মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

`সিলেট’ এক নামের ভেতরে কত যুগের ইতিহাস, কত অজানা কাহিনি লুকিয়ে আছে। আদি নাম ছিল সিলহট (Sylhet)। সেই নাম ধীরে ধীরে হয়ে ওঠে শ্রীহট্ট, আর পরবর্তীতে আধুনিক উচ্চারণে আমরা বলি সিলেট। সিলেটের মানুষ আদি উপভাষায় এখনো বলেন, সিলোট। নামের এই রূপান্তর শুধুই উচ্চারণের নয়, বরং হাজার বছরের ইতিহাস ও সাংস্কৃতিক অভিযাত্রার প্রতিফলন।

আদি যুগে শ্রীহট্ট ছিল সমৃদ্ধশালী জনপদ। পাহাড়-টিলা, উর্বর মাটি আর আধ্যাত্মিকতার আভায় ভরপুর এই ভুমিতে গড়ে উঠেছিল নিজস্ব সংস্কৃতি। ইসলাম আগমনের পর হযরত শাহজালাল (রহ.) ও তাঁর ৩৬০ আউলিয়া বিভিন্ন পাহাড়ের উপর বসে মানুষকে দীক্ষা দিতেন।

বেশিরভাগ আউলিয়াগণ নিজ নিজ এলাকায় পাহাড়ের চূড়ায় বসবাস করতেন। সেখানে তাঁরা মানুষকে ধর্মের দাওয়াত দিতেন, ভালোবাসা ছড়াতেন, জীবনকে আলোকিত করার বার্তা পৌঁছে দিতেন। তাঁদের ত্যাগ ও সাধনায় সিলেট হয়ে ওঠে “পুণ্যভূমি”, যেখানে ধর্ম, সংস্কৃতি ও আধ্যাত্মিকতার মিলন ঘটেছে।

ভাষার দিক থেকে সিলেট সবসময়ই স্বতন্ত্র। সিলেটি ভাষায় প্রাচীন প্রাকৃত, অসমিয়া ও মণিপুরি প্রভাব স্পষ্ট। ঢাকার মানুষ যেভাবে বলে, `আসছো না?’, সিলেটি মানুষ বলেন,`আইসছস না?। এ ভিন্নতা সিলেটিদের সাংস্কৃতিক স্বকীয়তাকে স্পষ্ট করেছে। কিন্তু সমস্যা হলো ঢাকায় গিয়ে কথা বললেই লোকে হাসি-তামাশা করত, আজও সেই প্রবণতা রয়ে গেছে।

টেলিভিশন নাটক, সিনেমা বা মঞ্চে সিলেটি ভাষা ও সংস্কৃতিকে প্রায়শই কৌতুকের উপাদান হিসেবে ব্যবহার করা হয়। যদিও অভিনয়কারীরা অনেক সময় আসল সিলেটি স্বর-উচ্চারণ করতে পারেন না, তারপরও দেশের মানুষ আনন্দ পান, উপভোগ করেন। এতে ভাষাটি বিনোদনের বিশেষ অনুষঙ্গ হয়ে উঠেছে। তবে সিলেটিদের মনে থেকে যায় এক ধরনের কষ্ট, যে ভাষা তাদের পরিচয় ও আবেগ, সেটিকেই অনেক সময় শুধুই কৌতুকের উপাদান হিসেবে দেখা হয়।

১৯৪৭ সালের গণভোট ছিল সিলেটের ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। সিলেট তখন ছিল আসাম প্রদেশের অংশ। গণভোটে অধিকাংশ মানুষ পাকিস্তানের সঙ্গে যুক্ত হওয়ার পক্ষে রায় দেন। তখনকার দিনে যোগাযোগের দিক থেকে সিলেট কলকাতা, আসাম বা করিমগঞ্জের কাছাকাছি ছিল; ঢাকা বা চট্টগ্রাম অনেক দূরের শহর মনে হতো। খরচের দিক থেকেও কলকাতা বা করিমগঞ্জ যাওয়া ছিল সাশ্রয়ী, অথচ ঢাকা বা চট্টগ্রামে যাওয়া মানে সময় ও অর্থ দুটোই বেশি। তার সঙ্গে ছিল ভাষার সমস্যা। ঢাকায় গিয়ে সিলেটিরা সহজে মিশতে পারতেন না। ফলে তাঁদের যাতায়াত ছিল আসাম-করিমগঞ্জ বা কলকাতার সঙ্গে, ঢাকা নয়।

আজকের সিলেট ভিন্ন এক বাস্তবতার মুখোমুখি। স্বাধীনতার পর থেকে বিদেশে অভিবাসনের ঢেউ সিলেটকে আমূল বদলে দিয়েছে। আজ লক্ষ লক্ষ সিলেটি লন্ডন, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্যসহ পৃথিবীর নানা দেশে স্থায়ীভাবে বসবাস করছেন। লন্ডনকে অনেকে মজা করে বলেন, ছোট্ট এক সিলেট। প্রবাসী আয় সিলেটকে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী করলেও এর প্রভাব পড়েছে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক জীবনে। শিক্ষার প্রতি অনীহা, সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে পিছিয়ে পড়া, দক্ষ মানবসম্পদের অভাবের সাথে প্রাসঙ্গিক কারণগুলি মিলিয়ে সিলেট আজ কর্মক্ষেত্রে দেশের তলানিতে।

অন্য জেলার কর্মকর্তা-কর্মচারীরা পরিবার নিয়ে এসে সিলেটে চাকরি করছেন, অথচ সিলেটিরা নিজেরাই সেই জায়গা অর্জন করতে পারছেন না। বিদেশে যাওয়ার প্রবণতা এতটাই প্রবল যে, অনেক পরিবার সন্তানকে পড়াশোনায় উৎসাহ না দিয়ে বরং বিদেশে পাঠানোকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন। নিজস্ব উপভাষা থেকে ধীরে ধীরে সরে যাচ্ছেন। বাংলা ভাষার প্রতি আগ্রহ কমছে, আর সিলেটি ভাষা হারিয়ে যাওয়ার পথে। একসময় হয়তো সত্যিই সিলেটি ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাস কেবল গবেষণার খাতায় সীমাবদ্ধ হয়ে পড়বে।

তবুও আশার আলো নিভে যায়নি। হাজার বছরের ঐতিহ্য, ৩৬০ আউলিয়ার ত্যাগ ও প্রবাসীদের অটল সম্পৃক্ততা—এসবই সিলেটের শক্তি। প্রয়োজন শুধু শিক্ষায় নতুন জাগরণ, সাংস্কৃতিক স্বকীয়তা রক্ষার উদ্যোগ, আর প্রবাসী সম্পদের সঠিক ব্যবহার। সিলহট থেকে শ্রীহট্ট, শ্রীহট্ট থেকে সিলেট, এই দীর্ঘ যাত্রা আমাদের মনে করিয়ে দেয়, সিলেট কেবল একটি ভুখণ্ড নয়, বরং এক গভীর আত্মপরিচয়।

আজকের চ্যালেঞ্জ হলো সেই আত্মপরিচয় রক্ষা করা। ভাষা, সংস্কৃতি ও ইতিহাসকে টিকিয়ে রাখা। আর সিলেটি মানুষ, যাদের হৃদয়ে এই ভুমির স্পন্দন লুকিয়ে আছে, তারা যদি ঐতিহ্য ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণে এগিয়ে আসে, তবে সিলেট শুধুই ইতিহাসের পাতায় নয়, বর্তমান ও ভবিষ্যতের গৌরবে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে পারবে। ইতিহাস যেমন প্রমাণ করেছে, এই অঞ্চলের মানুষ যে কঠিন সময়কেও অদম্য সাহসিকতায় জিতেছে, ঠিক তেমনি তারা আজও সিলেটকে মর্যাদার শীর্ষে রাখার শক্তি রাখে।

খসরু খান

লেখক, কলামিস্ট ও পর্যটক। সমসাময়িক রাজনীতি, সমাজ ও সংস্কৃতি নিয়ে তিনি নিয়মিত লেখেন দেশের শীর্ষস্থানীয় সংবাদমাধ্যমে। বিশ্বজুড়ে ভ্রমণের অভিজ্ঞতা ও পর্যবেক্ষণ তাঁর লেখায় অনন্য বৈচিত্র্য ও গভীরতা যোগ করে।

Share.
Exit mobile version