আসন্ন জাতীয় নির্বাচনকে ঘিরে সম্ভাব্য নাশকতা ঠেকাতে সারা দেশে তথ্যনির্ভর গোয়েন্দা অভিযানে সক্রিয় প্রস্তুতি নিচ্ছে পুলিশ। এসব অভিযানের মূল লক্ষ্য হবে অবৈধ অস্ত্র ও গোলাবারুদ উদ্ধার, বিশেষ করে গত বছরের জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সময় বিভিন্ন থানায় ও পুলিশ ফাঁড়িতে সংঘটিত লুটের ঘটনায় হারানো অস্ত্রশস্ত্র।
পুলিশ সদর দপ্তরের একজন উপ-মহাপরিদর্শক (ডিআইজি) ইউনাইটেড নিউজ অব বাংলাদেশকে (ইউএনবি) জানান, এবার পূর্ববর্তী জাতীয় নির্বাচনের মতো ‘কম্বিং’ বা বিশেষ অভিযান পরিচালনা না করে সম্পূর্ণভাবে গোয়েন্দা-তথ্যনির্ভর পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তিনি বলেন, “সাধারণত প্রতিটি জাতীয় নির্বাচনের আগে বিশেষ অভিযান চালানো হয় অস্ত্র উদ্ধারে। তবে এবারের পরিস্থিতি ভিন্ন। আমরা গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে নির্দিষ্ট লক্ষ্যভিত্তিক পদক্ষেপ নিচ্ছি। বিশ্লেষণ ও কৌশলগত প্রস্তুতি ইতোমধ্যে চলছে।”
তিনি আরও জানান, সরকার নির্দেশ দিলেই এসব অভিযান শুরু হবে। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের রাজনৈতিক অস্থিরতা। ওইদিন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা দেশ ত্যাগ করার পর উত্তেজিত বিক্ষোভকারীরা দেশজুড়ে সমন্বিতভাবে থানাসহ বিভিন্ন পুলিশ স্থাপনায় হামলা চালিয়ে বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট করে।
পুলিশ সদর দপ্তরের নথি অনুযায়ী, ওই আন্দোলনে ৫ হাজার ৭৫৩টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ৬ লাখ ৫১ হাজার ৮৩২ রাউন্ড গুলি লুট হয়। এছাড়া অসংখ্য অপ্রাণঘাতী অস্ত্রও নেওয়া হয়, যার মধ্যে রয়েছে ৩২ হাজার ৫টি টিয়ারশেল, ১ হাজার ৪৫৫টি টিয়ার গ্রেনেড, ৪ হাজার ৬৯২টি সাউন্ড গ্রেনেড, ২৯০টি স্মোক গ্রেনেড, ৫৫টি স্টান গ্রেনেড, ৮৯৩টি মাল্টিপল-ব্যাং স্টান গ্রেনেড এবং ১৭৭টি টিয়ার স্প্রে।
লুট হওয়া অস্ত্রের মধ্যে এখন পর্যন্ত উদ্ধার হয়েছে ৪ হাজার ৩৯৫টি আগ্নেয়াস্ত্র ও প্রায় ৩ লাখ ৯৪ হাজার ১১৭ রাউন্ড গুলি। এখনও নিখোঁজ রয়েছে প্রায় ১ হাজার ৩৬৮টি আগ্নেয়াস্ত্র ও ২ লাখ ৫৭ হাজার ৭১৫ রাউন্ড গুলি, যা আসন্ন নির্বাচনে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ব্যবহৃত হতে পারে বলে শঙ্কা রয়েছে।
এ প্রেক্ষাপটে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় অস্ত্র উদ্ধারে নগদ পুরস্কার ঘোষণা করেছে। গত ২৫ আগস্ট সচিবালয়ে আইনশৃঙ্খলা সংক্রান্ত কোর কমিটির বৈঠক শেষে উপদেষ্টা (স্বরাষ্ট্র) লে. জেনারেল (অব.) মো. জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী জানান, প্রতিটি লাইট মেশিনগান (এলএমজি) উদ্ধারে ৫ লাখ টাকা, প্রতিটি চায়নিজ রাইফেল বা সাবমেশিনগান (এসএমজি)-এ ১ লাখ টাকা, প্রতিটি শটগান বা পিস্তলে ৫০ হাজার টাকা এবং প্রতি গুলি উদ্ধারে ৫০০ টাকা পুরস্কার দেওয়া হবে।
তবে পুলিশ সদর দপ্তরের আরেক ডিআইজি ইউএনবিকে জানিয়েছেন, ঘোষণার পরও নতুন কোনো অস্ত্র উদ্ধার হয়নি। তিনি বলেন, “আমরা জনসাধারণের গতিবিধি পর্যবেক্ষণ করছি এবং সমন্বিত হামলায় জড়িত নেটওয়ার্ক শনাক্তের চেষ্টা চালাচ্ছি। গোয়েন্দা সংস্থাগুলো সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থায় রয়েছে।”
গত ৬ আগস্ট স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকার নির্দেশনা দেওয়া হয়। সেখানে বিশেষভাবে সতর্ক করা হয় যে লুট হওয়া অস্ত্র নির্বাচনকে ঘিরে অস্থিতিশীলতা তৈরিতে ব্যবহার হতে পারে।
পুলিশ সদর দপ্তরের কর্মকর্তারা বলছেন, এবার তারা গণঅভিযানের পরিবর্তে তথ্যের ভিত্তিতে দ্রুত ও নির্দিষ্ট গোয়েন্দা অভিযানে গুরুত্ব আরোাপ করছেন, যাতে জনমনে আতঙ্ক ছড়ানো ছাড়াই হুমকি মোকাবিলা সম্ভব হয়। এ লক্ষ্যে গোয়েন্দা সংস্থার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সমন্বয়ে কাজ করা হচ্ছে।
