ইকবাল মোহাম্মদ জাফর, ইউরোপ প্রতিনিধি:
জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি, জ্বালানির উচ্চমূল্য ও শিক্ষা খাতের নানা সংকটের প্রতিবাদে ফ্রান্সজুড়ে ব্যাপক বিক্ষোভ হয়েছে। শনিবার (১৭ অক্টোবর) রাজধানী প্যারিসসহ বিভিন্ন শহরে বিক্ষোভকারীদের সঙ্গে পুলিশের সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে পুলিশ। দিন শেষে দেশজুড়ে প্রায় ৪০০ জনকে গ্রেপ্তারের কথা জানান ফ্রান্সের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী লরাঁ নুনেজ।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের হিসাব অনুযায়ী, দেশজুড়ে ১১০টি মিছিলে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার মানুষ অংশ নেন। তবে আন্দোলনের আয়োজকদের দাবি, বিক্ষোভে অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা ছিল প্রায় ৮ লাখ।
বিক্ষোভকারীরা জীবনযাত্রার ব্যয় কমানো, মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি এবং সরকারি পরিষেবা সুরক্ষার দাবি জানান। আন্দোলনে শ্রমিক সংগঠন, শিক্ষার্থী ও বিভিন্ন সামাজিক গোষ্ঠীর সদস্যরা অংশ নেন।
রাজধানী প্যারিসে বিক্ষোভের একপর্যায়ে পুলিশের সঙ্গে সংঘর্ষ শুরু হয়। মুখোশধারী কিছু বিক্ষোভকারী পুলিশকে লক্ষ্য করে আতশবাজি ও বিভিন্ন বস্তু নিক্ষেপ করেন। এ সময় বেশ কয়েকটি গাড়িতে আগুন দেওয়া হয় এবং কিছু দোকানে লুটপাটের ঘটনা ঘটে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পুলিশ কাঁদানে গ্যাস ও জলকামান ব্যবহার করে। নিরাপত্তার কারণে শহরের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ এলাকায় জোরদার করা হয় নজরদারি। বন্ধ রাখা হয় ২৫টি মেট্রো স্টেশন।
প্যারিসের বাইরেও বিভিন্ন শহরে সহিংসতার খবর পাওয়া গেছে। মার্সেই শহরে বিক্ষোভকারীদের একটি দল সিটি হলে প্রবেশ করে লুটপাট চালায়। লিওঁ শহরে একটি পর্যটন কার্যালয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। এ ছাড়া কয়েকটি শহরে সরকারি ভবন, দোকানপাট ও পুলিশের স্থাপনায় হামলার খবর পাওয়া গেছে।
ফরাসি কর্তৃপক্ষের দাবি, অধিকাংশ মিছিল শান্তিপূর্ণভাবে শুরু হলেও কিছু বিক্ষোভকারী পরে ভাঙচুর, লুটপাট ও পুলিশের ওপর হামলায় জড়িয়ে পড়েন। এসব ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে সরকার।
ফ্রান্সে গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের পরিবেশ, শিক্ষকসংকট এবং শিক্ষা খাতে অর্থায়ন নিয়ে শিক্ষার্থীদের মধ্যে অসন্তোষ চলছিল। শনিবারের বিক্ষোভে এর সঙ্গে যুক্ত হয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতি, জ্বালানির ব্যয় বৃদ্ধি ও সাধারণ মানুষের ক্রয়ক্ষমতা কমে যাওয়ার বিষয়টি। শ্রমিক সংগঠনগুলোও মজুরি ও পেনশন বৃদ্ধি এবং জনসেবায় বিনিয়োগ বাড়ানোর দাবিতে আন্দোলনে সমর্থন জানায়।
ফরাসি প্রেসিডেন্ট এমানুয়েল মাক্রোঁ বিক্ষোভের অধিকারকে গণতন্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে উল্লেখ করে শান্ত থাকার আহ্বান জানিয়েছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। একই সঙ্গে মানুষের নিরাপত্তা ও সম্পত্তির সুরক্ষা নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি। সহিংসতা ও সরকারি সম্পত্তি ধ্বংসের ঘটনায় জড়িত ব্যক্তিদের বিচারের আওতায় আনার কথাও জানিয়েছে সরকার।
বিশ্লেষকদের মতে, এই বিক্ষোভ শুধু শিক্ষার্থীদের দাবির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অর্থনৈতিক চাপ, সামাজিক বৈষম্য এবং সরকারি নীতির প্রতি সাধারণ মানুষের অসন্তোষ। আগামী প্রেসিডেন্ট নির্বাচন সামনে রেখে আন্দোলনের প্রভাব ফ্রান্সের রাজনৈতিক পরিস্থিতিতেও পড়তে পারে।
সব মিলিয়ে, ফ্রান্সে শনিবারের বিক্ষোভ জীবনযাত্রার ব্যয় ও সরকারি পরিষেবার মান নিয়ে জনঅসন্তোষের বহিঃপ্রকাশ ঘটিয়েছে। তবে বিভিন্ন শহরে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও লুটপাটের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। আন্দোলনকারীদের দাবির বিষয়ে সরকার কী পদক্ষেপ নেয়, এখন সেদিকেই নজর রয়েছে।

