দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় সরাসরি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে বাংলাদেশ পুলিশ। এই ভূমিকা পালন করতে গিয়ে সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে পুলিশকে অনেক সময় নিজেদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে গিয়ে জনগণের বিপক্ষে দাঁড়াতে হয়। জনগণের সঙ্গে রাষ্ট্রের সম্পর্ক দর কষাকষির। সুতরাং রাষ্ট্র যখন জনগণের দাবি পূরণ করে না বা সময়ের পরিক্রমায় জনগণের কোনো অংশের নতুন দাবির উদ্ভব হলে তারা আন্দোলনে নামে।
বাংলাদেশের অধিকাংশ সরকার এই দাবি-দাওয়া আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে অনাগ্রহী থেকেছে এবং আন্দোলন দমনের চেষ্টা করেছে। এর প্রভাব পড়ে পুলিশের উপর। আমাদের মহান মুক্তিযুদ্ধে যেই পুলিশ বাহিনী দেশের স্বাধীনতা অর্জনে ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠায় পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলে, দেশ স্বাধীন হওয়ার পরে সেই পুলিশ বাহিনীকে অনিচ্ছা থাকা সত্ত্বেও সকল সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে বারংবার জনগণের বিপক্ষে দাঁড়াতে হয়েছে।
যার চূড়ান্ত রূপ আমরা ২০২৪-এর জুলাই-আগস্টের আন্দোলনে লক্ষ করেছি। তৎকালীন সরকার গণ-আন্দোলন দমনে পুলিশকে ব্যবহার করে এবং হতাহতের ঘটনা ঘটে। ফলে অনেক জায়গায় পুলিশ আন্দোলনকারীদের টার্গেটে পরিণত হয় এবং অনেক পুলিশ সদস্য নিহত হন। সহকর্মীদের প্রতি ঘটে যাওয়া বীভৎসতা ও তাদের বিকৃত লাশ দেখে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে এক বোধের আবির্ভাব ঘটে। সে জায়গা থেকে তারা ১১ দফা দাবি তোলে এবং সেটা মেনে নেওয়ার দাবিতে কর্মবিরতি ঘোষণা করে।
বর্তমান সরকার সেই দাবিগুলো মেনে নেওয়ার আশ্বাস দিয়ে বাংলাদেশ পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের কাজে যোগদানের আহ্বান জানালে তারা কাজে যোগ দেয়। কিন্তু সেই দাবি পূরণের আশ্বাসের বাস্তবায়ন কতটুকু হয়? পুলিশ বাহিনীর সদস্যদের উত্থাপিত ১১ দফা দাবি কোথায় হারিয়ে গেল? পুলিশ বাহিনীর দাবিগুলো মূলত পেশাগত ও মানবিক অধিকার সংশ্লিষ্ট ছিল। সেগুলো হলো—
১) বিচারাদেশ: ছাত্র আন্দোলনের সময় পুলিশের ওপর হামলা ও হত্যাকাণ্ডের দায়ীদের দ্রুত শনাক্ত করে বিচার করা।
২) নিহতদের পরিবারকে ক্ষতিপূরণ: নিহত পুলিশ সদস্যদের পরিবারকে এককালীন আর্থিক ক্ষতিপূরণ, আজীবন রেশন পেনশন এবং পরিবারের একজনের সরকারি চাকরি নিশ্চিত করা। আহতদের চিকিৎসা ও গুরুতর আহতদের আর্থিক সহায়তা।
৩) নিয়োগ প্রক্রিয়া বাতিল ও নিয়ন্ত্রণ: সাব-ইন্সপেক্টর ও সার্জেন্ট PSC-এর মাধ্যমে নিয়োগ এবং কনস্টেবল নিয়োগে ১০০% স্বচ্ছতা।
৪) পদোন্নতির জটিলতা নিরসন: পদোন্নতিতে নিয়ম সংজ্ঞায়, IPS-এ ৩০% সরাসরি ও ৭০% পদোন্নতি। সাব-ইন্সপেক্টর থেকে ইন্সপেক্টর পর্যায়ে এবং ইন্সপেক্টর থেকে সহকারী কমিশনার পদে এক বছরের মধ্যে পদোন্নতি। পাস করা কনস্টেবলদের পুনঃপরীক্ষা বাতিল, সিনিয়রিটি অনুযায়ী পদোন্নতি।
৫) অতিরিক্ত সময় ও কর্মঘণ্টা: ৮ ঘণ্টা ডিউটি সীমাবদ্ধ করা, অতিরিক্ত ডিউটির জন্য ওভারটাইম বা বছরের দুই বেসিক সমপরিমাণ অর্থ প্রদান।
৬) ঝুঁকি ভাতা ও টিএ/ডিএ বিল: ঝুঁকি ভাতা বৃদ্ধি, টিএ–ডিএ বিল প্রতি মাসের ১০ তারিখের মধ্যে প্রদান এবং প্রযোজ্য সব ক্ষেত্রে উৎস অর্থ নিশ্চিত করা।
৭) ছুটি ও আর্থিক সুবিধা: বার্ষিক নৈমিত্তিক ছুটি ২০ থেকে ৬০ দিন বৃদ্ধি, ছুটি না হলে আর্থিক সুবিধা প্রদান।
৮) আইন ও নিয়ম সংস্কার: পুরনো Police Regulation of Bengal ও পুলিশ আইন সংস্কার করে আধুনিক, কার্যকর, অধস্তন কর্মকর্তাদের মর্যাদা ও অধিকার নিশ্চিত করার মতো করা।
৯) স্বাধীন পুলিশ কমিশন: পুলিশ বাহিনীর রাজনৈতিক ব্যবহার রোধে একটি স্বাধীন পুলিশ কমিশন গঠন।
১০) স্থাপনা আধুনিকায়ন: সকল থানা, ফাঁড়ি ও ট্রাফিক বক্স আধুনিকীকরণ এবং অধস্তন কর্মকর্তাদের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
১১) আবাসন ব্যবস্থা: অধস্তন কর্মকর্তাদের জন্য নিরাপদ এবং আধুনিক আবাসন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা, ব্যারাকগুলো আধুনিকায়ন ও সংশ্লিষ্ট জটিলতা সমাধান করা।
এর মধ্যে আমার কাছে মনে হয়েছে পুলিশের চরিত্র বদলের জন্য ৫, ৮ ও ৯ দফাগুলোকে বেশি গুরুত্ব দিয়ে আমলে নেওয়া ও যুগোপযোগী উপায়ে বাস্তবায়ন করার পথে হাঁটলে জনগণের সঙ্গে পুলিশের সম্পর্কটা আরও ভালো হতো।
পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা যেখানে রাজনৈতিকভাবে নিজেরা ব্যবহৃত না হওয়ার দাবি তুলেছিল সেখানে গত এক বছরে আমরা কি সেটার কোনো ইঙ্গিত দেখতে পেয়েছি? না, দেখতে পাইনি। পুলিশ সেই আগের মতো রাজনৈতিক মতাদর্শ দ্বারা প্রভাবিত হয়ে পরিচালিত হচ্ছে। সরকারের আজ্ঞাবহ হয়ে তাদেরকে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে হচ্ছে। জনগণের ট্যাক্সের টাকায় চাকরি হলেও চাকরির রক্ষাকর্তা যেহেতু সরকার, সেহেতু সরকারের নির্দেশ পালন করতে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা বাধ্য হয়। আর এক্ষেত্রে র্যাঙ্ক অনুযায়ী যারা নিচের দিকে, তাদের মাঠ পর্যায়ে বেশি পরিশ্রম করতে হয়। আজ্ঞাবহ হয়ে জনগণের বিরুদ্ধে দাঁড়িয়ে তারা দায়িত্ব পালনে অপারগতা স্বীকার করার উপায় থাকে না। তাহলে কপালে জোটে ঊর্ধ্বতনের ভর্ৎসনা, এমনকি শারীরিক আঘাত। এসব ঘটনা দেশের জনগণ অতীতেও প্রত্যক্ষ করেছে, এখনও প্রত্যক্ষ করছে।
আর এভাবে যদি চলতে থাকে তাহলে দেশের সাধারণ জনগণ কীভাবে আইনের শাসন বা সুশাসনের প্রত্যাশা করবে? দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হিসেবে পুলিশের ভূমিকা অপরিসীম। অপরাধ দমন, জননিরাপত্তা নিশ্চিতকরণ ও বিচারপ্রক্রিয়া নির্বিঘ্ন করতে পুলিশ দিনরাত কাজ করতে হয়। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরেই বাহিনীটির নানা সমস্যার কথা উঠে আসলেও সমাধানের বিষয়টা আড়ালেই থেকে যাচ্ছে।
এসব সমস্যা সমাধানে পুলিশের দাবিসমূহের দিকে নজর দেওয়া যেমন জরুরি, তেমনি বাহিনীটির কাঠামোগত সংস্কারও সময়ের দাবি। রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত পেশাদার পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলা, অতিরিক্ত কর্মঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ, স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং মানবাধিকারভিত্তিক প্রশিক্ষণ প্রদান অপরিহার্য। এতে জনগণ পুলিশের কাছ থেকে প্রত্যাশিত সেবা পাবে এবং জনমনে পুলিশ প্রতি আস্থা বৃদ্ধি পাবে। পাশাপাশি প্রযুক্তি ব্যবহার ও সেবার মানোন্নয়নও গুরুত্ব পেতে হবে। ফলে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা অধিক চৌকস ও দক্ষ হবে এবং অপরাধ দমনে তৎপরতা দেখাতে সক্ষম হবে।
বাংলাদেশ পুলিশের বিরুদ্ধে বহুদিন ধরেই নির্যাতনের অভিযোগ রয়েছে। হেফাজতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন, মিথ্যা মামলা, ঘুষ ও হয়রানি জনআস্থাকে মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত করেছে। এর ফলে আইনের শাসন দুর্বল হয়েছে, মানবাধিকারের চরম লঙ্ঘন ঘটেছে এবং আন্তর্জাতিক মহলে দেশের ভাবমূর্তিও প্রশ্নবিদ্ধ হয়েছে।
তবে এসব অন্যায় অত্যাচার-নির্যাতনে পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা রাজনৈতিক প্রভাবের কারণেই যুক্ত হয়। কেননা তাদের পোস্টিং ও পদোন্নতি দক্ষতার চেয়ে রাজনৈতিক মতাদর্শ ও বিশ্বাসের উপর ভিত্তি করে হয়ে আসছে। সুতরাং পুলিশ বাহিনীর সদস্যরা জনগণের আস্থা অর্জনের চেয়ে নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের নেতাদের আস্থা অর্জনে বেশি মনোযোগী হয়।
সংস্কারের মধ্য দিয়ে পুলিশ বাহিনীকে একটি পেশাদার বাহিনী হিসেবে গড়ে তুলতে পারলে পুলিশের অনেক বদনাম ঘুচে যাবে এবং জনআস্থা পুনঃপ্রতিষ্ঠিত হবে।
সর্বোপরি, বাংলাদেশ পুলিশের ১১ দফা দাবি কেবল তাদের পেশাগত অধিকার নয়, বরং জনগণের নিরাপত্তা ও ন্যায়বিচারের সঙ্গেও সম্পৃক্ত। দাবি পূরণের পাশাপাশি নির্যাতন রোধ ও জবাবদিহিমূলক সংস্কার না হলে জনগণের আস্থা ফেরানো সম্ভব নয়। এখন সময় এসেছে একদিকে পুলিশ সদস্যদের ন্যায্য অধিকার নিশ্চিত করার, অন্যদিকে নির্যাতনমুক্ত মানবিক পুলিশ ব্যবস্থা গড়ে তোলার। এ সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে গেলে কোনো রাজনৈতিক সরকার সেটা করার সদিচ্ছা দেখাবে বলে মনে হয় না।
সুতরাং বর্তমান সরকারের প্রতি আহ্বান থাকবে, এ বিষয়ের প্রতি অধিক মনোযোগী হয়ে জনবান্ধব পুলিশ বাহিনী গড়ে তোলায় অগ্রণী ভূমিকা পালন করার।


