বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে কিছু দিন আছে, যেগুলো কেবল ক্যালেন্ডারের তারিখ নয়; বরং জাতির স্মৃতি, বেদনা এবং আত্মসমালোচনার অংশ। ৩০ মে তেমনই একটি দিন। ১৯৮১ সালের এই দিনে চট্টগ্রাম সার্কিট হাউসে নিহত হন বাংলাদেশের সপ্তম রাষ্ট্রপতি, মুক্তিযুদ্ধের সেক্টর কমান্ডার এবং বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের প্রতিষ্ঠাতা শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমান। তাঁর মৃত্যু শুধু একজন রাষ্ট্রপ্রধানের জীবনাবসান ছিল না; এটি ছিল স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশের রাজনৈতিক অস্থিরতা, সামরিক বিভাজন এবং ক্ষমতার সংঘাতের এক করুণ পরিণতি।
রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান
আজ তাঁর ৪৫তম শাহাদাত দিবসে আমরা যখন তাঁকে স্মরণ করি, তখন কেবল আবেগের জায়গা থেকে নয়, ইতিহাসের আলোয় তাঁর জীবন, কর্ম এবং মৃত্যুর তাৎপর্য পুনর্বিবেচনা করাও জরুরি।
জিয়াউর রহমানের রাজনৈতিক উত্থান বাংলাদেশের এক সংকটময় সময়ের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। ১৯৭১ সালের মহান মুক্তিযুদ্ধে তিনি একজন সাহসী সামরিক কর্মকর্তা হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেন। চট্টগ্রামের কালুরঘাট বেতার কেন্দ্র থেকে স্বাধীনতার ঘোষণা পাঠের ঘটনা তাঁকে জাতীয় পর্যায়ে পরিচিত করে তোলে। যুদ্ধোত্তর বাংলাদেশে যখন রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলো দুর্বল হয়ে পড়ছিল এবং রাজনৈতিক অস্থিরতা ক্রমশ তীব্র হচ্ছিল, তখন তিনি ধীরে ধীরে রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে উঠে আসেন।
তাঁর নেতৃত্বের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক ছিল রাষ্ট্রকে পুনর্গঠনের প্রচেষ্টা। বহুদলীয় রাজনীতির পুনঃপ্রবর্তন, স্থানীয় সরকার ব্যবস্থাকে সক্রিয় করার উদ্যোগ, কৃষি ও গ্রামীণ উন্নয়নে জোর প্রদান, খাল খনন কর্মসূচি এবং আত্মনির্ভরশীলতার ওপর গুরুত্বারোপ—এসব পদক্ষেপ তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে জনপ্রিয় করে তোলে। একইসঙ্গে তিনি “বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ” ধারণার মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় পরিচয়ের একটি নতুন রাজনৈতিক ব্যাখ্যা তুলে ধরেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক চিন্তায় দীর্ঘস্থায়ী প্রভাব ফেলেছে।
তবে তাঁর শাসনকাল ছিল বৈপরীত্যে পরিপূর্ণ। একদিকে তিনি রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করছিলেন, অন্যদিকে সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে অসন্তোষ ও বিভাজন ক্রমাগত বাড়ছিল। স্বাধীনতা-পরবর্তী বাংলাদেশে সামরিক বাহিনী কেবল একটি পেশাদার প্রতিরক্ষা প্রতিষ্ঠান ছিল না; বরং তা রাষ্ট্রক্ষমতার প্রতিযোগিতার অন্যতম ক্ষেত্র হয়ে উঠেছিল। মুক্তিযোদ্ধা ও প্রত্যাগত কর্মকর্তাদের মধ্যে দ্বন্দ্ব, ৭ নভেম্বর-পরবর্তী রাজনৈতিক পুনর্বিন্যাস, কর্নেল আবু তাহেরের বিচার ও ফাঁসি, এবং ১৯৭৭ সালের বিদ্রোহ দমনে কঠোর পদক্ষেপ—সব মিলিয়ে সেনাবাহিনীর ভেতরে এক ধরনের সুপ্ত অস্থিরতা তৈরি হয়েছিল।
এই অস্থিরতার চূড়ান্ত প্রকাশ ঘটে ১৯৮১ সালের ৩০ মে। চট্টগ্রামে দলীয় কোন্দল নিরসন এবং প্রশাসনিক পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণের উদ্দেশ্যে সফররত রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান ভোররাতে বিদ্রোহী সেনা কর্মকর্তাদের হামলার শিকার হন। তাঁর শেষ মুহূর্তগুলো নিয়ে নানা বর্ণনা প্রচলিত থাকলেও একটি বিষয় নিয়ে ঐতিহাসিকদের মধ্যে মোটামুটি ঐকমত্য রয়েছে—তাঁর মৃত্যু ছিল বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ইতিহাসের একটি গভীর ট্র্যাজেডি।
জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ডের আরেকটি তাৎপর্যপূর্ণ দিক হলো, এর পূর্ণ সত্য আজও সম্পূর্ণ উন্মোচিত হয়নি। বিদ্রোহের নেতা হিসেবে চিহ্নিত মেজর জেনারেল আবুল মঞ্জুর পরবর্তীতে নিহত হন। সামরিক ট্রাইব্যুনালে বিচার ও মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হলেও অনেক প্রশ্নের উত্তর অমীমাংসিত থেকে যায়। ঘটনার পেছনে কেবল ব্যক্তিগত উচ্চাকাঙ্ক্ষা কাজ করেছিল, নাকি বৃহত্তর রাজনৈতিক ও আন্তর্জাতিক কোনো মাত্রা ছিল—এ নিয়ে বিতর্ক আজও অব্যাহত।
ইতিহাসের বিচারে জিয়াউর রহমানের শাহাদাত বাংলাদেশের রাজনৈতিক সংস্কৃতি সম্পর্কে একটি কঠিন সত্যও আমাদের সামনে তুলে ধরে। স্বাধীনতার প্রথম এক দশকে রাষ্ট্রীয় নেতৃত্ব বারবার সহিংসতার শিকার হয়েছে। ১৯৭৫ সালে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ড এবং ১৯৮১ সালে জিয়াউর রহমানের হত্যাকাণ্ড—উভয় ঘটনাই দেখিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক মতপার্থক্য ও ক্ষমতার দ্বন্দ্ব যখন প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে সমাধান করা যায় না, তখন রাষ্ট্র গভীর সংকটে নিমজ্জিত হয়।
আজকের বাংলাদেশ অনেক দূর এগিয়েছে। অর্থনীতি, অবকাঠামো, শিক্ষা ও প্রযুক্তির ক্ষেত্রে দেশ উল্লেখযোগ্য সাফল্য অর্জন করেছে। কিন্তু রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করা, গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিকে সুসংহত করা এবং রাজনৈতিক সহনশীলতা গড়ে তোলার প্রশ্ন এখনও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। জিয়াউর রহমানের শাহাদাত দিবস আমাদের সেই শিক্ষাই দেয়—কোনো রাষ্ট্র কেবল একজন নেতার ওপর নির্ভর করে টিকে থাকতে পারে না; টিকে থাকতে হয় শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান, আইনের শাসন এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির ওপর।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানকে নিয়ে রাজনৈতিক মূল্যায়ন ভিন্ন হতে পারে। তাঁর নীতি, সিদ্ধান্ত বা রাজনৈতিক দর্শন নিয়ে বিতর্কও থাকবে। সেটিই ইতিহাসচর্চার স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য। কিন্তু এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে তিনি বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম প্রভাবশালী রাষ্ট্রনায়ক। মুক্তিযুদ্ধের একজন বীর সেনানায়ক, রাষ্ট্রপতি, রাজনৈতিক দলের প্রতিষ্ঠাতা এবং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রীয় চরিত্র হিসেবে তাঁর অবদান ইতিহাসে স্থায়ীভাবে লিপিবদ্ধ থাকবে।
৩০ মে তাই শুধু শোকের দিন নয়; এটি আত্মসমালোচনারও দিন। এটি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে রাজনৈতিক সহিংসতা কখনো কোনো জাতির জন্য কল্যাণকর হতে পারে না। রাষ্ট্রের স্থিতিশীলতা, গণতন্ত্রের বিকাশ এবং জাতীয় ঐক্যের জন্য প্রয়োজন সংলাপ, সহনশীলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি।
শহিদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের শাহাদাত দিবসে তাঁর স্মৃতির প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানাই। একইসঙ্গে প্রত্যাশা করি, বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসের এই বেদনাময় অধ্যায় থেকে আমরা এমন শিক্ষা গ্রহণ করব, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে একটি অধিকতর স্থিতিশীল, গণতান্ত্রিক এবং সহনশীল বাংলাদেশ নির্মাণে অনুপ্রাণিত করবে।
লেখক: প্রভাষক, ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিভাগ
জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়