বাংলাদেশের সশস্ত্র বাহিনী একটি নাম, একটি গৌরব, একটি অবিচল আস্থা। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়েই এই বাহিনীর জন্ম, রক্তে লেখা এক ইতিহাসের সূচনা।
যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ তখন নতুন করে দাঁড়াতে চাচ্ছে, আর সেই রাষ্ট্রের টিকে থাকার জন্য প্রয়োজন ছিল একটি শক্তিশালী প্রতিরক্ষা কাঠামো। এই উপলব্ধি থেকেই শুরু হয় সশস্ত্র বাহিনী গঠনের যাত্রা। স্বাধীনতার পর বঙ্গবন্ধু গভীরভাবে বুঝেছিলেন, একটি নবজাত রাষ্ট্রকে টিকিয়ে রাখতে হলে তার প্রয়োজন একটি শৃঙ্খলাবদ্ধ বাহিনী, যারা দেশের সার্বভৌমত্বরক্ষা করবে এবং যেকোনো সংকটে জাতির পাশে দাঁড়াবে। তখন বঙ্গবন্ধু চিন্তা করলেন, যে জাতি মুক্তিযুদ্ধে লড়াই করতে পারে, সে জাতির মধ্যেই সৈনিকের সাহস, বুদ্ধি ও ত্যাগের রক্ত প্রবাহিত। সেই ভাবনা থেকেই শুরু হলো একটি জাতীয় বাহিনী গড়ে তোলার উদ্যোগ। সীমিতসম্পদ, বিধ্বস্ত অবকাঠামো, বিদেশি চাপ ও অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জ সবকিছুর মাঝেও তিনি বিশ্বাস করেছিলেন, একদিন এই বাহিনী হবে বাংলাদেশের আত্মবিশ্বাসের প্রতীক।
প্রতি বছরের ১০ ডিসেম্বর পালিত হয় ‘সশস্ত্র বাহিনী দিবস‘। যে দিনটি শুধু একটি অনুষ্ঠান নয়, বরং জাতির আত্মপরিচয়ের প্রতীক। এ দিনে আমরা শ্রদ্ধাভরে স্মরণ করি সেইসব বীরসন্তানদের, যারা দেশের মর্যাদা ও স্বাধীনতা রক্ষায় জীবন উৎসর্গ করেছেন। তাদের রক্তে লেখাএই রাষ্ট্র আজ টিকে আছে নিরাপত্তা ও মর্যাদার বর্মে। সামরিক বাহিনী শুধু যুদ্ধের ময়দানে নয়, রাষ্ট্রের প্রতিটি সংকটে তাদের উপস্থিতি দেখিয়েছে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ, ঘূর্ণিঝড়, বন্যা কিংবা ভূমিকম্প; যেখানেই মানুষ বিপদে, সেখানেই দেখা যায় তাদের ছুটে চলা। পাহাড় ধ্বসে পড়লে, জনপদ ডুবে গেলে, সেতু ভেঙে গেলে তাঁরা নির্দ্বিধায় হাত বাড়িয়ে দেয়। তাই এই বাহিনী কেবল বন্দুকধারী যোদ্ধা নয়, তারা মানবতারও প্রহরী।
কিন্তু দুঃখজনক হলো আজকাল কিছু মানুষ অজান্তেই এমন মন্তব্য করে, যা সামরিক বাহিনীর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করে। তারা হয়তো বোঝেন না, দেশের এই প্রতিষ্ঠান নিয়ে কটুক্তি করা মানে নিজেরই ঘরে আগুন লাগানো। সামরিক বাহিনী কোনো দলের নয়, এটি রাষ্ট্রের সম্পদ, জাতির গর্ব। এই বাহিনীকে নিয়ে যদি কেউ বিভেদ সৃষ্টি করে, তবে সেটি শুধু বাহিনীর ক্ষতি নয়, পুরো রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতার ওপর আঘাত। কারণ, সামরিক বাহিনী হচ্ছে সার্বভৌমত্বের প্রতীক, জাতির আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি। তাদের হেয় প্রতিপন্ন করা মানেই নিজের অস্তিত্বকে অপমান করা।
এ কথা সত্য যে, এতো বড় একটি বাহিনীর ভেতরে কিছু খারাপ সদস্য থাকতে পারে।যেমনসমাজের প্রতিটি জায়গাতেই কিছু ব্যতিক্রম থাকে। কেউ যদি অপরাধ করে, সে অবশ্যই আইনের কাঠগড়ায় দাঁড়াবে। কিন্তু একজন বা কয়েকজনের জন্য পুরো বাহিনীকে দোষী করা, পুরো প্রতিষ্ঠানকে প্রশ্নবিদ্ধ করা অন্যায়। কারণ, এই বাহিনীর বৃহত্তর অংশই দেশের প্রতি নিবেদিত, সততা ও শৃঙ্খলার প্রতীক।
আজ বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী শুধু দেশের মাটিতে নয়, বিশ্বের মাটিতেও দেশের নামউজ্জ্বল করছে। জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে বাংলাদেশের সৈনিকেরা এখন বিশ্বে অন্যতমসেরা। তাঁরা শান্তির দূত হিসেবে জীবন বাজি রেখে কাজ করছেন। আফ্রিকা থেকে মধ্যপ্রাচ্যপর্যন্ত বিশ্বের নানা প্রান্তে তারা বাংলাদেশের পতাকা উড়াচ্ছেন গর্বের সঙ্গে। তাঁদের পরিশ্রম, সততা ও মানবিকতার জন্যই বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পেয়েছে গভীর সম্মান।
আমাদের সেনাবাহিনী পাহারা দিচ্ছে দেশের অন্তঃস্থল, নৌবাহিনী রক্ষা করছে সমুদ্র সীমা, আর বিমানবাহিনী পাহারা দিচ্ছে আকাশের সীমানা। এই তিন বাহিনীর সমন্বিত শক্তিইবাংলাদেশের প্রতিরক্ষার মূলভিত্তি। তাদের শক্তি শুধু অস্ত্রে নয়, তাদের নৈতিকতাতেও। তারাজানে, দেশের মানুষই তাদের শক্তি; জনগণের ভালোবাসা ছাড়া বাহিনীর মর্যাদা টিকে না। তাইদেশের প্রতিটি নাগরিকের দায়িত্ব এই বাহিনীর প্রতি শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বজায় রাখা।
এই বাহিনী আমাদের সন্তান, ভাই, বন্ধু ও গর্ব। তারা সেই মানুষ, যারা সীমান্তে দাঁড়িয়ে বা সমুদ্রে ভেসে, রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, ঝড়–তুফানে মোকাবিলা করে কিংবা নিকষ অন্ধকারে পাহারা দেয় আমাদের স্বাধীনতা ও নিরাপত্তা। তাই তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জানানো মানে দেশের প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করা। মনে রাখতে হবে, কোনো বাহিনী তখনই দুর্বল হয়, যখন জনগণ তাদের প্রতি বিশ্বাস হারায়।
বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী আমাদের রাষ্ট্রীয় মর্যাদার প্রতীক। তাদের ওপর বিশ্বাস রাখামানে বাংলাদেশের ভবিষ্যতের ওপর বিশ্বাস রাখা। বিভেদ নয় ঐক্যই পারে এই বাহিনীকে আরও শক্তিশালী করে তুলতে। আমরা চাই, তারা আরও আধুনিক হোক, আরও সক্ষম হোক, প্রযুক্তিতে ও মানসিকতায় আরও উন্নত হোক। কিন্তু সেই উন্নতি হোক ভালোবাসা ও গঠনমূলকচিন্তার মাধ্যমে, কটুক্তি বা অপপ্রচার দিয়ে নয়।
রক্তে লেখা এই রাষ্ট্রের প্রতিটি ইঞ্চি ভূমি যেমন স্বাধীনতার প্রতীক, তেমনি সশস্ত্র বাহিনী সেই স্বাধীনতার প্রহরী। তাঁদের অবদান কোনো শব্দে মাপা যায় না, শুধু শ্রদ্ধায় অনুভব করা যায়। তাই আসুন, আমরা সবাই ঐক্যবদ্ধভাবে বলি বাংলাদেশের সামরিক বাহিনী শুধু দেশের শক্তি নয়, তারা আমাদের গর্ব, আমাদের ভরসা, আমাদের আত্মবিশ্বাসের প্রতিচ্ছবি।
লেখক: কলামিস্ট
