সোমবার | মার্চ ২ | ২০২৬

পাঁচ বছরে খরচ হয়েছে হাজার কোটি টাকার বেশি। কিন্তু প্রকল্পের মূল লক্ষ্য পূরণ হয়নি। যন্ত্রপাতি অচল, নিয়োগ হয়নি জনবল, অনেক জেলায় আইসিইউ ইউনিট বন্ধ। ৫৬৪ কোটি টাকার অডিট আপত্তিরও এখনো জবাব মেলেনি।

জেলা পর্যায়ে আইসিইউ স্থাপন ও কোভিড-১৯ পরিস্থিতি মোকাবিলায় নেওয়া ‘কোভিড-১৯ ইমার্জেন্সি রেসপন্স অ্যান্ড প্যানডেমিক প্রিপেয়ার্ডনেস’ প্রকল্পের বাস্তবায়নে এমন বিপর্যয়কর চিত্র উঠে এসেছে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) প্রতিবেদনে।

মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ৫০টি জেলায় প্রতিটি ১০ শয্যার ৫০০ আইসিইউ স্থাপনের লক্ষ্য ছিল। কিন্তু চালু হয়েছে মাত্র ১৩টি জেলায়। শিশুদের জন্য নির্ধারিত ১৬টি শিশু-আইসিইউ (পেডিয়াট্রিক) এবং ১৫টি মাতৃ-আইসিইউ (অবস্টেট্রিক)—কোনোটিরই কাজ শুরু হয়নি।

এছাড়া ৫০টি জেলায় ২০ শয্যার এক হাজার আইসোলেশন ইউনিট নির্মাণের অগ্রগতি ‘শূন্য’। অথচ গত পাঁচ বছরে এসব কাজ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে ৫৬৪ কোটি ৮৫ লাখ টাকার হিসাব দিতে পারছেন না সংশ্লিষ্টরা।

প্রকল্পে এখন পর্যন্ত ৭৬টি অডিট আপত্তি তোলা হয়েছে। এর মধ্যে মাত্র আটটির জবাব দিয়েছে প্রকল্প অফিস, বাকিগুলো অনুত্তরিত রয়ে গেছে। আইএমইডি এ বিষয়ে একটি নিবিড় পরিবীক্ষণ প্রতিবেদন তৈরি করেছে।

মূলত যেসব জেলায় মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল নেই, সেই ৫০টি জেলা হাসপাতাল নির্বাচন করা হয়েছিল। কিন্তু সময়মতো আইসিইউ নির্মাণ করা যায়নি।

প্রকল্প পরিচালক ড. সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘প্রকল্পের আওতায় বিশ্বব্যাংকের টাকা খরচের সময়সীমা ২০২৪ সালের ডিসেম্বর মাসে শেষ হবে। কিন্তু এর আগে পর্ত কাজ হয়নি। ফলে যন্ত্রপাতি কেনা যায়নি, নির্মাণও দেরিতে হয়েছে।’

চালু হওয়া ইউনিটগুলো কেন বন্ধ—এ প্রশ্নে উত্তরে তিনি বলেন, ‘প্রকল্প শেষ হওয়ার পরে সংশ্লিষ্টদের বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। এখন তারা পরিচালনা করবে। যেসব কাজ বাকি আছে, সেগুলো স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অপারেশন প্ল্যানের (ওপি) মাধ্যমে সম্পন্ন করা হবে।’

অডিট আপত্তি প্রসঙ্গে তার দাবি, ‘সব আপত্তি সঠিক নয়। অনেক ক্ষেত্রে ডুপ্লিকেট রয়েছে।’

আইএমইডি সচিব মো. কামাল উদ্দিন বলেন, ‘আমরা প্রকল্পগুলো তদারকি করছি। কিছু প্রকল্পের নিবিড় পরিবীক্ষণ ও প্রভাব মূল্যায়ন প্রতিবেদন তৈরি করেছি। এর মধ্যে অন্যতম হলো এই প্রকল্প। প্রতিবেদনটি মন্ত্রণালয়, বিভাগ ও প্রকল্প পরিচালককে দেওয়া হয়েছে।’

প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আইসিইউ স্থাপন ও অবকাঠামো নির্মাণের অগ্রগতি হতাশাজনক। পণ্য ও সেবা সংগ্রহ প্রকল্প অফিসের মাধ্যমে বাস্তবায়ন করা হলেও, পর্ত কাজ শুরুতে অস্বাভাবিক দেরির কারণে আইসিইউ চালুতে ব্যাপক বিলম্ব ঘটেছে।

যেসব জেলায় আংশিক আইসিইউ চালু হয়েছে, সেখানেও রয়েছে চিকিৎসক-নার্সের ঘাটতি, যন্ত্রপাতির অভাব এবং অবকাঠামোগত সমস্যা। কমিল্লা, যশোর, টাঙ্গাইল ও বরিশালসহ কয়েকটি জেলায় আইসিইউ ইউনিট চালু হলেও সেখানে প্রয়োজনীয় জনবল ও রক্ষণাবেক্ষণ ব্যবস্থা নেই।

করোনাকালে আইসিইউর চাহিদা তীব্রভাবে বেড়েছিল। ঢাকার বাইরে সাধারণ মানুষ চিকিৎসার ক্ষেত্রে সবসময় পিছিয়ে থাকে। একেকজন রোগীর জন্য অক্সিজেন বা আইসিইউ প্রয়োজন হলেও তাকে পাঠাতে হতো ঢাকায় বা বিভাগীয় শহরে।

এই দুর্ভোগ কমাতেই জেলা পর্যায়ে আইসিইউ স্থাপনের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু বাস্তবে সেই লক্ষ্যই সবচেয়ে উপেক্ষিত হয়েছে এবং হচ্ছে।

Share.
Exit mobile version