দৈনিক সংবাদ প্রবাহের সঙ্গে চলচ্চিত্র নির্মাতা শমীক তার সদ্য মুক্তি প্রাপ্ত চলচ্চিত্র “মায়া সত্য ভ্রম ” ও তার চলচ্চিত্র ভাবনা এবং সার্বিক বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন। দৈনিক সংবাদ প্রবাহের পক্ষ থেকে সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন- কাজী বনফুল।
মায়া, সত্য নাকি এক চরম ভ্রম? সিনেমার নামটা যেন সিনেমার প্রতিটি ফ্রেমকে নিখুঁতভাবে সংজ্ঞায়িত করে কখনও চোখের সামনে ঘনায় এক মায়াবী কুয়াশা, কখনও কঠোর সত্যের মুখোমুখি দাঁড়াতে হয়, আবার পরক্ষণেই মনে হয় সবকিছুই কি কেবলই এক ভ্রম? একদম শেষ দৃশ্য পর্যন্ত যে থ্রিল আর রহস্যের বুনন পরিচালক ধরে রেখেছেন, তা দর্শককে হলঘরের চেয়ারে শক্ত করে বসিয়ে রাখার জন্য যথেষ্ট।
তবে এই থ্রিলারের আড়ালে লুকিয়ে থাকা আবেগটা একজন মায়ের মনকে ভীষণভাবে নাড়িয়ে দেয়। আমাদের সমাজের অতি-চিন্তাশীল মায়েদের মনের গহীনে একটা চিরন্তন ভয় সুপ্ত থাকে সন্তানকে হারিয়ে ফেলার ভয়, নিজের অবর্তমানে ওদের ভবিষ্যৎ কী হবে সেই অজানা আশঙ্কা। যারা ভালো মনস্তাত্ত্বিক রহস্য আর আবেগঘন কাহিনীর বুনন ভালোবাসেন, তাঁদের জন্য ‘মায়া সত্য ভ্রম’ একটি অবশ্যই দর্শনীয় চলচ্চিত্র।
আন্তর্জাতিক বিভিন্ন পুরস্কারে ভূষিত চলচ্চিত্র পরিচালক শমীক রচিত ও পরিচালিত “মায়া সত্য ভ্রম”
গল্পের আবছা ভাব যদি বলি তাহলে, শহরে ঘটে যাওয়া দুটি অদ্ভুত নিখোঁজ ঘটনা কলকাতার প্রফুল্লনগর থানার জীবন অস্থির করে তুলেছে। প্রথমটি হলো সাব-ইন্সপেক্টর সঞ্জয় কোনারের আট বছরের ছেলে টোটোরো নিখোঁজ হওয়া। দ্বিতীয়টি হলো সারা, একজন সুইডিশ ফিল্ম প্রোডাকশন অ্যাসিস্ট্যান্ট এবং গবেষক, যিনি শামানদের ওপর গবেষণার জন্য ভারতে এসেছিলেন।
প্রথম নজরে ঘটনাগুলি আলাদা মনে হলেও, তদন্তে উভয়ের ঘটনার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়, যা ঘটনাক্রমে এক রহস্যময় চরিত্র, ত্রিলোকদর্শী বাবা-র সঙ্গে যুক্ত। ছেলের খোঁজে সাব-ইন্সপেক্টর সঞ্জয় কোনার এবং তার স্ত্রী উর্মিলা এক কঠিন সময় পার করেন।
ত্রিলোকদর্শী বাবার রহস্য এবং তার যাত্রাপথ ধীরে ধীরে উন্মোচিত হয়, যখন তারা উভয় ঘটনার সংযোগসূত্র খুঁজতে থাকে।
এই সিনেমায় প্রথমবার জুটি বেঁধেছেন প্রিয়াঙ্কা সরকার এবং সোহম মজুমদার। সিনেমাটির চিত্রগ্রহণ করেছেন প্রসেনজিৎ কোলে, সম্পাদনা করেছেন সংলাপ ভৌমিক, ছবিটি শ্যুটিং এ যাওয়ার আগে দীর্ঘ ৬ মাসব্যাপী প্রিপ্রোডাকশন এবং ওয়ার্কশপ হয়েছিল বলে জানিয়েছেন ছবির অ্যাসোসিয়েট ডিরেক্টর ও অ্যাসিস্ট্যান্ট রাইটার চিশতী টি এম।
কাজী বনফুল – সম্প্রতি আপনার পরিচালিত “মায়া সত্য ভ্রম” চলচ্চিত্রটি মুক্তি পেয়েছে। মুক্তির পর থেকে মানুষের একাগ্র নিরবিচ্ছিন্ন সাড়া পাচ্ছে চলচ্চিত্রটি। এই চলচ্চিত্রটি সম্পর্কে আপনার লালিত যে স্বপ্ন ছিলো তার কতটুকু বাস্তবায়ন আপনি লক্ষ্য করছেন?
শমীক- “মায়া সত্য ভ্রম” নিয়ে আমার স্বপ্ন ছিল—আমি যেভাবে লিখেছি ও কল্পনা করেছি, ছবিটাকে তার কতটা কাছাকাছি নিয়ে যেতে পারি। সংগীত, সাউন্ড ডিজাইন ও চিত্রায়নের মাধ্যমে সেই ভাবনাটাকে একটি অনেস্ট রিপ্রেজেন্টেশন হিসেবে তুলে ধরতে চেয়েছি।
আমার চিন্তাভাবনার সেই সততা ছবিতে কতটা প্রকাশ পেয়েছে—এই দিক থেকে আমার মনে হয়, আমার স্বপ্ন অনেকটাই বাস্তবায়িত হয়েছে।
ফেস্টিভ্যাল, সিনেমা হল, দর্শক, কলাকুশলী ও ইন্ডাস্ট্রির বিশিষ্টজনদের কাছ থেকেও ছবিটি নিয়ে ইতিবাচক ফিডব্যাক পেয়েছি। তবে এগুলো আমার স্বপ্নের মূল অংশ ছিল না। আমার কাছে মূল বিষয় ছিল, আমি যেভাবে কল্পনা করেছি, সেই সততার সঙ্গে ছবিটাকে কতটা তৈরি করতে পেরেছি। সেদিক থেকে আমার মনে হয়, ছবিটি আমার স্বপ্নের খুব কাছাকাছি।
কাজী বনফুল- এই “মায়া সত্য ভ্রম” চলচ্চিত্রটির ভেতর দিয়ে আপনি সমাজ সভ্যতার জন্য আসলে কী বার্তা নির্মাণ করতে চেয়েছেন?
শমীক- আমি সমাজের কাছে একটি আয়না তুলে ধরেছি এবং কিছু প্রশ্ন ছুঁড়ে দিয়েছি। মানুষের বিশ্বাস, দায়িত্বশীলতা ও সামাজিক দায়বদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছি। সূক্ষ্ম ব্যঙ্গের মাধ্যমে অন্ধবিশ্বাসের বিপরীতে মানুষকে যুক্তিবাদী হতে, প্রশ্ন করতে এবং নিজের জ্ঞান, বুদ্ধি ও তর্কের ক্ষমতাকে ধরে রাখতে আহ্বান জানিয়েছি। এই প্রশ্ন ও বার্তাগুলোই আমি ছবির মাধ্যমে তুলে ধরতে চেয়েছি।
কাজী বনফুল -সিনেমা নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা কী?
শমীক- এক হচ্ছে কিছু ইন্টারন্যাশনাল প্রজেক্টের কথা চলছে সেগুলো সাকসেসফুলি হোক সেটা চাই। আর দ্বিতীয়ত তো, আমি যেভাবে ছবি তৈরি করতে চাই, আমি যে প্রসেসে শুট করি সেটাই হোক, সেটা যেন অনেস্টলি করতে পারি। আমি ফরমায়েসি ছবি করতে চাই না। নিজে যেটা বানাতে চাই, আজীবন যেন সেটাই যেন বানাতে পারি এটাই আমার পরিকল্পনা।

