মঙ্গলবার | মার্চ ৩ | ২০২৬

শিক্ষা একটি জাতির মেরুদণ্ড- এ কথা আমরা সবাই জানি। আর সেই মেরুদণ্ডকে শক্তিশালী করার অন্যতম উপায় হলো দক্ষ, যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক নিয়োগ। বাংলাদেশে বেসরকারি স্কুল-কলেজ, মাদরাসা ও কারিগরি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে শিক্ষক নিয়োগের অন্যতম স্বচ্ছ ও প্রতিযোগিতামূলক ব্যবস্থা হলো শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষা। প্রতিবছর ন্যাশনাল টিচার্স রেজিস্ট্রেশন অ্যান্ড সার্টিফিকেশন অথরিটি (এনটিআরসিএ) এ পরীক্ষা নিয়ে থাকে, এবং এর মাধ্যমে প্রার্থীরা সারাদেশের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে নিয়োগের সুযোগ পান। কিন্তু সাম্প্রতিক ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের চূড়ান্ত ফলাফল বা প্রতিষ্ঠান বরাদ্দের তালিকা প্রকাশে দীর্ঘসূত্রতা শুধু প্রার্থীদের উদ্বেগ বাড়াচ্ছে না, বরং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা ও কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।

প্রথমে পরীক্ষা, তারপর লিখিত, শেষে মৌখিক পরীক্ষা- এই তিন ধাপ অতিক্রম করে একজন প্রার্থী চূড়ান্ত নিয়োগের কাছাকাছি পৌঁছান। কিন্তু ফাইনাল রেজাল্ট বিলম্বিত হলে তার মানসিক চাপ বহুগুণ বেড়ে যায়। একজন প্রার্থী বছরের পর বছর ধরে প্রস্তুতি নেয়, প্রাইভেট বা কোচিংয়ের খরচ বহন করে, আর সেই সঙ্গে পরিবার ও সমাজের প্রত্যাশার বোঝা বহন করে। এই অবস্থায় ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব তার আত্মবিশ্বাসকে নষ্ট করে দিতে পারে। অনেকের বয়সসীমা পেরিয়ে যাওয়ার ঝুঁকিও থাকে, ফলে তারা ভবিষ্যতে আর শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অংশ নিতে পারেন না।

অন্যদিকে, নিয়োগপ্রাপ্ত শিক্ষকরা স্কুল-কলেজে যোগদানের পর শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই শিক্ষার্থীদের পড়ানো শুরু করতে পারলে শিক্ষার গুণগত মান বাড়ে। কিন্তু নিয়োগ বিলম্বিত হলে প্রতিষ্ঠানগুলো দীর্ঘ সময় ধরে শূন্যপদে থাকে, যার ফলে পাঠদান ব্যাহত হয়। এতে শিক্ষার্থীর শিক্ষার মানের ওপর সরাসরি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।

এই বিলম্বের পেছনে যাচাই-বাছাই প্রক্রিয়া, ডেটাবেইস হালনাগাদ, নিয়োগ বিধিমালার সংশোধন, আদালতের মামলা বা প্রশাসনিক জটিলতার মতো কিছু ওযর পেশ করার চেষ্টা করলেও সেগুলি যথার্থ নয়। প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার জন্য বিকল্প ব্যবস্থা গ্রহণ করা যেতে পারতো। অনেক দেশে শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় প্রযুক্তি ব্যবহারের মাধ্যমে দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করা হয়, এবং সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর মধ্যে সমন্বয় বাড়িয়ে সময়ক্ষেপণ কমানো হয়। বাংলাদেশেও একই ধরনের উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে।

তবে সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, ফলাফল ঘোষণায় বিলম্ব হলে গুজব, ভুল তথ্য ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নানা ধরনের বিভ্রান্তি ছড়িয়ে পড়ে। এতে প্রার্থীরা অযথা মানসিক চাপে পড়ে যান এবং নিয়োগ প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে সন্দেহ তৈরি হয়। ইতোমধ্যে শিক্ষক নিবন্ধনের নামে অসংখ্য ফেসবুক গ্রুপ রয়েছে যেখানে নিয়মিত অনুমান নির্ভর, অসত্য তথ্য ও গুজব ছড়িয়ে পড়ছে। সরকার ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে নিয়মিত বিজ্ঞপ্তি ও প্রেস ব্রিফিংয়ের মাধ্যমে প্রার্থীদের অবহিত রাখা, যাতে ভুল তথ্যের বিস্তার রোধ করা যায়। ফলাফল প্রকাশে মাত্রাতিরিক্ত বিলম্বে স্বচ্ছতা ও আস্থার সংকট তৈরী হওয়া মোটেই অমূলক নয়।

শিক্ষক নিয়োগ কেবল একটি চাকরির সুযোগ নয়, এটি জাতির ভবিষ্যত নির্মাণের দায়িত্ব অর্পণ। তাই এ প্রক্রিয়াটি দ্রুত, সুষ্ঠু ও স্বচ্ছভাবে সম্পন্ন হওয়া প্রয়োজন। বিলম্বের কারণে শুধু প্রার্থীই ক্ষতিগ্রস্ত হন না, পুরো শিক্ষাক্ষেত্রও এর নেতিবাচক প্রভাব ভোগ করে। শিক্ষক শূন্যপদ দীর্ঘায়িত হলে শিক্ষার্থীদের শেখার ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়, যা জাতীয় উন্নয়নের গতিকে ধীর করে দেয়।

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও এনটিআরসিএ যদি আন্তরিকভাবে চায়, তাহলে আধুনিক প্রযুক্তি, প্রশাসনিক দক্ষতা এবং সুসংগঠিত পরিকল্পনার মাধ্যমে এই বিলম্ব রোধ করা সম্ভব। অতিরিক্ত জটিলতা বা সময়ক্ষেপণ এড়িয়ে দ্রুত ফলাফল প্রকাশ করলে প্রার্থীরা যেমন স্বস্তি পাবেন, তেমনি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোও সময়মতো যোগ্য শিক্ষক পাবে। এতে শিক্ষাব্যবস্থা হবে আরও প্রাণবন্ত ও কার্যকর। মেঘে মেঘে অনেক বেলা গড়িয়েছে। তাই আর দেরি না করে অবিলম্বে ১৮তম শিক্ষক নিবন্ধনের ফাইনাল ফলাফল প্রকাশ করতে পারলে সেটিই হবে প্রার্থী, প্রতিষ্ঠান এবং দেশের শিক্ষা ব্যবস্থার জন্য সর্বাধিক কল্যাণকর পদক্ষেপ।

ওবায়দুল্লাহ ওবায়েদ

একজন কলামিস্ট, গুরুত্বপূর্ণ ও সমকালীন বিষয়ে গভীর বিশ্লেষণমূলক লেখালেখির জন্য পরিচিত।

Share.
Exit mobile version