তথ্যপ্রযুক্তি একবিংশ শতাব্দীর রাজনীতি, সমাজ ও পরিবারকে নতুন করে গড়ে তুলছে। কিন্তুএর দুটি মুখ– একদিকে মুক্তির হাতিয়ার, অন্যদিকে দমন ও বিভাজনের অস্ত্র। বিশ্বব্যাপীতথ্যযুদ্ধ, নজরদারি ও ভুয়া খবর ছড়ানো আজ এক বাস্তবতা। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সাম্প্রতিক রাজনৈতিক অস্থিরতা ও সহিংস ঘটনাবলি প্রমাণ করছে প্রযুক্তি আমাদের সমাজেআশীর্বাদ ও অভিশাপ দুটোই। একবিংশ শতাব্দীর এই ডিজিটাল যুগে ডেটা বা তথ্য–উপাত্তকেবল অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির চালিকাশক্তি নয়। এটি হয়ে উঠেছে ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবংসামাজিক সংঘাতের এক নতুন কেন্দ্রবিন্দু। বাংলাদেশের যখন এই পথে যাত্রা করছে, তখনতথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তির (ICT) অপার সম্ভাবনা সত্ত্বেও এর দ্বিধাগ্রস্ত মুখটি ক্রমশ স্পষ্টহচ্ছে। প্রযুক্তি একদিকে যেমন আমাদের জীবনযাত্রা সহজ করছে। অন্যদিকে মিথ্যা, বিকৃত বাউসকানিমূলক ডেটার মাধ্যমে দাঙ্গা বা সামাজিক অস্থিরতা উসকে দেওয়ার শক্তিশালীপ্ল্যাটর্ফম হিসেবেও কাজ করছে। যার ফলে প্রযুক্তি চালিত সংঘাতের সংযোগ এবং বিশ্বরাজনীতি সমাজ ও পারিবারিক কাঠামোর ওপর এর সুদূরপ্রসারী প্রভাব যোগ হচ্ছে প্রতিদিনের ক্যালেন্ডরের পাতায়।
প্রযুক্তি এবং উদ্ভাবন বাংলাদেশের জাতীয় জীবন ও অর্থনীতিতে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তনএনেছে। মোবাইল ব্যাংকিং প্ল্যাটর্ফম যেমন বিকাশ, নগদ, ট্যাপ এবং ই–কমার্স সেবা প্রান্তিকজনগণের জীবনমান উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সাধারণ মানুষের মোবাইল ফাইন্যানশিয়াল সার্ভিস ব্যবহার দেশের অর্থনৈতিক অন্তর্ভুক্তিকে ত্বরান্বিত করেছে। ই–গভর্ন্যান্সের মাধ্যমে নাগরিকরা সহজেই জাতীয় পরিচয়পত্র, জন্ম–মৃত্যু নিবন্ধন এবংঅন্যান্য সরকারি সেবা পাচ্ছে। এসব স্বচ্ছতা ও সুশাসনের দিকে দেশকে ধাবিত করছে। শিক্ষাক্ষেত্রেও অনলাইন লার্নিং প্ল্যাটর্ফম শিক্ষার পদ্ধতিকে আরও কার্যকর করেছে, বিশেষ করেকোভিড–১৯ মহামারির সময়। বিশ্বব্যাপী এই ধারা দেখা যায় ই–কমার্স, ডিজিটাল ব্যাংকিংএবং অনলাইন সেবা মানুষের জীবনকে আরও সহজ ও অন্তর্ভুক্তিমূলক করছে। সঠিক ব্যবহারে প্রযুক্তি নিঃসন্দেহে উন্নয়ন ও মানব কল্যাণের শক্তিশালী হাতিয়ার।
প্রযুক্তি এখন আর কেবল যোগাযোগ বা অর্থনীতির অংশ নয়। এটি বিশ্ব রাজনীতিরকৌশলের কেন্দ্রে চলে এসেছে। মার্কিন নির্বাচনে রাশিয়ার সাইবার প্রভাব নিয়ে জানা যায়। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধক্ষেত্রে ড্রোন ও ডিজিটাল প্রোপাগান্ডার ব্যবহার কিংবা মধ্যপ্রাচ্যে সামাজিক মাধ্যমে উসকানিমূলক প্রচার সবই প্রমাণ করে তথ্য এখন এক নতুন যুদ্ধক্ষেত্র।বিশ্বজুড়ে ডেটা ও প্রযুক্তি এখন রাজনৈতিক অস্থিরতা এবং মেরূকরণের গুরুত্বপূর্ণ হাতিয়ার।
কেমব্রিজ অ্যানালিটিকার কেলেঙ্কারিতে দেখা গেছে ফেসবুক থেকে কোটি কোটি ব্যবহারকারীর ব্যক্তিগত ডেটা অবৈধভাবে সংগ্রহ করে ভোটারদের মনস্তত্ত্ব প্রভাবিত করা হয়।সোশ্যাল মিডিয়ার অ্যালগরিদম ব্যবহারকারীর আগ্রহ অনুযায়ী কন্টেন্ট দেখায়। যা প্রায়ই‘ফিলটার বাবল‘ বা ‘ইকো চেম্বার‘ তৈরি করে, দলীয় বিদ্বেষ এবং উসকানিমূলক তথ্য দ্রুতছড়ায়। রাশিয়া–ইউক্রেন যুদ্ধে উভয় পক্ষ প্রোপাগান্ডা ছড়ানোর জন্য সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারকরছে। চীনে সামাজিক স্কোরিং ও নাগরিক নজরদারি প্রযুক্তি শক্তিশালী সামাজিক নিয়ন্ত্রণের উদাহরণ। আর আফ্রিকার কিছু দেশে ইন্টারনেট বন্ধ করে সরকার বিরোধী আন্দোলন দমন করা হচ্ছে। এসব প্রমাণ করে প্রযুক্তি আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে ক্ষমতার ভারসাম্য বদলে দিচ্ছে।
বাংলাদেশে সাফল্যের উলটো দিকও আছে। তথ্যের অবাধ প্রবাহ, যাচাইবিহীন সোশ্যালমিডিয়া কন্টেন্ট এবং বট বা ফেক আইডি মিথ্যা তথ্যকে দ্রুত ছড়াচ্ছে। বাংলাদেশে সাম্প্রতিক কয়েক বছরে বহু সাম্প্রদায়িক সহিংসতা ও অস্থিরতার মূলেই ছিল এই বিকৃত ডেটা। আইন ওসালিশ কেন্দ্রের (ASK) তথ্য অনুযায়ী ২০১৩–২০২০ সালে ধর্মীয় সংখ্যালঘুদের অনুভূতিতে আঘাতের ১,৫৮০টি ঘটনা ঘটেছে। যেখানে প্রায় সবকটিই ফেসবুক পোস্ট বা ছবির মাধ্যমে ছড়িয়েছে। ২০২১ সালের দুর্গাপূজার সময় কুমিল্লা, রংপুরসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সহিংসতাশুরু হয়েছিল কোরআন অবমাননার একটি মিথ্যা ফেসবুক পোস্ট থেকে। দ্রুত ভাইরাল হওয়াএই পোস্ট সংখ্যালঘুদের ওপর হামলা, বাড়িঘর ও
উপাসনালয়ে ভাঙচুরে রূপ নেয়। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন, ২০১৮ (সাইবার নিরাপত্তা আইন, ২০২৩ সংস্করণ) থাকলেও অস্পষ্টতা ও কঠোরতার কারণে এটি প্রায়ই মত প্রকাশের
স্বাধীনতা সীমিত বা হয়রানির হাতিয়ার হিসেবে অতীতে ব্যবহৃত হয়েছে। এই আইনের স্পষ্টতাও সহজীকরণ এবং নাগরিকদের ব্যক্তিগত ডেটা সুরক্ষার জন্য কার্যকর ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন আইন এখনও অপেক্ষমাণ।
ফেইক আইডি শুধু রাজনৈতিক প্রভাবের জন্য নয় বরং সামাজিক বিভাজন ও অর্থনৈতিকক্ষতি বৃদ্ধিতেও ব্যবহৃত হচ্ছে। অনলাইন প্ল্যাটফর্মে স্বল্প সময়ের মধ্যে বড় পরিসরে তথ্যছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। যা মুহূর্তের মধ্যে দাঙ্গার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। এই ঘটনা প্রমাণকরে যে, প্রযুক্তি শুধু যন্ত্র নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার উপর সরাসরি প্রভাব ফেলতেপারে।
বাংলাদেশে সাম্প্রতিক আন্দোলন ও রাজনৈতিক ঘটনাবলিতে তথ্যপ্রযুক্তি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকারেখেছে। ২০২৪ সালের জুলাই মাসে গণআন্দোলনের সময় সরকার টানা ১১ দিন মোবাইল ইন্টারনেট বন্ধ রাখে। এতে আন্দোলনের সংগঠকেরা মারাত্মকভাবে বাধাগ্রস্ত হন, ব্যবসা–বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং সাধারণ মানুষের যোগাযোগ ভেঙে পড়ে। সরকার এপদক্ষেপকে ‘শৃঙ্খলা রক্ষার অংশ‘ বলে ব্যাখ্যা করলেও নাগরিকদের মধ্যে প্রশ্ন ওঠে এটি কিকেবল নিরাপত্তা, নাকি নাগরিক স্বাধীনতার ওপর আঘাত?
সাম্প্রতিক সময়ে চট্টগ্রামে আইনজীবী সাইফুল ইসলামের হত্যার ঘটনা সামাজিক মাধ্যমে দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে এবং সহিংসতার সম্ভাবনা বাড়ায়। ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে খুলনা প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ে ছাত্রদল ও সাধারণ ছাত্রদের মধ্যে সংঘর্ষে প্রায় ৫০ জন আহতহন। সহিংসতা নিয়ন্ত্রণে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ছয় মাসের জন্য প্রতিষ্ঠানটি বন্ধ রাখে। এসংঘর্ষের ক্ষেত্রেও দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যমে বার্তাটিকে আরও জটিল করে তুলেছিল। সবমিলিয়ে বাংলাদেশের অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে, প্রযুক্তি এখানে একদিকে আন্দোলনের হাতিয়ার, অন্যদিকে সহিংসতা ও দাঙ্গার অনুঘটক হিসেবে কাজ করছে।
তবে প্রযুক্তির দ্বিমুখী প্রভাব কেবল রাজনীতিতেই সীমাবদ্ধ নয়, সমাজকেও গভীরভাবেপ্রভাবিত করছে। বাংলাদেশে তথ্যপ্রযুক্তির দ্রুত বিস্তার একদিকে নতুন সুযোগ সৃষ্টি করেছে, অন্যদিকে বৈষম্যও বাড়িয়েছে। শহর–গ্রাম, ধনী–গরিব ও শিক্ষিত–অশিক্ষিতের মধ্যে একপ্রবল ডিজিটাল বৈষম্য তৈরি হয়েছে। এই বৈষম্যের কারণে অনেকেই নতুন প্রযুক্তির সুবিধাপাচ্ছেন, আবার অনেকে সম্পূর্ণভাবে পিছিয়ে পড়ছেন। আন্দোলনে অংশগ্রহণ, তথ্যপ্রাপ্তিকিংবা নিরাপত্তা সম্পর্কে সচেতনতার
ক্ষেত্রেও এই বিভাজন স্পষ্ট। সামাজিক মাধ্যমে গোষ্ঠীভিত্তিক বিভাজন ও সাম্প্রদায়িক বিদ্বেষখুব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। একটিগুজব বা উসকানিমূলক পোস্ট কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই হাজার হাজার মানুষের কাছে পৌঁছে যায়এবং রাস্তায় সহিংসতায় রূপ নেয়। একই সঙ্গে দেখা যাচ্ছে প্রযুক্তি মানুষকে সংলাপের সুযোগদিচ্ছে, কিন্তু সেই সংলাপ আবার নতুন বিভাজনও তৈরি করছে। একটি ফেসবুক পোস্ট যেখানেমুক্তির স্লোগান তুলতে পারে, অন্যদিকে সেটি কারও ধর্মীয় পরিচয় বা রাজনৈতিক অবস্থানেরবিরুদ্ধে উসকানি তৈরি করতে পারে। ফলে সমাজে উত্তেজনা ও বিভাজন একই সঙ্গে বেড়েচলেছে।
পরিবারেও প্রযুক্তির প্রভাব প্রায় ততটাই গভীর। ছোট থেকে বড় সকলেই মোবাইল, ট্যাব বাকমপিউটারে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। অনেক সময় তারা গঠনমূলক কাজের পরিবর্তেটিকটক, রিল, ফেসবুক বা ইউটিউবে ব্যস্ত থাকে। এর ফলে কিশোররা প্রায়ই অবসর সময়েএকসাথে গ্যাং তৈরি করছে, যা অরাজকতা এবং নকল চ্যালেঞ্জের দিকে ঠেলে দিচ্ছে।রাজধানীর কিছু স্কুলছাত্র খেলার বা পড়াশোনার পরিবর্তে সামাজিক মিডিয়ার ট্রেন্ডিং ভিডিওদেখে অতিরিক্ত সময় কাটাচ্ছে। মেয়েরা অনভিজ্ঞতার কারণে ঝুঁকিপূর্ণ চ্যালেঞ্জে জড়িয়েপড়ছে। এই ডিজিটাল আসক্তি পরিবারে সংলাপ ও ঘনিষ্ঠতা ক্ষয় করছে, আস্থার ভাঙনঘটাচ্ছে এবং কিশোর অপরাধ, মানসিক চাপ ও সামাজিক অশান্তির সম্ভাবনা বাড়াচ্ছে।
বাংলাদেশ এখন এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। প্রযুক্তি আমাদের মুক্তির হাতিয়ারহবে নাকি দমনের যন্ত্রে পরিণত হবে, তা নির্ভর করছে রাষ্ট্রনীতি, সমাজচেতনা ও নাগরিকেরসচেতনতার ওপর। এজন্য প্রথমত, আইন সংস্কার প্রয়োজন, যাতে নিরাপত্তার নামে নাগরিকঅধিকার খর্ব না হয়। দ্বিতীয়ত, ডিজিটাল সাক্ষরতা বাড়াতে হবে, যাতে মানুষ ভুয়া খবর ওপ্রোপাগান্ডা চিহ্নিত করতে পারে। তৃতীয়ত, গণমাধ্যমকে দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতেহবে-‘প্রথমে প্রকাশ, পরে যাচাই‘ সংস্কৃতি ভাঙতে হবে। চতুর্থত, নতুন প্রযুক্তি যেমনস্যাটেলাইট ইন্টারনেট বা ব্লকচেইনভিত্তিক সুরক্ষা ব্যবহারের মাধ্যমে নাগরিকদের নিরাপত্তানিশ্চিত করা উচিত, তবে সেগুলো যেন জনগণের বিরুদ্ধে নিয়ন্ত্রণের হাতিয়ার না হয়।
সবশেষে বলা যায়, ‘ডেটা ও দাঙ্গা‘- এই দ্বিমুখী বাস্তবতা এখন বাংলাদেশের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ। প্রযুক্তি আমাদের মুক্তির হাতিয়ার হবে নাকি বিভাজনের আগুন, তা আমাদেরই ঠিককরতে হবে। বিশ্ব রাজনীতির মতোই বাংলাদেশকেও সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি প্রযুক্তিকেন্যায়ের অস্ত্র করব, নাকি দমন ও বিভাজনের অগ্নিতে পুড়তে দেব।
লেখক: সাংস্কৃতিক ও মানবাধিকার কর্মী, সাধারণ সম্পাদক: সেন্টার ফর বাংলাদেশ থিয়েটার(সিবিটি)
