১৯৭১ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ একটি নতুন মোড় নেয়। এই সময়ে মুক্তিবাহিনী পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে সশস্ত্র গেরিলা যুদ্ধের কৌশল গ্রহণ করে, যা স্বাধীনতা সংগ্রামকে ত্বরান্বিত করে।
জুলাই ১৯৭১—এ গেরিলা যুদ্ধের প্রসার মুক্তিযুদ্ধকে একটি গণযুদ্ধে রূপান্তরিত করে। এই সময়ে মুক্তিবাহিনীর আক্রমণাত্মক কৌশল পাকিস্তানি সেনাদের মনোবল ভেঙে দেয় এবং স্বাধীনতার পথকে আরও সুদৃঢ় করে। এই মাসেই বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের গতি প্রকৃতপক্ষে পালটে যায়, যা পরবর্তীতে ডিসেম্বর মাসে চূড়ান্ত বিজয়ের দিকে এগিয়ে নিয়ে যায়।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ শুধু সশস্ত্র সংগ্রামেই সীমিত থাকেনি এটি রূপ নেয় সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে। এই সময়ে ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’ গঠিত হয়, যারা খেলার মাঠকে মুক্তিযুদ্ধের অর্থসংগ্রহের অস্ত্রে পরিণত করে।
১ জুলাই থেকে ভারতীয় বিমানবাহিনী নিয়মিতভাবে বাংলাদেশের অভ্যন্তরে টহল বিমান উড্ডয়ন শুরু করে। এটি ছিল মুক্তিযুদ্ধের সমর্থনে ভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ।একই সময়ে রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক তৎপরতাও চলছিল। মুজিবনগর সরকারের পক্ষে স্বাধীনতার জন্য আন্তর্জাতিক সমর্থন আদায়ের চেষ্টা করছিলেন ইন্ধিরা গান্ধী।
ভারত যেকোনো সময় পূর্ব পাকিস্তানে সামরিক হস্তক্ষেপ করতে পারেÑপাকিস্তান সরকারের মনে এই আশংকা বরাবরই ছিল। প্রেসিডেন্ট ইয়াহিয়া খানের অন্যতম উপদেষ্টা জি.ডব্লিউ চৌধুরীর মতে জুলাই মাসেই পাকিস্তান সরকার জানতে পারে যে ভারত সামরিক প্রস্তুতি নিচ্ছে।
১৯৭১ সালের জুলাই মাসে অনুষ্ঠিত ‘শিলিগুড়ি সম্মেলন’ বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের জন্য ছিল একটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা। এ সভায় গৃহীত নীতিমালা ও সিদ্ধান্তের আলোকে পরিচালিত হয়েছিল মুক্তিযুদ্ধের মূলস্রোত।
১০ জুন ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব অশোক. কে. রায় তাজউদ্দীন আহমদকে খুব শিগগির নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের নিয়ে সম্মেলনের প্রস্তাব করেন। তিনি প্রথমে ১৯ জুন মেঘালয় রাজ্যের তুরায় এই সম্মেলন আয়োজনের প্রস্তাব করেন। তাজউদ্দীন আহমদের সম্মতি থাকলেও এত অল্প সময়ের মধ্যে সবাইকে জড়ো করার অসুবিধা বিবেচনা করে সময় পিছিয়ে ৫ ও ৬ জুলাই তারিখে হিমালয়ের পাদদেশ শিলিগুড়ির জঙ্গলে সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়।
৫ জুলাই সকাল সাড়ে ৯টা থেকে বেলা দেড়টা পর্যন্ত গোপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। গোপন সভার শুরুতে প্রধানমন্ত্রী দীর্ঘ বক্তব্য দেন। তিনি স্বাধীনতাযুদ্ধের পটভূমি, আওয়ামী লীগের ইতিহাস, জাতীয় নির্বাচন, পাকিস্তানিদের ক্র্যাকডাউন, যুদ্ধের বর্তমান অবস্থা ইত্যাদি সম্পর্কে বর্ণনা দেন। তিনি বলেন, সরকারের অনেক দুর্বলতা আছে, সরকার অনেক ভুলও করেছে। তিনি ঐক্যবদ্ধ সরকারের প্রয়োজনীয়তার ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রীর বক্তৃতার ওপর জাতীয় পরিষদের সদস্য মিজানুর রহমান চৌধুরী দল ও মুক্তিযুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়, বিশেষ করে মুক্তিযুদ্ধের মাঠপর্যায়ের সমস্যা তুলে ধরেন।
১৯৭১ সালের এপ্রিল—মে—জুন মাসে সশস্ত্র প্রতিরোধ গড়ে উঠলেও যুদ্ধ ছিল খানিকটা বিচ্ছিন্ন ও অপ্রাতিষ্ঠানিক। মুক্তিযোদ্ধারা বিভিন্ন সেক্টরে বিক্ষিপ্তভাবে যুদ্ধ করছিলেন, কিন্তু একটি কেন্দ্রীয় নীতিমালা ও কৌশলগত সমন্বয় অনুপস্থিত ছিল। সম্মেলনে যুদ্ধের সামরিক কাঠামো সুসংগঠিত করা, শহরভিত্তিক গেরিলা আক্রমণ চালানোর জন্য ‘ক্র্যাক প্লাটুন’ ও অন্যান্য গেরিলা ইউনিট গঠনের সিদ্ধান্ত’ ভারতীয় সেনাবাহিনী, জঅড ও প্রশিক্ষণ শিবিরগুলোর সঙ্গে সমন্বিত যুদ্ধ পরিকল্পনা ও সামরিক লজিস্টিক সাপোর্ট মুজিবনগর সরকারের নেতৃত্বে স্বাধীনতার লক্ষ্যকে আরও সুস্পষ্ট করা এবং আন্তর্জাতিক ও দেশীয় গণমাধ্যমে গেরিলা সফলতা ও পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা প্রচারে জোর দেওয়া হয়।
সভার গুরুত্ব বা ফলাফল সম্পর্কে সাপ্তাহিক জয় বাংলা উল্লেখ করে যে, এই বৈঠকের রাজনৈতিক তাৎপর্য ও ঐতিহাসিক গুরুত্ব অনেক। ভাবীকালের ঐতিহাসিকেরা যেদিন বাংলাদেশের মুক্তিসংগ্রামের গৌরবোজ্জ্বল ইতিহাস লিখবেন, সেদিন এই মুজিবনগর বৈঠকের গুরুত্ব তার যথার্থ পরিপ্রেক্ষিত নিয়ে ইতিহাসে লিপিবদ্ধ হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই।
১০ জুলাই প্রভাবশালী ব্রিটিশ দৈনিক দ্য ইকোনমিস্ট ‘মুক্তিবাহিনী এখনও লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে’ শিরোনামে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে। এই প্রতিবেদনে বলা হয়, পাকিস্তানের প্রেসিডেন্ট জেনারেল ইয়াহিয়া খানের দেওয়া সময়সূচী শুরু হলেও পূর্ব পাকিস্তানে এখনও কোনো উন্নতির চিহ্ন দেখা যাচ্ছে না।
১০ জুলাই ঢাকার ধানমন্ডি ২ নম্বর সড়কে ক্র্যাক প্লাটুনের গেরিলা দল পুলিশের ওপর গ্রেনেড হামলা চালায়। এ সময় এক পুলিশ অফিসারসহ পাঁচ পুলিশ নিহত হয়।
১০ জুলাই কানাডার পররাষ্ট্রমন্ত্রী মিচেল শার্প কানাডার প্রভাবশালী গণমাধ্যম গ্লোব অ্যান্ড মেইল পত্রিকায় দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে বলেন, পাকিস্তানকে বিচ্ছিন্ন করা হয়তো কাণ্ডজ্ঞানহীন কর্মকাণ্ড মনে হতে পারে। কিন্তু এখন এটিই বাস্তব। সংকট নিরসনের জন্য এটিই একমাত্র পথ হিসেবে বাকি রয়েছে। পাকিস্তান সরকার গণতান্ত্রিক পথের কথা বলছে, তা ইতোমধ্যেই পাকিস্তান সরকার নিজেরাই ধ্বংস করেছে। যদিও গণতান্ত্রিক সরকারই সবচেয়ে উত্তম পন্থা। জাতিসংঘ কী ব্যবস্থা নিচ্ছে তার দিকে আমরা তীক্ষ্ণ দৃষ্টি রাখছি।
১০ জুলাই কুমিল্লার শালদা নদীর সাগরতলায় মুক্তিবাহিনীর ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী হামলা চালায়। এ সময় মুক্তিবাহিনীও তীব্র পালটা আক্রমণ শানায়। মুক্তিবাহিনীর মর্টার ও মেশিনগানের পালটা আক্রমণে প্রায় ৪০ জনের মতো হানাদার নিহত হয়। এ সময় বৃষ্টির মতো গোলাগুলিতে হানাদার বাহিনী তাদের ক্যাম্পে ফিরে যেতে বাধ্য হয়।
এই দিনে কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের সদর দপ্তরে ১১ জুলাই থেকে ১৭ জুলাই পর্যন্ত শুরু হওয়া সাত দিনব্যাপী সেক্টর কমান্ডার সম্মেলনের প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। ১১ জুলাই শুরু হওয়া এই সম্মেলনে যোগ দিতে ১০ জুলাইয়ের মধ্যেই কলকাতায় হাজির হন মুক্তিবাহিনীর উচ্চপদস্থ কমান্ডারসহ সেনাবাহিনীর উচ্চ পদস্থ কর্মকর্তারা।
কলকাতার ৮ নম্বর থিয়েটার রোডের অফিস ভবনে মুক্তিবাহিনীর সেক্টর কমান্ডারদের প্রথম সম্মেলন (১১-১৭ জুলাই) শুরু হয়। সম্মেলনের প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদ। প্রথম সেক্টর কমান্ডার সম্মেলন মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে একটি বিরাট দোল—পরিবর্তন নিয়ে এসেছিল।
প্রতিদিন সকালে শুরু হয়ে সম্মেলন চলত অনেক রাত পর্যন্ত। সম্মেলনে সুষ্ঠুভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে সারাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করে একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়। পাশাপাশি সেক্টরগুলোকেও ভাগ করা হয় ৬৪টি সাব—সেক্টরে। তিনটি উদ্দেশ্য সামনে রেখে এই সেক্টরগুলো গঠন করা হয়। প্রথমত, সেক্টরগুলোর সীমানা নির্ধারণ; দ্বিতীয়ত, গেরিলা যোদ্ধাদের সংগঠিত করা এবং তৃতীয়ত, নিয়মিত বাহিনী সংগঠিত করা। সেসব সিদ্ধান্তের মধ্যে প্রধানতম ছিল সুষ্ঠুভাবে মুক্তিযুদ্ধ পরিচালনার লক্ষ্যে বাংলাদেশকে ১১টি সেক্টরে ভাগ করা, এবং প্রতি সেক্টরের জন্য একজন করে সেক্টর কমান্ডার নিযুক্ত করা হয়।
পরবর্তী সময়ে সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের মহাসচিব হারুন হাবীব বলছিলেন, সেক্টর ভাগ করার পর যুদ্ধের গতি বেড়ে গিয়েছিল। মার্চের শেষদিক থেকে জুলাই পর্যন্ত যুদ্ধ পরিকল্পনা অনুযায়ী চলেছে। এর মধ্যে যুদ্ধে ভারতের বিভিন্ন অংশে মুক্তিবাহিনীর ট্রেনিং চলছিল, এবং ভারতীয় অংশ থেকে নানাভাবে সাহায্য সহযোগিতা করা হচ্ছিল।
কিন্তু যখন সেক্টরগুলা গঠন করা হয়, তখন থেকে যুদ্ধের গতি ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়। হারুন হাবীব তার সাক্ষাৎকারে বলেন, দেশের বিভিন্ন অঞ্চল ছোট ছোট ভাগ করার কারণে প্রশাসনিক এবং সামরিক কর্মকাণ্ড ব্যাপকভাবে বেড়ে যায়।
১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধ শুধু বাংলাদেশের ইতিহাসে নয়, গোটা বিশ্বের বিবেকেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। যুদ্ধকালীন সময়ে অনেক দেশের বিবেকবান মানুষ নিজেদের অবস্থান থেকে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
একাত্তরে বাংলাদেশের স্বাধীনতার বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিয়েছিল যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রনীতি ও তৎকালীন প্রশাসন। যুক্তরাষ্ট্র—চীন সম্পর্ক গড়ে তুলতে পাকিস্তানের পক্ষে সহায়তা করছিল এবং বাংলাদেশে চলমান গনহত্যাকে ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষা করছিল কিন্তু সেখানকার সাধারণ ও সচেতন মানুষ বাংলাদেশে গণহত্যার প্রতিবাদে সোচ্চার ছিলেন।
১৪ জুলাই ১৯৭১ তারিখের ঘটনা। একদল শ্রমিক ও স্থানীয় জনসাধারণ যুদ্ধ জাহাজে অস্ত্র তুলতে বাধা দেয়। এ ছাড়া কোয়ার্কাস নামের একটি দল কতকগুলো ডিঙি নৌকা নিয়ে ব্যারিকেড তৈরি করে পাকিস্তানের কার্গো জাহাজের গতিপথও বন্ধ রাখে। এ প্রতিবাদের নেতৃত্বে ছিলেন চার্লস খান। তার সঙ্গে ছিলেন মি. ডিক টেলর, স্যালি উইলবি, স্টেফানি হলিম্যান, চার্লস গুডউইন, ওয়েইন লাউসার প্রমুখ।
সেদিন এ আন্দোলনের কারণে তাদের গ্রেফতার করা হলেও বাংলাদেশের গণহত্যার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ বন্ধ করা যায়নি। এরপরই ধর্মঘট ডেকে বসে পোর্ট শ্রমিকেরা। ‘রক্তমাখা টাকা নেব না’ এমন স্লোগান দিয়ে তারা পাকিস্তানি জাহাজে মালপত্র তোলা থেকে বিরত থাকে। ‘No arms to Pakistan, End all Us Aid to Pakistan’ লেখা ফেস্টুন নিয়ে তারা সেদিন ধর্মঘট করে। এ আন্দোলনের খবর ফলাও করে প্রচার করে গণমাধ্যমগুলো। ফলে মার্কিন জনগণ ভিন্নভাবে জেনে যায় বাংলাদেশে সংগঠিত পাকিস্তান সেনাবাহিনীর গণহত্যার কথা।
মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে ১৬ জুলাই গুরুত্বপূর্ণ ও ঘটনাবহুল একটি দিন। এদিন জাতীয় ও প্রাদেশিক পরিষদ সদস্যদের উদ্দেশ্যে এক সমাবেশে বক্তৃতায় প্রবাসী বাংলাদেশ সরকারের অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি সৈয়দ নজরুল ইসলাম বলেন, ‘আপনারা মনে রাখবেন আমাদের বীর মুক্তিযোদ্ধারা পরাজিত হবার জন্য রণক্ষেত্রে অস্ত্রধারণ করেনি।’
১৬ জুলাই রাত ৯টার দিকে ক্র্যাকপ্লাটুনের ছয় জন গেরিলা ঢাকার রামপুরায় ঢাকার সর্ববৃহৎ বিদ্যুৎকেন্দ্র উড়িয়ে দেওয়ার কাজ শুরু করে। সে সময় ক্র্যাকপ্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে ছিল ২০ পাউন্ড প্লাস্টিক এক্সপ্লোসিভ, ডেটোনেটর ও ফিউজ। পাওয়ার স্টেশনের গেটে পৌঁছে ক্র্যাকপ্লাটুনের গেরিলারা প্রথমেই পুলিশ ও গার্ডদের ফাঁকি দিয়ে টেলিফোন লাইন বিচ্ছিন্ন করে দেয়। এরপর তারা গার্ডের কাছ থেকে চাবি ছিনিয়ে নিয়ে অস্ত্রের মুখে অন্য গার্ড ও পুলিশদের রুম দেখিয়ে দিতে বাধ্য করে। সেসময় ক্র্যাকপ্লাটুনের মুক্তিযোদ্ধারা ১৭ জন পুলিশকে বন্দি করে, অপারেটরকে ট্রান্সফর্মার রুমে নিয়ে যেতে বাধ্য করে। ট্রান্সফরমার রুমে গেরিলারা বিস্ফোরক বসিয়ে ট্রান্সফরমার উড়িয়ে দেয়।
একই দিন সন্ধ্যা ৫টা ৪৫ মিনিটে হানাদার সেনাদের আরও একটি দল নৌকায় বল্লার দিকে এগোতে চেষ্টা করলে মুক্তিবাহিনী তাদের লক্ষ্য করে গুলি শুরু করে। সেসময় মুক্তিবাহিনীর এক কোম্পানি মুক্তিযোদ্ধা হানাদারদের ওপর হামলা চালালে হানাদার বাহিনীর সব নৌকা ডুবে যায়। এদিন বহু হানাদার সৈন্য কাদেরিয়া বাহিনীর হাতে আটক হয়েছিল।
১৬ জুলাই রাজশাহীতে পূর্ব পাকিস্তান জামায়াতে ইসলামীর আমীর গোলাম আজম বলেন, ‘পাকিস্তানের সংহতি রক্ষা করার জন্যই কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটি গঠন করা হয়েছে। দেশ থেকে রাষ্ট্রবিরোধীদের নির্মূল করার জন্য এখন দেশপ্রেমিক জনসাধারণকে একত্রিত করতে হবে।’
তিনি আরও বলেন, ‘বিচ্ছিন্নতাবাদীদের নিজেদের শক্তি নেই, তারা ভারতের সাহায্যের ওপর নির্ভর করে স্বাধীন হতে চায়। ভারত এদেশ দখল করলে তাদের অধীনতা থেকে স্বাধীনতা লাভ করা কীভাবে সম্ভব?’
একই দিনে বরিশালে শান্তি কমিটির এক সভায় মুসলিম লীগের সহ—সভাপতি ও কেন্দ্রীয় শান্তি কমিটির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার আখতার উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘ভারতের দালাল দেশদ্রোহী মুক্তিবাহিনীকে কঠোর হস্তে দমন করতে হবে। পাকিস্তানকে বিভক্ত করতে এরা সর্বশক্তি নিয়োগ করেছে। পূর্ব পাকিস্তানের জনগণ কখনোই তা হতে দেবে না।’
১৯ জুলাই ১৯৭১ ঢাকা শহরের বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থার অন্যতম প্রধান পাঁচটি কেন্দ্র ছিল ঢাকার মোট পাঁচটি পাওয়ার স্টেশন। গেরিলাদের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য ছিল এই স্টেশনগুলো উড়িয়ে দিয়ে বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যবস্থা ধ্বংস করা।
ক্র্যাক প্লাটুনের সদস্য ব্যবসায়ী আবদুস সামাদের নিউ ইস্কাটন রোডের বাসা এবং মাসুক সাদেক চুল্লুর ধানমন্ডি ২৭ নম্বর রোডের বাসায় সিদ্ধান্ত হলো, অপারেশন হবে ১৯ জুলাই। ১৯ জুলাই প্রথমবারের মত ঢাকার ৫ টি পাওয়ার স্টেশনে অপারেশন করেন গেরিলা মুক্তিযোদ্ধারা। দু:সাহসিক ওই অপারেশনে অংশ নিয়েছিলেন ঢাকার গেরিলা হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক।
হাবিবুল আলম বীরপ্রতীক এক সাক্ষাৎকারে বলেন, ‘জুলাই মাসের ১৯ তারিখ সন্ধ্যা রাতেই একই সময়ে অপারেশন করি আমরা। তখন প্রতিটি অপারেশনের রিপোর্ট পাঠাতে হতো দুই নম্বর সেক্টর হেডকোয়ার্টারে। লিখিত বা বাহক মারফত সেটি পাঠাতেন শাহাদাত চৌধুরী।
হাতিরপুল পাওয়ার স্টেশন (ধানমন্ডি লিংক রোডে ছিল) উড়ানোর দায়িত্ব ছিল আমার ওপর। সঙ্গে ছিলেন গেরিলা কামরুল হক (স্বপন), আনোয়ার রহমান (আনু), এম এ খান (ম্যাক) ও ফাজলী (ষাটের দশকের গিটারবাদক)। উলন পাওয়ার স্টেশন (রামপুরায়) অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন বীরপ্রতীক গাজী গোলাম দস্তগীর। তার সঙ্গে ছিলেন গেরিলা হাফিজ ও নীল।
গুলবাগ পাওয়ার স্টেশন (মালিবাগে ছিল) উড়ানোর দায়িত্ব ছিল আবু সাঈদ খানের। সঙ্গে ছিলেন গেরিলা পুলু, মুক্তার ও এবিএম মমিনুল হাসান। তেজগাঁও পাওয়ার স্টেশন অপারেশনের দায়িত্বে ছিলেন আলী আহমেদ জিয়াউদ্দীনের। তার সঙ্গে ছিলেন মাসুদ সিদ্দিক ছুল্লু, মাহবুব আহমেদ শহীদ ও এএফএম হারিস। মতিঝিল পাওয়ার স্টেশন উড়ানোর দায়িত্বে ছিলেন বীরবিক্রম মোফাজ্জল হোসেন চৌধুরী মায়া। সঙ্গে ছিলেন গেরিলা উলফাৎ, হানিফ ও গোপীবাগের অপু।’
১৯৭১ সালের ২৫ জুলাই দেশের ক্রীড়া ইতিহাস নিয়েছিল আশ্চর্য এক মোড়। বাংলার জনপদ যখন রক্তাক্ত, ঠিক তখনই তারা স্বাধীনতার পক্ষে জনমত তৈরি আর তহবিল গড়তেই ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ফুটবল ম্যাচ খেলার উদ্যোগ নেন। গড়ে তোলা হয় ‘স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল’। পরিকল্পনাটি নিয়ে তারা সাক্ষাৎ করেছিলেন মুজিবনগর সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমেদের সঙ্গেও। ওই সরকারের সহযোগিতায় রচিত হয় ফুটবল পায়ে মুক্তিযুদ্ধের আরেক ইতিহাস।
ফুটবল পায়ে একাত্তরের সেই যুদ্ধের বিস্তারিত ঘটনা শোনা যায় দলটির প্রতিষ্ঠাতা সাইদুর রহমান প্যাটেলের মুখে। তিনি বলেছেন, “মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে ফুটবল দল গঠনের প্রস্তাবটি শুনে তাজউদ্দীন আহমেদ এর উদ্দেশ্যটি জানতে চান। বললাম, ম্যাচের গেট মানিটা আমরা মুক্তিযুদ্ধের তহবিলে দেবো। পাশাপাশি আমাদের যুদ্ধের পক্ষে জনমত গঠনেও এটা ভূমিকা রাখবে। আর আমাদের ফুটবল খেলোয়াড়রাও স্বাধীনতা যুদ্ধে অবদান রাখার সুযোগ পাবে।
প্রস্তাবনাগুলো শুনে উনি জড়িয়ে ধরে বললেন, ‘ইয়াং চ্যাপ প্যাটেল। এত সুন্দর চিন্তা তোমাদের। কী করতে হবে বলো?’
আমি বললাম, ‘এজন্য সর্ব ভারতীয় ফুটবল ফেডারেশনের অনুমতি লাগবে।’
তিনি দৃঢ়তার সঙ্গে বলেন, ‘সবকিছু আমি ও আমার সরকার করে দেবে।’ এরপর প্রাথমিক খরচবাবদ চোদ্দ হাজার রুপি আমাদের হাতে তুলে দেন।’
স্বাধীন বাংলা ফুটবল দল মোট ম্যাচ খেলে ১৬টি। সেই ম্যাচ থেকে ওঠা ১৬ লাখ টাকা মুক্তিযদ্ধা তহবিলে জমা দেওয়া হয়।
তথ্যসূত্র: বাংলাদেশের স্বাধনাতযুদ্ধ দলিলপত্র: নবম—দশম খণ্ড
শফিক আহমেদ ভুইয়া
একজন সমাজ গবেষক ও লেখক, যিনি সমাজ, ইতিহাস ও সাহিত্য নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।


