সমগ্র নিউজ ফিড জুড়ে একটি মর্মান্তিক ঘটনা ঘুরে বেড়াচ্ছে। মিরপুরে মৃত্যুর সাতদিন পর এক বৃদ্ধা মায়ের পঁচা গলা লাশ উদ্ধার করেছে পুলিশ। লাশের শরীরের মাংস গলে খসে পড়ে যাচ্ছে শরীর থেকে তবু এতদিনে তার সন্তানরা মায়ের কোন খোঁজ নেয়নি। মৃত্যুর আগে হয়তো একটু পানির জন্য ছটফট করেছে ঐ বৃদ্ধা মা তবুও একটু পানি দেওয়ার কোন আপনজন ছিলো না তার পাশে। হয়তো একটু শেষ কথা বলার জন্য খুঁজেছে নিজের উদরস্থ সন্তানদের কিন্তু কই কোথাও কেউ নেই। সব যেন হারিয়ে গেছে সময়ের জমাটবদ্ধ লোভের ফাঁদে। যে মা একা নিভৃত একটি বদ্ধ ইট পাথরের খাঁচার ভেতর ধুঁকে ধুঁকে বিশ্বাসহীন নিশ্বাস ত্যাগ করেছেন তার সন্তানরা সমাজের কোন সাধারণ সন্তান নয়। তারা সামাজিক ভাবে বড় পদস্থ কর্মকর্তা
সকলের এখন একটাই প্রশ্ন এত বড় বড় পদস্থ কর্মকর্তা সন্তান থাকা স্বত্বেও মায়ের এমন একাকিত্ব সঙ্গীহীন মুমূর্ষু জীবন কেন? কেন মাকে তার সন্তানরা তাদের সাথে না রেখে একা নিস্তব্ধতায় মোড়া পাথরের খাঁচায় বন্দী করে রেখেছিল। কেন মায়ের এমন করুন মৃত্যুযাত্রা?
রাষ্ট্র যেহেতু আমাদের বার্ধক্যের দায়িত্ব নেয়না সেহেতু সন্তান ছাড়া মা বাবার আর পথ কোথায়। বৃদ্ধ মা বাবাদের সন্তান ছাড়া আর উপায়ই বা কী?
এবার আসি মূল প্রসঙ্গে আমরা আসলে আমাদের সমাজকে কেমন সমাজ রূপে নির্মাণ করতে চাই বা কেমন সমাজ রূপে গড়ে তুলতে চাই সেই চাওয়ার উপরেই আমাদের সমাজ তার গতিপথ নির্মাণ করে পরিচালিত হয়, নির্মিত হয়। আমরা যেমন সমাজ মনে মনে প্রত্যাশা করবো বাস্তবিক ভাবে ঠিক তেমন সমাজই আমাদের সম্মুখে দর্পণ রূপে দর্পিত হবে।
সেদিন এক মা তার সন্তানকে বলছে বাবা তোমাকে অনেক বড় হতে হবে। সন্তান তার মাকে পাল্টা প্রশ্ন করছে কত বড় হতে হবে মা। মা বলছে যতখানি বড় হলে তোমার বন্ধু এবং তোমার কাছের যারা আছে তারা যেন তোমাকে দেখে ভয় পায় তোমার সাথে কথা বলতে গেলে দশবার ভেবে কথা বলে। তোমার কাছের যে বন্ধুটা আছে সে যেন তোমাকে আর ছুঁতে না পারে। সন্তান তার মাকে বলছে আমার কাছের যারা আছে তারা যদি আমাকে দেখে ভয় পায় আমাকে ছুঁতেই না পারে তাহলে আমি মিশবো কার সাথে মা। মা বলছে যখন তুমি ঐরকম বড় হয়ে উঠবে তখন তোমার মত এমন আরো বড়দের সাথে তোমার সম্পর্ক তৈরি হবে তখন তুমি তাদের সাথে মিশবে তখন তোমার সার্কেল তোমার বন্ধু হয়ে উঠবে তারা যারা পদ পদবিতে তোমার সমকক্ষ। তখন সন্তান তার মাকে বলছে না মা আমি এমন বড় হতে চাই না যে বড় হওয়া আমাকে আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধুর থেকে আমাকে আলাদা করে দিবে আমাকে একা করে দিবে। এই যে মা ছেলের কথপোকথন এটি আমাদের সমাজের মায়েদের গোপন ইচ্ছের প্রতিফলন। আমাদের সমাজের মায়েরা তার সন্তানদের ভেতর নিভৃতে রোপণ করে স্বার্থপরতার বীজ। মায়েরা তার সন্তানদের তার কাছের বন্ধুর প্রতিদ্বন্দ্বী করে গড়ে তোলে। সন্তানদের একা খেতে শেখায় একা বাঁচতে শেখায় এভাবে সন্তানরা হয়ে উঠে অমানবিক নিষ্ঠুর ও আবেগহীন। অথচ মায়েদের তার সন্তানদের শেখানোর কথা মানবিকতা, শেখানোর কখা ভাগ করে বাঁচার, বন্ধুত্ব ও সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার বোধ প্রতিষ্ঠার বীজ রোপণ করা।
আমাদের সমাজের মা বাবারা তাদের সন্তানদের এতটাই বড় করতে মরিয়া যে সন্তানরা তার কাছের বন্ধু বান্ধবদের ভুলতে ভুলতে নিজের শেকড় ভুলতে ভুলতে অবশেষে তাদের মা বাবাদেরও ভুলে যায়। ভুলে যায় নিজের জীবনের উদ্দেশ্যের কথা ভুলে যায় তার জীবনের মর্মত্বত্ত্বের বেদমন্ত্রের কথা। যাপন করে কেবল আত্মকেন্দ্রিক স্বার্থপর পৈশাচিক জীবন।
লালন মানুষের জীবনের উদ্দেশ্য নিয়ে নানান গানে নানান ভাবে বয়ান করেছেন তাদের জীবন অতিবাহিতের সময়কালের কথা। বলেছেন জীবনের আসল স্বরূপ খুঁজার কথা। নিভৃত বলেছেন সে গূঢ়লিপির মূলমর্মের সারকথা -” সময় গেলে সাধন হবে না ”
বা সহজ মানুষ ভজে দেখ না মন দিব্য জ্ঞানে অথচ মানুষের ভেতরের অন্ধকার কোন ভাবেই দূরীকরণ হচ্ছে না আরো গাঢ় অন্ধকারে নিমজ্জিত হচ্ছে মানুষ আত্মা।
এত বড় বড় পদস্থ সন্তান অথচ মায়ের এমন একাকিত্ব ঘেরা মৃত্যুর কারণ মূলত সন্তানদের শুধুমাত্র পদ পদবিতে বড় হয়ে উঠা। তাদের ভেতর শৈশবে যে মানবিক বীজ রোপিত হওয়ার কথা ছিল সে বীজ রোপিত হওয়ার বদলে রোপিত হয়েছে কেবল বড় চেয়ার দখলের লোভিত বীজ। একজন যুগ্ম সচিব মানে রাষ্ট্রের প্রশাসনিক কাঠামো বিনির্মানের একজন গুরুত্বপূর্ণ কারিগর। যে মানুষের ভেতর মানবিক বোধ সৃষ্টি হয়নি যে মানুষ কেবল একটি চেয়ার ও পদের লোভে তার সমগ্র জীবন বিসর্জন দিয়ে বড় পদ দখলের প্রতিযোগিতা করে গেছেন সে মানুষ দ্বারা একটি সুগন্ধি মানবিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা কতটা প্রহসনের বিষয় খুব অল্পতেই অনুমেয়। এমন রাষ্ট্র পরিচালকদের দিয়ে আমরা কী করবো। এমন বড় বড় পদ পদবিহারীর দ্বারা আমরা কী করবো যদি আমাদের মূল ভিত নষ্ট হয়ে যায়। যদি তাদের ভেতর মানবিক বোধই না থাকে।
আরেক সন্তান বুয়েটের মত একটি প্রতিষ্ঠানের শিক্ষক। যে সন্তান তার মা কোথায় আছে কেমন আছে খোঁজ পর্যন্ত নিতে পারে নি সে সন্তানের কাছ থেকে তার ছাত্ররা কেমন শিক্ষা পাবে কী শিখবে তা ভাবতে বেশি চিন্তা করার প্রয়োজন নেই অল্পতেই সেটা অনুধাবন করা যায়। মানুষের মাঝে এমন বড় বড় শিক্ষদের প্রতি আস্থা বিশ্বাস কীভাবে থাকবে কীভাবে অভিভাবকরা এদের কাছে সন্তানদে শিক্ষা নিতে আগ্রহী হবে। কারণ অভিভাবকরা মনে করছে এদের নিজেদেরই তো সঠিক শিক্ষা নেই নিজেদেরই তো মানবিক বোধ নেই।
আমি তখন ছোট এক সন্তান তার মাকে অবহেলা করতো একদিন ভিসিআরে আম্মাজান চলচ্চিত্রটি দেখার পর আর কখনও সে সন্তান তার মাকে আর অবহেলা করেনি। তার পর থেকে সে তাে মাকে অনেক যত্নে অনেক আদরে তার বার্ধক্য জীবনে সঙ্গ দিয়েছে। একটি চলচ্চিত্র কতটা শক্তিশালী ভাবা যায় যা মানুষের মনকে পাল্টে দিতে পারে। আমার মনে হয় ঐ বড় পদস্থ কর্মকর্তা সন্তানরা আম্মাজান চলচ্চিত্রটি দেখেনি বা চলচ্চিত্রের সাথে তাদের কোন যোগ নেই তারা কেবলই পদের লোভে অন্ধ হয়ে ছুটে চলেছে গভীর অন্ধকারে।
আমাদের বড় বড় পদের আগে মানবিক বোধের উজ্জ্বল আলোর চর্চা করতে হবে। শিশুদের মাঝে মানবিক বোধ প্রতিষ্ঠা করতে হবে না হলে ভবিষ্যতে এমন দৃষ্টান্ত আমাদের জন্য প্রচুর অপেক্ষা করছে।
লেখক: সহ সম্পাদক, দৈনিক সংবাদ প্রবাহ
