে চালু ছিল বেশ কিছুদিন ধরেই। আর ডোনাল্ড ট্রাম্প যে ধরনের নিখাদ আনুগত্য চান তাতে তুলসি কতদিন টিকতে পারবেন ট্রাম্প প্রশাসনে সে প্রশ্নও সংশয়বাদিরা করে আসছিলেন নিয়োগের শুরু থেকেই। শেষ পর্যন্ত তাদের আশংকাই সত্য হলো। ‘স্বামীর অসুস্থতার’ সৌজন্য মোড়ানো অজুহাতে তিনি পদত্যাগ করলেন।

তুলসি গ্যাবার্ডের এই পদত্যাগ শুধু যুক্তরাষ্ট্রের একজন উচ্চপদস্থ কর্মকর্তার দায়িত্ব ছাড়ার ঘটনা নয়; এটি মার্কিন প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ দ্বন্দ্ব, পররাষ্ট্রনীতি এবং ক্ষমতার রাজনীতির একটি বড় প্রতিফলন। একসময় ডেমোক্র্যাটিক পার্টির জনপ্রিয় মুখ হিসেবে পরিচিত গ্যাবার্ড পরে দলীয় অবস্থান থেকে সরে এসে ডোনাল্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্রে পরিণত হন এবং শেষ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের জাতীয় গোয়েন্দা বিভাগের প্রধানের দায়িত্ব পান। কিন্তু তার পুরো রাজনৈতিক যাত্রাই ছিল বিতর্কে ঘেরা, বিশেষ করে রাশিয়া, সিরিয়া এবং মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপ নিয়ে তার অবস্থানের কারণে।

তুলসী গ্যাবার্ড

আনুষ্ঠানিকভাবে গ্যাবার্ড জানিয়েছেন, তার স্বামী আব্রাহাম উইলিয়াম এর বিরল ধরনের হাড়ের ক্যান্সার ধরা পড়ায় তিনি পরিবারকে সময় দিতে দায়িত্ব ছেড়েছেন। কিন্তু মার্কিন সংবাদমাধ্যম ও প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ সূত্রগুলো ভিন্ন ইঙ্গিত দিচ্ছে। জবঁঃবৎং–সহ একাধিক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে তার অবস্থান ক্রমশ দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং শেষ পর্যন্ত তাকে কার্যত পদত্যাগে বাধ্য করা হয়। বিশেষ করে ইরান, রাশিয়া ও ইউক্রেন ইস্যুতে তার অবস্থান হোয়াইট হাউসের কট্টর নিরাপত্তা নীতির সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ ছিল না।

তুলসি গ্যাবার্ড নিজেকে বরাবরই যুদ্ধবিরোধী রাজনীতিক হিসেবে তুলে ধরেছেন। ইরাক যুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে তিনি বিশ্বাস করতে শুরু করেন যে, বিদেশে যুক্তরাষ্ট্রের তথাকথিত “ৎবমরসব পযধহমব ধিৎং” বা সরকার পরিবর্তনের যুদ্ধ মধ্যপ্রাচ্য ও বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে আরও অস্থিতিশীলতা তৈরি করেছে। আফগানিস্তান, ইরাক, লিবিয়া কিংবা সিরিয়ায় মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের সমালোচনা করে তিনি বারবার বলেছেন, এসব যুদ্ধ গণতন্ত্রের চেয়ে বেশি ধ্বংস ও মানবিক সংকট সৃষ্টি করেছে। মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপে দীর্ঘস্থায়ী অস্থিতিশীলতা, জঙ্গিবাদ এবং মানবিক বিপর্যয় তৈরি করেছে। সিরিয়া প্রসঙ্গে তিনি বহুবার বলেছেন, যুক্তরাষ্ট্র “সন্ত্রাসবাদ দমনের” নামে আসলে সরকার পরিবর্তনের রাজনীতি করেছে।

কিন্তু তার এই অবস্থান বড় বিতর্কের জন্ম দেয় ২০১৭ সালে, যখন তিনি সিরিয়ায় গিয়ে প্রেসিডেন্ট বাসার-আল-আসাদ এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। পশ্চিমা বিশ্বে আসাদ তখন যুদ্ধাপরাধ ও দমন-পীড়নের প্রতীক হিসেবে বিবেচিত। সমালোচকদের অভিযোগ ছিল, গ্যাবার্ড সেই সাক্ষাতের মাধ্যমে এক ধরনের বৈধতা দিয়েছেন সিরিয়ার শাসকগোষ্ঠীকে। গ্যাবার্ড অবশ্য দাবি করেন, শান্তি প্রতিষ্ঠা করতে হলে বাস্তব ক্ষমতাধরদের সঙ্গে সংলাপ জরুরি। কিন্তু তার বিরোধীরা মনে করেন, এই অবস্থান আসলে সিরিয়া ও রাশিয়ার রাজনৈতিক বয়ানকে শক্তিশালী করেছে।

রাশিয়া প্রসঙ্গেও একই ধরনের সমালোচনা তৈরি হয়। ইউক্রেন যুদ্ধের সময় গ্যাবার্ড ন্যাটো সম্প্রসারণ এবং পশ্চিমা নীতিকে সংঘাতের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেন। তার কিছু বক্তব্য রুশ প্রচারণার সঙ্গে মিলে যায় বলে অভিযোগ ওঠে। মার্কিন রাজনৈতিক মহলের একাংশ মনে করে, তিনি অনিচ্ছাকৃতভাবেও ক্রেমলিনের কৌশলগত বক্তব্যকে স্বাভাবিক করে তুলেছিলেন।

যদিও গ্যাবার্ডের সমর্থকেরা একে ভিন্নভাবে দেখেন। সমর্থকেরা বলেন, গ্যাবার্ড আসলে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের যুদ্ধকেন্দ্রিক পররাষ্ট্রনীতির বিরুদ্ধে সাহসী প্রশ্ন তুলেছিলেন। তাদের মতে, যুক্তরাষ্ট্রে দীর্ঘদিন ধরে যুদ্ধপন্থী ঐকমত্য গড়ে উঠেছে, যেখানে সামরিক হস্তক্ষেপকে সহজ সমাধান হিসেবে তুলে ধরা হয়। গ্যাবার্ড সেই ধারার বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে প্রশ্ন তুলেছেন-কেন আমেরিকা বারবার বিদেশে যুদ্ধ করবে, এবং কেন সেই যুদ্ধের মানবিক মূল্য নিয়ে খুব কম আলোচনা হয়? এই দৃষ্টিকোণ থেকে তিনি একধরনের অ-হস্তক্ষেপবাদী রাজনীতির প্রতিনিধিত্ব করেন।

এই অবস্থানগুলোই শেষ পর্যন্ত তাকে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে একটি জটিল অবস্থানে নিয়ে যায়। একদিকে তিনি ছিলেন ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ মিত্র, অন্যদিকে সব ইস্যুতে প্রশাসনের কট্টর অবস্থানের সঙ্গে একমত ছিলেন না। বিশেষ করে ইরান নীতি ও গোয়েন্দা মূল্যায়ন নিয়ে মতপার্থক্য তাকে প্রশাসনের শক্তিশালী অংশের সঙ্গে দ্বন্দ্বে ফেলে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ধীরে ধীরে তাকে গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা আলোচনার বাইরে রাখা শুরু হয় এবং প্রশাসনের ভেতরে তার প্রভাব কমে যেতে থাকে। প্রতিবেদনগুলোতে বলা হয়েছে, গত কয়েক মাসে ট্রাম্প প্রশাসনের সঙ্গে গ্যাবার্ডের সম্পর্ক দৃশ্যত খারাপ হচ্ছিল। বিশেষ করে ইরান ইস্যুতে তার গোয়েন্দা মূল্যায়ন এবং প্রশাসনের আক্রমণাত্মক অবস্থানের মধ্যে মতবিরোধ তৈরি হয়েছিল। হোয়াইট হাউসের কিছু কর্মকর্তা মনে করতেন, গ্যাবার্ড “অতিরিক্ত স্বাধীন” অবস্থান নিচ্ছেন এবং প্রশাসনের রাজনৈতিক বার্তার সঙ্গে পুরোপুরি তাল মিলিয়ে চলছেন না।

আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, ট্রাম্প প্রশাসনে ব্যক্তিগত আনুগত্যের প্রশ্ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাবার্ড ট্রাম্পের ঘনিষ্ঠ হলেও সব ইস্যুতে নিঃশর্ত সমর্থন দেননি। ফলে প্রশাসনের অনেকেই তাকে পুরোপুরি “বিশ্বস্ত” মনে করতেন না। বিশেষ করে সিআইএ ও জাতীয় নিরাপত্তা মহলের সঙ্গে তার টানাপোড়েনও ছিল বলে বিভিন্ন প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
তার পদত্যাগ মার্কিন প্রশাসনের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব ফেলতে পারে। ডিএনআই পদটি যুক্তরাষ্ট্রের ১৮টি গোয়েন্দা সংস্থার সমন্বয়কারী হিসেবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। গ্যাবার্ড এই কাঠামোয় পরিবর্তন আনার চেষ্টা করেছিলেন এবং গোয়েন্দা কার্যক্রমে রাজনৈতিক প্রভাব কমানোর কথা বলেছিলেন। তার বিদায়ের ফলে সেই সংস্কার প্রক্রিয়া থেমে যেতে পারে। একই সঙ্গে ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরে সামরিক হস্তক্ষেপবিরোধী অংশ আরও দুর্বল হয়ে পড়তে পারে এবং আক্রমণাত্মক পররাষ্ট্রনীতির সমর্থকেরা আরও শক্তিশালী হতে পারেন।

আন্তর্জাতিক পর্যায়েও এই পদত্যাগ প্রতীকী গুরুত্ব বহন করে। ইউরোপীয় মিত্ররা এটিকে ট্রাম্প প্রশাসনের আরও কঠোর নিরাপত্তানীতির ইঙ্গিত হিসেবে দেখতে পারে। অন্যদিকে গ্যাবার্ডের সমর্থকদের মতে, তার বিদায় এমন একটি কণ্ঠস্বরের অনুপস্থিতি তৈরি করবে, যে কণ্ঠস্বর মার্কিন সামরিক হস্তক্ষেপের বিরুদ্ধে প্রশ্ন তুলতে সাহস করত।
রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশ মনে করছেন, এটি পুরোপুরি স্বেচ্ছায় দেওয়া পদত্যাগ নয়; আবার সরাসরি বরখাস্তও নয়। বরং ব্যক্তিগত সংকটের সুযোগে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ চাপ তার বিদায়কে ত্বরান্বিত করেছে। একে অনেকে “হবমড়ঃরধঃবফ বীরঃ” বলেও আখ্যা দিচ্ছেন।

এই পদত্যাগ ট্রাম্প প্রশাসনের স্থিতিশীলতা নিয়েও প্রশ্ন তুলছে। সাম্প্রতিক মাসগুলোতে একাধিক উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা প্রশাসন ছেড়েছেন বা অপসারিত হয়েছেন। ফলে বিরোধীরা দাবি করতে পারে যে প্রশাসনের ভেতরে নীতিগত ঐক্য দুর্বল হচ্ছে এবং গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা নীতিগুলো ব্যক্তি-নির্ভর হয়ে পড়ছে।

গ্যাবার্ডের সমর্থকেরা মনে করেন তার বিদায় প্রশাসনের জন্য একটি রাজনৈতিক ক্ষতি। কারণ তিনি ছিলেন যুদ্ধবিরোধী ভোটার, স্বাধীনচেতা রিপাবলিকান এবং কিছু সাবেক ডেমোক্র্যাট ভোটারের কাছে গ্রহণযোগ্য একটি মুখ। ফলে তার অনুপস্থিতি ট্রাম্পের “বিকল্প পররাষ্ট্রনীতি”-র ভাবমূর্তিকেও দুর্বল করতে পারে।

তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগ শুধু একজন কর্মকর্তার বিদায় নয়; এটি ট্রাম্প প্রশাসনের ভেতরের আদর্শিক টানাপোড়েন, গোয়েন্দা কাঠামোর ভবিষ্যৎ এবং যুক্তরাষ্ট্রের বৈদেশিক নীতির দিকনির্দেশনা নিয়ে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে। সব মিলিয়ে, তুলসি গ্যাবার্ডের পদত্যাগ কেবল একজন কর্মকর্তার ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত নয়; এটি যুক্তরাষ্ট্রের বর্তমান রাজনৈতিক বাস্তবতা, প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ ক্ষমতার লড়াই এবং মার্কিন পররাষ্ট্রনীতির গভীর আদর্শিক বিভাজনের প্রতিচ্ছবি। তিনি একদিকে যুদ্ধবিরোধী কণ্ঠ হিসেবে প্রশংসিত হয়েছেন, অন্যদিকে স্বৈরশাসক ও রুশ ভূরাজনৈতিক বক্তব্যের প্রতি সহানুভূতিশীল হওয়ার অভিযোগও শুনেছেন। আর এই দ্বৈত মূল্যায়নই তাকে সমসাময়িক মার্কিন রাজনীতির সবচেয়ে বিতর্কিত ও আলোচিত ব্যক্তিত্বদের একজন করে তুলেছে।

লেখক: গবেষক, উপ-সম্পাদক দৈনিক সংবাদ প্রবাহ।

 

Share.
Exit mobile version