দৈনিক সংবাদ প্রবাহের সঙ্গে বৃক্ষ ও মানুষের মধ্যে সম্পর্কের গভীরতা, বৃক্ষের ভেষজ গুণাগুণ ও প্রয়োজনীয় বিষয় নিয়ে কথা বলেছেন- বৃক্ষবন্ধু হিসেবে খ্যাত উদ্ভিদবিদ আজহারুল ইসলাম খান। সাক্ষাৎকারটি গ্রহণ করেছেন-কাজী বনফুল।কাজী বনফুল: আপনাকে সবাই বৃক্ষপ্রেমী হিসেবে চেনে। বৃক্ষের প্রতি এই প্রেমটা কীভাবে গড়ে উঠলো, শুরুটা যদি আমাদের বলতেন?আজহারুল: আমার বৃক্ষপ্রেমের শুরুটা আসলে বাবার হাত ধরে। বলতে পারেন, অনেকটা হেরিডিটির মতোই এই ভালোবাসাটা আমার মধ্যে এসেছে। আমার বাবা গাছ লাগাতে খুব ভালোবাসতেন। ছোটবেলায় তিনি আমাকে সঙ্গে নিয়ে বিভিন্ন ধরনের বৃক্ষ, লতা ও গুল্মের পরিচর্যা করতেন। গাছের সঙ্গে বাবার যে মমতা, যত্ন আর ভালোবাসা ছিল, খুব ছোট বয়সেই সেটার গভীর প্রভাব আমার মধ্যে পড়ে। ধীরে ধীরে গাছ আমার কাছে শুধু গাছ থাকেনি, হয়ে উঠেছে আপনজনের মতো। বাবার হাত ধরে যে ভালোবাসার শুরু, সময়ের সঙ্গে সেটাই আমার জীবনের একটা অংশ হয়ে গেছে।কাজী বনফুল: আমরা যতটুকু জানি আপনি এই বৃক্ষ সংক্রান্ত আয়ুর্বেদ বা ভেষজ ঔষধ নিয়ে কাজ করেন। আপনার এই আগ্রহের জায়গাটা কীভাবে সৃষ্টি হলো?আজহারুল: বৃক্ষ তরুলতার চেয়ে আপন বন্ধু, বড় বন্ধু আর নেই। আসলে বৃক্ষের সঙ্গে আমার সম্পর্কটা শুধু ভালোবাসার জায়গায় সীমাবদ্ধ থাকেনি, ধীরে ধীরে সেটা জানার এবং বোঝার জায়গায় চলে গেছে। বিষয়টি আরো গভীর হয়েছে কারণ আমি পড়াশুনা করেছি উদ্ভিদবিজ্ঞান নিয়ে। এছাড়া ছোটবেলা থেকেই গাছের সঙ্গে বড় হয়েছি, কিন্তু একটা সময় আমার মনে প্রশ্ন জাগল, এই গাছগুলো শুধু আমাদের ছায়া, ফল, ফুল বা সৌন্দর্যই দেয় না, মানুষের জীবনে এদের আর কী কী ভূমিকা আছে?সেখান থেকেই ঔষধি উদ্ভিদের প্রতি আমার আগ্রহ তৈরি হয়। আমাদের পূর্বপুরুষেরা আধুনিক চিকিৎসা ব্যবস্থা না থাকা অবস্থায় প্রকৃতির ওপর অনেকটাই নির্ভর করতেন। বিভিন্ন উদ্ভিদের পাতা, ছাল, মূল, ফুল, ফল কিংবা বীজ ব্যবহার করে তারা নানা ধরনের চিকিৎসা পদ্ধতি গড়ে তুলেছিলেন। বিশেষ করে আয়ুর্বেদ বা ভেষজ উদ্ভিদভিত্তিক জ্ঞান আমাকে খুব আকৃষ্ট করেছে। উদ্ভিদবিজ্ঞানে লেখাপড়া করার সময় উদ্ভিদ থেকে প্রাপ্ত ফাইটোকেমিক্যাল নিয়ে পড়াশোনা করেছি, ফার্মাকোলজি শিখেছি। এই লব্ধ জ্ঞান আমাকে উদ্ভিদের প্রতি আরো নির্ভরশীল করে তুলেছে। তাই আমি এটাকে শুধু প্রচলিত বিশ্বাসের জায়গা থেকে দেখি না। কোন উদ্ভিদে কী রাসায়নিক উপাদান আছে, তার সম্ভাব্য কার্যকারিতা কী, কোথায় বৈজ্ঞানিক প্রমাণ আছে আর কোথায় এখনো গবেষণা প্রয়োজন, এগুলো জানার চেষ্টা করি। তাই বলতে পারেন, গাছকে ভালোবাসা থেকেই গাছকে জানার আগ্রহ, আর গাছকে জানতে গিয়েই ঔষধি উদ্ভিদ ও আয়ুর্বেদের প্রতি আমার এই দীর্ঘদিনের আগ্রহ তৈরি হয়েছে। আমার কাছে প্রকৃতি শুধু সৌন্দর্যের বিষয় নয়, প্রকৃতি একটা বিশাল জ্ঞানের ভাণ্ডার।কাজী বনফুল: অনেক সময় দেখা যায় বাজারের অনেক ভেষজ ঔষধ শরীরে নানান ক্ষতিকর প্রভাব ফেলে। আপনার ভেষজ ঔষধ তার বিপরীতে কতটুকু নিরাপদ। এবং এর কোনো ক্ষতিকর পার্শপ্রতিক্রিয়া আছে কি না?আজহারুল: প্রথমেই একটি বিষয় পরিষ্কার করে বলতে চাই, ভেষজ ঔষধ মানেই সম্পূর্ণ নিরাপদ, আর ইচ্ছেমতো খেলেও কোনো ক্ষতি হবে না, এমন ধারণা একেবারেই সঠিক নয়। ভেষজ উপাদানও শরীরে জৈবিক প্রভাব সৃষ্টি করে। তাই এর সঠিক মাত্রা, দিনে কতবার, কখন এবং কীভাবে সেবন করতে হবে, সেসব বিষয় জানা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আরেকটি বিষয় হলো, কোনো ভেষজ ঔষধ সম্পর্কে ১০০% কার্যকর বা কোনো পার্শ্বপ্রতিক্রিয়া নেই এমন দাবি করাও বৈজ্ঞানিকভাবে সমীচীন নয়। কারণ একই ভেষজ উপাদান একেকজন মানুষের শরীরে একেকভাবে প্রতিক্রিয়া করতে পারে।তাই বিষয়টি শুধু ভেষজ ভালো না খারাপ, তা দিয়ে বিচার করা যায় না। ব্যক্তিভেদে সংবেদনশীলতা, সেবনের মাত্রা, বয়স, শারীরিক অবস্থা এবং অন্য কোনো ওষুধ গ্রহণ করছেন কি না, এসব বিষয়ও বিবেচনা করতে হয়। আমি বরং বলব, ভেষজ ঔষধের ক্ষেত্রেও আমাদের সেই একই দায়িত্বশীলতা থাকা উচিত, যা অন্য যেকোনো ঔষধের ক্ষেত্রে থাকা প্রয়োজন। প্রাকৃতিক শব্দটি নিরাপত্তার নিশ্চয়তা নয়। সঠিক ভেষজ, সঠিক মাত্রা, সঠিক পদ্ধতি এবং সঠিক ব্যক্তির জন্য প্রয়োগ করাই হলো নিরাপদ ব্যবহারের মূল কথা।
আর আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, কোনো পণ্যের ভালো দিক যেমন বলা হবে, তেমনি তার সম্ভাব্য ঝুঁকি বা পার্শ্বপ্রতিক্রিয়াও সৎভাবে জানাতে হবে। কারণ মানুষের বিশ্বাস অর্জনের চেয়ে মানুষের নিরাপত্তা ও কল্যাণ অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ। ইকোফুডস এর ত্রিফলা মিক্স, বিটরুট ও রোজেলা চা- তিনটি পণ্যই ল্যাব টেস্ট করা হয়েছে। তবে আমার দেয়া ৬ টি পন্য বিএসটিআইয়ের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত নেই অর্থাৎ এই ধরনের পন্যের জন্য বিএসটিআই এর অনুমোদন লাগে না।
কাজী বনফুল: বৃক্ষ ও তার ভেষজ গুণাগুণ নিয়ে আপনি দীর্ঘদিন যাবৎ কাজ করছেন। মানুষকে আপনি ফেসবুকে বৃক্ষের উপকারিতা ও অপকারিতা নিয়ে নানান বিষয়ে আলোচনা করে থাকেন। ভবিষ্যতে আপনি এই ভেষজ ঔষধ নিয়ে আরো বড় পরিসরে কিছু ভাবছেন কি না যদি আমাদের জানাতেন?আজহারুল: অবশ্যই ভাবছি। বরং বলা যায়, আমার দীর্ঘদিনের কাজের পরবর্তী স্বপ্নই হলো ভেষজ ও প্রাকৃতিক উপাদানকে আরও বৃহৎ পরিসরে মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়া। তবে আমি এটাকে শুধু ব্যবসা হিসেবে দেখতে চাই না। আমার কাছে এটি মানুষের স্বাস্থ্য সচেতনতা এবং প্রকৃতির সঙ্গে মানুষের সম্পর্ককে আরও গভীর করার একটি দায়িত্ব। আমি দীর্ঘদিন ধরে লক্ষ্য করছি, আমাদের চারপাশে অসংখ্য উদ্ভিদ রয়েছে, যেগুলোর অনেকেরই খাদ্য, ভেষজ বা পরিবেশগত গুরুত্ব আছে। কিন্তু একই সঙ্গে এসব উদ্ভিদকে ঘিরে নানা ভুল ধারণা ও অতিরঞ্জিত দাবিও প্রচলিত আছে। আমার ভবিষ্যৎ পরিকল্পনার একটি বড় অংশ হলো বৈজ্ঞানিক তথ্যের ভিত্তিতে ভেষজ উদ্ভিদকে মানুষের সামনে তুলে ধরা।আমি চাই এমন একটি ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, যেখানে কোনো একটি ভেষজ উপাদান সম্পর্কে মানুষ শুধু তার উপকারিতাই জানবে না, বরং তার বৈজ্ঞানিক পরিচয়, কার্যকর উপাদান, কীভাবে ব্যবহার করা যায়, কারা সতর্ক থাকবেন এবং কোথায় চিকিৎসকের পরামর্শ প্রয়োজন, সেটিও জানতে পারবেন।ভবিষ্যতে গবেষণা, মাননিয়ন্ত্রণ এবং বিশেষজ্ঞদের পরামর্শের সমন্বয়ে আরও কিছু প্রাকৃতিক পথ্য নিয়ে কাজ করার ইচ্ছা আছে। একই সঙ্গে তরুণ প্রজন্মকে আমাদের দেশীয় উদ্ভিদসম্পদ সম্পর্কে আগ্রহী করে তোলাও আমার একটি বড় লক্ষ্য। সুস্থতার জন্য প্রকৃতির কাছে ফিরে যাওয়া যেমন প্রয়োজন, তেমনি প্রকৃতিকে বোঝার জন্য বিজ্ঞানকেও সঙ্গে রাখা প্রয়োজন।কাজী বনফুল: আপনার পড়াশোনা, কর্মজীবন এবং দৈনিক সংবাদ প্রবাহের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের উদ্দেশে যদি কিছু বলতে চান?আজহারুল: আমি উদ্ভিদবিদ্যা (Botany) বিষয়ে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেছি। একটি বেসরকারী প্রতিষ্ঠানে দীর্ঘ প্রায় ২৮ বছর দায়িত্ব পালন করেছি এবং কর্মক্ষেত্রে মানুষের সঙ্গে কাজ করতে গিয়ে নেতৃত্ব, শৃঙ্খলা ও দায়িত্ববোধের অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি।বর্তমানে আমি মূলত উদ্ভিদ, প্রকৃতি, ভেষজ জ্ঞান ও পরিবেশ নিয়ে কাজ করছি। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সাধারণ মানুষ এবং উদ্ভিদবিদ্যার শিক্ষার্থীদের কাছে উদ্ভিদ সম্পর্কে বৈজ্ঞানিক ও সঠিক তথ্য সহজ ভাষায় তুলে ধরার চেষ্টা করি।দৈনিক সংবাদ প্রবাহের মাধ্যমে সমাজ ও মানুষের উদ্দেশে বলতে চাই-আমরা যেন শুধু তথ্যের ভোক্তা না হই, সত্যের অনুসন্ধানী হই। বিশেষ করে স্বাস্থ্য, ভেষজ চিকিৎসা, খাদ্য ও প্রকৃতি নিয়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের তথ্য ছড়িয়ে পড়ে। সবকিছু বিশ্বাস করার আগে তার সত্যতা যাচাই করা আমাদের দায়িত্ব।আরেকটি কথা, গাছকে শুধু কাঠ, ফল কিংবা ওষুধের উৎস হিসেবে দেখবেন নাঃ গাছ আমাদের জীবনেরই একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। একটি গাছ বাঁচানো মানে শুধু একটি উদ্ভিদকে বাঁচানো নয়, বরং মাটি, পানি, বায়ু, জীববৈচিত্র্য এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি নিরাপদ পৃথিবীকে রক্ষা করা।আমি বিশ্বাস করি, জ্ঞান তখনই সার্থক হয়, যখন সেই জ্ঞান মানুষের উপকারে আসে। তাই জীবনের বাকি সময়টুকুও উদ্ভিদ, প্রকৃতি ও মানুষের কল্যাণে আমার অর্জিত জ্ঞানটুকু কাজে লাগাতে চাই।

