ফি বছরের মতো এবারও চট্টগ্রাম ও সিলেটের বিস্তীর্ণ জনপদ পানির নিচে। শহরের ব্যস্ত সড়ক থেকে শুরু করে গ্রামের উঠান সবই যেন এক বিশাল জলরাশির অংশ। কোথাও পাহাড়ি ঢল মুহূর্তের মধ্যে গ্রাম ডুবিয়ে দিয়েছে, কোথাও টানা বৃষ্টিতে শহর পরিণত হয়েছে অচল নগরে। হাজারো পরিবার আশ্রয়কেন্দ্রে, লাখো মানুষ বিদ্যুৎ ও বিশুদ্ধ পানির সংকটে। কৃষকের ক্ষেত তলিয়ে গেছে, মাছের ঘের, পুকুরের মাছ ভেসে গিয়েছে, ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীর পুঁজি শেষ, শিক্ষার্থীর বই পানিতে নষ্ট হয়েছে। চট্টগ্রামে পরীক্ষা গ্রহণ স্থগিত করা হলেও অন্যান্য জায়গায় কেউ সাঁতার কেটে, কেউ ডিঙ্গি বা কোষা নৌকায় করে চলমান এইচএসসি পরীক্ষায় অংশ নিচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভেসে আসছে উদ্ধারকাজ, কান্না আর মানবিক বিপর্যয়ের অসংখ্য ছবি। এই দুর্দশা বাংলাদেশের মানুষের কাছে নতুন নয়। এটি বছরের পর বছরের বন্যার পুনরাবৃত্তি, যা প্রতি বর্ষায় আমাদের বিবেককে প্রশ্ন করে আমরা কী বন্যাপ্রবণ এই দেশে পরিকল্পনাহীনভাবে বাস করছি?
বন্যায় ঘরের চাল ছুয়েছে পানি
বাংলাদেশের ভৌগোলিক অবস্থান অস্বীকার করার সুযোগ নেই। বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপের অন্যতম অংশ এই দেশ। গঙ্গা, ব্রহ্মপুত্র ও মেঘনা অববাহিকার শেষ প্রান্তে অবস্থিত হওয়ায় উজানের বিপুল পরিমাণ পানি শেষ পর্যন্ত এসে জমা হয় বাংলাদেশে। দেশের ৭০০-এর বেশি নদী এবং অসংখ্য খাল-বিল-মাঠ-জলাভূমি শত শত বছর ধরে এই পানিকে ধারণ ও প্রবাহিত করেছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, স্বাভাবিকভাবে প্রতিবছর দেশের প্রায় ২০ থেকে ২৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। কিন্তু অতি বর্ষণ ও উজানের প্রবল ঢলের সময় এই প্লাবন ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ এলাকায়ও ছড়িয়ে পড়তে পারে। অর্থাৎ বন্যা বাংলাদেশের শত্রু নয়; এটি আমাদের ভূ-প্রকৃতির স্বাভাবিক অবস্থা। কিন্তু প্রাকৃতিক বন্যা এবং মানবসৃষ্ট বিপর্যয় এক জিনিস নয়। প্রকৃতি পানি দেয়, রাষ্ট্র ঠিক করে সেই পানি সম্পদ হবে, নাকি দুর্যোগে পরিণত হবে।
স্বাধীনতার পর থেকেই বাংলাদেশ বন্যার সঙ্গে লড়ছে। ১৯৭৪ সালের বন্যা ছিল স্বাধীনতার পর প্রথম বড় জাতীয় বিপর্যয়গুলোর একটি। কৃষি উৎপাদন মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয় এবং খাদ্যসংকট তীব্রতর হয়ে ওঠে। অনেক অর্থনীতিবিদ মনে করেন, ওই বছরের বন্যা পরবর্তী দুর্ভিক্ষের অন্যতম কারণ ছিল। এরপর ১৯৮৭ সালের বন্যায় দেশের প্রায় ৪০ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়। পরের বছর, অর্থাৎ ১৯৮৮ সালে, পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ নেয়। রাজধানী ঢাকাসহ দেশের প্রায় ৬০ শতাংশ এলাকা পানির নিচে চলে যায়। সেই বন্যা বাংলাদেশের পানি ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করেছিল নীতিনির্ধারকদের।
কিন্তু বাংলাদেশের ইতিহাসে সবচেয়ে আলোচিত বন্যা নিঃসন্দেহে ১৯৯৮ সালের মহাবন্যা। দেশের প্রায় ৭৫ শতাংশ এলাকা প্লাবিত হয়, বহু স্থানে টানা দুই মাসের বেশি সময় পানি স্থায়ী ছিল। প্রায় তিন কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। কৃষি, যোগাযোগ, শিক্ষা, স্বাস্থ্য প্রায় প্রতিটি খাত বড় ধাক্কা খায়। সেই বন্যা দেখিয়েছিল, একটি বড় দুর্যোগ কীভাবে পুরো জাতীয় অর্থনীতিকে প্রভাবিত করতে পারে।
জাতীয় ও আঞ্চলিক মহাসড়কও পানির নিচে
এরপর ২০০৪, ২০০৭, ২০১৭, ২০২২, ২০২৪ এবং সাম্প্রতিক ২০২৬ সালের বন্যাও একই সতর্কবার্তা বহন করছে। বিশেষ করে ২০২২ সালের সিলেট-সুনামগঞ্জের আকস্মিক বন্যা এবং সাম্প্রতিক চট্টগ্রাম ও সিলেটের বন্যা আমাদের বুঝিয়ে দিয়েছে যে জলবায়ু পরিবর্তনের যুগে বন্যার চরিত্র বদলে গেছে। এখন আর শুধু নদীর পানি বেড়ে ধীরে ধীরে বন্যা হয় না; অল্প সময়ে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত এবং পাহাড়ি ঢল মুহূর্তের মধ্যে পুরো জনপদ ডুবিয়ে দিতে পারে।
বিশ্ব আবহাওয়া সংস্থা, আইপিসিসি এবং বিশ্বব্যাংকের বিভিন্ন গবেষণায় বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ায় চরম বৃষ্টিপাতের ঘটনা বেড়েছে। বাংলাদেশ বৈশ্বিক কার্বন নিঃসরণে খুব সামান্য অবদান রাখলেও জলবায়ু পরিবর্তনের সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোর একটি। আগে যে পরিমাণ বৃষ্টি পাঁচ বা সাত দিনে হতো, এখন অনেক ক্ষেত্রে তা এক বা দুই দিনেই হচ্ছে। ফলে নদী, খাল এবং নগরের ড্রেনেজ ব্যবস্থা সেই পানি বহন করতে পারছে না। উদাহরণ স্বরূপ বলা যায় গত সপ্তাহে ২৪ ঘন্টায় ঢাকা মহানগরীতে ৯৭ মিলিমিটার বৃষ্টি রেকর্ড করা হয়েছে। ওই ক্লাউডবার্স্টে ঢাকা জলমগ্ন হয়ে বন্যার আকার ধারণ করে সাময়িক সময়ের জন্য।
তবে শুধু জলবায়ু পরিবর্তনকে দায়ী করলে ভুল হবে। আজ বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সংকটব বন্যা মোকাবেলায় আমাদের নীতিগত দৃষ্টিভঙ্গি। আমরা নদীকে এখনও একটি প্রকল্প হিসেবে দেখি, একটি জীবন্ত পরিবেশগত ব্যবস্থা হিসেবে নয়। বর্ষা এলেই ড্রেজিং, নদী খনন, বাঁধ নির্মাণ কিংবা খাল সংস্কারের ঘোষণা আসে। হাজার হাজার কোটি টাকার প্রকল্প নেওয়া হয়। কিন্তু কয়েক মাস পর দেখা যায় নদী আবার পলি জমে ভরাট হয়েছে, খাল আবার দখল হয়েছে, নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ আবার বাধাগ্রস্ত হয়েছে। নদী ব্যবস্থাপনা কোনো এককালীন উন্নয়ন প্রকল্প নয়; এটি একটি ধারাবাহিক বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়া। নদী খননকে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরে নানা অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ রয়েছে। কোথাও কাগজে-কলমে খনন হয়েছে, কোথাও অপরিকল্পিতভাবে ড্রেজিং হয়েছে, কোথাও উত্তোলিত পলি আবার নদীতেই ফিরে গেছে। ফলে জনগণের অর্থ ব্যয় হলেও নদীর ধারণক্ষমতা স্থায়ীভাবে বাড়েনি।
চট্টগ্রামের সমস্যার ধরন আবার কিছুটা ভিন্ন। একদিকে পাহাড়ি ঢল, অন্যদিকে অপরিকল্পিত নগরায়ণ। পাহাড় কেটে বসতি নির্মাণ, খাল দখল, নালা ভরাট, জলাধার সংকুচিত হওয়া এবং কংক্রিটনির্ভর উন্নয়নের কারণে বৃষ্টির পানি দ্রুত নিষ্কাশনের পথ হারিয়ে ফেলেছে। অল্প সময়ের ভারী বৃষ্টিতেই নগরীর অনেক এলাকা ডুবে যায়। অবশ্য এবারের ভয়াবহ বন্যা শহরে নয়, বাঁশখালি ও সন্নিহিত আরও কয়েকটি উপজেলায়। সিলেটের পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক। একসময় হাওর ও জলাভূমি প্রাকৃতিক জলাধারের কাজ করত। এখন জলাভূমি সংকুচিত হচ্ছে, নদীর নাব্যতা কমছে, খাল ভরাট হচ্ছে এবং প্রাকৃতিক প্রবাহপথ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ফলে পাহাড়ি ঢলের পানি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে।
প্রকৃতির একটি সহজ নিয়ম আছে পানি কখনও নিজের পথ ভুলে না। মানুষ যদি সেই পথ বন্ধ করে, পানি তখন নিজের নতুন পথ তৈরি করে। সেই পথ যদি নদী না হয়, তবে তা হয়ে যায় শহরের রাস্তা, মানুষের ঘর কিংবা কৃষকের জমি। এখানেই বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় নীতিগত ব্যর্থতা। আমরা নদীকে সংকুচিত করেছি, খাল ভরাট করেছি, জলাভূমি দখল করেছি, তারপর আবার বন্যাকে প্রাকৃতিক দুর্যোগ বলে দায় এড়াতে চেয়েছি। অথচ প্রকৃতি কখনও প্রতিশোধ নেয় না; প্রকৃতি কেবল তার নিয়ম মেনে চলে।
আমরা এখনও কী বন্যাকে শুধুই বর্ষাকালের ঘটনা হিসেবে দেখব, নাকি এটিকে অর্থনীতি, খাদ্যনিরাপত্তা, জলবায়ু এবং জাতীয় নিরাপত্তার প্রশ্ন হিসেবে বিবেচনা করব? এই প্রশ্নের উত্তরই নির্ধারণ করবে আগামী কয়েক দশকে বাংলাদেশের বন্যা পরিস্থিতি উন্নয়নের ভবিষ্যৎ। বিশ্বের বহু দেশ আমাদের চেয়ে অনেক কঠিন প্রাকৃতিক বৈরিতার মুখোমুখি হয়েও বন্যাকে জাতীয় বিপর্যয়ে পরিণত হতে দেয়নি। কারণ তারা প্রকৃতিকে পরাজিত করার চেষ্টা করেনি; বরং প্রকৃতিকে বুঝে তার সঙ্গে সহাবস্থানের পথ বেছে নিয়েছে।
এর সবচেয়ে আলোচিত উদাহরণ নেদারল্যান্ডস। দেশটির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ সমুদ্রপৃষ্ঠের নিচে অবস্থিত। শত শত বছর ধরে তারা বাঁধ নির্মাণের মাধ্যমে সমুদ্র ও নদী নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছিল। কিন্তু নব্বইয়ের দশকে বড় বড় বন্যার অভিজ্ঞতা তাদের বুঝিয়ে দেয় শুধু বাঁধ দিয়ে নদীকে আটকে রাখা সম্ভব নয়। এরপর তারা গ্রহণ করে “Room for the River” নীতি। এই নীতির মূল দর্শন হলো নদীকে তার প্রাকৃতিক বন্যাপ্রবাহের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা ফিরিয়ে দেওয়া। কোথাও বাঁধ সরিয়ে নেওয়া হয়েছে, কোথাও নদীর তীর প্রশস্ত করা হয়েছে, কোথাও নিচু অঞ্চলকে মৌসুমি প্লাবনভূমি হিসেবে সংরক্ষণ করা হয়েছে। এতে নদীর প্রবাহ স্বাভাবিক হয়েছে এবং বন্যার ঝুঁকিও কমেছে।
জাপানও ভিন্ন পথ দেখিয়েছে। টোকিও মহানগরকে আকস্মিক বন্যা থেকে রক্ষা করতে তারা ভূগর্ভে বিশাল পানি ধারণ টানেল ও রিজার্ভার নির্মাণ করেছে, যা অতিবৃষ্টির সময় বিপুল পরিমাণ পানি সাময়িকভাবে ধারণ করে পরে ধীরে ধীরে নদীতে ছেড়ে দেয়। দক্ষিণ কোরিয়া সিউলের ঐতিহাসিক চেওংগেচন খাল পুনরুদ্ধার করে নগর পরিকল্পনায় প্রকৃতিকে ফিরিয়ে এনেছে। এসব উদাহরণ একটি বিষয়ই প্রমাণ করে বন্যা মোকাবিলা কেবল প্রকৌশল নয়; এটি পরিবেশ, নগর পরিকল্পনা, বিজ্ঞান এবং দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রনীতির সমন্বিত প্রয়াস।
বাংলাদেশও ২০১৮ সালে বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ গ্রহণ করেছে। এই মহাপরিকল্পনার লক্ষ্য হলো আগামী শতাব্দীর জলবায়ু পরিবর্তন, নদী ব্যবস্থাপনা, খাদ্যনিরাপত্তা, কৃষি, নগরায়ণ এবং পানিসম্পদকে সমন্বিতভাবে পরিচালনা করা। এটি নিঃসন্দেহে একটি দূরদর্শী পরিকল্পনা। কিন্তু আমাদের অভিজ্ঞতা বলে, পরিকল্পনা গ্রহণের চেয়ে তার বাস্তবায়ন অনেক বেশি কঠিন। রাজনৈতিক অগ্রাধিকার, আন্তঃমন্ত্রণালয় সমন্বয়, দক্ষ প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছতা এবং জবাবদিহিতা নিশ্চিত না হলে মহাপরিকল্পনাও কাগজেই সীমাবদ্ধ থেকে যায়।
বাংলাদেশের আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো আন্তঃসীমান্ত নদী ব্যবস্থাপনা। দেশের অধিকাংশ প্রধান নদীর উজান বাংলাদেশের বাইরে। ফলে উজানে অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, পাহাড়ি ঢল কিংবা নদীর পানি বৃদ্ধির তথ্য যত দ্রুত পাওয়া যাবে, তত দ্রুত জনগণকে সতর্ক করা সম্ভব হবে। আধুনিক প্রযুক্তির যুগে রিয়েল-টাইম তথ্য বিনিময় শুধু কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এটি জীবন ও জীবিকা রক্ষার পূর্বশর্ত।
বন্যা নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে আমরা প্রায়ই একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় ভুলে যাই, বন্যার অর্থনৈতিক মূল্য। একটি বড় বন্যা শুধু কয়েকটি জেলা প্লাবিত করে না; জাতীয় অর্থনীতিকে নাড়া দেয়। কৃষি উৎপাদন কমে যায়, খাদ্যদ্রব্যের দাম বাড়ে, সড়ক ও সেতু ক্ষতিগ্রস্ত হয়, শিল্পকারখানার সরবরাহ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়, শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়, পানিবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ে এবং লাখো মানুষ নতুন করে দারিদ্র্যের ঝুঁকিতে পড়ে। অর্থনীতিবিদদের ভাষায়, দুর্যোগের প্রত্যক্ষ ক্ষতির পাশাপাশি পরোক্ষ ক্ষতিও সমান গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি দীর্ঘমেয়াদে উৎপাদনশীলতা ও মানবসম্পদের ওপর প্রভাব ফেলে।
বাংলাদেশ ঘূর্ণিঝড় মোকাবিলায় বিশ্বের কাছে একটি সফল উদাহরণ। ১৯৭০ সালের ঘূর্ণিঝড়ে, ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ে যেখানে কয়েক লাখ মানুষের প্রাণহানি ঘটেছিল, সেখানে বর্তমানে আগাম সতর্কবার্তা, আশ্রয়কেন্দ্র, প্রশিক্ষিত স্বেচ্ছাসেবক এবং জনসচেতনতার কারণে প্রাণহানি অবিশ্বাস্যরকম কমেছে। এই অভিজ্ঞতা প্রমাণ করে প্রস্তুতি থাকলে দুর্যোগ নিয়ন্ত্রণ করা যায়। একই ধরনের প্রস্তুতি বন্যা ব্যবস্থাপনায়ও গড়ে তোলা সম্ভব। প্রতিটি বন্যাপ্রবণ ইউনিয়নে কমিউনিটি-ভিত্তিক দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা কমিটি সক্রিয় করতে হবে। বিদ্যালয়ে বন্যা শিক্ষা অন্তর্ভুক্ত করা, বছরে অন্তত একবার মহড়া আয়োজন, স্থানীয় নৌযান প্রস্তুত রাখা, জরুরি খাদ্য ও বিশুদ্ধ পানির সংরক্ষণ, বয়স্ক, শিশু, গর্ভবতী নারী ও প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য পৃথক উদ্ধার পরিকল্পনা এখন মৌলিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার অংশ। প্রত্যেক পরিবারের একটি দুর্যোগ প্রস্তুতি পরিকল্পনা থাকা উচিত, যাতে শুকনো খাবার, বিশুদ্ধ পানি, প্রাথমিক চিকিৎসা সামগ্রী, টর্চ, পাওয়ার ব্যাংক এবং গুরুত্বপূর্ণ নথিপত্র নিরাপদে সংরক্ষণের ব্যবস্থা থাকে।
বন্যায় ভেঙ্গেছে অসংখ্য বাধ
সরকারের করণীয়ও এখন অত্যন্ত স্পষ্ট। প্রতিটি নদীর জন্য সমন্বিত অববাহিকা ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে হবে। একটি নদীকে আলাদা করে নয়, পুরো অববাহিকার প্রেক্ষাপটে পরিকল্পনা করতে হবে। নদী খনন, ড্রেজিং, বাঁধ নির্মাণ এবং পানি ব্যবস্থাপনায় সর্বোচ্চ স্বচ্ছতা নিশ্চিত করতে হবে। স্যাটেলাইট পর্যবেক্ষণ, জিআইএস ভিত্তিক মানচিত্র, উন্মুক্ত তথ্যভান্ডার এবং স্বাধীন নিরীক্ষা বাধ্যতামূলক করা উচিত। খাল, বিল, হাওর, জলাভূমি ও বন্যাপ্রবাহ অঞ্চলকে আইনি সুরক্ষার আওতায় এনে দখলমুক্ত রাখতে হবে। উন্নয়নের নামে প্রাকৃতিক পানি ধারণের স্থান ধ্বংস করা মানে ভবিষ্যতের দুর্যোগকে আমন্ত্রণ জানানো। চট্টগ্রাম, সিলেট, সুনামগঞ্জ, কক্সবাজার এবং অন্যান্য ঝুঁকিপূর্ণ অঞ্চলের জন্য জলবায়ু-সহনশীল পৃথক আঞ্চলিক পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে হবে। উজানের দেশগুলোর সঙ্গে তথ্য বিনিময়, যৌথ গবেষণা এবং নদী ব্যবস্থাপনায় সহযোগিতা আরও জোরদার করতে হবে। দুর্যোগ-সহনশীল অবকাঠামো, উঁচু আশ্রয়কেন্দ্র, বন্যা-সহনশীল কৃষি প্রযুক্তি, জলাধার পুনরুদ্ধার এবং নগরের আধুনিক ড্রেনেজ ব্যবস্থায় বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। সবচেয়ে বড় কথা, দুর্যোগকে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতার বিষয় না বানিয়ে জাতীয় ঐকমত্যের বিষয় হিসেবে দেখতে হবে। নদী ব্যবস্থাপনা, জলাভূমি সংরক্ষণ,পানি নীতি কিংবা জলবায়ু অভিযোজন এসব কোনো এক সরকারের পাঁচ বছরের কর্মসূচি হতে পারে না। এগুলো অন্তত ৩০ থেকে ৫০ বছরের ধারাবাহিক রাষ্ট্রনীতি হওয়া উচিত।
একটি রাষ্ট্রের প্রকৃত উন্নয়নের পরিচয় হলো দুর্যোগের সময় কত কম মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, কত দ্রুত মানুষ স্বাভাবিক জীবনে ফিরে আসে এবং রাষ্ট্র কতটা দক্ষতার সঙ্গে মানুষের জীবন, জীবিকা ও সম্পদ রক্ষা করতে পারে। বাংলাদেশ আজ মধ্যম আয়ের দেশ থেকে উন্নত দেশের পথে এগোতে চায়। কিন্তু যদি প্রতি বন্যায় লাখ লাখ মানুষ ঘরছাড়া হয়, কৃষি বারবার বিপর্যস্ত হয়, শহর কয়েক ঘণ্টার বৃষ্টিতেই অচল হয়ে পড়ে তাহলে উন্নয়নের ভিত্তি দুর্বল হয়ে পড়বে। জলবায়ু পরিবর্তনের এই শতাব্দীতে সবচেয়ে সফল রাষ্ট্র হতে হলে দুর্যোগকে দক্ষতার সঙ্গে মোকাবিলা করতে পারতে হবে।
চট্টগ্রাম ও সিলেটের সাম্প্রতিক বন্যা আমাদের সামনে একটি নির্মম সত্য তুলে ধরেছে যে আমাদের পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়েছে। যখন পরিকল্পনা ব্যর্থ হয়, তখন শুধু ঘরবাড়ি নয়, ভেসে যায় মানুষের ভবিষ্যৎ, রাষ্ট্রের উন্নয়ন যজ্ঞ। তবু আশার জায়গা আছে। কারণ বাংলাদেশ অতীতে প্রমাণ করেছে যে সঠিক পরিকল্পনা, রাজনৈতিক সদিচ্ছা, বৈজ্ঞানিক সিদ্ধান্ত এবং জনগণের অংশগ্রহণ থাকলে অসম্ভবকেও সম্ভব করা যায়। ঘূর্ণিঝড়ে মৃত্যুহার কমানোর মতো সাফল্য যদি আমরা অর্জন করতে পারি, তবে বন্যাজনিত ক্ষয়ক্ষতিও উল্লেখযোগ্যভাবে কমানো সম্ভব।
আজ আমাদের সিদ্ধান্ত নিতে হবে আমরা কি প্রতি বর্ষায় একই দুর্ভোগ ও শোকের কথা লিখব নাকি এমন একটি বাংলাদেশ গড়ে তুলব যেখানে নদী থাকবে, বর্ষা থাকবে, বন্যাও থাকবে; কিন্তু মানুষের জীবন, জীবিকা এবং ভবিষ্যৎ আর ডুবে যাবে না। নদী বাংলাদেশের প্রাণ। নদীই এ দেশের সভ্যতার জন্ম দিয়েছে, কৃষিকে সমৃদ্ধ করেছে, বাণিজ্যের পথ খুলে দিয়েছে, সংস্কৃতিকে বিকশিত করেছে। তাই নদী হত্যা- দখল নয়, নদী বাঁচিয়ে রেখে সহাবস্থান শেখাই হবে আগামী বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় রাষ্ট্রনৈতিক প্রজ্ঞা। সেই প্রজ্ঞার পরীক্ষাই এখন আমাদের সামনে।