মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

১৯৭৮ সালের ১ সেপ্টেম্বর। ঢাকার রমনা বটমূলে এক অনাড়ম্বর আয়োজন। হাতে গোনা কিছু চেয়ার, কয়েকজন সাংবাদিক, আর মাইকে প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কণ্ঠ—“বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল” নামে এক নতুন রাজনৈতিক শক্তির জন্মের ঘোষণা। সেই ছোট্ট আয়োজনেই শুরু হয়েছিল এক দীর্ঘ রাজনৈতিক যাত্রা, যা চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশের ক্ষমতা, বিরোধিতা ও গণআন্দোলনের কেন্দ্রে থেকেছে।

বিএনপির এই পথচলা ছিল আলো-অন্ধকারে ভরা। কখনও শাসনে, কখনও রাস্তায়, আবার কখনও অস্তিত্বের লড়াইয়ে। ৪৭ বছরে দলটি যতটা শক্তি সঞ্চয় করেছে, ততটাই প্রতিকূলতার আগুনে জ্বলেছে। আন্দোলন, কারাবরণ, নির্বাসন ও রক্তক্ষয়ী দমন, সব মিলিয়ে বিএনপি আজও দেশের বৃহত্তম প্রভাবশালী রাজনৈতিক শক্তি।

বেগম খালেদা জিয়া তিনবার প্রধানমন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পালন করেছেন। তার হাত ধরেই বিএনপি গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ায় শক্ত অবস্থান গড়ে তোলে। কিন্তু গত দেড় যুগে দলটির ওপর নেমে আসে নজিরবিহীন দমননীতি। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে দুই লাখেরও বেশি মামলা হয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের নামে। গুম, খুন আর নির্যাতন হয়ে পড়েছিল স্বাভাবিক ঘটনা। অভিযোগ ছিল বানোয়াট, ভিত্তিহীন। অনেকেই বছরের পর বছর কারাবন্দি থেকে পরিবার-সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েন।

তবুও আন্দোলনের চেতনা নিভে যায়নি। নির্বাসনে থেকেও ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান দলকে সংগঠিত করেছেন ডিজিটাল মাধ্যমে। শত প্রতিকূলতার মাঝেও নিয়মিত বৈঠক, কর্মসূচি আর সাংগঠনিক তৎপরতায় নতুন প্রজন্মকে সম্পৃক্ত করেছেন তিনি। সম্প্রতি একাধিক মামলায় খালাস পাওয়ায় তার নেতৃত্ব আরও দৃঢ়তা পেয়েছে।

২০২৪ সালের জুলাই গণঅভ্যুত্থান শেখ হাসিনার পতনের মধ্য দিয়ে দেশে এক নতুন বাস্তবতা তৈরি করেছে। সেই প্রেক্ষাপটে বিএনপি এখন সবচেয়ে অনুকূল অবস্থানে রয়েছে। বহুদলীয় গণতন্ত্রের পুনঃপ্রতিষ্ঠা, ভোটাধিকার, সুশাসন ও স্বাধীনতার স্বার্থরক্ষার প্রতিশ্রুতি সামনে এনে দলটি নতুন রূপে হাজির হয়েছে।

রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা বলছেন, বিএনপি বর্তমানে “সুযোগ ও পরীক্ষার সন্ধিক্ষণে” দাঁড়িয়ে আছে। একদিকে ইতিহাসের ভার, অন্যদিকে পরিবর্তিত রাজনৈতিক পরিস্থিতি। তাদের মতে, দলটি যদি জাতিকে ঐক্যবদ্ধ করতে পারে, তবে আগামী দিনের বাংলাদেশ গঠনে প্রধান ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে।

ড. মাহবুবউল্লাহর ভাষায়, “গণতন্ত্র বারবার আক্রান্ত হয়েছে অভ্যন্তরীণ ও বহিঃশক্তির কারসাজিতে। বিএনপিকে এ মুহূর্তে সবচেয়ে বড় দায়িত্ব নিতে হবে—জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা।”

উদযাপন আর প্রত্যাশা

৪৭তম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে রাজধানী থেকে জেলা-উপজেলায় চলছে কর্মসূচি। পতাকা উত্তোলন, র‌্যালি, প্রতিষ্ঠাতা শহীদ প্রেসিডেন্ট জিয়াউর রহমানের কবরে শ্রদ্ধা নিবেদন, আলোচনা সভা—সবই এক উৎসবের আবহ তৈরি করেছে। কিন্তু এর বাইরেও কর্মী-সমর্থকদের প্রত্যাশা আরও বড়। তারা দেখতে চান বিএনপি কেবল অতীতের স্মৃতিতে সীমাবদ্ধ থাকবে না, বরং আগামী বাংলাদেশ গঠনে নেতৃত্ব দেবে।

রমনা বটমূলে জন্ম নেওয়া বিএনপি আজ ৪৭ বছরে এসে আবারও এক সন্ধিক্ষণে। অতীতের ব্যর্থতা ও সাফল্যের অভিজ্ঞতা পেছনে রেখে তাদের সামনে এখন নতুন সুযোগ। জনগণের প্রত্যাশা স্পষ্ট—তারা একটি জবাবদিহিমূলক, সুশাসননির্ভর, গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র চায়। বিএনপির সামনে তাই চূড়ান্ত প্রশ্ন একটাই: দলটি কি সেই প্রত্যাশার প্রতিফলন ঘটাতে পারবে?

৪৭ বছরের লড়াই-সংগ্রামের ইতিহাসের পরে বর্তমানে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দল (বিএনপি)র সবচেয়ে বড় পরীক্ষা। আর এই পরীক্ষার ফলাফল নির্ধারণ করবে আগামী দিনের বাংলাদেশের পথচলা।

Share.
Exit mobile version