আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে কুটনীতির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ পাঠ হল রাষ্ট্র গুলোর চরিত্র লক্ষ করা এবং তা এনালাইসিস করা। সে ক্ষেত্রে ১৯৭১ সালে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে জয়লাভের পর বৈশ্বিক রাজনীতিতে যে উত্থান-পতন, পরাশক্তিগুলোর শীতল যুদ্ধ, বিশ্বমন্দার মধ্যেও দ্বিপক্ষীয়, আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বজায় রেখে ১৯৭২ সালের পররাষ্ট্রনীতির মূল কথা হয়ে দাঁড়ায়: ‘সকলের সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারো সঙ্গে বৈরিতা নয়’ বঙ্গবন্ধু সেই পররাষ্ট্রনীতি প্রনয়ণ করে।
এটি কেবল নিছক নীতিবাক্য ছিল না; বরং ছিল বাংলাদেশের মতো ছোট কিন্তু ভূ-কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ রাষ্ট্রের বাস্তব প্রয়োজন। অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের স্বার্থে ভারত, সোভিয়েত ইউনিয়ন, যুক্তরাষ্ট্র, চীন ও মধ্যপ্রাচ্যের সঙ্গে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক জরুরি ছিল। তাই স্বাধীনতার পর বাংলাদেশ কোনো সামরিক জোটে যোগ দেয়নি। সরকার বদলালেও পাঁচ দশক ধরে এই নীতির মূল কাঠামো অটুট রয়েছে।
যা হোক, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে বাংলাদেশের ভারসাম্যনীতির ধারাবাহিকতার সামনে নতুন প্রশ্ন তৈরি করেছে একটি সাম্প্রতিক ঘটনার প্রেক্ষিতে ।
৩১ জুলাই ২০২৬ রিয়াদে সৌদি প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের আয়োজিত এক বৈঠকে বহুজাতিক মেরিটাইম ডিফেন্স অ্যালায়েন্স গঠনের ঘোষণা আসে। বৈঠকে ৪৩টি দেশ ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রতিনিধিরা অংশ নেন। শেষ পর্যন্ত সৌদি আরব, বাংলাদেশ, তুরস্ক, কুয়েত, বাহরাইন, কাতার, জর্ডান, মিসর, পাকিস্তান, জিবুতি, সোমালিয়া, ইয়েমেন, সুদান ও নাইজেরিয়াসহ ১৪টি দেশ যৌথ ঘোষণায় স্বাক্ষর করে।
দক্ষিণ এশিয়ায় একমাত্র বাংলাদেশ ও পাকিস্তান এই জোটে যোগ দিয়েছে। এবং কুটনৈতিকদের দাবি অনেকটাই ‘পাকিস্তানের হাত ধরে’ সৌদি আরবের এই প্রতিরক্ষা জোটে যুক্ত হয়েছে বাংলাদেশ।
এই জোটের গঠন শুধুমাত্র কূটনৈতিক আনুষ্ঠানিকতা নয়। ইরান-যুক্তরাষ্ট্র-ইজরায়েল যুদ্ধ শুরুর পর হরমুজ প্রণালি দিয়ে সৌদি জ্বালানি রপ্তানি কার্যত বন্ধ হয়ে যায়। বিকল্প হিসেবে সৌদি আরব লোহিত সাগরের উপকূলে অবস্থিত ইয়ানবু বন্দর ব্যবহার করে সৌদি জ্বালানি রপ্তানি কার্যক্রম শুরু করছিল, পরবর্তীতে ইরান-সমর্থিত হুতি বাহিনী সৌদি আরবের বিরুদ্ধে নৌ অবরোধ ঘোষণা করে এবং বাব-এল-মান্দেব, লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরে সৌদি জাহাজে হামলা চালায়। এই পরিস্থিতি মোকাবেলাতেই রিয়াদ বহুপাক্ষিক এই নিরাপত্তা কাঠামোর উদ্যোগ নেয়।
যৌথ ঘোষণায় জোটটিকে প্রতিরক্ষামূলক এবং কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে নয় বলে উল্লেখ করা হলেও বাস্তব প্রয়োগের ক্ষেত্রে এটি ইরান-সমর্থিত শক্তির মোকাবিলায় একটি সমন্বিত সামুদ্রিক নিরাপত্তা কাঠামো হিসেবে কাজ করবে, যেখানে সদস্য দেশগুলো গোয়েন্দা তথ্য বিনিময়, যৌথ সামরিক মহড়া এবং সমন্বিত নৌ অভিযান পরিচালনা করবে।
এর মধ্য দিয়ে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতির দীর্ঘদিনের অবস্থান থেকে একটি তাৎপর্যপূর্ণ বিচ্যুতি হিসেবেই দেখতে হবে। স্বাধীনতার পর থেকে যে ‘নন-অ্যালাইন্ড’ বা জোটনিরপেক্ষতা বাংলাদেশের কূটনীতির অন্যতম ভিত্তি ছিল, এই সামরিক নিরাপত্তা জোটে যুক্ত হওয়ার মধ্য দিয়ে সেই নীতির বাস্তব প্রয়োগে বড় ধরনের পরিবর্তন ঘটতে পারে। এর ফলে বাংলাদেশ আরব বিশ্বের প্রক্সি যুদ্ধে জড়িয়ে পড়ার আশঙ্কার সাথে সাথে ঐতিহাসিক ‘নন-অ্যালাইন্ড’ বা জোটনিরপেক্ষ অবস্থানের নৈতিক ভিত্তিও প্রশ্নের মুখে পড়বে।
এই জোটের লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য অভিন্ন আর তা হলো ইরান সমর্থিত জোটের বিপক্ষে সৌদির নেতৃত্বে একটি সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো তৈরি করা। অর্থাৎ ইরানের বিপক্ষেই এই জোট।
এখানেই বাংলাদেশের জন্য সম্ভাব্য কৌশলগত ঝুঁকিটা রয়েছে। অবশ্যই সৌদি আরব বাংলাদেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ দ্বিপাক্ষিক অংশীদার, বিশেষ করে শ্রমবাজার, রেমিট্যান্স, বিনিয়োগের ক্ষেত্রে দেশটির গুরুত্ব অনস্বীকার্য। বিপুলসংখ্যক বাংলাদেশি নাগরিক সৌদি আরবে কর্মরত এবং দুই দেশের অর্থনৈতিক সম্পর্ক বাংলাদেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। তবে মনে রাখা দরকার এটাও যে ইরান আমাদের জন্য কোন বৈরি রাষ্ট্র না। ঢাকার সঙ্গে তেহরানের স্বাভাবিক কূটনৈতিক সম্পর্ক বিদ্যমান এবং বাংলাদেশ ঐতিহাসিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন প্রতিদ্বন্দ্বী শক্তির মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও স্বতন্ত্র কূটনৈতিক অবস্থান বজায় রাখার চেষ্টা করে আসছে।
ইরান-ইসরায়েল সাম্প্রতিক সংঘাত মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে নতুন করে চরম উত্তেজনা সৃষ্টি হয়েছে। ইরান সরকারের কূটনৈতিক ও সামরিক নীতিমালার সাম্প্রতিক বার্তা অনুযায়ী, তারা কেবল ইসরায়েল এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অবস্থান বা নীতিকেই তাদের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে চিহ্নিত করছে না; বরং যেসব আঞ্চলিক ও আন্তর্জাতিক মিত্র এই প্রক্রিয়ায় সরাসরি বা পরোক্ষভাবে সহায়তা প্রদান করছে, তাদের ব্যাপারেও কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা ও নীতি গ্রহণের প্রতিক্রিয়া জানিয়েছে ।
ফলে কোনো আঞ্চলিক নিরাপত্তা কাঠামোয় অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য গুরুত্বপূর্ণ নীতি হবে-সেই কাঠামোটি কতটা প্রতিরক্ষামূলক ও বহুপাক্ষিক এবং এর মাধ্যমে বাংলাদেশ কোনো নির্দিষ্ট রাষ্ট্রের সঙ্গে কৌশলগত বিরোধে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত হয়ে পড়ছে কি না।
১২ আগস্ট ইয়েমেনের সৌদি আরব সমর্থিত সরকারের পরিবহন মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, লোহিত সাগরের বাব আল-মান্দেব প্রণালিতে একটি কার্গো জাহাজে ইরান সমর্থিত হুতিদের হামলায় চার নাবিক নিহত হয়েছে । রয়টার্স জানিয়েছে, জাহাজটি মিসরের মালিকাধীন ছিল। নতুন এই সৌদি নিরাপত্তা জোটের সদস্য হিসেবে রয়েছে মিসর। এই হামলা সৌদি নেতৃত্বাধীন নতুন নিরাপত্তা জোটের জন্য প্রথম বড় বাস্তব পরীক্ষা। ফলে এখন প্রশ্ন শুধু সৌদি আরবের নিরাপত্তা নিয়ে নয়; জোটের অন্য সদস্য রাষ্ট্রগুলোর ওপরও ইরান-সমর্থিত গোষ্ঠীগুলোর হামলার ঝুঁকি রয়েছে। কোনো সদস্য রাষ্ট্রের ওপর আঘাত এলে জোটের collective security mechanism বাস্তবে কতটা কার্যকর হবে- এই হামলা সেই প্রশ্নটিই সামনে নিয়ে এসেছে।
সেই সাথে লক্ষ্য করা উচিত, ইরান চীনে বিশাল পরিমাণ জ্বালানি রপ্তানি করে। এবং চীনের আরেক গুরুত্বপূর্ণ জ্বালানি হাব ছিল ভেনজুয়েলা যা এখন যুক্তরাষ্ট্রের দখলে। সুতরাং ইরান চীনের জন্য এখন খুবই গুরুত্বপূর্ণ এলাই। অন্যদিকে ইরান ও রাশিয়ার এই সম্পর্ক কেবল অর্থনৈতিক সহযোগিতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, এটি একটি কৌশলগত সম্পর্ক। সুতরাং, এই জোট কূটনৈতিকভাবে ইরানের পাশাপাশি চীন ও রাশিয়ার জন্যও অস্বস্তিকর হবে।
আরেকদিকে বাংলাদেশ-ভারত সম্পর্ক আজ তলানিতে পৌঁছানোর অন্যতম কারণ হলো, কূটনীতির জায়গায় জনতুষ্টিমূলক অবস্থান ক্রমেই প্রাধান্য পাচ্ছে। রাষ্ট্রীয় সম্পর্ক আবেগ দিয়ে নয়, স্বার্থ, বাস্তবতা ও কৌশল দিয়ে পরিচালিত হওয়া উচিত। কূটনীতি সফল হয় measurable outcome-এ, প্রতীকী অবস্থানে নয়। রাশিয়া বাংলাদেশের সঙ্গে ভারতীয় রুপিতে বাণিজ্যের প্রস্তাব দিয়েছে, এখন ভারতের সঙ্গে সম্পর্ককে জনতুষ্টি দিয়ে পরিচালনা করার সুযোগ আরও কমে গেছে। কারণ এখানে ভারত শুধু প্রতিবেশী রাষ্ট্র নয়—সম্ভাব্যভাবে বাংলাদেশের একটি গুরুত্বপূর্ণ trade-settlement architecture-এর অংশ হতে যাচ্ছে। একই সঙ্গে রাশিয়ার ওপর মার্কিন নিষেধাজ্ঞা এড়াতে এই ব্যবস্থা ব্যবহৃত হলে Washington বিষয়টিকে কীভাবে দেখবে, সেটিও বাংলাদেশের হিসাবের মধ্যে রাখতে হবে। বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি তাই কোনো পক্ষের প্রতি আবেগ বা বিরাগ দিয়ে নয়; বরং প্রতিটি সিদ্ধান্তের measurable economic, diplomatic and strategic cost-benefit হিসাব করে পরিচালিত হওয়া উচিত।
একইসঙ্গে ইন্দো-প্যাসিফিক অঞ্চলেও বাংলাদেশের জন্য ভারসাম্য রক্ষা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে। এখানে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত স্বার্থ, চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব এবং ভারতের আঞ্চলিক শক্তির অবস্থান-তিনটি শক্তি একই ভূরাজনৈতিক পরিসরে সক্রিয়। ফলে বাংলাদেশের জন্য কোনো একটি পক্ষকে বেছে নেওয়া নয়, বরং সবার সঙ্গে সম্পর্ক রেখে নিজের স্বার্থ ও কৌশলগত স্বাধীনতা বজায় রাখাই সবচেয়ে বড় কূটনৈতিক চ্যালেঞ্জ।
বড় শক্তিগুলোর জন্য এমন কূটনৈতিক মূল্য তুলনামূলক সহজ, কারণ তাদের অর্থনৈতিক, সামরিক ও কূটনৈতিক সক্ষমতা বিস্তৃত। কিন্তু বাংলাদেশের মতো ছোট রাষ্ট্রের জন্য প্রতিটি ভুল কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের মূল্য অনেক বেশি। তাই সৌদি নিরাপত্তা জোট শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশ প্রক্সি যুদ্ধের মাঠ হয় কিনা তা গুরুত্ব সহকারে ভেবে দেখা উচিত।