পৃথিবী দ্রুত বদলাচ্ছে। বিশ্ব অর্থনীতির কেন্দ্র ধীরে ধীরে স্থানান্তরিত হচ্ছে নতুন শক্তিগুলোর দিকে। প্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সেমিকন্ডাক্টর, ব্লু ইকোনমি, ভূ-রাজনীতি ও জ্ঞানভিত্তিক অর্থনীতি সব মিলিয়ে বিশ্ব এখন এক নতুন প্রতিযোগিতার যুগে প্রবেশ করেছে। এই যুগে শুধু ভৌগোলিক অবস্থান বা জনসংখ্যা কোনো রাষ্ট্রকে শক্তিশালী করে না; নেতৃত্বের দূরদর্শিতা, অর্থনৈতিক সক্ষমতা, মানবসম্পদের গুণগত মান এবং রাষ্ট্রের ন্যায়বিচার কাঠামো নির্ধারক হিসেবে কাজ করে।
বৈশ্বিক ঢামাডোলের মধ্যে বাংলাদেশ এক গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে আছে। স্বাধীনতার অর্ধশতাব্দী পেরিয়ে দেশ উন্নয়ন ও অবকাঠামোগত অগ্রগতির অনেক মাইলফলক অর্জন করেছে। মাথাপিছু আয় বেড়েছে, বিদ্যুৎ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে, যোগাযোগ ব্যবস্থায় যুগান্তকারী পরিবর্তন এসেছে, রপ্তানি সক্ষমতা বিস্তৃত হয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে সমাজের ভেতরে জমেছে এক ধরনের অস্বস্তি, যেখানে উন্নয়নের পরিসংখ্যানের আড়ালে সাধারণ মানুষের অর্থনৈতিক অনিশ্চয়তা, বেকারত্ব, বৈষম্য, রাজনৈতিক বিভাজন ও ন্যায়বিচার নিয়ে প্রশ্ন ক্রমেই গভীর হচ্ছে।
বাংলাদেশের সামনে এখন সবচেয়ে বড় সম্ভাবনা তরুণ সমাজ, আবার সবচেয়ে বড় ঝুঁকিও এই তরুণ সমাজ। বর্তমানে বাংলাদেশের মোট জনসংখ্যার প্রায় দুই-তৃতীয়াংশই কর্মক্ষম (১৫ থেকে ৬৪ বছর বয়সী)। এর মধ্যে একটি বিশাল অংশ তরুণ। পৃথিবীর বহু দেশ যখন বার্ধক্যজনিত সংকটে ভুগছে, তখন বাংলাদেশ এখনো “ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্ড”-এর একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগের মধ্যে রয়েছে। কিন্তু এই সুযোগকে জনশক্তিতে রূপান্তর করতে না পারলে সেটিই ভবিষ্যতের বড় সামাজিক অস্থিরতায় পরিণত হতে পারে।
হতাশ তরুণ সমাজ কখনো রাষ্ট্রের জন্য ইতিবাচক শক্তি হয়ে উঠতে পারে না। দীর্ঘদিন ধরে কর্মসংস্থানের সীমাবদ্ধতা, দক্ষতার ঘাটতি, রাজনৈতিক সহিংসতা ও সামাজিক অনিশ্চয়তা বহু তরুণকে হতাশ করে তুলছে। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে লাখ লাখ গ্র্যাজুয়েট বের হলেও বাস্তব অর্থনীতিতে তাদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মক্ষেত্র তৈরি হয়নি। শিক্ষার সঙ্গে শিল্প, প্রযুক্তি ও গবেষণার সংযোগ এখনো দুর্বল। ফলে একটি অদ্ভূত বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে; ডিগ্রিধারী তরুণ বাড়ছে, কিন্তু দক্ষ জনশক্তির ঘাটতি থেকেই যাচ্ছে। বাংলাদেশ এখনো এমন একটি শিক্ষা কাঠামোর লিগ্যাসি বহন করছে যা অনেক ক্ষেত্রে তরুণদের সৃজনশীলতা ও উদ্ভাবনের চেয়ে পরীক্ষাকেন্দ্রিক প্রতিযোগিতায় অভ্যস্ত করে তোলে। তরুণদের রাষ্ট্র নির্মাতা হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে তাদের বড় অংশকে শুধু চাকরিপ্রার্থী হিসেবে তৈরি করা হচ্ছে। অথচ চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের যুগে রাষ্ট্রের শক্তি নির্ধারিত হবে গবেষণা, উদ্ভাবন, প্রযুক্তি ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজের মাধ্যমে।
আজকের বিশ্বে সবচেয়ে বড় শক্তি সামরিক শক্তি নয়; সবচেয়ে বড় শক্তি অর্থনৈতিক সক্ষমতা। যে রাষ্ট্র প্রযুক্তিতে এগিয়ে, উৎপাদনে শক্তিশালী, নিজেদের জাতীয় স্বার্থ রক্ষা করতে পারে এবং সেই রাষ্ট্রই বৈশ্বিক নেতৃত্ব দেয়। উদাহরণ স্বরূপ, দক্ষিণ কোরিয়ার দিকে তাকালে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়। যুদ্ধবিধ্বস্ত একটি দেশ কীভাবে শিক্ষা, প্রযুক্তি ও শিল্পনীতির মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনীতির শক্তিতে পরিণত হতে পারে, তার অন্যতম উদাহরণ দক্ষিণ কোরিয়া। একইভাবে সিঙ্গাপুর প্রাকৃতিক সম্পদের সীমাবদ্ধতা সত্ত্বেও মানবসম্পদনির্ভর অর্থনীতি গড়ে বিশ্বের অন্যতম সফল রাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে। চীন দীর্ঘমেয়াদি রাষ্ট্রীয় পরিকল্পনা, উৎপাদনমুখী অর্থনীতি ও প্রযুক্তিগত বিনিয়োগের মাধ্যমে বৈশ্বিক অর্থনৈতিক শক্তির কেন্দ্রে উঠে এসেছে।
বাংলাদেশের ক্ষেত্রেও সবচেয়ে বড় প্রয়োজন একটি সুস্পষ্ট রাষ্ট্রীয় দর্শন যেখানে তারুণ্য নির্ভর জনশক্তি, অর্থনৈতিক স্বনির্ভরতা ও মানবিক ন্যায়বিচার একসঙ্গে কাজ করবে। এটি এমন একটি রাষ্ট্রচিন্তা, যেখানে অর্থনীতি, প্রযুক্তি, শিক্ষা ও বিচারব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে দেশের মানুষ। বিশেষ করে তরুণ সমাজকে কেবল ভোটার বা রাজনৈতিক কর্মী হিসেবে নয় বরং রাষ্ট্র নির্মাতা হিসেবে দেখার মানসিকতা গড়ে তুলতে হবে।
বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ নির্ভর করবে আমরা কী ধরনের অর্থনৈতিক মডেল গড়ে তুলতে পারি তার ওপর। বাংলাদেশ ভারী ও টেকসই শিল্পের অভাব রয়েছে। বিদেশি বিনিয়োগও অপ্রতুল। এই কারণে বাংলাদেশের রিজার্ভের বড় অংশ ব্যয় হয় আমদানি ব্যয় মেটাতে। ভারী শিল্প ও বৈদেশিক বিনিয়োগ অপ্রতুল হওয়ায় বড় আকারের কর্মসংস্থান সৃষ্টি হয়নি। ফলে বাংলাদেশে শ্রমিক শ্রেণির বিকাশ ঘটেনি। জাতীয় পরিকল্পনা ও রাজনীতিতে শ্রমিক শ্রেণির অনুপস্থিতি শিল্পায়ন, শ্রমিকদের অধিকার ও দেশের অগ্রগতিতে প্রভাব ফেলছে। এমন একটি অর্থনীতি প্রয়োজন যেখানে স্থানীয় শিল্প ও উদ্যোক্তারা সুরক্ষা পাবে; কৃষি, প্রযুক্তি ও ব্লু ইকোনমিকে গুরুত্ব দেওয়া হবে; ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের জন্য সহজ ঋণের সুযোগ তৈরি হবে; শিক্ষা, গবেষণা ও উদ্ভাবনে রাষ্ট্র সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করবে এবং দক্ষতাভিত্তিক কর্মসংস্থান তৈরিকে জাতীয় অগ্রাধিকারে পরিণত করা হবে। বিশেষ করে ব্লু ইকোনমি বাংলাদেশের জন্য একটি বড় সম্ভাবনার ক্ষেত্র। বঙ্গোপসাগরকেন্দ্রিক সামুদ্রিক সম্পদ,মৎস্যসম্পদ, জাহাজশিল্প, সামুদ্রিক বাণিজ্য ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিসহ বিভিন্নখাতে যথেষ্ট সম্ভাবনা থাকা সত্ত্বেও অগ্রগতি কম। উপরিল্লিখিত প্রতিটি সেক্টরে বাংলাদেশের লিড নেওয়ার সুযোগ রয়েছে। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে যে অগ্রগতি হয়েছে সামনে এগিয়ে নিতে সরকারের ভূমিকা দরকার। জাহাজ নির্মাণ শিল্পে ইউরোপের বাজার ধরতে সরকার তৎপর হলে এই খাত থেকে বছরে কয়েক বিলিয়ন ডলার আয় করতে পারে বাংলাদেশ। ভবিষ্যতের বৈশ্বিক অর্থনীতিতে সামুদ্রিক সম্পদ একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূরাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক শক্তিতে পরিণত হতে যাচ্ছে। কৌশলগত অবস্থানের কারণে বঙ্গোপসাগরে বাংলাদেশের ১১৮০০০ বর্গকিলোমিটারের অর্থনৈতিক অঞ্চল রয়েছে। একইভাবে প্রযুক্তি খাতেও বাংলাদেশকে আউটসোর্সিংনির্ভর অর্থনীতির বাইরে যেতে হবে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সেমিকন্ডাক্টর গবেষণা, রোবোটিকস ও নবায়নযোগ্য জ্বালানির মতো খাতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ ছাড়া ভবিষ্যতের প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হবে। শুধু সস্তা শ্রম দিয়ে আর দীর্ঘদিন বিশ্ববাজারে টিকে থাকা সম্ভব নয়।
তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি একাই কোনো রাষ্ট্রকে সভ্য করে না। যদি উন্নয়ন মানুষের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেই উন্নয়ন শেষ পর্যন্ত বৈষম্যের কারখানায় পরিণত হয়। ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে অর্থনৈতিক বৈষম্য ও আইনের দুর্বলতা শেষ পর্যন্ত সামাজিক অস্থিরতা সৃষ্টি করে। বাংলাদেশের সামনে তাই আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ হলো মানবিক ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠা করা। রাজনৈতিক পরিচয়, অর্থনৈতিক ক্ষমতা বা সামাজিক অবস্থানের চেয়ে আইনের শাসনকে শক্তিশালী করা ছাড়া কোনো রাষ্ট্র দীর্ঘমেয়াদে স্থিতিশীল হতে পারে না। আজ আমাদের সমাজে রাজনৈতিক বিভাজন উদ্বেগজনকভাবে গভীর। মতের ভিন্নতাকে শত্রুতায় রূপান্তর করা হচ্ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘৃণার সংস্কৃতি বাড়ছে। ক্ষমতার কাছে অনেক সময় আইন দুর্বল হয়ে পড়ছে। অথচ একটি সভ্য রাষ্ট্রের ভিত্তি হওয়া উচিত এমন একটি ন্যায়বিচার ব্যবস্থা যেখানে সাধারণ মানুষ আইনের প্রতি আস্থা রাখতে পারে।
একটি রাষ্ট্র তখনই সত্যিকার অর্থে শক্তিশালী হয় যখন শ্রমিক তার মর্যাদা পায়, কৃষক ন্যায্যমূল্য পায়, নারী নিরাপত্তা পায়, সংখ্যালঘুরা ভয়হীনভাবে বাঁচতে পারে এবং তরুণরা নিজেদের ভবিষ্যৎ নিয়ে আশাবাদী হতে পারে। মানবিকতা ছাড়া জাতীয়তাবাদ বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। ন্যায়বিচার ছাড়া উন্নয়ন টেকসই হয় না। তাই নতুন বাংলাদেশের স্বপ্ন হতে হবে এমন একটি রাষ্ট্র যেখানে অর্থনৈতিক শক্তি ও মানবিক মূল্যবোধ একসঙ্গে বিকশিত হবে। এই পরিবর্তনের সবচেয়ে বড় দায়িত্ব তরুণ সমাজের ওপরই বর্তায়। শুধু সামাজিক মাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে বা রাজনৈতিক স্লোগান দিয়ে ভবিষ্যতের বাংলাদেশ তৈরি হবে না। তরুণদের রাষ্ট্র পরিচালনা, অর্থনীতি, প্রযুক্তি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক, আইন, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণের প্রতিটি জায়গায় নিজেদের প্রস্তুত করতে হবে। কারণ ভবিষ্যতের নেতৃত্ব তাদের হাতেই যাবে, যারা জ্ঞান, দক্ষতা ও নৈতিক শক্তিকে একসঙ্গে ধারণ করতে পারবে।
বাংলাদেশের নতুন প্রজন্মকে চাকরি জন্য যেমন দক্ষ করে গড়ে তুলতে হবে, তেমনি উদ্যোক্তা, উদ্ভাবক ও নীতি-নির্ধারক হিসেবে নিজেদের গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রকেও সেই পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে, যেখানে মেধা রাজনৈতিক পরিচয়ের কাছে পরাজিত হবে না। আমরা এমন একটি বাংলাদেশ চাই, যেখানে অর্থনীতি শক্তিশালী হবে কিন্তু মানবতা হারাবে না; উন্নয়ন হবে কিন্তু ন্যায়বিচার বিসর্জন দেওয়া হবে না; রাষ্ট্র আধুনিক হবে কিন্তু মানুষ অমানবিক হয়ে উঠবে না। এমন একটি বাংলাদেশ, যেখানে তরুণরা শুধু নির্বাচনের সময় গুরুত্বপূর্ণ হবে না বরং রাষ্ট্রের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের কেন্দ্রীয় শক্তিতে পরিণত হবে। কারণ ইতিহাস শেষ পর্যন্ত তাদের পক্ষেই দাঁড়ায়, যারা নিজেদের যুবশক্তিকে জাগাতে পারে, নিজেদের অর্থনীতিকে শক্তিশালী করতে পারে এবং ক্ষমতার চেয়ে মানবিকতাকে বড় করে দেখতে পারে। বাংলাদেশের ভবিষ্যৎ শুধু রাজনৈতিক পালাবদলের মাধ্যমে নির্ধারিত হবে না। সেটি নির্ধারিত হবে আমরা কতটা দক্ষ, ন্যায়ভিত্তিক ও মানবিক রাষ্ট্র গড়ে তুলতে পারলাম তার ওপর। আর সেই ভবিষ্যতের কেন্দ্রবিন্দুতে থাকবে আজকের তরুণ সমাজ যারা চাইলে বাংলাদেশকে কেবল একটি উন্নত রাষ্ট্র নয়, আত্মমর্যাদাশীল, উদ্ভাবনী ও মানবিক রাষ্ট্রে পরিণত করতে পারে।
লেখক: উদ্যোক্তা, গবেষক ও সমাজসেবক

