বৃহস্পতিবার | অক্টোবর ১৫ | ২০২৬

দৈনিক সংবাদ প্রবাহের সাথে কথা বলেছেন ভারতীয় তরুণ চলচ্চিত্র নির্মাতা, অভিনয় শিল্পী, চিত্রনাট্যকার ও লেখক কৌশিক কর। মঞ্চ থেকে পর্দা, অভিনয় থেকে চলচ্চিত্র পরিচালক হিসেবে জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে আলাদা করে দেখার ও চেনার চেষ্টা করেছেন তিনি। কৌশিক করের সাথে তার চিরন্তন ভাবনাগুলো নিয়ে কথা বলেছেন কাজী বনফুল। দৈনিক সংবাদ প্রবাহে দুই পর্বের সাক্ষাৎকারের এটি শেষ পর্ব…

কাজী বনফুল: গত পর্বের সাক্ষাৎকারে আপনি সমাজ, মানুষ, শ্রেণীর ব্যবধানের কথা বলতে গিয়ে ট্রেন ও কাশফুলের মধ্যে দিয়ে সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীকে উপমা হিসেবে টেনে এনেছেন। আপনান বক্তব্যে তাহলে কী সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীকে একটু পাশ কাটানো হলো কীনা বা আপনি কী মনে করেন সত্যজিৎ রায়ের পথের পাঁচালীর কাশফুল, খোলা মাঠ, খোলা আকাশ এবং সভ্যতার আগমনের চিহ্ন স্বরূপ যে ট্রেনকে দেখানো হয়েছে সেটা সমাজ সভ্যতার সাথে কোন একটা জায়গায় অযাচিত বা সাংঘর্ষিক?

কৌশিক কর: একেবারেই তা নয়। বরং উল্টোটাই। পথের পাঁচালীতে সত্যজিৎ রায় যে ল্যান্ডমার্ক সেট করে দিয়েছেন,পরবর্তীকালে সিনেমা সমালোচকদের সেখান থেকে না নড়তে পারাটাকেই আমি সমালোচনা করেছি। উদাহরণস্বরূপ,এলিট ক্লাস যেখানে ‘পথের পাঁচালী’ বা ‘কোমল গান্ধার’কে ফুলমার্কস দিচ্ছেন, সেখানে ‘বেদের মেয়ে জোৎস্না’কে মেধাহীন ছবির দলে ফেলতে চাইছেন। এই পৃথকীকরণকে আমি আপত্তি জানাচ্ছি। আমাদের দেশ কৃষিভিত্তিক দেশ। যেখানে আশি শতাংশই কৃষক ও তাদের সংস্কৃতির একটা লৌকিক আবেদন আছে। কেন সাপ আমাদের ইমোশনের সঙ্গে জড়িয়ে, কেন বেদ-বেদেনীর গল্প আমাদের মাটির কাছের তা সবার আগে বুঝতে হবে। সাপকে পুজো করার এই রীতি আসলে অর্থনীতির আবেগের সঙ্গে জড়িত। বাংলার কোটি কোটি কৃষকের কুইন্টাল কুইন্টাল ধান রক্ষা করে সাপ তার খাদ্য-শৃঙ্খলের নিয়ম মেনেই। সাপ না থাকলে মাঠের ইঁদুর মাঠের ধান শেষ করে ফেলতো। তাই এই সাপকে বাঁচিয়ে রাখার উদ্দেশ্যেই তাকে পুজো করার ধর্মীয় রীতি মানে তারা। আর হাজারটা প্রাণির মতোই নির্দিষ্ট সময়ে অম্বুবাচীর আশেপাশেই সাপে ডিম পাড়ে।সেসময় সাপের অতি ছোট বাচ্চারা ছড়িয়ে পড়ে চাষীর বাড়ি-ঘর-দোর-উঠোনের নানান আনাচে কানাচে। সেই বিপদ থেকে বাঁচতে তারা তাদের ফসল-রক্ষক সাপকে মারে না, বরং ওই সময় মনসা পুজোর রীতি পালন ক’রে রোজ ঘন্টাধ্বনি, কাঁসরধ্বনিসহ ধূপ-ধুনো সহ নিরামিশ জীবন পালন করে। এতে শব্দের তীব্র ফ্রিকোয়েন্সীর ফলে সাপের অনভিজ্ঞ ছোট বাচ্চারা স্বাভাবিকভাবেই মূল ভিটা থেকে দূরে সরে থাকে ভয়ে, আঁশটে আকর্ষণও কমে যায়। একই কারণেই বছর ধরে শাঁখ, ঘন্টা, কাঁসর বাজানো হয় সন্ধ্যেতে। কারণ সূর্য ডুবলেই এরা শিকারে বেরোয় ও খাদ্যের গন্ধে আকর্ষিত হয়ে চলে আসে ভিটাতে। তাই প্রতিরোধ গড়তেই শব্দকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা হয়। কারণ সাপ পরিস্থিতিকে মাপে শব্দ অনুভব করেই। (তারা জানে অতিরিক্ত সাপকে খাবার জন্য গোসাপ আছে।সব প্রাণিই সবটা খেয়ে ফেলে না এক সিজনে। কিছু খায়, কিছু বাঁচিয়ে রাখে)। তাই এই রীতি, নীতিগুলো তাদের অর্থনীতিকে পরিপুষ্ট করে বলেই দেশের সাধারণ কৃষকের সাপের সঙ্গে যাপনের একটা প্রজন্মান্তরে সম্পর্ক থেকেই গেছে। তাই বেদ-বেদেনীর গল্প, তাদের প্রেম-প্রত্যাখানের স্থূল ও চড়া রসের আখ্যানকে, নিজের শহরকেন্দ্রিক সংকীর্ণ দর্শন দিয়ে মেপে, নান্দনিকতার চূড়ান্ত মার্কশীট ঘোষণা করে দিলে খুব হতাশা জাগে। এই সমালোচকেরা ভুলে যান যে, শ্রম থেকেই শিল্পের উৎপত্তি। অমন ঠান্ডা ঘরে বসে চারটে চটুল কথার জাগলারিতে কোনো নান্দনিকতা নেই,এস্থেটিক নেই, সংস্কৃতিও নেই- যা আছে চাষীর ধানভাঙার গানে, সাপ বন্দনার সুরে, শ্রমিকের সম্মিলিত শ্রমের তালে-ছন্দে। আসলে শিল্পকে বাইরে থেকে বুঝে, মুখস্ত ও অভ্যস্ত টীকা কপচানো দেখলে আর ক্রমাগত এক-পাক্ষিক তর্জা শুনলে আমার বদহজম হয়, ঢেঁকুর ওঠে মস্তিষ্কে।

কাজী বনফুল: আপনার পরিচালিত চলচ্চিত্র পর্ণমোচি, ছিপকালি, ফটাস এবং আপনার অভিনীত চলচ্চিত্র লড়াই, ব্যোমকেশ, এক যে ছিল রাজা, সব ভূতুড়ে, চাবিওয়ালাসহ আরো অসংখ্য চলচ্চিত্রে আপনি অভিনয় করেছেন। সব মিলিয়ে এই পথ চলার অভিজ্ঞতা ও অনুভূতি যদি আমাদের বলতেন?

কৌশিক কর:  সিনেমা শুরুর অভিজ্ঞতাটাই বেশ রাজকীয়। প্রসেনজিৎ চ্যাটার্জির সঙ্গে আর একটি প্রধান চরিত্রে অভিনয়, পরমব্রত চট্টোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকের সিনেমার মূল চরিত্রের সুযোগ আসে আমার “লড়াই” সিনেমাতে। সেই সিনেমার সূত্র ধরে মোহনবাগান মাঠে দীর্ঘদিন ফুটবল অভ্যাস, পি.কে’র মতো কোচের ক্লাস, বড় প্লেয়ারদের সঙ্গে অভ্যাস, বড় প্রযোজনা সংস্থার আয়োজনে বিরাট টিমের শ্যুটিং আমার দেখাটাকেই বড় করে দিয়েছিলো। তারপর একে একে নায়ক, ভিলেন, এক-দু সিন চরিত্র, টিভি, সিরিজ; আমি কিছু ছাড়িনি- কারণ অভিনয় করতে আমার খুব ভালো লাগতো। বলাই বাহুল্য অভিনয়ের থেকেও অভিনেতার জীবনটাকে আমি লুটে পুটে অনুভব করতাম বেশী। এই আমি পুরুলিয়ার গভীর জঙ্গলে মাওবাদী হয়ে বন্দুক হাতে গর্জে উঠছি, তো সে’ই আমি এভারেস্টের কনকনে ঠান্ডায় পর্বতারোহন করছি; এই আমি হাজার ফিট উচ্চতায় আকাশে উড়ছি পাখির মতো, তো সে’ই আমি জল-কাদামাটিতে প্রেমিকার হাত ধরে দৌড়াচ্ছি; এই আমি ঘোড়া ছুটিয়ে পাহাড় পেরোচ্ছি, ফাঁসুড়ে ঠগ হয়ে তো সে’ই আমি বাইকে গ্যাং নিয়ে ভয়ংকর মাইনে -কোলিয়ারিতে গুন্ডামো করছি বিষাক্ত গ্যাসের মধ্যে; এই আমি বিপ্লবী হয়ে ইংরেজ ঠেঙাচ্ছি তো সে’ই আমি ইংরেজ সেজে বিপ্লবী ঠেঙাচ্ছি; এই আমি সিনেমার প্রমোশনে সেভেন স্টারের বাথটবে ফেনায় ডুবে আছি, তো সে’ই আমি এন.এস.ডির বিরাট মঞ্চে পরিচালকের সম্মান নিচ্ছি আর করতালি শুনে বুঁদ হচ্ছি আত্মপ্রেমে। এই জীবনটায় যে কত কত মধু আছে তা অভিনেতার জীবন না হলে বুঝতাম না। পর পর কাজ পেয়ে গেছি স্বনামধন্য পরিচালক ও হাউসের সঙ্গে। আর তারপরেই একসময় থমকেছি “পারপাস” বা “উদ্দেশ্য” এর প্রশ্নে। ক্রমেই বুঝতে পারছিলাম সিনেমা জগতের অসাড়তা ও অন্ধকার দিকটা। পাশাপাশি থিয়েটারেও তখন নাম, একই সঙ্গে নন্দনে “পর্ণমোচী” সিনেমা ও আকাডেমিতে “অটো” নাটক, দুটোই হাউসফুল যাচ্ছে! কিন্তু আমার মনে বৈরাগ্য দেখা দিচ্ছে একই সাথে। দ্রুত সব কিছু আয়ত্ত করার ধাক্কাই হোক বা ফ্যান্টাসির আড়ালে সত্য-দর্শন হোক, আমাকে ক্রমেই বিমুখ করে তুলছিলো সিনেমা ও থিয়েটার জগতের প্রতি। বক্তব্য ও ব্যক্তিত্বের সংঘাত হচ্ছিলো আমার অভিজ্ঞতায়। একদিকে দেখছি-মিশছি-আদর পাচ্ছি সিনেমা দুনিয়ার তাবড় সেলিব্রিটিদের কাছে, অপরদিকে থিয়েটার সূত্রে প্রসিদ্ধ কবি, শিল্পী, সাহিত্যিক, নাট্যব্যক্তিত্বদের চোখের মণি হয়ে আশীর্বাদ কুড়িয়ে পুরষ্কার নিচ্ছি,পাশাপাশি সেই স্রোতে ভেসেই ক্ষমতার গা ঘেঁষে নানান সুযোগ সুবিধা পেয়ে যাচ্ছি মন্ত্রী-আমলা-রাজনৈতিক ক্ষমতাসম্পন্ন ব্যক্তিত্বদের কাছ থেকে। থিয়েটারটাও শুরু করা সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো অভিনেতা ও সুমন মুখোপাধ্যায়ের মতো পরিচালকের তত্ত্বাবধানে। রাজা লীয়রের মতো বিগ বাজেট নাটকে বিরাট সরকারি পরিকাঠামোতে। তাই শুরু থেকেই সিংহাসন ও তার পেছনের ঘটনা আমার পেশাদারী জীবনের বিশ্বাস নড়িয়ে দিয়েছিলো। উদ্দেশ্যহীন আর্ট আর জাঁকজমজপূর্ন শিল্পকলা আমাকে হাজার বছরের প্রতিবাদী প্রশ্ন করা শুরু করেছিলো অন্তরে অন্তরে। ততদিনে বিখ্যাত হবার বাসনাও মনে লোভ জাগিয়ে তুফান তুলেছে। ক্রমে সিরিজগুলোতে অসম্ভব ক্রাইম, সেক্স, ভায়োলেন্সে অভিনয় করতে করতে মনে প্রশ্ন আসতে থাকলো ভিউয়ারদের “মেন্টাল হেলথ ” নিয়ে। থিয়েটারে গ্রান্ট, দুর্নীতি, রাজনৈতিক আগ্রাসন নিয়েও বিরক্ত হচ্ছিলাম। ক্রমেই আমি সিনেমা ও থিয়েটারে প্রশ্নবাজ মানুষ হয়ে উঠলাম। “কেন” এই কাজটায় আমি অংশগ্রহণ করবো তা আমার মহা-প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো! ব্যাস! যা হবার তাই হতে থাকলো। একদিকে আমার ক্রমে আসতে থাকা বৈরাগ্য আর অন্যদিকে প্রতিষ্ঠানের চোখের বালি হয়ে ওঠা, আমাকে একেবারে উপড়ে এনে মাটিতে ফেললো। আমি করালী (হাসুলী বাঁকের উপকথা) সেজে যে হাততালি হাউসফুল মঞ্চে পেয়েও লজ্জিত হচ্ছিলাম, সে’ই বিনা হাততালির ধান লাগানো,সত্যিকারের মাঠে-জলে নেমে আরাম পেলো অধিক। আমি ক্রমেই আর্টকে অভ্যাসে আয়ত্ত করছিলাম,’রিয়াল’ লাইফে। ‘রিল’ লাইফের ওপর-চালাক লোকেদের থেকে দূরে এনে ফেলে শান্তি পাচ্ছিলাম মাঠে, কৃষিতে, সবুজে। আর সেই সময়েই এলো লক ডাউন। আর এই পর্যায়ে আমি একেবারে সরে এলাম মানুষ সম্পর্কিত আর্ট ও বাকী বিষয়গুলি থেকে। যখন দেখলাম মাত্র একটা ছোঁয়াচ রোগের ভয়ে মানুষ তার প্রিয় সম্পর্কগুলোর হাত ধরা ছাড়ছে, সারা দুনিয়া ভ্যাকসিন নিচ্ছে আর নিজেকে বাবা, মা, ভাই, বোন, স্বামী, স্ত্রী, বন্ধু, স্বজন থেকে আলাদা করছে স্বার্থপরের মতো। অসহায় দুনিয়াতে আমি তখন একা। আজো ভ্যাকসিন না নেওয়া একটা সম্পূর্ণ একা মানুষ হিসাবে টিঁকে আছি সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে। তাই কিছুদিন সরিয়ে নিলাম নিজেকে এই জগৎ থেকে। যেহেতু আমার কাজই ছিলো জনসংযোগের। যেখানে ‘জন’ ক্রমেই সংযোগ হারিয়ে এক ভার্চুয়াল দুনিয়ায় মনোনিবেশ করলো আর করোনা পরবর্তী কালে এক স্বার্থপর ও সমাজের জন্ম দিলো। আমি তখন থেকেই আমার আর্টকে আরো অন্তর্মুখী করে ফেলে যোগে ডুবে গেলাম। আর সেখান থেকেই পেলাম এক নতুন চেতনা, যা আমাকে চেনালো হাজার বছরের পথ চলার অভিজ্ঞতা। বড্ড বেশী বাইরেটা নিয়ে ব্যাস্ত থাকার ফলে নিজেকে চেনা শুরু হতে অনেক সময় লেগে গেলো। আর তারপরেই শুরু করলাম এ পর্যায়ে নতুনভাবে। “শূন্য” নামক দলটার জন্ম দিয়ে “বিশ্বরূপম” ও ” এবার খলনায়কের পালা” আমার নতুন যাত্রাপথের সামান্য পুঁজি হলো। তার আগের সিনেমা বা থিয়েটারের অভিজ্ঞতা আমার আজ ছেলেমানুষী ছাড়া আর কিছুই মনে হয়না। ওসব উইকিপিডিয়ায় দেখায় ঠিকই,ও আমার নয়। ওটা কৌশিক করের তথ্য জানতে কাজে লাগে। আমি ত সবে আমাকে জানা শুরু করেছি।

কাজী বনফুল: চলচ্চিত্র ও নাট্য জগতে প্রবেশের পর আপনার সাথে ঘটা এমন কোন ঘটনা যা কোথাও বলা হয়নি?

কৌশিক কর: প্রকাশ্যে না বললেও, খুব কাছের দু একজনকে বলেছি। এই একটা ঘটনা আমাকে আমূল কাঁপিয়ে দিয়েছিলো।এমনিতেই চন্দ্রগুপ্ত (মিনার্ভা রেপার্টারী থিয়েটারের প্রযোজনায় নামভুমিকায়) নাটকের শো এর মাত্র আধ ঘন্টা আগে আমার মায়ের আকস্মিক মৃত্যু-সংবাদ আমায় নিজেকে নতুন ভাবে চিনিয়েছিলো, ওইদিন শো শেষ করা অবধি আবেগ ধরে রেখে নিজের কর্তব্য করে যেতে রবীন্দ্রসদন-ভর্তি মানুষের প্রতি। কিন্তু তার থেকেও শ্লো-বার্নিং এক অভিজ্ঞতা আমার সম্পূর্ণ বদল এনে দেয়। সালটা ২০১৮, অটো (নবারুণ ভট্টাচার্য) নাটকে চন্দন নামে এক ধ্বজর চরিত্রে অভিনয় করি তখন। এর আগে আমাকে পরিচালকেরা যা কাস্ট করেছেন বা আমি নিজের পরিচালনায় যে চরিত্র করেছি সেগুলো সবই বলশালী, তেজী, যোদ্ধা, প্রতিবাদী, এনার্জিটিক চরিত্র; যেমন করালী, চন্দ্রগুপ্ত, উদাস (দেবী সর্পমস্তা)। কিন্তু এ পর্যায়ে একজন শারীরিক অক্ষম মানুষ, স্ত্রী সেই কারণে পরকীয়া করে তাকে ছেড়ে চলে যাচ্ছে, এহেন অসহায় চরিত্র করিনি। এদিকে নাটকটা সুপারহিট করে যাচ্ছে। অভিনেতা,পরিচালক হিসাবে অনেক পুরষ্কারও জুটছে, গ্রীনরুমে দীর্ঘসময় ধরে পোস্ট-শো রিয়াকশনে আপ্লুত হচ্ছি। কিন্তু এরই ফাঁকে ফোঁকরে, মাঝে মধ্যেই, এমন এক-আধটা প্রতিক্রিয়া আসতে লাগলো, যা অন্যান্য নাটকের থেকে সম্পূর্ণ ভিন্ন। পিঠ-চাপড়ানি বা সাবাসি দেবার বদলে কিছু দর্শক খুব কাছে এসে, হাতটা চেপে ধরে, কানের কাছে মুখ নিয়ে এসে বলতে লাগলো, ‘এই যন্ত্রণা ত সবাই বোঝেনা’! এই ধরণের মন্তব্য! প্রথম দিন বুকে ছ্যাঁক করে লেগেছিলো এই ভেবে যে, “আমাকে ধ্বজ ভাবছে নাকি? আমি বুঝি মানে? আমাকে কি চন্দনের সঙ্গে ঘুলিয়ে ফেলছে?”বেশ বুঝতাম কেউ কেউ নিজের যৌন-অক্ষমতা জনিত সম্পর্ক ভাঙার অভিজ্ঞতায় আমাকে একাত্ম অনুভব করছেন। তাদের এই একাত্ম অনুভবটা আমাকে পীড়া দিতে শুরু করলো। আমি ক্রমেই গভীর চিন্তায় পড়ে গেলাম। আমি এতদিন বীর, সাহসী, বিপ্লবী, এমন ইমেজেই পরিচিত ছিলাম। হঠাৎ ধ্বজর ইমেজ গায়ে মাখতে আমার আপত্তি কিসের? এই শুরু হোলো অভিনেতার প্রথম দ্বন্দ্ব। খুব গভীরে আমি নিজেকে একদিন প্রশ্ন করলাম,”কৌশিক, তুমি যদি চন্দনের অসহায়ত্ব কৌশিকের গায়ে মাখতে অস্বীকার করো, তাহলে এতদিন যে মানুষগুলো তোমাকে চন্দ্রগুপ্তের মতো যোদ্ধা,করালীর মতো ডাকাবুকো, উদাসের মতো দুর্ধর্ষ ভেবে পিঠ চাবড়ে গেছে,সেইসব চরিত্রের বীরত্বের ক্ষীর নিজ গায়ে মেখেছো কেন? তুমি যদি চন্দনের মতো অসহায় ধ্বজ না হও, তাহলে চন্দ্রগুপ্তের মতো বীর যোদ্ধাও না। তাহলে ‘তুমি’ কে?” এই যে প্রশ্ন এলো আমার ভেতর থেকে, তা আমাকে সব ছেড়ে ছুড়ে মাঠে পালাতে বাধ্য করেছিলো কেরিয়ারের মধ্য গগনে ছেড়ে। যেখান থেকে আমার নিজেকে চেনা শুরু হলো।আমি কে? আমি কেন? এই প্রশ্ন আমাকে বিশ্বরূপ দেখালো ক্রমে ও নিজেকে চেনালো শূন্য হিসাবে। আমি আকার ও নিরাকারের অঙ্ককে “শূন্য” আর “এক” এর বায়োনারিতে ধরতে শিখে ফেললাম। ভাব ও বস্তুর আদান প্রদান বুঝলাম। আজো বুঝে চলেছি.. বাকীটা বুঝে ফেলতেই হবে,এবারে না হোক,আরো আগামী হাজার বছরে……

কাজী বনফুল: চলচ্চিত্র নির্মাণ নিয়ে আপনার ভবিষ্যৎ ভাবনা?

কৌশিক কর: চলচিত্র নির্মাণকে আরো স্বাধীন, সহজ ও ঘরোয়া করতে মন চায়। ইন্ড্রাস্ট্রি যেভাবে কর্পোরেট ডমিনেটেড হয়ে উঠছে, যেভাবে আর্ট ও আর্টিস্টকে নিয়ন্ত্রণ করতে চাইছে পুঁজিপতিরা, তাতে আমার ঘোর আপত্তি ও ভয়। একটা কবিতা লিখতে, ছবি আঁকতে বা গল্প লিখতে ফেডারেশন লাগে না, গিল্ড লাগে না, কিন্তু ছবি বানাতে গেলে প্রচুর ঝামেলা পোহাতে হয় এইসবের। এইখানে মুক্তি চাই। মানছি সিনেমা দলগত কাজ, তাই দলের সকলের অধিকার যাতে খর্ব না হয়, বা প্রারিশ্রমিকে বঞ্চনা না হয়, তাই এই সংগঠনগুলোকে দরকার। তার মানে এই নয় যে এই সংগঠনগুলোই সিনেমাকে চালিত করবে। আর বাংলার সিনেমা ঠিক এইখানেই ক্রমে মরে যাচ্ছে। শত্রু আটকাতে যেমন আর্মির দরকার, কিন্তু আর্মি চালিত সরকার হলে চাপটা অন্যত্র হয়ে যায়। তেমনই রক্ষক এখানে ভক্ষক হয়ে যাচ্ছে। আবার সরকার তার ভোটব্যাঙ্ক বাঁচাতে এই সংগঠনগুলোর শক্তিকে এড়াতে পারে না। তাই ক্রমেই দরকার হয়ে পড়ছে বিকল্প পথ। বিশেষ করে আজকের যুগে যেখানে হাই-রেজ্যুলেশন ক্যামেরা বা আনুসঙ্গিক যন্ত্রপাতি খুব হালকা, সহজ ও ছোট আকার আয়তনে চলে এসেছে হাতের নাগালে, সেখানে বাড়িতে বসেই সিনেমা বানানো সম্ভব। আর দেখানোর জন্য ইন্টারনেট। জরুরী নয় যে ইন্ড্রাস্ট্রির মধ্যে ঢুকে তবেই সিনেমা বানাতে হবে। এই ধরনের ইন্ড্রাস্ট্রিগুলো পুরোপুরি ক্ষমতাশালীদের নিয়ন্ত্রণে আছে। যারা কখনোই আপনাকে স্বাধীন সিনেমা বানাতে দেবে না, যা তাদের আগ্রাসনের পর্দা ফাঁস করে দেয়। তারা চাইবে সবসময় চানাচুরের মতো কুড়মুড়ে বিনোদন যা ব্যবসার ক্ষেত্রেও লাভজনক আবার বক্তব্যের ক্ষেত্রে নিরাপদ। স্বাধীনচেতা মানুষের হাতে ক্যামেরা বা কলম, দুটোই বিপজ্জনক ঠেকে ওদের।
তাই আগামীতে ক্যামেরার বিকল্প হিসাবে এ.আই-কে আমি এগিয়ে রাখবো। বলাই বাহুল্য ক্যামেরা, লাইট, অভিনেতাসহ বাকী উপকরণ ও সরঞ্জাম যা লাগে তা সবই এখানে মজুত। উদ্দেশ্য যদি হয় একটা গল্প বলা বা বিষয়কে উপস্থাপনা করা,তাহলে এ.আই টুলসগুলো অনেক বেশী কার্যকরী ও স্বাধীন। সিনেমা মানেই নকল। তাই পর্দায় যেটা দেখতে পাচ্ছি সেটা এ.আই দিয়ে নাকি ক্যামেরায় শ্যুটিং করে বানানো,সেটা আর ফ্যাক্টর করে না। নির্মাতার পারপাস বা উদ্দেশ্য পূরণ হলেই হলো। ঋত্বিক ঘটক তার বক্তব্যের জন্য সিনেমা বানাতেন। তিনি বলতেন, থিয়েটারের থেকে ভালো মাধ্যম ক্যামেরা, যেদিন ক্যামেরার থেকেও ভালো মাধ্যম পাবো,সেদিন ক্যামেরাকে লাথি মেরে বেরিয়ে যাবো। আজ এ.আই হাতে পেলে উনি সেইটাই করতেন বলে আমার বিশ্বাস। না তেল মারতে হতো প্রযোজককে, না ক্যামেরাম্যানের মাতব্বরি শুনতে হতো, না অভিনেতাদের ট্যান্ট্রাম সহ্য করতে হোতো। বিশেষ করে এ.আই বর্তমান টিভিসিরিয়াল বা সিনেমার অভিনেতাদের থেকে অনেক ভালো অভিনয় করছে। যেখানে একটি দুটি রসের বাইরে অভিনেতারা বেরোতেই পারে না, সেখানে নব-রসে অভিনয় করছে এ.আই। আল্টিমেট তো সবটাই অংক। ক্যামেরাও আলো ও শব্দের অংক। এ.আই আরো বিস্তারিত কোয়ান্টাম মেকানিজমের অংশ। আগামীতে যা আরো নিখুঁত ও ক্ষমতাসম্পন্ন হয়ে উঠবে।

কাজী বনফুল: আপনার প্রিয় এমন পাঁচটি বই যা আপনাকে সবসময় মনে করিয়ে দেয় যে আপনি বই গুলোর একান্ত আত্মীয়?

কৌশিক কর:
নীলকন্ঠ পাখির খোঁজে
নাস্তিক পন্ডিতের ভিটা
রক্তকরবী
হাঁসুলী বাঁকের উপকথা
দেবযান

কাজী বনফুল: দৈনিক সংবাদ প্রবাহের মাধ্যমে যদি আপনার অনুরাগীদের কিছু বলতে চান।

কৌশিক কর: বাংলাদেশ, দৈনিক সংবাদ প্রবাহ এবং আপনার প্রতি অজস্র ভালোবাসা রইলো কাজী বনফুল। পরিশেষে ছোট মুখে হয়ত বড় কথাই বলতে চাই সকলকে। আমাদের পকেট থেকে ওই পরিচয়পত্র সরিয়ে দিলে, নাম- ধাম -পরিচয়- নাগরিকত্ব কিছুই যখন প্রমাণ করা যাবে না, তাহলে কেন আমরা সেগুলোকেই আমাদের পরিচয়পত্র ভেবে আঁকড়ে বসে আছি? আমাদের পরিচয় কি শুধুই রাষ্ট্রীয় পরিচয়পত্রে? নাকি আপনি সেই ‘নাম’ মাত্র, যা ছাপা হয়েছে আপনার মাথায় বাল্যকাল থেকে? নাকি তার বাইরে, প্রামাণ্য কাগজ পত্রের তথ্যের বাইরে আরো কিছু? আরো সত্য? কি সেই অস্তিত্ব? কি সেই উদ্দেশ্য? যেহেতু ফিজিক্সের সবটাই কারণ-কার্যে বাঁধা, তাই কি সেই কারণ, যার জন্য আপনার জন্ম? কেন? নিজেকে ‘কেন’ দিয়ে প্রশ্ন করুন প্রতিটি কাজে, প্রতিটি বিষয়ে, তাহলেই এক যাত্রাপথ আপনার সামনে খুলে যাবে। এই মাল্টি-ডায়মেনশনাল প্রকৃতি আপনাকে স্থান-কাল-পাত্র ভেদে আলাদা আলাদা সময়ের, আলাদা আলাদা মাত্রার খেলা দেখাবে। যার একটিও সত্য নয়, আবার সবই সত্য। আপনি শুধু কোন সত্যের স্তরে নিজের খেলাটাকে জারি রাখবেন, তা আপনার ‘গতি’ই আপনাকে ঠিক করে দেবে সময়-জ্বালের কোল ঘেঁষে। শুধু সেই গতি ও অতিক্রান্ত দূরত্বের হিসাব বুঝে গেলেই কালের খেলার কেল্লাফতে।

Share.
Exit mobile version