মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

বাংলাদেশের অর্থনীতি আবারও স্থিতিশীলতার পথে হাঁটছে। পরিকল্পনা কমিশনের সাধারণ অর্থনীতি বিভাগ (GED) প্রকাশিত সর্বশেষ অর্থনৈতিক প্রতিবেদন অনুসারে ডিজিটাল লেনদেনের দ্রুত প্রসার, রপ্তানি আয়ের ধারাবাহিক বৃদ্ধি, প্রবাসী আয়ের উল্লম্ফন এবং বহির্বিশ্বের খাতসমূহে ইতিবাচক অগ্রগতি মিলিয়ে এক নতুন আস্থার সংকেত দিচ্ছে অর্থনীতি। তবে চালের দামে সামগ্রিক মুদ্রাস্ফীতি প্রভাব পড়েছে।

এক বছরের ব্যবধানে মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসেসে (এমএফএস)  লেনদেন ব্যাপকভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের মার্চ মাসে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে।  তখন লেনদেনের পরিমাণ ১৫.৩৭ লাখ কোটি থেকে ১৭.৮১ লাখ কোটি টাকার মধ্যে ওঠানামা করেছে। উৎসবকেন্দ্রিক কেনাকাটা, বেতন প্রদান ও মার্চেন্ট পেমেন্টে এই প্রবৃদ্ধি চোখে পড়েছে।

একইসঙ্গে ই-কমার্স খাতেও প্রায় ৬৪ শতাংশ প্রবৃদ্ধি হয়েছে; জুলাই ২০২৪-এ যেখানে লেনদেন ছিল ১,৪৪৮ কোটি টাকা, মে ২০২৫-এ তা বেড়ে দাঁড়ায় ২,৩৬৫ কোটি টাকায়।

বিদেশি খাতগুলোতেও আশাব্যঞ্জক পরিবর্তন এসেছে। পাঁচ বছর পর প্রথমবারের মতো ২০২৪-২৫ অর্থবছরে চলতি হিসাবে ১ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত রেকর্ড হয়েছে। সামগ্রিক ভারসাম্যেও ৩.৩ বিলিয়ন ডলারের উদ্বৃত্ত মিলেছে, যা দীর্ঘদিনের ঘাটতির অবসান ঘটিয়েছে।

জুলাই ২০২৫-এ রপ্তানি আয়ের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৪৭৭ কোটি ৫৯ লাখ ডলার, যা গত বছরের একই সময়ের তুলনায় প্রায় ২৫ শতাংশ বেশি। মে ও ডিসেম্বরেও শক্তিশালী প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। অন্যদিকে আমদানিও ধীরে ধীরে পুনরুদ্ধার হচ্ছে, বিশেষত পুঁজিপণ্যের আমদানি স্থিতিশীল থাকায় বিনিয়োগ আগ্রহের ইঙ্গিত মেলে।

২০২৫ সালের জুলাইয়ে প্রবাসী আয় দাঁড়ায় ২.৪৭ বিলিয়ন ডলারে, যা আগের বছরের তুলনায় ২৯.৫ শতাংশ বেশি। মার্চ, মে ও ডিসেম্বরে মৌসুমি প্রবাহ বৃদ্ধির ফলে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। সরকার প্রদত্ত প্রণোদনা ও ট্রান্সফার চ্যানেল উন্নয়নের কারণে এই খাতে প্রবৃদ্ধি আরও জোরদার হয়েছে।

কৃষিঋণ বিতরণ মে ২০২৫-এ পৌঁছে ৩,৬৫৪ কোটি টাকায়, যা গত বছরের তুলনায় বেশি। শিল্প খাতও উত্থান দেখিয়েছে; ২০২৪ সালের অক্টোবর মাসে শিল্পোৎপাদনে বছরওয়ারি প্রবৃদ্ধি ১১.৩৯ শতাংশে পৌঁছায়। যদিও আগস্টে সাময়িক মন্দা এসেছিল, দ্রুতই খাতটি ঘুরে দাঁড়িয়েছে।

মুদ্রাস্ফীতির চ্যালেঞ্জ

অর্থনৈতিক ইতিবাচক ধারা সত্ত্বেও চালের দামের চাপ কমেনি। জুলাই ২০২৫-এ খাদ্য মুদ্রাস্ফীতিতে চালের অবদান দাঁড়ায় ৫১.৫৫ শতাংশে, যেখানে মে মাসে ছিল ৪০ শতাংশ। বিশেষ করে মাঝারি ও মোটা চালের দাম বেশি প্রভাব ফেলেছে। জুলাই মাসে তিন ধরণের চালেই প্রায় ১৫ শতাংশ মুদ্রাস্ফীতি রেকর্ড হয়েছে।

সরকার ১৪ লাখ মেট্রিক টন বোরো চাল সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নিলেও জুলাইয়ে বিতরণ আগের বছরের তুলনায় ৩৬ শতাংশ কম ছিল। বাজার নিয়ন্ত্রণে রাখতে ২৩ জুলাই খাদ্য মন্ত্রণালয় বেসরকারি আমদানির অনুমতি দিলেও এর প্রভাব বাজারে আসতে সময় লাগবে।

২০২৪ সালের আগস্টে অন্তর্বর্তীকালীন সরকার দায়িত্ব নেওয়ার সময় মুদ্রাস্ফীতি দুই অঙ্কে ছিল। এখন তা কমে প্রায় ৮.৫ শতাংশে এসেছে। টানা দ্বিতীয় মাসের মতো সার্বিক মুদ্রাস্ফীতি ৯ শতাংশের নিচে রয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ডিসেম্বর ২০২৫ নাগাদ মুদ্রাস্ফীতি ৭ শতাংশের নিচে নামানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে।

সবজিসহ কিছু খাদ্যপণ্যের দাম কমায় খাদ্য মুদ্রাস্ফীতি কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এসেছে। তবে আবহাওয়ার অনিশ্চয়তা ও চালের বাজার এখনও বড় ঝুঁকি।

জিইডি বলছে, প্রবাসী আয়, রপ্তানি, ডিজিটাল লেনদেন ও বৈদেশিক খাতের সাফল্য মিলিয়ে অর্থনীতিতে নতুন আস্থার সঞ্চার হয়েছে। চ্যালেঞ্জ থাকলেও সমন্বিত নীতিগত পদক্ষেপ, সরবরাহ ব্যবস্থাপনা ও কৃষি ইনপুটের সময়মতো প্রাপ্যতা নিশ্চিত হলে বাংলাদেশ আগামী অর্থবছরে আরও স্থিতিশীল ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনীতির পথে অগ্রসর হতে পারবে।

Share.
Exit mobile version