মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

শিক্ষক জাতির পথপ্রদর্শক,  কথা নতুন কিছু নয়। সভ্যতার ইতিহাস ঘাটলেই এটা দেখা যায়যেখানে জ্ঞানচর্চা হয়েছে, সেখানে শিক্ষক সমাজে মর্যাদার আসনে অধিষ্ঠিত হয়েছেন। মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) নিজেকে বলেছেন মুয়াল্লিম বা শিক্ষক। বাদশাহ আলমগীর তাঁর শিক্ষককে সম্মান জানাতে রাজসিংহাসন থেকে নেমে এসে ইতিহাস সৃষ্টি করেছিলেন। এসব দৃষ্টান্ত আমাদের মনে করিয়ে দেয় শিক্ষকতা শুধু একটি পেশা নয়বরং জাতি গঠনের এক মহৎ দায়িত্ব।

আমাদের দেশের বাস্তবতায় এই মর্যাদা মুখের কথাতেই সীমাবদ্ধ থেকে গেছে। সমাজেশিক্ষকদের যথাযথ শ্রদ্ধার চোখে দেখা হয় না।  তাঁদের জীবনযাত্রা প্রায়শই দুঃখকষ্টেনিমজ্জিত। যে শিক্ষক ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে গড়ে তোলেন, তাঁকেই মাস শেষে সংসারের খরচমেলাতে হিমশিম খেতে হয়।

বাংলাদেশের গ্রামেগঞ্জে বা শহরে শিক্ষক মানেই এক শ্রদ্ধাভাজন চরিত্র। বিয়েশাদী, সামাজিক আচারঅনুষ্ঠানে শিক্ষককে আলাদা আসনে বসানো হয়, তাঁর মতামতকে দেওয়াহয় গুরুত্ব। কিন্তু মর্যাদা অনেক সময় কেবল আনুষ্ঠানিকতায় সীমাবদ্ধ থাকে। অনেক শিক্ষক আর্থিক অনিশ্চয়তায় ভোগেন। অনেকে সন্তানকে ভালো স্কুলে পড়াতে পারেন না। চিকিৎসার অভাবে কষ্ট পান অনেক শিক্ষক।  সামাজিক সম্মান তাঁদের দুঃখ দূর করতে কতটা কার্যকর? প্রকৃত বাস্তবতা হলো অর্থের কাজ টাকা দিয়ে হাসিল হয় না। ব্যাগভর্তি বাজারকেবল সম্মান দিয়ে হয় না বরং প্রয়োজন হয় টাকার।

সম্মান কেবল কথায় থাকলে তা ভ্রান্তির জন্ম দেয়। প্রকৃত সম্মান প্রতিফলিত হয় জীবনে, জীবিকায় রাষ্ট্রীয় চেতনায়।

বাংলাদেশের এমপিওভুক্ত শিক্ষকদের মাসিক আয় সরকারিভাবে নির্ধারিত হলেও তা অনেকক্ষেত্রেই পর্যাপ্ত নয়। শিক্ষকরা মাস শেষে ঘরভাড়া, বাজার, সন্তানের পড়ালেখা, চিকিৎসা কোনো কিছুর সাথেই তাল মেলাতে পারেন না। সামান্য বেতনের টাকা দিয়ে একটি পরিবার টিকিয়ে রাখা কার্যত অসম্ভব।

ফলে শিক্ষক বাধ্য হন টিউশনি বা কোচিংয়ের আশ্রয় নিতে। কিন্তু সমাজ তখন আবার তাঁকেইদোষারোপ করে। সমালোচনা করে শিক্ষকরা কোচিং বাণিজ্যে মেতে উঠেছেন। প্রকৃত সত্য হলো জীবনজীবিকার তাগিদেশিক্ষকরা এই পথ বেছে নিতে বাধ্য হন। যেসকল বিষয়ে টিউশনির চাহিদা কম তাদের সে সুযোগটুকুও নাই। ফলে তাদের বেছে নিতে হয় আয়ের ভিন্নকোন উৎস।

বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে আমরা দেখি ভিন্ন এক চিত্র। ফিনল্যান্ডে শিক্ষকতা সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ পেশাগুলির একটি। সেখানে একজন প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকও ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ারের সমান বেতন সুবিধা পান। জাপানে শিক্ষককে বলা হয় জাতির হৃদয়ের প্রকৌশলী। সেখানে সমাজের শীর্ষ পর্যায়ে শিক্ষককে স্থান দেওয়া হয়। 

ইউরোপের শিক্ষকরা গবেষণা বিদেশে প্রশিক্ষণের অধিকহারে সুযোগ পান। তাঁরা অবসরে সম্মানজনক ভাতা পান। ফলত, সেখানে মেধাবীরা গর্ব করে শিক্ষকতা পেশায় আসেন।আমাদের দেশে পরিস্থিতি উল্টোমেধাবীরা শিক্ষকতায় আগ্রহী নন, কারণ এখানে আর্থিক নিরাপত্তা নেই।

শিক্ষকের প্রতি যথাযথ সম্মান না দিলে তা গোটা জাতিকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে। এতে মেধাবীরা বিমুখ হন, যোগ্যরা শিক্ষকতায় আসতে চান না। আর্থিক দুশ্চিন্তায় থাকা শিক্ষক পূর্ণ মনোযোগ দিয়ে পাঠদান করতে পারেন না। ফলে শিক্ষার মান কমে যায়

তাতে সমাজে ভুল ধারণা জন্মায় যে শিক্ষকরা কেবল অর্থকেন্দ্রিক। শিক্ষক যদি দারিদ্র্যেরপ্রতীক হয়ে যান, তবে শিক্ষার্থীরা শিক্ষাকে তেমন মর্যাদা দেয় না।

বাংলাদেশে মানুষ ১৮ কোটি হলেও মানবসম্পদ অপ্রতুল। এই বিশাল জনসংখ্যাকে শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ দিয়ে দক্ষ মানবসম্পদে রূপান্তর করতে হবে। এখানেই গুনগত শিক্ষা ও শিক্ষকের প্রাসঙ্গিকতা। সুন্দর সমাজ ও রাষ্ট্র বিনির্মাণে শিক্ষকদের কথা ভাবতে হবে।

শিক্ষকের মূল্যায়ন

শিক্ষকদের জন্য ন্যায্য বেতন কাঠামো প্রণয়ন করা গুরুত্বপূর্ণ। স্বতন্ত্র বেতন কাঠামোতে একজন শিক্ষক সম্মানের সঙ্গে জীবনযাপন করতে পারবেন। সাথে অবসরকালীন আর্থিক নিরাপত্তা জোরদার করতে হবেযেনো শিক্ষকগণ অবসরে দারিদ্র্যের শিকার না হন। সব স্তরের শিক্ষকদের প্রশিক্ষণ গবেষণা সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে। তাহলে শিক্ষক শুধু পড়াবেননা, জ্ঞান উৎপাদনেও অংশ নিতে পারবেন

শিক্ষকদের যোগ্যতা, দক্ষতা ও অধিকার সম্পর্কে সবার জানা প্রয়োজন। শিক্ষক ছাড়া উন্নত জাতি, সভ্য জাতি তৈরি করা যায় না। এই সত্যটি সমাজ ও রাষ্ট্রকে বিশ্বাস করতে হবে। ভালো শিক্ষক ছাড়া ভালো পেশাজীবী তৈরি হয় না সত্য সর্বত্র পৌঁছে দিতে হবে।

আইনগত সুরক্ষা নিশ্চিত করতে না পারলে সেই পেশায় মেধাবীরা, জ্ঞানীরা  ও যোগ্যরা যেতে চান না। শিক্ষকদের হেয় করার, নিপীড়ন করার বিচ্ছিন্ন ঘটনা কোনো কোনো সময় হলেও সূদূর অতীত থেকে শিক্ষকতা এদেশে অত্যন্ত সম্মানীয় ও শ্রদ্ধার পেশ ছিলো। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে শিক্ষক নিপীড়ন, শিক্ষকদের উপর মব ভায়োলেন্স মহামারী আকার ধারণ করছে। সকল স্তরের শিক্ষকদের সুরক্ষা দিতে না পারলে, এই জায়গা থেকে দেশকে বের করতে না পারলে শিক্ষকরা আরো বেশি বিপন্ন বোধ করবেন। ঝাতি হিসেবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে যেটা কাম্য নয়।

শিক্ষককে আমরা প্রায়শই জাতির কর্ণধার বলিকিন্তু তাঁদের জীবনযাত্রা বেতনভাতা সেইকথার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। সমাজ যদি সত্যিই আলোকিত হতে চায়, তবে শিক্ষকের সম্মান নিশ্চিত করতে হবে কথায় নয় কাজে।

শিক্ষকের সম্মান প্রতিফলিত হোক বেতনে, জীবনে রাষ্ট্রের চেতনায়, এই হোক আমাদেরঅঙ্গীকার। কারণ শিক্ষককে মর্যাদা না দিলে জাতি কখনোই বিশ্বসভায় মাথা উঁচু করে দাঁড়াতেপারবে না।

লেখক: কলামিস্ট, অ্যাডভোকেট ফর পিস। তিনি নিয়মিত শিক্ষা, শিক্ষকতা, মানবাধিকার ও শান্তি বিষয়ে লেখালেখি করছেন।

Share.
Exit mobile version