
সোমবার (১৭ আগস্ট) সকালে টানা বৃষ্টিতে আবারও ডুবলো বন্দর নগরী চট্টগ্রাম।
নগরীর গুরুত্বপূর্ণ সড়ক এবং অলিগলিতে পানির স্রোত এবং উচ্চতা ছিল ঝুঁকিপূর্ণ।
টানা বৃষ্টিতে চারিদিকে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে যাওয়ার কারণে চরম ভোগান্তিতে পড়েছেন নগরবাসী। কোথাও হাঁটুসমান, কোথাও কোমরসমান পানিতে ডুবন্ত ছিল সড়ক ও অলিগলি। এতে করে অফিসগামী মানুষ, শিক্ষার্থী ও সাধারণ পথচারীদের চরম দুর্ভোগে পড়তে দেখা গেছে।
রবিবার (১৬ আগস্ট) রাত ১০টার পর থেকে শুরু হওয়া বৃষ্টিতে সোমবার (১৭ আগস্ট) সকাল পর্যন্ত নগরীর আগ্রাবাদ বাণিজ্যিক এলাকা, হালিশহর, পাঠানটুলি চৌমুহনী,চকবাজার, বাকলিয়া, কাতালগঞ্জ, পাঁচলাইশ, কাপাসগোলাসহ বিভিন্ন নিচু এলাকায় জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। মূল সড়ক থেকে অলিগলি পর্যন্ত পানি উঠে যাওয়ার কারণে অনেক বাসাবাড়ির নিচতলাতেও পানি ঢুকে পড়েছে।
সোমবার চৌমুহনী পাঠানটুলি এলাকায় সরেজমিনে দেখা যায়, সড়ক কোমর সমান পানিতে তলিয়ে গেছে। পথচারী এবং স্কুল শিক্ষার্থীরা সেই পানি মাড়িয়ে চলাচল করছে।
আগ্রাবাদের বেপারি পাড়া, দাইয়া পাড়া এলাকার চিত্র ছিল আরও ভয়াবহ। সড়কে কোমর সমান পানি জমে থাকায় মানুষের ঘরবাড়িতে পানি ঢুকে গেছে। অনেক দোকানদারদের দোকানে পানি ঢুকে মালামাল নষ্ট হয়ে পড়েছে।
দাইয়াপাড়া এলাকার মুরগি ব্যবসায়ী রাশেদ নূরী দৈনিক সংবাদ প্রবাহকে জানান, রাতে অতিরিক্ত বৃষ্টি হওয়ার কারণে সকালে দোকান ডুবে বিক্রয়ের জন্য রাখা তার প্রায় ২০০ টা মুরগি ভিজে গেছে।
তার মধ্যে অনেকগুলোর অবস্থা আশংকাজনক।অসুস্থ হয়ে মুমূর্ষু অবস্থায় পড়ে আছে অনেকগুলো মুরগি।
জলাবদ্ধতার কারণে সোমবার সকাল থেকে নগরের বিভিন্ন সড়কে যানবাহন চলাচল ব্যাহত হয়। গণপরিবহন ও রিকশা না পেয়ে অনেককেই বৃষ্টির মধ্যে হেঁটে নিজেদের গন্তব্যে যেতে দেখা যায়।
পরিবহন সংকটের কারণে বরাবরের মতো এবারও যাত্রীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পাওয়া গেছে।
নগরীর দেওয়ান হাট মোড়ে গণপরিবহনের জন্য দাঁড়িয়ে থাকা কয়েকজন চাকরিজীবীরা জানান,
জনপ্রতিনিধিরা জলবদ্ধতা মুক্ত নগরীর প্রতিশ্রুতি দিলেও দিনে দিনে যেন সেই জলবদ্ধতা আগের চেয়ে আরও বেড়ে গেছে।রবিবার রাত থেকে টানা বৃষ্টিতে এবারের পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ। সড়কে যানবাহন না থাকায় কিছু রিকশাচালক দিগুন,তিন গুণ পর্যন্ত ভাড়া চাইলে তাদের মধ্যে অনেকেই বাধ্য হয়ে পায়ে হেঁটে অফিসে গেছেন।
অতিরিক্ত জলাবদ্ধতার কারণে মহানগরের বিভিন্ন স্কুলগামী শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের চরম দুর্ভোগে পড়তে হয়েছে।
সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে আজকে থেকে দ্বিতীয় প্রান্তিক মূল্যায়ন পরীক্ষা শুরু হয়েছে।
অনেকগুলো শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের নিচতলা ডুবে গেলেও পরীক্ষা নেওয়া বন্ধ করেননি শিক্ষকেরা।
চৌমুহনী পাঠানটুলি খান সাহেব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের অভিভাবকরা এ ব্যাপারে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন।
এ ব্যাপারে পাঠানটুলি খান সাহেব সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের জিজ্ঞেস করা হলে তারা দৈনিক সংবাদ প্রবাহকে জানান, সরকারি নির্দেশ মেনেই তারা পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বৃষ্টি কারণে রাস্তাঘাট পানিতে তলিয়ে গেলেও পরীক্ষা দেওয়ার জন্য তাদের স্কুলের প্রায় ৯৫ শতাংশ শিক্ষার্থী উপস্থিত হয়ে গেছে। সেই কারণেই মূলত তারা পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি।
অন্যদিকে অভিভাবকদের মধ্যে কেউ কেউ বলছেন, অতিরিক্ত বৃষ্টি এবং কোমর সমান পানির মধ্যে ছোট ছোট শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে পরীক্ষা নেওয়ার সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসা উচিত ছিল শিক্ষকদের।
তবে নগরীর বিভিন্ন দিকে পরিবহন সংকট ও জলাবদ্ধতার কারণে অনেক শিক্ষার্থীরা সোমবার স্কুলে যেতে পারেননি। কোথাও কোথাও শ্রেণি কার্যক্রম স্থগিত বা বাতিল করা হয়েছে। অনেক স্কুলে পরীক্ষা থাকলেও সেটা বাতিল করে পরবর্তীতে নেওয়া হবে বলে শিক্ষার্থীদের জানিয়ে দেওয়া হয়েছে।
চট্টগ্রাম নগরের জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রায় সাড়ে ১৪ হাজার কোটি টাকা ব্যয়ে চারটি প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে চট্টগ্রাম উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (সিডিএ), চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন ও পানি উন্নয়ন বোর্ড। প্রকল্পগুলোর কাজ এখন প্রায় শেষ পর্যায়ে।
সেই প্রকল্প বাস্তবায়নের শেষ পর্যায়ে থাকার পরও সামান্য সময়ের বৃষ্টিতে নগরের বিভিন্ন এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে যাওয়ায় এসব উদ্যোগের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নগরবাসী। অনেক এলাকায় ড্রেন থেকে ময়লা পরিষ্কার করলেও সেগুলোতে সঠিকভাবে পানি চলাচল করছে না বলে অভিযোগ করেছেন নগরবাসী।
নগরবাসীর দাবি, শুধু প্রকল্প বাস্তবায়ন নয়, পানি নিষ্কাশনের প্রতিবন্ধকতা, খাল-নালা ও ড্রেনের সক্ষমতা এবং রক্ষণাবেক্ষণব্যবস্থার দিকেও নজর দিতে হবে। মানুষের বাসাবাড়িতে থেকে যত্রতত্র ময়লা ছুঁড়ে ফেলার বিষয়টি থামানোর জন্য সিটি কর্পোরেশনকে কঠিন এবং কার্যকরী সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হবে।না হলে হাজার হাজার কোটি টাকা খরচ করেও জলবদ্ধতা নিরসনে বড় বড় প্রকল্প গুলোর কোন সুফল পাবেন না নগরবাসী।
