মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬
মুহাম্মদ দিদারুল ইসলাম

বাংলাদেশের প্রধানতম ব্যস্ত নগর চট্টগ্রাম। এই গুরুত্বপূর্ণ নগরটিও পরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠে নাই। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের নান্দনিক সন্তান বন্দরনগরীর ফুসফুস সীমাবদ্ধ হয়ে পড়েছে সিআরবি এলাকায়। এখানে বুকে ইতিহাস জমা করে আছে দশদিকে ডালপালা মেলে দেওয়া প্রাচীন বনস্পতি আর আর অঢেল পুষ্পপত্রপল্লব। গড়ে উঠেছে সমৃদ্ধ জীববৈচিত্র্য আর  নিত্য আকাশের সাথে কথা বলা পাহাড়।

দুই পাশে পাহাড়ের অশেষ সুন্দরকে সাক্ষী রেখে মাঝখানে বয়ে গেছে কংক্রিটের নদী ‘টাইগার পাস থেকে লালখান বাজার সড়ক’। এই সড়কের দুই পাশে এবার বর্ষায় সবুজের বিস্ফোরণ ঘটেছে। কর্মব্যস্ততায় মুখর নগরের অনুষঙ্গ মানসিক ও শারীরিক ক্লান্তিতে সজীবতার পরশ বুলাচ্ছে এই সড়ক। বর্ষা মৌসুমের ভেজা হাওয়া ফিসফিসিয়ে বলছে, “এই অসহ্য গরমে একটু জিরোও।”

বর্ষায় ফিরে পাহাড়ের প্রাণ

বর্ষা এলেই পাহাড়ের বুকে জাগে তুমুল উচ্ছ্বাস। অন্তত ক’মাসের জন্য তাদের বিবর্ণতার দিন ফুরোবার আশায়। বৃষ্টি নামে কখন ছিটেফোঁটা আর কখনও তুমুল, কখনও অল্প সময়ের জন্য আর কখনও কালিদাসের বিরহকালের মতো দীর্ঘ। প্রতি ফোঁটা বৃষ্টিতে পাহাড়ের মাটিতে জাগে প্রাণ আর জাগে আনন্দ।

মেঘ মৌসুমের হাওয়া আর বৃষ্টিতে ধুয়ে যায় ধুলোবালির আস্তরণ, ফের প্রকাশ্যে আসে বহুমাত্রিক সবুজ রোদের আভায় উজ্জ্বল, মেঘের ছায়ায় ধ্যানী সন্ন্যাসীর মতো কোমল আর জোছনার রাতে রমণীয়। কত শত রকমের সবুজ বুকে ধারণ করে আপন সৌন্দর্য তুলে ধরে পাহাড়।

তখনও দখলদারদের অত্যাচার থামে না, তবে কিছুটা কমে আসে। এ সময় সাধারণ পথচারীরাও ব্যস্ততা ভুলে একটু দাঁড়ায়। বিশ্রাম নেয়। সবুজে স্নান করে। অনেক শিক্ষার্থী আর বন্ধুবান্ধবের দল নির্মল আড্ডায় মগ্ন হয়। কোনো দলে চলে ধর্মালোচনা, কোনো আড্ডায় রাজনীতি আর বিজ্ঞান, হঠাৎ একটা একটা বিকেলে শোনা যায় ইউকুলেলে বা গিটারের টুংটাং-এর সাথে দরাজ গলার গান।

চট্টগ্রামের সাধারণ মানুষের সাথে পাহাড় আর সাগরের যে অনাদিকালের বন্ধন, বর্ষা আর পরের দিনগুলিতেই যেন শুধু শুনতে পায় রক্তে সেই ডাক।

নতুন নিরাপত্তা বলয়

চট্টগ্রাম শহরের ভেতরে হলেও পাহাড়ে নিরাপত্তাজনিত কিছু সমস্যা ছিল। তবে বর্তমানে তা কমে এসেছে। পাহাড়ের পাদদেশে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের অস্থায়ী কার্যালয় আর উপরে সরকারি বিভিন্ন দপ্তর ও সংশ্লিষ্ট স্থাপনার কারণে নিরাপত্তা বলয় গড়ে উঠেছে। এছাড়া সাধারণ মানুষের সমাগম বাড়ার ফলেও একটি অকৃত্রিম নিরাপদ পরিবেশ তৈরি হয়েছে।

জিলাপি পাহাড়ে স্বাস্থ্যচর্চা

চট্টগ্রামেও জিলাপি প্রীতি অশেষ। জিলাপির প্যাঁচে আপত্তি থাকলেও স্বাদে আপত্তি নেই। তাই আঁকাবাঁকা পথের ‘বাটালি পাহাড়কে’ স্থানীয়রা আদর করে ডাকেন ‘জিলাপি পাহাড়’।

সকাল এবং সন্ধ্যায় স্বাস্থ্য সচেতন মানুষের শারীরিক ব্যায়াম, বেড়ানো আর মানসিক প্রশান্তিতে মুখর হয়ে ওঠে শতায়ু অঙ্গন।

বনলতার জয়

পাহাড় রক্ষার নামে বিভিন্ন সময় সরকারি উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। নানা প্রকল্পের অধীনে সময় সময় পাহাড়ে ভিনদেশি ও ভিন্ন অঞ্চলের গাছ লাগানো হয়েছে। কিন্তু এই মাটির স্বজন হয়ে উঠতে পারেনি তারা। একসময় পাহাড়ের ক্ষয় রুখতে থাইল্যান্ড থেকে এনে লাগানো হয়েছিল বিন্নাঘাস, সেসবও আজ আর খুব একটা চোখে পড়ে না।

এই পাহাড় মায়ের মতো জানে কোথায় জড়াবে কোন শিকড়, কোন লতা থাকবে বেঁচে। প্রাকৃতিকভাবেই এখানে বারবার বনলতার কাছে হার মানে উদ্যানলতা। প্রাকৃতিক আত্মীয়তার বাইরে আসা কোনো উদ্ভিদ এই পাহাড়ের ঢালুতে থিতু হতে পারে না।

গরমে ধূসরতা, দখল আর আগুন

কুয়াশাচ্ছন্ন শীতের শেষে যখন আসে গরমের মৌসুম, ধূসর বিবর্ণতার পথে যাত্রা করে এসব পাহাড়। এই করুণ যাত্রা প্রাকৃতিক বা অকৃত্রিম নয়। দখলদাররা নিয়ম অমান্য করে প্রায়ই পাহাড়গুলোতে আগুন লাগিয়ে দেয়। উদ্ভিদ পুড়ে ভস্ম হয়। এছাড়া রয়েছে নগরের ধুলোবালির আধিপত্য আর মাদকসেবীদের অবাধ আস্তানা নির্মাণ।

পাহাড়গুলো তখন গুমরে কাঁদে। এই কান্না সংক্রমিত হয় অধিকাংশ মানুষের মাঝে, কিন্তু সংঘবদ্ধ প্রতিবাদ হয় খুব কম। শুধু কমে আসে বিশুদ্ধ অক্সিজেনের যোগান।

প্রকৃতির অবিরাম লড়াই

বর্ষা এসে পাহাড়ের মলিন শরীরে যে অপার স্নিগ্ধতা ঢেলে দেয়, তার স্নানে ধুয়ে যায় বছরের জমে থাকা ক্লান্তি, ধুলো, কষ্ট। বৃষ্টিধারায় পাহাড় ফিরে পায় তার মৌলিক সৌন্দর্য, চিরযৌবনের দীপ্তি। পাহাড় ঘোষণা করে, “তোমাদের এই নগরে আমি নীরব প্রেমিক, যার হৃদয়ে এখনো জেগে আছে মহাজীবনের ছন্দ। আমি তোমাদের শান্তির আশ্রয় আর স্বস্তির আশ্রম।”

বন্দরনগরীর পাহাড় শুধু একখণ্ড ঊর্ধ্বমুখী জমি নয়। দাঁড়িয়ে থাকা এই পাহাড়গুলো শেখায়, যেখানে দখল, ভাঙন আর নিষ্ঠুরতা বীজ বোনে, সেখানে প্রতিবাদে প্রকৃতি বারবার উঠে দাঁড়ায়। জাগে সবুজ, জাগে প্রাণ আর আশাবাদ।

Share.
Exit mobile version