জাফর ইকবাল, শিবগঞ্জ (বগুড়া) প্রতিবেদক
একসময় বগুড়ার শিবগঞ্জের গ্রামাঞ্চলে শীতের মৌসুম এলেই দেখা মিলত আখের ক্ষেত আর গুড় তৈরির ব্যস্ততা। মাঠ থেকে আখ কেটে রস বের করা, বড় কড়াইয়ে ঘণ্টার পর ঘণ্টা জ্বাল দেওয়া—এরপর সেই রস থেকেই তৈরি হতো সুস্বাদু গুড়। সময়ের সঙ্গে আখ চাষ কমেছে, কমেছে ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে গুড় তৈরির আয়োজনও। ফলে নতুন প্রজন্মের অনেকের কাছেই আখ থেকে গুড় তৈরির দৃশ্য এখন অনেকটাই নতুন।
তবে পুরোনো সেই ঐতিহ্য ধরে রেখেছেন বগুড়ার নবগঠিত মোকামতলা উপজেলার রহবল এলাকার অবসরপ্রাপ্ত প্রধান শিক্ষক বিনয় মাস্টার। শিক্ষকতা থেকে অবসরে গিয়ে তিনি সাড়ে তিন বিঘা জমিতে আখ চাষ করছেন। একই সঙ্গে নিজের চাষ করা আখ থেকে নিজেই তৈরি করছেন গুড়। এতে একদিকে যেমন তার অবসর সময় কাটছে, অন্যদিকে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যও ফিরে পাচ্ছে নতুন প্রাণ।
বুধবার সকালে রহবল বর্মসর এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, জমিতে সারি সারি আখ। পরিপক্ব আখ কেটে সংগ্রহ করে সেগুলো নেওয়া হচ্ছে রস বের করার মেশিনের কাছে। মেশিনে চাপ দিয়ে আখ থেকে বের করা হচ্ছে রস। সেই রস কলাগাছের বাকল দিয়ে তৈরি নালার মাধ্যমে জড়ো হচ্ছে বড় একটি পাত্রে।
এরপর শুরু হয় গুড় তৈরির মূল প্রক্রিয়া। বড় কড়াইয়ে আখের রস ঢেলে চুলায় জ্বাল দেওয়া হয়। প্রায় তিন থেকে সাড়ে তিন ঘণ্টা ধরে জ্বাল দেওয়ার পর ধীরে ধীরে রসের পানি কমে আসতে থাকে। আগুনের তাপে একপর্যায়ে ঘন হয়ে যায় রস।
এরপর কড়াইটি চুলা থেকে নামিয়ে কাঠের নাড়ানি দিয়ে কিছুক্ষণ নাড়াচাড়া করা হয়। ধীরে ধীরে ঘন রস জমতে শুরু করে এবং একপর্যায়ে তা গুড় তৈরির উপযোগী হয়। পরে সেটি নামিয়ে এনে তৈরি করা হয় সুস্বাদু আখের গুড়।
গুড় তৈরির পর নির্দিষ্ট পরিমাণে ওজন করা হয়।প্রায় আধা কেজি করে ওজন করে হাতের সাহায্যে মুঠো আকারে তৈরি করেন বিনয় মাস্টার ও অন্যান্য শ্রমিকরা। পরে এসব গুড় খুচরা ও পাইকারি হিসেবে বিক্রি করেন তিনি। প্রতিমুঠো গুড় বিক্রি করেন ৬৫ থেকে ৭০ টাকা।
বিনয় মাস্টার জানান, দীর্ঘদিন তিনি রহবল দ্বিমুখী উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। শিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর বসে না থেকে কৃষিকাজের প্রতি আগ্রহ থেকেই আখ চাষ শুরু করেন। নিজের জমিতে উৎপাদিত আখ থেকেই গুড় তৈরি করছেন তিনি।
তিনি বলেন, আগে এ এলাকায় অনেকেই আখ চাষ করতেন এবং আখ থেকে গুড় তৈরি করতেন। এখন সেই চিত্র অনেকটাই বদলে গেছে। আখ চাষ কমে যাওয়ায় দেশীয় পদ্ধতিতে গুড় তৈরির প্রচলনও কমেছে। তাই নিজে আখ চাষ করে নিজেই গুড় তৈরি করছি।
মোকামতলা উপজেলা কৃষি অফিসার আব্দুল হান্নান বলেন, আখ চাষ লাভজনক একটি ফসল। বিনয় মাস্টারের মতো শিক্ষিত ও অবসরপ্রাপ্ত ব্যক্তিরা কৃষিকাজে যুক্ত হলে অন্যরাও উৎসাহিত হবেন। পাশাপাশি দেশীয় পদ্ধতিতে আখের গুড় উৎপাদনের মাধ্যমে আমাদের গ্রামীণ ঐতিহ্যও টিকে থাকবে।
স্থানীয় রমেশ চন্দ্র বলেন, একসময় এলাকায় অনেক আখের চাষ ও গুড় তৈরির প্রচলন ছিল। এখন সেভাবে আর দেখা যায় না। বিনয় মাস্টারের আখ চাষ ও গুড় তৈরির দৃশ্য অনেকের মধ্যেই পুরোনো দিনের স্মৃতি ফিরিয়ে দিচ্ছে।
তাঁদের মতে, বিনয় মাস্টারের উদ্যোগ শুধু কৃষিকাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; এর মাধ্যমে হারিয়ে যেতে বসা গ্রামীণ ঐতিহ্যও নতুন প্রজন্মের সামনে তুলে ধরা হচ্ছে।

