দৈনিক সংবাদ প্রবাহের সাথে কথা বলেছেন ভারতীয় তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনয় শিল্পী, চিত্রনাট্যকার ও লেখক কৌশিক কর। মঞ্চ থেকে পর্দা, অভিনয় থেকে চলচ্চিত্র পরিচালকহিসেবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আলাদা করে দেখার ও চেনার চেষ্টা করেছেন তিনি।কৌশিক করের সাথে তার চিরন্তন ভাবনাগুলো নিয়ে কথা বলেছেন কাজী বনফুল। দৈনিকসংবাদ প্রবাহে দুই পর্বে সে কথপোকথন প্রকাশিত হবে। এটি প্রথম পর্ব…
কাজী বনফুল – আমরা জানি আপনি একাধারে একজন অভিনেতা, নাট্য পরিচালক, চলচ্চিত্রনির্মাতা। আপনি একত্রে এতগুলো শৈল্পিক সত্তাকে কীভাবে লালন করেন?
কৌশিক কর– আসলে আমি এগুলির একটাও নই। এই পরিচয়গুলো শিল্প–সমাজে আপনাআপনিই গড়ে উঠেছে আমার কর্মের প্রকাশে। শিল্প প্রকাশভঙ্গী বা বলা যেতে পারে মাধ্যমমাত্র। নাট্য,চলচ্চিত্র বা অন্য কোনো শিল্পের কান্ডারী হিসাবে আমাকে দেখা গেলেওসেগুলোর নেপথ্যে আছে আমার কিছু বলতে চাওয়া বা দেখতে পাওয়া। এই দেখা বাদর্শনটাকে মানুষের কাছে পৌছাতে গিয়ে থিয়েটার বা সিনেমাকে মাধ্যম করেছি। মূলতঃআমার কাজ বর্তমান সময়কে অতীত ও ভবিষ্যতের প্রেক্ষাপটে দেখা,আলোচনা ও সমালোচনাকরা এবং একটা দিগদর্শন করা। কোনো একটা বক্তব্য কবিতা,গান,বা এ.আই কিংবাঅ্যানিমেশনেও পরিস্ফুট হতে পারে। আমার হাতের নাগালে,মস্তিষ্কের ক্ষমতায়,ও শারীরিকভাবে –ভঙ্গীমায় যতটা পারা যায়,আমি সেইসব দর্শনকে মানুষের সামনে নানান মাধ্যমে তুলেধরার চেষ্টা করি মাত্র। দু‘ঘন্টার গল্প যদি পাঁচ মিনিটের গানে ধরে ফেলতে পারি বা কোনো ছবিএঁকে বুঝিয়ে দিতে পারি,তখন সেইটাই আমার প্রয়োগ পদ্ধতি হয়ে দাঁড়ায় সেই নির্দিষ্ট ভাবনারজন্য। তাই মাধ্যমকে আলাদা করে লালন করিনা। আমার সহোজাত প্রবৃত্তি সেগুলোকেবলিয়ে করিয়ে নেয় আমাকে দিয়ে। শুধুমাত্র প্রতিটা আলাদা মাধ্যমের আলাদা আলাদাবিজ্ঞান আয়ত্ত করতে হয় প্রতিবারে। যেটা একেবারেই টেকনিক্যাল দিক।
কাজী বনফুল –আপনার এই শৈল্পিক পথে আগমনের শুরুর কথা?
কৌশিক কর – হাজার বছর ধরে আমি এই প্রকাশভঙ্গীকে আয়ত্ত করেছি। আমার জন্মের বহুআগে,আমার পূর্বপুরুষের ডিএনএ‘র সিঁড়ি বেয়ে,আমার অ্যামাইনো অ্যাসিডের সঞ্চিত তথ্যধরে,বার বার বিভিন্ন নাড়িপথে ঘুরে ফিরে এসে আমি এই অভ্যাস জারি রেখেছি। প্রতিবারআমার পঞ্চতত্ত্বে গঠিত দেহ–মন,প্রতিবার পঞ্চভূত থেকে এসেছে,থেকেছে,ধ্বংস হয়ে আবারপরবর্তী যাত্রাপথে সেজে উঠেছে। মা বলতো,গর্ভাবস্থায় গান বা ছন্দ শুনলেই আমি পেটেরভেতরে পারফর্ম করতে শুরু করতাম। তারপর ভূমিষ্ট হবার পর থেকেই অবচেতনে জুড়ে থাকাসেই পারফর্মার খেলা দেখাতে শুরু করেছে।আর খুব চলতি বা বাজারী অর্থে ধরলে পেশাদারীশিল্পী হিসাবে ২০১০ এ মিনার্ভা রেপার্টারী থিয়েটার থেকে শুরু।কিন্তু তার আগেই আমিনিজেকে মেলে ধরেছি, বাল্যকাল থেকেইনাচে,গানে,বাজনায়,বাচালতায়,ভাঁড়ামোতে,লেখালিখিতে,খেলাধূলায়,নাটকে। তারপরে যখনসময় এলো পোক্ত ভাবে,দায়িত্ব নিয়ে কিছু বলার,তখনই প্রাতিষ্ঠানিক পথ চলা শুরু।
কাজী বনফুল – আপনার হাত ধরে গড়ে উঠছে অজস্র গুণী অভিনেতা আপনি এই সৃষ্টিকেকীভাবে অনুধাবন করছেন।
কৌশিক কর – ওরা সকলেই পূর্ব থেকেই গুনী ছিলেন।তারাও হয়ত হাজার বছরের তাড়নায়, মহাযাত্রাপথ থেকে ছিটকে, চুম্বকীয় বা গুরুত্ব আকর্ষণে এসে পড়েছে আমার দিকে বা আমিতাদের দিকে। তারপরে একটা ‘জ্যামিং‘ হয়েছেতত্ত্বের,তথ্যের,চিন্তনের,মননের,প্রকাশভঙ্গীর,পরিবেশের।তখন তাদের বর্তমান পরিচিতিরএক মাধ্যম হয়ে গেছি আমি, যেভাবে কেউ না কেউ আমার পরিচিতির সূত্রপাত করেফেলেছিলেন তার কোনো এক যাত্রাপথে। আমি শুধু তাদের ভেতরের লুকানো আগুনটাকেখুঁচিয়ে হাওয়া দিয়েছি। ধোঁয়া আগে থেকে ছিলো বলেই তা আবার স্ফূলিঙ্গ ফেরত দিয়েছে।সেই সব সৃষ্টি তো আমার নয়।তারাও প্রকৃতির এক একটা উদ্দেশ্য সফল করতে এসেছে,কেউবুঝেছে,কেউ বোঝেনি,কেউ বিখ্যাত হয়েছে বা কেউ কুখ্যাত। এসবে আমার কোনো হাত নেই।আমি আমার কাজ করে গেছি মাত্র। আর তাদের উপকরণ হিসাবেই দেখেছি। আমি নিজেসরঞ্জাম সেজেছি।
কাজী বনফুল – কীভাবে একটি চলচ্চিত্র সকলের চলচ্চিত্র হয়ে উঠতে পারে বলে আপনি মনেকরেন?
কৌশিক কর– ‘সকলের চলচ্চিত্র‘ সেদিনই সম্ভব যেদিন সকলের সামাজিক অবস্থান সমানহবে।শিক্ষা,রুচি,মনন,চিন্তন,রোজগার,খাদ্য,বস্ত্র,বাসস্থানের ফারাকে কোনোদিন জন–মনএকধরনের গড়ে উঠতে পারেনা। বেঁচে থাকার কারণ –কার্যই সম্পূর্ণ বদলে যায় নানানশ্রেণিতে। তাই সার্বিক গ্রহনযোগ্যতা একটা অলীক কথা এই সমাজের ভিত্তিতে দাঁড়িয়ে।নন্দনে বিরাট পর্দায় বসে খোলা মাঠ,কাশফুল,আর ট্রেন চলে যাওয়া দেখে তারা আপ্লুতহয়,’যাদের কপালে আর সেসব নেই;যাদের সূর্য মাথার ওপর ওঠে মাত্র ১১–১২ টার মধ্যে;বাকীসময় ঢেকে থাকে আকাশচুম্বী অট্টালিকায়;যাদের কানে আর মা ঠাকুমার দূরের ডাক ভেসেআসেনা;তালের বড়া আর পুঁটিমাছ ভাজার গন্ধ বিলীন হয়ে গেছে যাদের ইন্দ্রিয়গুলোথেকে;তাদের কাঙ্ক্ষিত ভালো লাগার সিনেমাটা‘,আর ‘যাদের কপালে সারাদিন ওইকাশফুল,অসহ্য রোদ,পচা কাদা,খালি পেট আর ট্রেন যাতায়াত দেখতে দেখতে ক্লান্তিই সম্বল; দিনান্তে তাদের সাদা–সুন্দরী,ঝকঝকে মল আর রঙীন জমকালো নাচ–গান –মারামারি দেখেবৃহত্তর দুনিয়ার বুঝে নেবার স্বাদের সিনেমাটা‘ আলাদা হতেই হবে। মানুষ তো শুধু গল্প জানারজন্য সিনেমা দ্যাখে না,সেসবের জন্য সাহিত্য আছে,সাহিত্যের নানান বিভাগ আছে।মানুষসিনেমা দ্যাখে স্থান–কাল–পাত্রে একটা বিষয়কে সম্পূর্ণরূপে, সকল ইন্দ্রিয় দ্বারা উপভোগকরতে আর তার কল্পলোকের দ্বারা সেই মায়াময় পরিবেশে এক গভীর ক্যাথারসিসে ডুবতে।তাই সকলের জন্য আদর্শ, এমন চলচিত্র বানানো যায় না চট করে।
কাজী বনফুল – আপনার প্রিয় পাঁচটি সিনেমা?
কৌশিক কর –
লাইফ ইজ বিউটিফুল
ইন্টারস্টেলার
অ্যাপোক্যালিপ্টো
দ্য বাইসাইকেল থিফ
অ্যামেরোস পেরোস
আরো আছে,অনেক….

